কৈশোরের ডায়েরি: প্রথম পর্ব

পূর্বকথা-

পৃথিবী নানা আশ্চর্য ও রহস্যে ভরা, তাই জীবন প্রতি মূহুর্তে আমাদের শেখায় শুধু শেখার ইচ্ছা আর প্রচেষ্টা থাকলেই আমরা জীবনকে নতুন আঙ্গিকে দেখতে পারি। ব্যাক্তিগত জীবনে আমি ছেলেবেলা থেকেই কৌতুহল প্রবণ, তাই পৃথিবীর বিভিন্ন জিনিস কেন হয় এই প্রশ্ন আমার মনকে নাড়া দিত! আমার কৌতুহলি মন শিশুকাল থেকেই প্রশ্ন করতে শেখে কেন দিন রাত্রি হয়? কেন আকাশে সূর্য ওঠে? কেন মানুষ মারা যায়? কেন আমরা ধর্ম মানি? এটা না মানলে কি সমস্যা? ইত্যাদি…। এইরকম বহুবিধ প্রশ্ন আমার মনে নাড়া দিত বড়দের কাছ থেকে এই প্রশ্ন গুলির উত্তর আশা করতাম! কিন্তু এগুলির উত্তর কখনও পাইনি, তার পরিবর্তে এই প্রশ্নের কারণে অনেকে আমাকে এড়িয়ে চলত, অনেকে আবার আমাকে বাচাল মনে করত! অনেকে আবার মনে করত আমার মস্তিষ্কে বিকৃতি রয়েছে, অনেকে আবার এই প্রথা বিরোধী প্রশ্নের জন্য আমার উপর ক্রুদ্ধ হত, কেউ কেউ আবার ছেলে মানুষের কথা ভেবে গুরুত্ব দিত না! অনেকে আবার প্রকাশ্যে ও প্রচ্ছন্নে হুমকি ও দিত ‘এর ফল ভালো হবে না, এর জন্য চরম ফল ভোগ করতে হবে’! অনেকে আবার চরম ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিল!

যাক জীবনে এইরকম বহু অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, তবে মনের দুর্দমনীয় প্রশ্ন করার আকাঙ্ক্ষা ও জানার কৌতুহল এতটুকু কমেনি। ধীরে ধীরে যখন একটু বড় হলাম তখন পৃথিবীর সৃষ্টি হল কিভাবে, আদিম মানুষ থেকে আধুনিক সভ্যতার বিকাশ হল কিভাবে এগুলি জানতে পারলাম। এগুলি খুবই আগ্রহের সঙ্গে পড়তাম এবং পৃথিবী ও মানবসভ্যতার বিবর্তন যেন চোখের সামনে ভেসে উঠত। এরপর আর একটু উচু ক্লাসে উঠে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আন্দোলন সম্পর্কে পড়ার সুযোগ পায় এই বইগুলি পড়ে জানতে পারি পৃথিবীতে বিভিন্ন রকম ধর্মের উৎপত্তি হল কিভাবে! মনে প্রশ্ন জাগত পৃথিবীতে এত ধর্ম কেন? কি প্রয়োজন ছিল ঈশ্বরের এত ধর্ম প্রবর্তনের? আর একটু বড় হয়ে পড়ি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ম সংস্কার আন্দোলন, সেখানে জানতে পারি ইউরোপে ক্যাথলিক ধর্মমত ও চার্চের বিরুদ্ধে প্রটেষ্টান ধর্মমতের প্রসার, ভারতে হিন্দু ধর্মের গোড়ামির বিরুদ্ধে ডিরোজিওর নব্যবঙ্গ আন্দোলন, রাজা রামমোহন রায়ের নেতৃত্বে সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধকরণ ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নেতৃত্বে বিধবা বিবাহ প্রবর্তন ও নারী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি এগুলি আমার মনকে তীব্র ভাবে নাড়া দিত!

আমার মনে প্রশ্ন জাগত পৃথিবীতে যদি সব ধর্মের মানুষরাই তাঁদের ধর্মকে সংস্কার করতে পারে এবং বাইবেল, বেদ ইত্যাদির বিরুদ্ধে গিয়ে যদি সমাজ পরিবর্তন করতে পারে, তাহলে আমি যে ধর্ম অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছি এই ধর্মের কোন পরিবর্তন হয় না কেন? এই ধর্মে কি কোন ভুল নেই? সত্যিই কি আল্লাই অভ্রান্ত? সত্যিই আল্লা কি জগতের একমাত্র মালিক? তাহলে ভগবান, গড, যিশু, শিব এরা কেমন ঈশ্বর? এদের মধ্যে যদি যুদ্ধ হয় কে জিতবে? মোল্লারা যে বলে কোরানে কোন ভুল নেই তা কতটা যথার্থ? আল্লা কেন মানুষকে কোরানের মত একটা বই লেখার চ্যালেঞ্জ করে, যে সর্বশক্তিমান সে মানুষের মত এক তুচ্ছ প্রাণীকে কেন কোরান লেখার চ্যালেঞ্জ জানাবে? তাহলে কোরান কি কোন মানুষের লেখা? আচ্ছা পৃথিবীতে কি একজন মানুষ ও এমন নেই যে মনে করেন ইসলাম অভ্রান্ত নয়? যখন বেদ, বাইবেল সমস্ত ধর্ম গ্রন্থের ভুল মানুষ ধরে তখন কি কোরানে ও ইসলামে সত্যিই কোন ভুল নেই? সত্যি বলতে কি এই প্রশ্নগুলি মনে তীব্র ভাবে নাড়া দিত!

ব্যাক্তিগত জীবনে কেন জানি না জন্মের পর থেকেই আমি অবিশ্বাসী! যদিও এর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব আমি আমার বাবাকে দিতে চাই, কারণ বাবা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন শুক্রবারে নামাজের দিন তিনি তাঁর দোকানে বসে টিভি দেখতেন, আমার দাদু এই জন্য আমার বাবাকে খুব রাগারাগি করতেন। যদিও বাবা এগুলি বিশেষ আমল দিতেন না। একদিন বাবাকে জিজ্ঞাসা করি আল্লা বড়, শিব বড় না গড বড়? কোন ধর্ম সবচেয়ে ভালো ইসলাম, হিন্দু না খ্রিস্টান? বাবা বলেছিলেন ‘সব ধর্মই ভালো, সবাই সমান!’ তাই প্রকৃতপক্ষে শিশু বয়স থেকেই আমার মনে বাবার এই আদর্শের প্রতিফলন ঘটতে থাকে এবং ধর্মকে দূরে সরিয়ে রেখে মানুষকে ভালোবাসতে শিখি।

আমি ছোটবেলায় পড়তে খুব ভালোবাসতাম বা বলা ভালো এখনও ভালোবাসি। বাবা আমাকে বিভিন্ন গল্পের বই ও বিভিন্ন ধরনের বই কিনে দিতেন এই বইগুলির একটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যতদূর মনে পড়ে ‘ছোটদের মুকুল নামে’ এক বই বাবা এনে দিয়েছিলেন। এই বইটি ছিল বিভিন্ন দেশের গল্প, উপকথা, মহাপুরুষের জীবনী, ভ্রমণ, সংস্কৃতি, সাহিত্য ইত্যাদির সংকলন! এই বইতে ছিল নেপোলিয়ান বোনাপার্ট, আব্রাহাম লিঙ্কন, মহাদেব গোবিন্দ রানাডে ইত্যাদির মত মহাপুরুষের বাল্যকাল ও জীবনী সত্যি বলতে কি এগুলি আমাকে পৃথিবীকে নতুন করে বুঝতে শেখায়। কিছু দিন পর এলাকায় কেবল টিভি আসার পর ন্যাচরাল জিওগ্রাফি, ডিসকভারি ইত্যাদি চ্যানেল দেখতাম এর ফলে অতি অল্প বয়সেই এমন বহু বিষয় আমার কারায়ত্ব হয়ে ছিল যা আমার সম বয়স্ক অনেক শিশুরাই জানত না! এই জানার আগ্রহের কারণেই শিশু বয়সেই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা, আমেরিকার আফগানিস্তান আক্রমণ, লাদেন, ইরাক যুদ্ধ, সাদ্দাম হুসেনের পতন ইত্যাদি বিষয় গুলি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলাম এই ঘটনাগুলি পৃথিবী সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গি তৈরীতে বিশেষ সাহায্য করেছিল!

তবে সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হল যে বাবার আদর্শে আমি মানবতার শিক্ষা গ্রহণ করি আজ তিনি বেশ কিছুটা ধর্মান্ধতার করাল গ্রাসে নিমজ্জিত! আসলে বাবা তীব্র দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, তাই লেখাপড়া শেখার বিশেষ সুযোগ পাননি, জীবনে কঠোর পরিশ্রম করে নিজের পায়ে দাঁড়ান এবং সমাজে মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই জীবনে যখন তিনি অনেক কঠিন সমস্যার সম্মুখীন হলেন এবং অনেক কষ্টে নিজেকে আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন তখন অনেক বন্ধু ও মোল্লারা বাবাকে বলতে লাগল দেখ- ‘তোমার আজ এত সমস্যা কারণ তুমি ইমানদার নও, তুমি আল্লার উপর বিশ্বাস কর না, তাই তোমার এত কষ্ট এত সমস্যা!’ সম্ভবত আমার বাবা এদের কথায় প্রভাবিত হয়ে বেশ কিছুটা ধর্মের পথে ফিরে আসে। যদিও বাবাকে প্রশ্ন করি তুমিও তো ধর্মকর্ম মানতে না তখন বাবা তা অস্বীকার করেন তিনি বলেন আমি সর্বদায় ধর্ম মানতাম, আর প্রত্যেককে তাঁর নিজের ধর্ম মানা উচিত! তবে আমার উপলব্ধি জীবনে হয়তো কঠিন সমস্যা ও বয়সের ভারে আজ আমার বাবা বেশ কিছুটা ধর্মান্ধতাকে গ্রহণ করেছে তবুও এটা বলতে দ্বিধা নেই আর পাঁচটা বাবার থেকে আজও তিনি অনেকটা ধর্মনিরপেক্ষ এবং সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত একজন মানুষ। তবুও আশাকরি আমি যেন আমার পুরানো বাবাকে ফিরে পাই, তা হয়তো হবে না তবুও সেই বাবাই আমার কাছে কাঙ্ক্ষিত!

যাক জীবনে যখন এই রকম বহু প্রশ্ন ও ঝড়ঝঞ্ঝা চলছে তখন পৃথিবী সম্পর্কে, জগৎ ও সংসার নিয়ে আমার মনে নানা প্রশ্ন দেখা দিল। সমাজের দারিদ্রতা, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, নারীর উপর অত্যাচার এগুলি আমার মনে তীব্র ভাবে নাড়া দিতে থাকে। তখন ধর্মের অনাচার গুলি চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে, কাউকে এবিষয়ে প্রশ্ন করার উপায় নেই। তখন আজকের মতো ইন্টারনেট, ফেসবুক, টুইটার ইত্যাদির উদ্ভব হয়নি। তাই এগুলির বিরুদ্ধ মত সম্পর্কে জানার বিশেষ সুযোগ ছিল না। তাই এই অনাচার ও অন্যায়ের প্রতিবাদে আমার বিদ্রোহী ও অনুসন্ধিৎসু মন লিখতে শুরু করে। আমার তখন মনে হত আমিই হয়তো পৃথিবীর প্রথম মানুষ যে এই ধর্মের বিরুদ্ধে লিখছি। তাই আমি আমার মনের কথা গুলি লিপিবদ্ধ করি। মনে মনে ভাবি, আমি যদি কোনদিন মারা যায় তাহলে একদিন এই লেখা প্রকাশ পাবে এবং মানুষ আমার কথা জানতে পারবে।

চোদ্দ পনেরো বছর বয়সের এই কাঁচা হাতের লেখাগুলি আজ যে প্রযুক্তির কল্যাণে প্রকাশ করতে পারব এটাই ভেবেই ভালো লাগছে! প্রকৃতপক্ষে তখন ও আমার কোন মুক্তচিন্তা বা মুক্তচিন্তক সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না। প্রথম আমার ধারণা হয় যখন শুনি ‘তসলিমা নাসরিন’ নামে কেউ একজন আছে তিনি ধর্ম মানেন না! তারপর একদিন দেখি কলকাতা পুড়ছে কারণ তসলিমা নাসরিনকে কলকাতা থেকে বিতাড়িত করতে হবে! সত্যি কথা বলতে কি সেদিন প্রচন্ড ক্রুদ্ধ হয়, বাড়িতে বসে যখন দেখি মোল্লারা টিভিতে তসলিমা নাসরিনকে প্রচুর গালিগালাজ করছে তখন আমার প্রচন্ড রাগ হয়! সত্যি বলতে কি তখন ও আমি ধার্মিক না অধার্মিক এটা নিয়ে দন্দে ছিলাম এবং ইসলাম ও কোরান মানে না এমন মানুষ পৃথিবীতে আছে এটা জানতাম না। সত্যি বলতে কি সেদিন থেকেই আমার নতুন জন্ম হল, সেদিন থেকেই ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে সারাজীবন আপসহীন সংগ্রাম করব এই শপথ নিলাম। সেদিন মনে মনে এই শপথ নিলাম তসলিমা নাসরিনের বিরুদ্ধে এই অন্যায়ের বদলা নিতে হবে। সমাজে লক্ষ লক্ষ তসলিমা তৈরী করতে হবে, তখন দেখব এই মোল্লাতন্ত্র কোথায় যায়?

তবে এটা ঠিক তসলিমা নাসরিনের কথা জানতে পেরে খুবই আনন্দিত হয়, কিছু দিন আগে পর্যন্ত ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে আন্দোলন মানে একমাত্র তসলিমা নাসরিনকেই চিনতাম, ধীরে ধীরে সালমান রুশদি ও আরও অন্যান্য মুক্তচিন্তকদের সম্পর্কে পরিচিত হলাম। বুঝলাম পৃথিবী শুধু আমার এই পাড়া ও আমার এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বহু মানুষ আছেন যারা ধর্ম মানেন না! তবে তখন এটাও মনে করলাম যেহেতু তসলিমা নাসরিন লিখছে তাই আমার এখন লেখার প্রয়োজন নেই, আমার এখন পড়াশোনা করা প্রয়োজন পড়া শেষে পরে লিখব।

এই ঘটনার বেশ কয়েক বছর পরে কলেজে পড়ার শেষের দিকে স্কুলের পুরানো এক শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয় হয় তিনি হঠাৎ বলেন- ‘তোমার দ্বারা হবে, তুমি লেখ, তুমি যখন লিখবে তোমার কলম কথা বলবে’! আমার এই শিক্ষকের এক ছোটখাটো লিটিল ম্যাগাজিন আছে তিনি এখানে লেখা প্রকাশ করেন কিছু সাহিত্যিকের আড্ডা বসত সেখানে। তাঁরা কিছু কবিতা লেখা নিয়ে যেত, আমাকে বলা হয় দুএকটা লেখা নিয়ে যেতে আমিও ছোট খাটো দুএকটা লেখা নিয়ে যেতাম সেখান থেকেই নতুন করে লেখার শুরু। পরে কোন এক বিখ্যাত মুক্তমনাকে পুরানো দুএকটি লেখার ছবি পাঠায় তিনি কি পড়েছেন জানি না, তবে তিনি খুবই প্রশংসা করেন ও লেখার জন্য উৎসাহ দেন। জানি না তিনি সেদিন সত্যিই ভালোবেসে বলেছিলেন না উৎসাহ দেওয়ার জন্যই বলেছিলেন! তবে তিনি এটাও বলেছিলেন তোমার একটা ইবুক বানিয়ে দেব। সেটা আর তিনি করে দেওয়ার সুযোগ পাননি, সম্ভবত তিনি সত্যিই খুবই ব্যস্ত তাই পারেন নি। তবে তাঁর সহচার্য জীবনে এগিয়ে যেতে প্রভূত সাহায্য করেছে।

এভাবেই লেখনির জগতে পা রাখা কোন বিশেষ চিন্তা বাসনা নিয়ে নয়; এই লেখা শুধু মনের কথা প্রকাশ করার ইচ্ছা ও সমাজকে ভালো কিছু দেওয়ার বাসনা নিয়ে এই লেখালিখির জগতে পা রাখা। যাক এবার মূল কথায় ফিরে আসি এই ‘কৈশোরের ডায়েরি’ আমার চোদ্দ পনেরো বছর বয়সের কাঁচা হাতের লেখা, কাঁচা মনের কল্পনা! লেখাগুলি আজও মনে কৌতুহল তৈরী করে কখনও ভাবিনি এভাবে লেখা প্রকাশ করতে পারব। লেখাগুলি পড়ি ও স্মৃতির অতল গহ্বরে গিয়ে মনে মনে হাসি! আশাবাদী এই লেখাটি বহু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকেও নতুন করে চিন্তা করতে শেখাবে। এই লেখাটি আমার কাছে আয়নার মতো এই লেখা থেকে বুঝতে পারি কৈশোর বয়সে আমি কেমন চিন্তা করতাম ও কি ভাবতাম! ওই সময়ের লেখাগুলি তারিখ ও সময় দিয়ে লিখতাম, তাই মূল লেখাতে কোন পরিবর্তন করব না। অপরিণত কাঁচা হাতের লেখা আপনাদের কাছে প্রকাশ করলাম, ত্রুটি বিচ্যুতি হলে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল!
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~

7.15 P.M                                   24/09/2007

□ আমরা আসলে কে?
☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆☆

আমরা মনুষ্য জাতি যুগে যুগে যখন মানুষ পথ হারিয়েছে তখন মহাপুরুষেরা পথ দেখিয়ে গেছেন এগুলিই পরবর্তীকালে ধর্ম হয়ে দাড়িয়েছে।

নানা মহাপুরুষের মতামত নিয়ে এক একটি ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক ধর্মের লোকেরা ধর্মের মূল উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে বাহ্যিক আচরণ নিয়ে বেশি মাতামাতি করে। মানুষের প্রয়োজনের জন্য সৃষ্ট যে ধর্ম তার কিভাবে অপপ্রয়োগ?

সমাজ আমি মুসলমান ও হিন্দু ও খৃষ্টান ও বৌদ্ধ ও শিখ ইত্যাদি। মুসলমানরা বলছে ওদের বাড়িতে গেলে গোনা, ধর্ম নষ্ট হবে। হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, শিখ সকল ধর্মের লোকেরাই একই কথা ভাবছে।

এবার, মুসলমানদের মধ্যে আবার ভাগ শিয়া ও সুন্নি। শিয়া ওদের সঙ্গে বেশি থাকা ভালো নয় ও সুন্নি ওরা একটু বেশি আনাড়ি।

গোত্র- আবার শিয়া, সুন্নিদের মধ্যে ওরা শেখ, ওরা কাজী, ওরা মল্লিক, ওরা মুন্সী, ওরা হালদার ইত্যাদি ভাগ চালু আছে। মল্লিকদের একটা শির বাড়া, কাজীরা বহুত পাজি, শেখ করে ভেক ভেক ইত্যাদি প্রবাদ চালু রয়েছে! অনেকে আবার কেউ মল্লিকদের, কেউ কাজীদের, কেউ শেখদের দেখতে পারে না। কোন কোন বংশে মল্লিকদের বাড়িতে মেয়েদের বিয়ে দিতে রাজি নয় এবং ছেলেদের বিয়ে ও অন্য কোথাও দেয়, এটা অন্য একটা গোত্রের প্রতি চরম ঘৃণা নয়? আবার কাজী-মল্লিক, শেখ-কাজী ইত্যাদি গোত্রের মধ্যে এই সব ঘৃণা চালু নেই তা বলা যাবে না!

হিন্দুদের ক্ষেত্রে- হিন্দুদের সমাজ চারভাগে বিভক্ত ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।

ব্রাহ্মণ- সমাজের সবচেয়ে উপরে এর মধ্যে কুলীন, বড় ব্রাহ্মণ, ছোট ব্রাহ্মণ ইত্যাদি আছে। এরা পরস্পরের বিরোধীতায় পঞ্চমুখ। এই ব্রাহ্মণরা অন্য গোত্রগুলি বৈশ্য, শূদ্র এদের নিচু জাত বলে অপমান করে।

ক্ষত্রিয়- এরা রাজা মহারাজার বংশ এদের মধ্যে ও বিরোধীতা প্রবল। যেমন- রাজপুত, সিন্ধিয়া, ভোঁসলে প্রভৃতি এরা একে অপরকে খুব একটা পছন্দ করে না।

বৈশ্য ও শূদ্র- এরা সমাজের নিম্নশ্রেণীর মানুষ এদের উচ্চশ্রেণীর মানুষেরা পচ্ছন্দ করে না।

ধর্মের নামে কি এটা অন্যায় নয়?

খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে- খ্রিস্টান সম্প্রদায় দুই ভাগে বিভক্ত এক- ক্যাথলিক ও দুই- প্রোটেষ্টান।

ক্যাথলিক- এরা যিশুর মূর্তি মানে এরা গোঁড়া খ্রিস্টান নামে পরিচিত। এদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ আজও খ্রিস্টান সমাজকে ধর্মের দিক থেকে শাসন করছে।

প্রোটেষ্টান- এরা যুক্তিবাদে বিশ্বাসী, খ্রিস্টান সমাজকে পোপের হাত থেকে রক্ষাকরতে এই ধর্মমত সৃষ্টি হয়েছে। এরা মূর্তিপূজা বিরোধী। বর্তমানে প্রোটেষ্টান ধর্মমতের খ্রিষ্টানদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি যা মানব সভ্যতার কাছে আশীর্বাদ স্বরূপ!

বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে- এরা হীনযান, মহাযান ও ব্রজযান এই তিনভাগে বিভক্ত। হীনযান পন্থীরা মনে করেন নিজের চেষ্টায় মহাজ্ঞানী হওয়া যায়। এছাড়া মহাযান ও ব্রজযান মতবাদ রয়েছে।

জৈন্যদের ক্ষেত্রে- এরা শেতাম্বর ও দিগম্বর এই দুইভাগে বিভক্ত।

তাহলে আমরা প্রথমে বলছি মুসলমানদের সঙ্গে হিন্দুদের বা মুসলমানদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের বা খ্রিস্টানদের সঙ্গে হিন্দুদের মেলামেশায় ধর্মনাশ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে!

এটা কি যুক্তি সঙ্গত কথা?

আবার মুসলমানদের মধ্যে শিয়া, সুন্নি। তারপর মল্লিক, কাজী, শেখ, মুন্সী প্রভৃতি গোত্রে ভাগ করছি এবং নানা রকম ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করছি। তারপর আবার গরীব বড়লোকে ভাগ।

হিন্দুদের ক্ষেত্রে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত এদের মধ্যে গোড়ামি ও সংকীর্ণতা বিদ্যমান!

খ্রিস্টানরা ক্যাথলিক, প্রোটেষ্টান। বৌদ্ধরা হীনযান, মহাযান ও ব্রজযান। জৈন্যরা শ্বেতাম্বর, দিগম্বর ইত্যাদি ভাগে বিভক্ত।

তাহলে আমাদের কাছে কি মানুষের কোন মূল্য নেই?

তাহলে কি কোন জাত বা ধর্ম মেনে আমরা রক্ষণশীল হয়ে, নিশ্চুপ থেকে কোন উচিত কাজ করছি?

আর কতদিন, আর কতদিন আমরা প্রথমে মানুষকে ধর্মের নামে ভাগ করব, তারপর জাতের নামে, তারপর সম্প্রদায়ের নামে, তারপর বংশ পরম্পরার নামে, তারপর ধনী দরিদ্রের নামে ভাগ করব?

এই ধর্ম ও জাতির নামে ভাগ করে করে- ‘আমরা যে মানুষ, মানুষের সেবা করাই আমাদের প্রকৃত ধর্ম!’ এই কথাটি আমরা ভুলে গেছি!

তাহলে মানব সমাজের সত্যিই কি কোন জাত বা ধর্মের প্রয়োজন রয়েছে?

চলবে…

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of