লৌকিক লোকলীলা (উপন্যাস: পর্ব-পাঁচ)

ওরা তিনজন যখন রাস্তার পাশের পুরোনো দিনের ওয়াল করা ঘরটার খুব কাছে এসে পড়ে তখন অতুলের একদা চর্চিত সুরেলা গলার গান থেমে যায়, আর যাত্রার সংলাপ বলার ঢঙে আবেগঘন কণ্ঠে বলতে থাকে, ‘রাধা, রাধা, রাধা; দুঃখিনী রাধা, অভাগিনী রাধা, বিরহিণী রাধা…!’

অতুলের ঘরের রাস্তার দিকের জানালাটা খোলা, জানালা বরাবর এসে অমল দাঁড়ায়, পরিমল আর বিলাস অমলকে অতিক্রম করে কিছুটা সামনে গিয়ে থামে, অমল জানালা দিয়ে ঘরের ভেতরে তাকায় কিন্তু জমাট অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। হঠাৎ-ই আবেগ ঝেড়ে ফেলে চিৎকার করে ধমকের সুরে বলতে শুরু করে অতুল-‘চালাক কানু, হারামজাদা কানু, ধোঁকাবাজ কানু! kanu wasn’t real lover, I hate him, but I love Radha. Radha was unlucky, her husband Ayan Ghosh was a stupid and blind righteous, he doesn’t know what is love! Not only Radha, he wasn’t worthy of love any women. On the other hand, kanu was clever, fraud, he didn’t respect Radha’s love, he abused Radha. So, Kanu and Ayan Ghosh both of them heartless and too much unqualified for Radha. Radha was great lover, I love Radha, I love Radha! I am not fraud, but unfortunately I lost my Radha.’

কথাগুলো বলতে বলতে শেষদিকে কান্নায় গলা জড়িয়ে আসে অতুলের, কয়েক মুহূর্তের বিরতি দিয়ে কান্না জড়ানো কণ্ঠে আবার গাইতে শুরু করে- ‘ও কী ও…কলঙ্কিনী রাধা…’

ওরা তিনজন আবার পা চালায়। অমল বলে, ‘অতুলদারে নিয়ে স্কুলের স্যার, এলাকার লোকজন সবারই খুব উচ্চাশা ছিল। সবাই ভাবত অতুলদা বড় কিছু হবি, কত ভাল ছাত্র ছিল, আর কী ভাল গান গাইত, সব শ্যাষ, ক্যামনে যে কী হয়ে গেল!’

বিলাসের মুখ থেকে সংস্কার উদ্গত হয়, ‘সব কপাল, কপালে ল্যাহা ছিল পাগল হওয়া!’

পরিমল বলে, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ওর নাকি এক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল, পরে সেই মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়, সবার ধারণা ওই মেয়ের শোকেই পাগল হইছে।’

অমল বলে, ‘কী জানি, সত্যি কী মিথ্যে! অমন ভাল মানুষটা যে পাগল হয়ে গেল, এইডে ভাবলিই খারাপ লাগে।’

অতুল পাগল, এখন এই নামেই সে এলাকায় পরিচিত, বয়স সাইত্রিশ-আটত্রিশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে মাস্টার্স শেষ করার পর ঢাকার একটা বেসরকারি স্কুলে চাকরি পেয়েছিল, চাকরির পাশাপাশি বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ওই সময় থেকেই ওর আচরণ বদলাতে থাকে, তারপর পুরোপুরি পাগল হয়ে যায়। অতুলকে পাবনার মানসিক হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করিয়েও কোনো ফল হয়নি, হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা ছাড়াও কবিরাজি চিকিৎসা করা হয়েছে, বহু পীর-ফকির-সাধুবাবার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, বাড়িতে মানসা করে কালীপূজা করা হয়েছে, হাজরা পূজায় মানসা করে পাঁঠা বলি দেওয়া হয়েছে, বিপত্তারিণী দেবীর পূজা দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কিছুতেই মানসিকভাবে সুস্থ হয়নি অতুল। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে, দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে অনেক আগেই, বাবা মারা গেছেন বছর কয়েক আগে, এখন অতুলের দেখাশোনা করেন বিধবা মা উমা রায়। উমা’র বয়স ষাটের মতো, তার নিজের দেখাশোনার জন্যই এখন মানুষ দরকার, তাই তিনি প্রথমে তার ছোট মেয়ে গীতাকে বলেছিলেন জামাই আর সন্তানদের নিয়ে এখানে এসে থাকতে, জামাইকে লোকে ঘরজামাই বলবে এই অজুহাতে মেয়ে-জামাই রাজি হয়নি। গীতা আর জামাইকে বোঝাতে তিনি যখন জামাইয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন তখন একরাতে নিজে কানে শোনেন গীতার উদ্দেশে বলা জামাইয়ের কথা, ‘পাগলডা মরলি তো সম্পত্তি তুমরা দুই বুনই পাবানে, খালি খালি এহন ওই পাগল বাল টানবার যাবি কিডা!’ একই প্রস্তাব বড় মেয়ে রিতাকে দিয়েও প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন উমা, মেয়েরা বাবার ভিটেয় এসে মা এবং ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়ে থাকতে না চাইলেও পৈত্রিক সম্পত্তির ওপর তাদের লোভ আছে। পৈত্রিক সূত্রে অতুল অনেক সম্পত্তি পেয়েছে, উমার নিজের নামেও কিছু সম্পত্তি আছে, রিতা আর গীতা বেশ কয়েকবার উমাকে চাপ দিয়েছে জমি বিক্রি করে তাদেরকে টাকা দেবার জন্য, কিন্তু তিনি তাতে রাজি হননি। মেয়ে এবং জামাইদের আচরণে কষ্ট পেয়ে একটা সময় তিনি অতুলের বিয়ে দেবার জন্য দরিদ্র পরিবারের পাত্রীর খোঁজ শুরু করেন, তন্ন তন্ন খুঁজেও তিনি অতুলের জন্য পাত্রী খুঁজে পাননি, পাগল ছেলের সঙ্গে কোনো বাবা-মা তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে রাজি হননি।

বছর তিনেক আগে অতুল একবার হারিয়ে গিয়েছিল, ওকে খুঁজে বের করতে মেয়ে-জামাইদের আন্তরিক সহযোগিতা পাননি উমা। নিজেই গাড়ি ভাড়া করে পাড়ার যুবক ছেলেদের সঙ্গে নিয়ে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, মাগুরা, কুষ্টিয়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় অতুলকে খুঁজেছেন; ছবি দেখিয়ে জনে জনে জিজ্ঞেস করেছেন যে কেউ অতুলকে দেখেছে কি না, আর অতুলের ছবি সম্বলিত পোস্টার সেঁটেছেন দেয়ালে-দেয়ালে এবং গাছে-গাছে। হারিয়ে যাবার প্রায় পাঁচ মাস পর একদিন বিকেলে একজন অপরিচিত ভদ্রলোক উমার সেলফোনে ফোন করে জানায় যে ভাটিয়াপাড়া স্টেশন এলাকায় অতুলের মতো দেখতে একজন মানসিক ভারসাম্যহীন মানুষকে তিনি দেখেছেন। পরদিন ভোরবেলায় ভাড়া গাড়ি আর পাড়ার ছেলে ভুবনকে সঙ্গে নিয়ে ভাটিয়াপাড়া যান উমা; লোকজনের কাছে খোঁজ করতে করতে যান ভাটিয়াপাড়া স্টেশনে আর সেখানেই দেখতে পান পরনে ছায়া পরা, উর্ধ্বাঙ্গ উদোম, গলায় কয়েকটা পুঁতির মালা, মাথায় লম্বা জটাধারী মাঝারি গড়নের ঘুমন্ত মধ্যবয়সী এক নারীকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে অতুল! অতুলেরও উদোম গা আর পরনে কালো রঙের ময়লা ফুলপ্যান্ট। উমা ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকেন ছেলের দিকে, গত পাঁচ মাসে ছেলের শরীর শুকিয়ে গেছে, গায়ে পাঁচড়া, গাল বসে গেছে, নিশ্চিতভাবেই বিগত পাঁচ মাসে মাথার চুল আর মুখের দাড়ি-গোঁফ কাটা হয়নি, চুল-দাড়িতে ময়লা। উমা বুঝতে পারেন জটাধারী নারীও মানসিক ভারসাম্যহীন।

উমা অতুলকে জাগিয়ে তোলেন, মাকে দেখে জড়িয়ে ধরে অতুল, কেঁদে ফেলে, বলে, ‘তুই এতদিন কোথায় ছিলি মা? আমার খুব ক্ষিধে পায়, আমি ভাত খাব।’

ভুবনের সহায়তায় হাত ধরে অতুলকে টেনে তোলেন উমা, ছেলের প্যান্টের চেইনের পাশে শুকিয়ে যাওয়া বীর্যের দাগ মায়ের দৃষ্টি এড়ায় না। অতুল বলে, ‘আমরা কোথায় যাব মা?’

‘ভাত খাবি চল।’

ঘুমন্ত মানসিক ভারসাম্যহীন নারীকে দেখিয়ে বলে, ‘রাধাকে ডাকি? রাধাও ভাত খাবে, ওরও খুব ক্ষিধে পায়।’

‘ও ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। আমরা ওর জন্য ভাত নিয়ে আসব।’

স্টেশন থেকে বেরিয়ে সবাই গাড়িতে ওঠে আর কিছুটা দূরে এসে গাড়ি থেকে নেমে অতুলকে ভাত খাওয়ানোর জন্য একটা হোটেলে ঢোকে। ভুবন এবং গাড়ির ড্রাইভারের জন্য নাস্তা, অতুলের জন্য ভাত আর মাছের অর্ডার দেওয়া হয়, উমা ভাত মাখিয়ে অতুলকে খাইয়ে দিতে থাকেন, ভুবন আর ড্রাইভারের নাস্তা খাওয়া শেষ হলে উমা বলেন, ‘প্যাকেটে ভাত আর মাংস নিয়ে স্টেশনের ছুড়িডারে দিয়ে আয়।’

ভাতের প্যাকেট নিয়ে স্টেশনের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যায় ভুবন আর ড্রাইভার। দুই প্লেট ভাত খাওয়ানোর পর উমা অতুলের উদ্দেশে বলেন, ‘আরো ভাত নেব?’

অতুল হ্যাঁ-সূচক ঘাড় নাড়লে আরো এক প্লেট ভাতের অর্ডার দেন উমা, সেই প্লেট ফুরোলে অতুল বলে, ‘মা আরো ভাত খাব।’

আবারও ভাতের অর্ডার দেন উমা, তার মাতৃহৃদয় নীরবে কাঁদে, চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে নামে, ছেলে তার কতদিন ভাত খায়নি কে জানে! সন্তর্পণে চোখের জল মোছেন তিনি। চার প্লেট ভাত খেয়ে পেট ভরে অতুলের। স্টেশন থেকে ভুবন আর ড্রাইভার ফিরে এলে উমা বলেন, ‘ঘুম ভাঙছে?’

ভুবন ঘাড় নাড়ে, ‘হ।’

‘খাবার নিলো?’

মৃদু মাথা নেড়ে ইশারায় প্রশ্ন করতে নিষেধ করে ভুবন, বলে, ‘চলেন জেঠিমা।’

খাবারের বিল মিটিয়ে সবাই গিয়ে গাড়িতে উঠলে গাড়ি ধাবিত হয় বাড়ির পথে। অতুল বলে, ‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’

উমা বলেন, ‘আমরা বাড়ি যাতেছি বাবা।’

‘আমি রাধার কাছে যাব, রাধাকে বাড়ি নিয়ে যাব, রাধার কাছে চলো মা।’

‘রাধা আমাগের সাথে যাবি নে বাবা। রাধা ওর বাবা-মা’র সাথে বাড়ি যাবি।’

‘আমি রাধার কাছে যাব।’

‘রাধা এখন ওর বাবা-মা’র সাথে বাড়ি যাক। পরে আমরা যায়ে রাধারে নিয়ে আসপো, এহন বাড়ি চলো বাবা।’

‘রাধা আমাদের বাড়িতে আসবে?’

ভুবন বলে, ‘আসবে দাদা। আমি যায়ে রাধা আর ওর বাবা-মারে নিয়ে আসবো।’

‘সত্যি?’

‘হুম, সত্যি।’

‘তুই খুব ভাল ভুবন!’

চুপ হয়ে যায় অতুল, এক সময় মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরলে উমা ভুবনের কাছে জানতে চান, ‘ভাত খাইছে?’

গাড়ির সামনের সিটে বসা ভুবন পিছনে ঘাড় ঘুরিয়ে একবার অতুলের মুখের দিকে তাকায়, অতুল ঘুমিয়েছে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে তারপর বলে, ‘না, আমি যায়ে দেহি কাঁদতেছে আর কৃষ্ণ কৃষ্ণ বলে চিল্লাতেছে। মানষির কাছে জিজ্ঞেস করতেছে যে আমার কৃষ্ণ কনে গেল। আমি ভাত দিলাম, হাতে নিয়ে ছুড়ে ফ্যালা দিয়ে কয়, আগে আমার কৃষ্ণ আনে দে, তারপর ভাত খাব। কৃষ্ণরে থুয়ে আমি ভাত খাব না। স্টেশনের চায়ের দোকানদাররে জিজ্ঞেস করে জানলাম, দাদা আর পাগলীটা কয়েক মাস ধরেই একসাথে ছিল। লোকজন দুইজনের নাম দিছে রাধা-কৃষ্ণ, ওরাও দুইজন দুইজনরে রাধা-কৃষ্ণ বলে ডাহে!’

উমার চোখ ভিজে ওঠে, তার কত স্বপ্ন ছিল-অতুলের বিয়ে দিয়ে ঘরে বউ আনবেন, ঘর আলো করে নাতি-নাতনি আসবে, ওদের সুখের সংসার দেখে তিনি চোখ বুজবেন। আর এখন!

বাড়িতে আনার পর থেকে পায়ে শিকল পরিয়ে ঘরে বেঁধে রাখা হয় অতুলকে, যাতে আবার কোথাও চলে যেতে না পারে; স্নান এবং টয়লেট করার সময় শিকল খুলে দেন উমা, অতুলকে কলতলায় নিয়ে গিয়ে স্নান করিয়ে দেন, টয়লেট করার সময় খেয়াল রাখেন যে কখন ও বের হয়, বের হলেই ঘরে নিয়ে পায়ে শিকল পরিয়ে রাখেন। এছাড়া প্রতিদিনই বিকেল বেলা শিকল খুলে অতুলকে নিয়ে রাস্তায় একটু হাঁটাহাঁটি করেন, এর বাইরে অতুলের পায়ের শিকল খুব একটা খোলেন না, প্রসাব করার জন্য একটা পাত্র রেখেছেন ওর খাটের নিচে। রাতে উমা অতুলের পাশের ঘরেই ঘুমান ভেতরের দরজা খুলে রেখে, যাতে অতুল ডাকলে তিনি শুনতে পান।

ভাটিয়াপাড়া থেকে বাড়িতে নিয়ে আসার পর প্রায়শই রাতের বেলা অস্থির আচরণ করত অতুল, রেগে যেত, হাত দিয়ে টেনে কিংবা দাঁত দিয়ে কামড়ে শিকল ছিঁড়তে চাইত, কিন্তু ব্যর্থ হয়ে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলত, ‘রাধাকে আমার কাছে এনে দাও, আমি রাধার সাথে ঘুমাবো!’

উমা প্রথম কয়েকদিন নানা কথা বলে অতুলকে শান্ত করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন, তাকে দেখলে ওর আবদার-পাগলামী আরো বেড়ে যেত, ফলে ও যখন রাধাকে এনে দেবার আবদার করত তখন আর তিনি ওর সামনে যেতেন না, সামনে না এলেও ছেলের জন্য কষ্ট হত উমার। তিনি বুঝতে পারতেন যে কয়েক মাস পাগলীটার সঙ্গে থাকার ফলে যৌন অভ্যাস তৈরি হয়েছে অতুলের, রাতের বেলা যখন ওর কামভাব জাগ্রত হয় তখন অস্থির হয়ে ওঠে আর রাধাকে এনে দেবার জন্য জেদ ধরে। কিন্তু তিনি কিভাবে ছেলের এই আবদার পূরণ করবেন, কিভাবে ছেলের কামতপ্ত শরীর শান্ত করার ব্যবস্থা করবেন?

পাড়ার বছর চল্লিশের বিধবা অম্বিকা, স্বামী মারা যাবার পর একমাত্র ছেলে কাজলকে নিয়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে ধান কিনে সিদ্ধ করে ভাঙিয়ে বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে চাল বিক্রি করে। ভোর থেকে রাত অব্দি খেটেও খুব যে স্বচ্ছন্দে দিন কাটে মা-ছেলের তা নয়, খেয়ে-পরে চলে যায়, ছেলেটা ক্লাস নাইনে পড়ে, লেখাপড়ার পাশাপাশি মায়ের কাজে সাহায্য করে। উমা একদিন বিকেলে অম্বিকার বাড়িতে গিয়ে ওর সংসারের খোঁজ-খবর নেন, অভাব-অনটনের কথা শোনেন, অসময়ে স্বামী মারা যাবার জন্য আফসোস আর অম্বিকার জীবন সংগ্রামের প্রশংসা করেন, অম্বিকার কী এমন বয়স, এখনো জীবনের অনেক স্বাদ-আহ্লাদ বাকি ইত্যাদি সব কথাবার্তা বলার পর সুযোগ বুঝে চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে অম্বিকাকে এই প্রস্তাব দেন যে সে যদি সপ্তাহে দু-তিনদিন রাতে অতুলকে যৌনসঙ্গ দেয় তাহলে মাস্টার্স পাস করা পর্যন্ত তার ছেলের লেখাপড়া এবং পোশাক-পরিচ্ছদের যাবতীয় খরচ তিনি বহন করবেন, এছাড়াও মাঝে মাঝে মা-ছেলে দুজনেরই হাত-খরচ দেবেন। কিন্তু অম্বিকা এই প্রস্তাবে রাজি হয় না।

গ্রামের চামেলী নামের একজন গৃহবধূ, তার কিছুটা বদনাম আছে যে স্বামী বর্তমান সত্ত্বেও পরপুরুষের সঙ্গে শোয়, উমা তাকেও প্রস্তাব দেন অর্থের বিনিময়ে অতুলকে যৌনসঙ্গ দেবার জন্য, কিন্তু চামেলী তো রাজি হয়ই না উল্টো উমাকে কড়া কথা শুনিয়ে দেয় এমন প্রস্তাব দেবার জন্য। উমা ছেলেকে বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পাত্রী খুঁজে পাননি; এখন ছেলের যৌন তাড়না মিটানোর জন্য একজন নারীও খুঁজে পাচ্ছেন না! তিনি মা না হয়ে বাবা হলে না হয় ছেলেকে মাঝে মাঝে নিয়ে যেতেন যৌনপল্লীতে, কিন্তু একজন নারী হয়ে তিনি কিভাবে সেখানে যাবেন? উমার মাতৃহৃদয় হাহাকার করে ছেলের জন্য, ছেলে তার যৌন তাড়নায় পীড়িত, অথচ তিনি ওর একজন যৌনসঙ্গীর ব্যবস্থা করতে পারছেন না!

একদিন বাজার করতে গিয়ে উমা একদল বৃহন্নলাকে ছল্লা করতে দেখেন, তাদের মধ্যে একজন বৃহন্নলা উমার দৃষ্টি কাড়ে, যাকে তিনি পূর্বে কোনোদিন দ্যাখেননি, সে দেখতে খুবই সুন্দরী আর চেহারা ও শরীরের গড়ন অবিকল মেয়েদের মতই কমনীয়। উমা বৃহন্নলাদের পিছু নেন, তারপর সুযোগ বুঝে জানান যে তার নাতি হয়েছে, পরের সপ্তাহেই নাতি মামাবাড়ি থেকে আসবে, নাতিকে নাচিয়ে আশির্বাদ করতে হবে ইত্যাদি। এইসব মিথ্যে কথা বলে সুন্দরী বৃহন্নলার ফোন নম্বর নেন, নামও জেনে নেন তার-নন্দিতা। সেদিন রাতেই তিনি নন্দিতাকে ফোন করেন, একথা-সেকথার পর আসল কথাটা বলেন যে তার মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলে অতুলের যৌনসঙ্গ প্রয়োজন, মানসিক ভারসাম্যহীন হলেও অতুল ভদ্র স্বভাবের আর দেখতেও বেশ সুন্দর, নন্দিতা মাঝে মাঝে ওকে যৌনসঙ্গ দিলে বিনিময়ে তিনি টাকা দেবেন। অতুল মানসিক ভারসাম্যহীন বলে নন্দিতা কিছুটা গাঁইগুঁই করতেই উমা শাড়ি-গহনার মতো নানা জিনিসের লোভ দেখান ওকে, শেষ পর্যন্ত রাজি হয় নন্দিতা, শর্ত হয় যে দুজনের কেউই এই বিষয়ে কাউকে কিছু বলবে না।

যেদিন বিকেলে নন্দিতা আসবে বলে কথা দেয়, সেদিন অতুলকে সেলুনে নিয়ে গিয়ে চুল-দাড়ি-বগলের চুল কাটিয়ে এনে কাঁচা হলুদ বেঁটে গায়ে মেখে সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে স্নান করিয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে দেন উমা। অতুলের পছন্দের খাবার ইলিশ মাছ, খাসির মাংস, বেগুনভাজি আর পায়েস রান্না করেন। একা একাই সকল কাজ করেন, তবু উমার আড়ম্বর দেখে মনে হয় যেন অতুলের বিয়ে! সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পূর্বে নন্দিতা আসে, উমা নন্দিতার সাথে এমন আন্তরিক ব্যবহার করেন যেন নন্দিতা তার নব বিবাহিত ছেলের বৌ! নন্দিতার স্নানের সময় কলের জল তুলে দেন উমা আর বারবার দৃষ্টি বুলান স্নানরত নন্দিতার শরীরের আনাচে-কানাচে। সে দৃষ্টিতে ফুটে ওঠে বালিকার পুতুল পাবার উচ্ছ্বাস, অব্যক্ত আনন্দের ঝর্ণাধারায় ভেসে যায় তার হৃদয়ের ঝিরিপথ! স্নানের পরে অতুল আর নন্দিতাকে পাশাপাশি বসিয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে খাওয়ান, অতুল নীরবে ভাত খায় আর বারবার তাকিয়ে নন্দিতাকে দ্যাখে।

রাত একটু বাড়লে উমা ট্রাঙ্ক থেকে একটা শাড়ি বের করে পরিয়ে দেন নন্দিতাকে, উমা এখন সাদা শাড়ি পরলেও তার ট্রাঙ্কে অনেক রঙিন শাড়ি আছে, স্বামী বেঁচে থাকতে যেগুলো তিনি পরতেন। শাড়ি পরাতে পরাতে উমা করুণাময়ী শাশুড়ির মত গল্প জুড়ে দেন নন্দিতার সাথে; বাড়িতে কে কে আছে জানতে চান, বাড়িতে যায় কি না, এখন কোথায় থাকে, সেখানে থাকতে কষ্ট হয় কি না ইত্যাদি নানা ধরনের প্রশ্ন করেন আর নন্দিতাও সে-সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। নিজ হাতে সাজিয়ে-গুছিয়ে নন্দিতাকে অতুলের ঘরে পাঠিয়ে ভেতরের দরজা বন্ধ করে বিপুল আনন্দে নিজের ঘরের আলো বন্ধ করে শুয়ে পড়েন, কিন্তু ঘুম আর সহজে আসে না চোখে, মাঝে মাঝে নন্দিতার হাতের কাঁচের চুড়ির ঢুং টাং আওয়াজ ভেসে আসে তার কানে আর তিনি বিপুল আনন্দে ছলছল চোখে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করেন!

পরদিন সকালেই নিজের পাওনা বুঝে নিয়ে চলে যায় নন্দিতা, উমার দাবি অনুযায়ী কথা দেয় যে সপ্তাহে অন্তত একদিন সে আসবে। প্রথম প্রথম সপ্তাহে একদিন এলেও পরে উমার ব্যবহারে নন্দিতা এতটাই মুগ্ধ হয়, দুজনের সম্পর্ক শাশুড়ি-বৌমার মতো এতটাই মধুর হয়ে ওঠে যে সে একটানা সাত-আটদিনও থাকে, উমাকে মা বলে সম্বোধন করে, রান্নার কাজে সাহায্য করে, সংসারের অন্যান্য টুকিটাকি কাজও করে দেনা-পাওনার কথা ভুলে। সাত-আটদিন থাকার পর নন্দিতা চলে গেলে উমা যেমনি শূন্যতা অনুভব করেন, তেমনি অতুলও বার বার মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘মা, নন্দিতা আবার কবে আসবে?’

উমা নন্দিতাকে বলেছেন, ‘তুই ডেরা ছেড়ে পাকাপাকিভাবে আমার কাছে চলে আয়। তোর কোনোদিন ভাত-কাপড়ের অভাব হবি নে, আমি মরে গেলে আমার ছাওয়ালডারে তুই দেহিস, আমি সব বন্দোবস্ত করে যাব।’

নন্দিতা পেট ফুলিয়ে হাসতে হাসতে বলেছে, ‘তুমার ছাওয়ালরে ছাড়ে আমি কই যাব, এই দ্যাহ না আমার প্যাটে তুমার নাতি!’

 

(চলবে…..)

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of