বাংলা ভাষার বিকৃতি ও বিলুপ্তি।

ভাষা বিকৃতি নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বিকৃতি ভাষার লাবণ্য, মাধুর্য ও শ্রী-তে আঘাত করছে।  ‘মোদের গরব মোদের আশা…আ মরি বাংলা ভাষা’ র  গরব ও আশা -কে ম্লান করে দিচ্ছে। আমাদের এ গ্রহে প্রতি চোদ্দ দিনে একটি করে ভাষার বিলুপ্তি হচ্ছে। ইউনোস্কোর গবেষণা জানান দিচ্ছে, যে ভাষায় ১০,০০০ হাজারের কম মানুষ কথা বলে, সেই ভাষা বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা থাকে। এই হিসাবে ভারতে পাওয়া ৭৮০ টি ভাষার মধ্যে ৬০০টি ভাষা সংকটে আছে।  গত ৬০ বছরে প্রায় ২৫০ টি ভারতীয় ভাষা হারিয়ে গেছে।

বাংলা ভাষা অদূর ভবিষ্যতে কঠিন সংকট মোকাবেলা করবে কি না বলা কঠিন।  শুধু বাংলাদেশে নয় পাশের দেশ ভারতের কলকাতাতেও বাংলা ভাষার বিকৃতি অহরহ হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারতের কলকাতা ও আসাম রাজ্যে বাংলা ভাষার ব্যাবহার সবচেয়ে বেশি।  বাংলাদেশে নবীন প্রজন্ম ইংরেজি মেশানো এবং বিকৃতি বাংলায় কথা বলে।  টেলিভিশন ও  এফ এম রেডিও চ্যানেলগুলিতে বিকৃত বাংলা ভাষার ব্যবহার ভয়কর রূপ ধারণ করেছে। বিপনী বিতান গুলির নাম ভিনদেশী ভাষার দখলে চলে যাচ্ছে। শিক্ষা, আদালত ও বাণিজ্যে অপ্রয়োজনে বিদেশী ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। কলকাতার নবীন প্রজন্মের মাঝে হিন্দি ও ইংরেজি মিশানো বাংলায় কথা প্রবণতা বাড়ছে।

এখনও পৃথিবীতে প্রায় ২৩ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। মানুষের কথা বলার ভাষা হিসাবে বাংলা ভাষা ষষ্ঠ কিংবা সপ্তম স্থানে আছে।  একটি ভাষার ভান্ডার সমৃদ্ধ হয় বিভিন্ন ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণের মাধ্যমে। ভাষার বিলুপ্তির মূল কারণ ভাষার ব্যবহার হ্রাস। অতীতের সাথে হিসাব কষলে দেখা যায় খবরের কাগজের সংখ্যা, অনলাইন বাংলা নিউজ পোর্টাল সংখ্যাগত ভাবে অনেকটাই বেড়েছে এবং প্রতি বছর বাংলাদেশ, কলকাতা ও আসামে প্রচুর বাংলা বই প্রকাশিত হচ্ছে।  ভাষার বিকাশে খবরের কাগজ, নিউজ পোর্টাল ও অনেক অনেক প্রকাশিত বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।  বাংলা ভাষাভাষীরা যত বেশি বাংলা ভাষায় পাঠ করবে ও  লিখবে ততবেশি ভাষার প্রতি মমত্ববোধ ও দায়িত্ব বৃদ্ধি পাবে।
ফেব্রুয়ারী এলেই ভাষার প্রতি আমাদের মমত্ববোধ জেগে উঠে। এটা ভাষা শহীদদের প্রতি হঠকারিতা। বাঙালি সন্তানদের বাংলা ভাষা ও ভাষা শহীদদের ভালোবাসতে হবে জন্ম থেকে জন্মান্তরে। হৃদয়ে ধারণ করতে হবে বাংলা ভাষা ও ভাষা শহীদদের আদর্শ । বাংলা ভাষার হাত ধরেই বাঙালির পরিচয়। একটি জাতি তাঁর ভাষাগত পরিচয় এড়িয়ে কখনো অভিষ্ঠ লক্ষে পৌঁছাতে পারে না।

আমাদের বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল  ইসলাম সহ  অনেকেই  বাংলা ভাষায় লেখে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।  তাঁরা অন্য ভাষাও দক্ষ ছিলেন।  স্ব-ভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষায় জ্ঞান রাখা ভালো। এতে দোষের কিছু নেই।  স্ব-ভাষাকে অবজ্ঞা করে স্বপ্নের সিঁড়িতে হাঁটা যায় কিন্তু বাস্তবতায়  হোঁচট খাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।  আমাদেরকে সেই কথাই  মনে করিয়ে দেয় মাইকেল মধুসূদন দত্ত। অবশেষে বাংলা ভাষাই মহাকবি, নাট্যকার, বাংলা ভাষার সনেট প্রবর্তক, অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্তকে খ্যাতি দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন,  ড. মুহাম্মদ ইউনুস, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়রা বাঙালি ও বাংলা ভাষার অহংকার। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে বাঙ্গালীরা সবচেয়ে বেশি মনোনয়ন পেয়েছেন নোবেল পুরুস্কারের তালিকায়।  এ ধারা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছিলো ভাষা আন্দোলনের হাত ধরে। ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই ছিল বাংলাদেশ নামক রাস্টার জন্মের বীজ। সেই বীজ থেকেই বাংলাদেশের জন্ম। আজ পুস্প-পল্লবে বিকশিত।

বাংলাদেশের ২১শে ফেব্রুয়ারী আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে স্বীকৃত। সব মানুষের মাতৃভাষাকে সম্মান জানাতে এ দিবস বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। মাতৃভাষা দিবস বাংলাদেশিদের জন্য বিশেষ গর্বের ব্যাপার। বাংলা ভাষার সাথে বাঙালির আবেগ, শ্রদ্ধা, মাতৃত্ববোধ, দেশপ্রেম, জীবন ও রক্ত মিশে আছে। প্রতিটি বাংলা বর্ণমালা ভাষা সৈনিক ও শহীদের রক্তে ভেজা। ভাষা শহীদের আত্মা আমাদের বর্ণমালার প্রাণ।

বাংলা ভাষা বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয় বহন করছে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের স্বার্থে এ ভাষার মর্যাদা, সংরক্ষণ ও প্রসার আমাদের হাত ধরেই হতে হবে ।

এ প্রজন্মের বাঙালি তরুণ ও তরুণীরা বাংলা ভাষা নিয়ে কদাচিৎ হীনমন্যতায় ভোগে। তাঁরা ইংরেজি বলতেই ভালোবাসে। ২০১১ সালে ভারতের জনগণনার রিপোর্ট জানান দেয় মোট জনসংখ্যার ৪৩.৬৩ শতাংশ মানুষ হিন্দিতে কথা বলে।  তার পর বাংলার অবস্থান।  ভারতে বাংলা দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার ভাষা। কিন্তু বাস্তবে বাংলা ভাষা সংকটের মুখোমুখি। আমাদের অভিবাবকেরা বাংলা প্রীতি হারিয়ে ফেলছেন। সন্তানদের আধুনিক করতে গিয়ে বা একবিংশশতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত  করতে গিয়ে বুঝে কিংবা না বুঝে ইংরেজি ভাষার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

এ গ্রহে প্রায় ২৫০০ ভাষা বিলুপ্তির হবার সম্ভাবনা আছে।  এর মধ্যে এমন কিছু ভাষা আছে যে ভাষাগুলি ব্যবহার করছে মাত্র ত্রিশজন মানুষ। বর্তমানে আমরা এ গ্রহে যত গুলি ভাষায় কথা বলছি এ শতাব্দীর শেষে প্রায় অর্ধেক ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাবে। এটা অশনি সংকেত বিশ্ববাসীর জন্য।  ২০১০ সালে বাংলা ভাষা স্বীকৃতি পেয়েছিলো ‘পৃথিবীর সব চেয়ে মিষ্টি ভাষা’র।  এ মিষ্টি ভাষার বিকৃতি আমাদেরকেই রোধ করতে হবে।

বাংলা ভাষার প্রসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত ও প্রশাসনে সর্বজনীন বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।  ভাষার প্রসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত ও প্রশাস বিশেষ ভূমিকা পালন করে।  কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন, বাংলাদেশে ধীরে ধীরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আদালত ও প্রশাসনে বাংলা ভাষার ব্যবহার কমছে। ভাষার মাস ফেব্রুয়ারী এলে আমরা বাংলা ভাষা  নিয়ে  যতটা সরব ভাষার মাস চলে গেলে আমরা ততটাই নীরব। আমরা মিশ্র বা বিকৃত বাংলা চাই না।  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানের  অনুচ্ছেদ তিন অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্র ভাষা হল বাংলা।

বিকৃত বাংলা কাগজের ফুলের মতো রংচঙে। কোন সুবাস নেই। তরুণদের কাছে চাকচিক্যময় তবে হৃদয়কে আলিঙ্গন করে না। কৃত্রিম ভাব থাকে তবে ভালোবাসা থাকে না। জগাখিচুড়ি মাৰ্কা বিকৃত বাংলায় থাকে না প্রকৃত বাংলা ভাষার লালিত্য, মাধুর্য, শ্রুতিমধুরতা ও ভাষার যাবতীয় ইতিহাস। এতে ভাষার বিরাট ক্ষতি হয়। এ ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। এ ক্ষতি কাছাকাছি সময়ে অনুভব করা যায় না।

 

 

 

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of