ভেঙে গেল যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের ‘ফাইভ আইস’ গ্রুপ?

চীনা প্রযুক্তি কোম্পানি হুয়াওয়েকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র সরকার। ফাইভ-জি প্রযুক্তিতে কোম্পানিটির যে অংশীদারি, তা ঠেকাতে না পারলে আগামী বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ অনেকখানি আলগা হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করেছিল তারা। হুয়াওয়েকে দমাতে তাই নেয়া হয়েছিল নানা ধরনের পদক্ষেপ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের আগেই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসা না করার জন্য একটা চাপ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে একটি গ্রুপ তৈরি করে। ‘ফাইভ আই’স’ বলে পরিচিত এই গ্রুপের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ড।

এই পাঁচটি দেশের মধ্যে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের জন্য খুবই ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। এর বেশিরভাগটাই করা হয় ইলেকট্রনিক উপায়ে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল যে, এই পাঁচ দেশের কোন দেশ যদি হুয়াওয়ের নেটওয়ার্ক তাদের গুরুত্বপূর্ণ কোন ইনফরমেশন সিস্টেমে বসায়, তাহলে সেই দেশের সঙ্গে আর কোনও গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করা যাবে না। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি সে দেশে হুয়াওয়েকে সীমিত পরিসরে কাজ চালানোর অনুমোদন দেওয়ার মাধ্যমে এই নীতি উপেক্ষা করেছে। যা কিনা এই উদ্যোগের বাকি দেশগুলোকে সমস্যায় ফেলে দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে ভেস্তে যেতে বসেছে ‘ফাইভ আই’স’ বলে পরিচিত গ্রুপটির লক্ষ্য ও পরিকল্পনা।
২৮ জানুয়ারি ন্যাশনাল সিকিউরটি কাউন্সিলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের সাক্ষাতের পর ব্রিটিশ ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা আগামী বছরগুলোতে পরবর্তী প্রজন্মের ফাইভজি নেটওয়ার্কের কিছু অংশ স্থাপনে হুয়াওয়ের কাছ থেকে সাহায্য নেবে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রাশাসন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের এই সিদ্ধান্তে ‘হতাশা’ প্রকাশ করেছে। ব্রিটেনের এমন সিদ্ধান্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক খারাপ হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে। হুয়াওয়ের যন্ত্রাংশের মাধ্যমে চীনা সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাতে পারে বলে দাবি যুক্তরাষ্ট্রের। এ কারণেই ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক থেকে হুয়াওয়েকে বাদ দিতে যুক্তরাজ্যসহ অন্যান্য দেশকে চাপ দিয়ে আসছিলো যুক্তরাষ্ট্র। তবে হুয়াওয়ে বরাবরই এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। যুুক্তরাষ্ট্রও তাদের দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ তুলে ধরেনি।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বলেন, সংবেদনশীল মূল নেটওয়ার্কে উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়া হবে এবং সংবেদনশীল নয় এমন নেটওয়ার্কে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ থাকবে ৩৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি হুয়াওয়ের নাম উল্লেখ করা না হলেও দেশটির যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, জটিল নেটওয়ার্ক এবং পরমাণু ও সেনা ঘাঁটির মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলো থেকে উচ্চমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাদ দেওয়া হবে। যোগাযোগ সচিব নিকি মরগান বলেন, এটি যুক্তরাজ্যের জন্য যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি সমাধান এবং আমরা এখন যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হচ্ছি তার ওপর ভিত্তি করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের এমন সিদ্ধান্তে খুশি হুয়াওয়ে। এর ফলে ইউরোপে এখন আশার আলো দেখছে হুয়াওয়ে। গতবছর হুয়াওয়েকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি অভিযোগ করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোকে হুয়াওয়ের কাছ থেকে টেলিযোগাযোগ যন্ত্রপাতি না কেনার জন্য চাপ দিতে থাকে। যেসব দেশকে যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়ের প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে চাপ দিচ্ছিল তাদের জন্য কিছুটা স্বস্তির খবর এটি। প্রতিষ্ঠানের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভিক্টর জ্যাং বলেন, ‘যুক্তরাজ্যে সরকারের সিদ্ধান্তে হুয়াওয়ে পুনরায় নিশ্চিত হয়েছে যে, আমরা ফাইভ-জি ভূমিকা ঠিক পথে রাখতে গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাবো।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, বরিস জনসনের সরকারের জন্য ব্রেক্সিটের পর এটিই ছিল সবচেয়ে জটিল বৈদেমিক নীতি বিষয়ক সংকট। ট্রাম্প প্রশাসনের আকাক্সক্ষার কাছে নতি স্বীকার না করে যুক্তরাজ্য যে এক্ষেত্রে সাহসী ভ‚মিকা নিতে পেরেছে, এটা অনেককে অবাক বরলেও অর্থনীতিবিদরা এতে অবাক হননি। কারণ যুক্তরাজ্যের অর্থনীতিকে ব্রেক্সিট উত্তরকালে সঠিক ধারায় রাখতে হলে এর বিকল্প ছিল না। ব্রেক্সিট পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যকে এমনিতেই ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বড় ঝামলায় পড়তে হতে পারে। একই সময়ে পররাষ্ট্র নীতিতে চীনবিরোধী অবস্থান গৃহীত হলে চীনারাও ছেড়ে দেবে না। এরকম বিশাল দুটো ফ্রন্টে একত্রে লড়াই চালানো ব্রিটেনের পক্ষে বর্তমানে সম্ভব নয়।

তাছাড়া হুয়াওয়েকে বাদ দিতে গেলে নগদ ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়। অতি উচ্চগতির এ মোবাইল ইন্টারনেট সেবা প্রদানের জন্য নেটওয়ার্ক ও সরঞ্জাম স্থাপন বাবদ বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে চীনা হুয়াওয়ে ও জেডটিই যৌথভাবে ৪০ শতাংশেরও বেশি বাজার অংশীদারিত্ব দখলে রেখেছে। চীনা কোম্পানি নিষিদ্ধে ফাইভজিতে ইউরোপের ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবেদনটি দিয়েছে আন্তর্জাতিক টেলিকম লবি গ্রæপ জিএসএমএ। সারা বিশ্বের ৭৫০টি সেলফোন অপারেটর কোম্পানির সংগঠন এটি। তাদের গবেষণা বলছে, চীনা কোম্পানিটি থেকে নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম ক্রয় নিষিদ্ধের কারণে ইউরোপে ফাইভজি প্রযুক্তি অবকাঠামো স্থাপনে অতিরিক্ত ৬ হাজার ২০০ কোটি (৬২ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হবে। শুধু তাই নয়, এ কারণে ফাইভজি চালুর ক্ষেত্রে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অন্তত ১৮ মাস পিছিয়ে পড়তে পারে ইউরোপ।

জিএসএমএ আরো বলছে, চীনা কোম্পানি নিষিদ্ধের কারণে ফাইভজি প্রযুক্তিতে ইউরোপ বেশ পিছিয়ে পড়বে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) মধ্যে ফারাকটা বাড়বে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত ফাইভজি প্রযুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ১৫ শতাংশেরও বেশি পয়েন্টে পিছিয়ে থাকবে ইইউ। যেখানে এ প্রযুক্তি স্বচালিত গাড়ি, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করার সম্ভাবনা রয়েছে। এ পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ, চীনা কোম্পানি নিষিদ্ধের ফলে টেলিকম সরঞ্জামের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এরিকসন, নকিয়া ও স্যামসাংয়ের মতো কোম্পানি সময়মতো সরবরাহ করতে ব্যর্থ হবে। এরপর বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে আরেকটি ব্যবস্থায় যাওয়ার প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নেও টেলিকম অপারেটরদের সময় লাগবে।

যুক্তরাজ্য এসব সমস্যার বোঝা কাঁধে নিতে চাইছে না। বরিস জনসন এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা উদ্বেগকে ‘কুসংস্কার’ বলেও মন্তব্য করেছেন। সর্বোপরি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধের হুমকিকে যে তিনি উপেক্ষা করতে পেরেছেন, এটা বাকি বিশ্বকে পথ দেখাবে। ‘ফাইভ আই’স’ গ্রæপের বিলুপ্তি নিঃসন্দেহে চীনসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্য প্রতিদ্ব›দ্বীদের মুখে হাসি ছড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of