ভালোবাসা দিবসের ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর সব জায়গায়!

আজ ১৪ ই ফেব্রুয়ারি! বিশ্ব ভালোবাসা দিবস! এই ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর সব জায়গায়, সকল ধর্মের, সকল মতের, সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের প্রতি। ভালোবাসা ছড়িয়ে পড়ুক প্রাণী জগতের সকল প্রাণীর প্রতি। বাঙালি ভালোবাসা বোঝেনা! বাঙালি জাতির বিশাল অংশ মনে করে ভালোবাসা মানেই যৌনতা। একটা ছেলে ভালোবেসে একটা মেয়ের হাত ধরবে, একটা মেয়ে ভালোবেসে একটা ছেলের ঠোটে চুমু খাবে, দুজন দুজনকে ভালোবেসে অনেক দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে, নির্জন অরণ্যে, গভীর বন জঙ্গলে, পাহাড় অথবা সমুদ্রের পাড়ে, এমনকি চার দেয়ালের মাঝে দুজন মানুষ, পাশাপাশি, কাছাকাছি বসে, কথা বলা, জড়িয়ে ধরা, আদর করা, এইসব কাজকে বাঙালি জাতির বিশাল একটা অংশ অন্যায় মনে করে।

আদতে এটা অন্যায় কিছু না। বাঙালির যৌন জীবন কাটে কষ্টে, হীনমন্যতায়, একাকিত্বে চাইলেও তারা ভালবাসার মানুষকে নিয়ে একসাথে ঘুরতে পারেনা। পরিবারের ভয়, সমাজের ভয়, এমনকি রাষ্ট্রেরও ভয়! রাষ্ট্র প্রকাশ্যে প্রেম-ভালোবাসাকে একপ্রকার নিষিদ্ধই করে রেখেছে। পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে গিয়ে কে কার সাথে শুয়ে আছে সেগুলো খোঁজাখুঁজি করে। পুলিশ সমকামীদের ধরে ধরে তাদের কে জেলে ভরে দিচ্ছে। পুলিশ প্রশাসন হয়তো মনে করে, ভালোবাসা পৃথিবীর ভয়ঙ্কর অপরাধ গুলোর মধ্যে একটি!

আদতে ভালোবাসা কোন অপরাধ না।  আমি আমার পরিবারকে ভালোবাসি, আমি ভালোবাসি বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সবকিছু! আমি ভালোবাসি এই দেশের ধানক্ষেত, নদী, মাঠ, পাহাড় সমুদ্র সবকিছুই। আমি ভালোবাসি রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কুকুর-বিড়াল গুলোকেও। সেই ভালোবাসা যেমন অপরাধ নয়, কোন একজন মানুষ অন্য একটা মানুষকে ভালবাসবে, তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখবে, তার সাথে দূরে কোথাও হারিয়ে যাবে, সেটাও কোন অপরাধ নয়!

অভিনেত্রী “মিথিলা” আর সুজিতের বিয়ে দেখে অনলাইনের মানুষ তাদের নিয়ে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করে যাচ্ছে। বাঙ্গালী ধরেই নিয়েছি মিথিলা একটা নষ্টা মেয়ে। কোন পুরুষের ভালোবাসা পাওয়ার কোন অধিকার মিথিলা নেই। বাঙালির আরেকটা কষ্টের কারণ, “মিথিলা” হিন্দু ধর্মের একটা ছেলেকে বিয়ে করেছে। তাহসানের একাকিত্বের কষ্ট বাঙালি সহ্য করতে পারতেছে না। বাঙালি তাহসানকে মাথায় তুলে নাচতেছে। বাঙালির লাফালাফি দেখে মনে হচ্ছে তাহসান বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ একজন মানুষ! এগুলো দেখলে আমার হাসি পায়। হতে পারে তাহসান অবশ্যই ভালো কোন একটা ছেলে। বাঙ্গালীর একটা অংশ যেভাবে তাদের এই বিষয়টাকে নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে, তাতে মনে হয়, মিথিলা নয়, তারাই তাহসান এর সাথে সংসার করে এসেছে। তাই তারা জানে, তাহসান ফেরেস্তা!

ভালোবাসা কে কখনো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা যায় না! ভালোবাসা ভারত বাংলাদেশের বর্ডার না, যে চাইলেই সেটাকে আলাদা করে ফেলা যাবে।  মিথিলার ভালো লেগেছে সুজিতকে সুজিতের ভালো লেগেছে মিথিলাকে। তারা একজন আরেকজনকে ভালবেসে বিয়ে করে সংসার করতেছে। এটা দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়ার কোন মানে নেই। বাঙ্গালীদের কষ্ট দেখে তাহসান হয়তো নিজেও লজ্জা পাচ্ছে। সে নিজেও হয়তো চাইনি মিথিলার সাথে তার সংসার টা হোক।

বাঙালি কে ছোটবেলা থেকে ভালোবাসা শেখানো হয় না! শেখানো হয় ভয়, লোভ, হিংসা, ক্রোধ।  ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়, পাশের ঘরে গিয়ে কোন কিছু না খাওয়ার জন্য! পাশের বাসার মানুষের সাথে বেশি কথা না বলার জন্য! পাশের বাসার কোন ছেলে ভালো রেজাল্ট করলে, সেটা দেখে পিতা-মাতারা হিংসে জ্বলে পুড়ে যায়। পাশের বাসার আঙ্কেল দামি গাড়ি কিনেছে, আমাদের নেই। পাশের বাসার আন্টি দামি শাড়ি কিনেছে, আমার নেই। পাশের বাসার মেয়েটার ভালো বিয়ে হয়েছে, আমাদের মেয়েটার এখনো বিয়ে হয়নি। পাশের বাসার ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে, আর আমাদের ছেলেটা ঠিকম তো কলেজেও যায় না। পাশের বাসার ওই মহিলার অহংকারে মাটিতে পা পড়ে না, কাইল্লা জামাইটা নিয়ে কি ঢং টাইনা করে। পাশের বাসার ওই ছেলেটাকে নাকি ইংলিশ মিডিয়ামে ভর্তি করিয়েছে, ঢং দেখে আর বাঁচি না। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা এই সমস্ত হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড দেখে দেখে বড় হয়। তারা ভালবাসা শিখবে কিভাবে?

ওয়াজের মোল্লারা মানুষকে ওয়াজের মাধ্যমে শিখিয়ে দেয়, ভালোবাসা হারাম, চুমাচুমি হারাম, জড়িয়ে ধরা হারাম, পার্কে বসে কথা বলা হারাম। বোরকা ছাড়া মেয়েদের ঘর থেকে বের হওয়া উচিত না। বিয়ের আগে মেয়েদের পর পুরুষের সাথে আড্ডা দেওয়া উচিত না। এই সমস্ত কথা শুনে শুনেই তরুণ প্রজন্ম বেড়ে উঠেছে। তাইতো তারা ভালোবাসা কে অন্যায় মনে করে। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই হুজুররাই মাদ্রাসায় ছোটছোট বাচ্চা ছেলেদের বলাৎকার করে। তখন তারা নিজেরাই ভুলে যায় হারাম-হালাল কি জিনিস।

আসুন না এই ভালোবাসা দিবসে, মায়ের পাশে গিয়ে বসে মাকে বলি, মা তোমাকে আমি ভালোবাসি! বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলি, বাবা তুমি না থাকলে আমি আজকে জায়গায় আসতে পারতাম না! বোনের পাশে গিয়ে বলি, বোন তুই আমার দেখা শ্রেষ্ঠ বোনদের একজন! ভাইয়ের পাশে গিয়ে বলি ভাই, তুই আমার অতি আদরের লক্ষী ভাই! বন্ধুর পাশে গিয়ে বলি, বন্ধু তুই আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষ! ভালোবাসার মানুষের পাশে গিয়ে বলি, তোমাকে পাশে নিয়েই আমি দিগন্ত পথ পাড়ি দিতে চাই!

আসুন ভালবাসি, ভালবাসি, ভালবাসি! ভালবাসা দিয়ে সুন্দর এক মানবিক পৃথিবী গড়ে তুলি!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of