সেরা উদ্ভাবনী দেশের শীর্ষ পাঁচে নেই যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানী শীর্ষে

শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত এমন দেশগুলোর তালিকায় কানাডা, অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে পিছিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তালিকার প্রথম ১৫টি দেশের মধ্যে নেই যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগীসক্ষম দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুরের নাম। এদিকে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণমাধ্যম ব্লুমবার্গের সর্বশেষ উদ্ভাবনী সূচকে বিশ্বের সেরা উদ্ভাবনী দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে জার্মানি। তালিকার প্রথম পাঁচেও জায়গা পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। এটা যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ঘিরে আতঙ্ক সৃষ্টি করার মতো তথ্য বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

২০১৩ সালে ব্লুমবার্গের উদ্ভাবনী সূচকে শীর্ষস্থানে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নাম। সাত বছরের ব্যবধানে বর্তমানে দেশটির অবস্থান নবম। বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশটি যখন ক্রমাগত এক্ষেত্রে পিছু হঠছে, প্রতিদ্ব›দ্বী রাষ্ট্র চীন তখন এক্ষেত্রে নিয়ম করে উন্নতি করে চলেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীন একধাপ এগিয়ে এবারই প্রথম ১৫তম অবস্থানে উঠে এসেছে। গত ছয় বছর ধরে দক্ষিণ কোরিয়াই ছিল এই তালিকার শীর্ষে। উৎপাদনে ইতিবাচক রেটিংয়ের কারণে জার্মানি প্রথম এবং উৎপাদনশীলতা কম রেকর্ড হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়া দ্বিতীয় স্থানে চলে এসেছে। সিঙ্গাপুর ষষ্ঠস্থান থেকে লাফিয়ে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। এছাড়াও, স্ক্যান্ডিনেভিয়ার তিনটি দেশ জায়গা পেয়েছে সেরা দশে। জাপানের উদ্ভাবনী র‌্যাঙ্কিং তিন ধাপ কমেছে। দেশটি এখন ১২তম অবস্থানে রয়েছে।

এই সূচকে মোট ৬০টি দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিলো। তালিকাটি তৈরিতে গবেষণা, উন্নয়ন ব্যয়, উৎপাদন ক্ষমতা এবং উচ্চমানের প্রযুক্তি বিকাশে সরকারি সংস্থাগুলোর সক্ষমতাকে সূচকের মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। তবে এই সূচকের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে যেসব সূচক, যুক্তরাষ্ট্র আসলে সেগুলোতে পিছিয়ে পড়াতেই তার এমন অবনমন পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগীসক্ষম দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুরের নাম। ২০১৯ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (WEF) গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্টে ১৪১টি দেশের ১০৩টি প্রধান সূচক পরিমাপ করেছে। মূল্যস্ফীতি, ডিজিটাল দক্ষতা, বাণিজ্য শুল্ক, প্রতিষ্ঠান, সামষ্টিক অর্থনীতিক স্থিতিশীলতা এবং স্বাস্থ্যের মতো ১২টি প্রধান ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে ডবিøউইএফ। ২০১৮ সালের এ সংক্রান্ত তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও ২০১৯ সালে তাদের অবস্থান একধাপ অবনমিত হয়েছে।

কয়েকটি ক্যাটাগরিতে তুলনামূলক নিম্নস্কোর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য শুল্ক, জীবনমান প্রত্যাশার অবনমন এবং আমেরিকান জনগোষ্ঠীর নিম্ন ডিজিটাল দক্ষতা দেশটির সার্বিক স্কোরে পতন ঘটিয়েছে। ডব্লিউইএফে’র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের জীবনমান প্রত্যাশা চীনের নাগরিকদের চেয়ে কম। ধারণা করা হচ্ছে, এসব কারণেই সামগ্রিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে সৃজনশীল মানুষদের বেশি সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে উদ্ভাবন তথা আবিস্কারেও।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য উপযুক্ত এমন দেশগুলোর তালিকায় পিছিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং দেশটিতে বন্দুক হামলা ক্রমাগত বাড়তে থাকা এবং কর্মক্ষেত্রে বাবা মায়ের ছুটির অভাবের কারণে সেখানে সন্তান মানুষ করা বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য ভালো এমন দেশগুলোর তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান ১৮তম। আর এই তালিকায় শীর্ষে রয়েছে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের বেশ কিছু দেশ। বুধবার ইউএস নিউজ অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড রিপোর্টস ২০২০ এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকা স্বত্ত্বেও পারিবারিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। শিক্ষা এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে থাকলেও শিশু বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে অনেকটাই পিছিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটিতে চারজনের একটি পরিবারের প্রতি মাসে ব্যয় হয় চার হাজার ৪৫ ডলার। যেখানে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেন হেগেনে ব্যয় হয় তিন হাজার ৭০৫ ডলার। অপরদিকে দেশটিতে একজন শিশুর দেখাশুনার পেছনে চাইল্ড কেয়ারে বছরে ব্যয় হয় ৯ হাজার থেকে ৯ হাজার ৬শ ডলার। প্রতি মাসে খরচ হয় ৭৫০ ডলার। চাইল্ড কেয়ারে অতিরিক্ত ব্যয়ভার বহনে সরকারের তরফ থেকে কোনো সুবিধা পান না বাবা-মায়েরা।

২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কমপক্ষে ৪৫টি স্কুলে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলায় বহু শিশু প্রাণ হারিয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের হামলা বেড়ে যাওয়ায় দেশটিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মার্কিন সংবিধান বন্দুকের মালিকানার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিলেও বয়স্ক লোকজন এবং শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় লক্ষণীয় কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শিশু দেখাশোনায় পিছিয়ে পড়াটা যুক্তরাষ্ট্রের সব খাতকেই প্রভাবিত করবে।

২০২০ সালে ব্লুমবার্গের উদ্ভাবনী সূচকে সেরা দশে থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে-

১. জার্মানি : এই তালিকায় সবার শীর্ষে রয়েছে জার্মানি। দেশটি যখন তাদের অর্থনীতি নিয়ে লড়াই করছে, সেসময়ে এমন ফলাফল কিছুটা হলেও অবাক করেছে বিশ্বকে। ২০১৯ সালে তাদের অর্থনীতি গত ছয় বছরে তুলনায় সবচেয়ে ধীর গতিতে বেড়েছে। বাণিজ্য বিবাদ, স্বয়ংচালিত শিল্পের সংকট এবং ব্রেক্সিটের প্রভাব পড়েছে জামানির অর্থনীতিতে। এরপরও দেশটি সেরা উদ্ভাবনী দেশ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে।

২. দক্ষিণ কোরিয়া : সামান্য ব্যবধানে প্রথমস্থান হারিয়েছে এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটির প্রযুক্তিভিত্তিক সেরা প্রতিষ্ঠান হলো: স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স, হুন্দাই মোটরস এবং এলজি ইলেকট্রনিক্স। সিউলের হানিয়াং বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক চ্যাং সুক-গাউন ব্লুমবার্গকে বলেছেন, ‘আমাদের কাছে অন্যকোনও প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। আমাদের ব্যবহার করার মতো সম্পদ শুধুই মস্তিষ্ক।’

৩. সিঙ্গাপুর : গত বছর সব সূচকেই সিঙ্গাপুরে অর্জন ছিলো উচ্চ পর্যায়ের। ফলে দেশটি ২০২০ সালে ৬ষ্ঠ স্থান থেকে তৃতীয় স্থানে উঠে এসেছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনীয় উৎপাদনের উন্নতি সিঙ্গাপুরকে উপরের দিকে উঠে আসতে সহায়তা করেছে।

৪. সুইজারল্যান্ড : সুইজারল্যান্ড ধারাবাহিকভাবে বিশ্বের শীর্ষ ২০ উদ্ভাবনী দেশের তালিকায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট নোভার্টিস এবং হফম্যান-লা রোচে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেছে। এ কারণে দেশটির মূল্য সংযোজনীয় উৎপাদনের উচ্চমান নিয়ে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

৫. সুইডেন : ২০১৮ সালের দ্বিতীয় স্থানে থাকা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অপর দেশ সুইডেন এবার পঞ্চমস্থানে নেমে এসেছে। দেশটি উৎপাদন বিভাগে ধারাবাহিকভাবে ভালো স্কোর করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের টেক জায়ান্ট স্পটিফাইয়ের এর সহযোগিতায় প্রযুক্তি খাতে উন্নতি করেছে সুইডেন।

৬. ইসরাইল : মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তিধর ইসরাইল গত বছরের তুলনায় এক ধাপ পিছিয়েছে। সূচকের উৎপাদনশীলতা এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনায় পিছিয়ে থাকলেও, গবেষণা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রথম অবস্থানে ছিলো দেশটি।

৭. ফিনল্যান্ড : এ বছর ফিনল্যান্ডের চার ধাপ অবনমন হয়েছে। গত বছর তৃতীয়স্থানে থাকা দেশটি এবার জায়গা পেয়েছে সাতে। ফিনল্যান্ড সূচকের সব বিভাগে ভালো পয়েন্ট অর্জন করলেও শীর্ষ তিনে থাকার জন্য তা যথেষ্ট ছিলো না।

৮. ডেনমার্ক : ব্লুমবার্গের উদ্ভাবনী সূচকের শীর্ষ দশে রয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্ক। দেশটি বিশ্ব উদ্ভাবনী সূচকেও ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে রয়েছে। মূলধন, গবেষণা, অবকাঠামো এবং ব্যবসার উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ডেনমার্ক।

৯. যুক্তরাষ্ট্র : ব্লুমবার্গের উদ্ভাবনী সূচক প্রথম প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। প্রথমবারেই সবার শীর্ষে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র। এর পরের বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ধারাবাহিকভাবে নিচের দিকে নেমে এসেছে। যদিও বিশ্বে নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখতে উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং উদ্ভাবনী কার্যক্রম, দুটি বিষয়ে সবার থেকে এগিয়ে ছিলো যুক্তরাষ্ট্র।

১০. ফ্রান্স : এই তালিকায় থাকা একমাত্র দেশ ফ্রান্সের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হয়নি। গতবারও দেশটির অবস্থান ছিলো ১০ এ। করপোরেট গবেষণা ও উন্নয়ন এবং টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোতে বিনিয়োগের কারণেই শীর্ষে দশে জায়গা পেয়েছে দেশটি। ফ্রান্সের শিক্ষাব্যবস্থাকে এই সূচকের জন্য বিবেচনায় আনা হয়নি।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 53 = 55