২১শে ফেব্রুয়ারি, বাঙালীয়ানা ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ সমাচার!

২১শে ফেব্রুয়ারি, বাঙালীয়ানা ও মুসলিম জাতীয়তাবাদ সমাচার!
———————————————————

আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। ঘুমের মধ্যেই ছিলাম। সকালে থেকে থেকে প্রভাত ফেরী ও দেশাত্মবোধক গানগুলো কানের কাছে ভেসে আসছিল। আধো ঘুম আধো জাগরণে গানগুলো শুনছিলাম। মনে পড়ে যায় শৈশব। ছোট বেলায় আমরা ঝাঁক ঝাঁক শিশু মিলে শহীদ বেদীতে ফুল দিতে যেতাম। মাইকে বাজতো আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি….. শুনে খুব রোমাঞ্চিত হতাম। সকাল ৯ টার দিকে স্কুল থেকে র‍্যালি বের হতো। আমরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে সমান তালে হেঁটে র‍্যালি বের করে এগিয়ে যেতাম। আমাদের র‍্যালির সামনে থাকতো একটা রিকশা। সেই রিকশায় বাঁধা থাকতো সামনে-পেছনে দুটি মাইক। আর সেই মাইকে বাজতো প্রভাতফেরীর গানগুলো। স্কুলের প্রাঙ্গন এক উৎসব মুখর পরিবেশে মুখরিত হয়ে উঠতো। সেই ৯৪-৯৫ সালে আমি তখন দেখতাম আমাদের স্কুলের বড়ভাই (তখন তাঁরা উচ্চ বিদ্যালয়ে,পড়তো। আমাদের প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয় পাশাপাশি ছিল) কামাল, জামাল, রফিক, দিদার, মোর্শেদ এঁরা এই উৎসবগুলোর আয়োজন করতো। সেই সময় এদের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতা দেখতাম না। মুসলমান মুসলমান ভাব দেখতাম না। বুঝাই তো যেতো না এরা যে মুসলমান। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। প্রায় ২৪-২৫ বছর। ছোট বেলায় বোরখা হিজাব পড়া কোনো আপুকেই চোখে পড়েনি। ইউনিফর্ম পড়ে বড় বড় দিদি আর আপুরা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তে আসতো। সেই সময় স্কুলে প্রায় প্রতি মাসেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। খেলাধুলা হতো। গানের, নাচের প্রতিযোগিতা হতো। আমরা সেই অনুষ্ঠানগুলো দেখার জন্য বাড়ি থেকে এক ছুটে স্কুলের মাঠে পৌঁছে যেতাম। স্কুলের সামনে স্বগোরবে জাতীয় পতকা উড়তো। মনে আনন্দের মাদল বাজতো।

আজ অনেকগুলো বছর হয়ে গেল। শহীদ বেদীতে ফুল দেয়া হয়না। আসলে ফুল দিতে ইচ্ছে করে না। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালবাসা এখন সব এক ধরনের কৃত্রিম ফ্যাশন হয়ে গেছে। মনে হয় শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার চেয়ে পোশাক-আশাকীয় ফ্যাশনের দেশপ্রেমই বড়। শুধু ২১শে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে উথলে উঠে আমাদের দেশপ্রেম। আর সারা বছর থাকে ইসলামিক চর্চা। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনটা বাংলা ভাষা, বাঙালী সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদকে লক্ষ্য করে হলেও আজ অধিকাংশ বাংলাদেশীদের মনে সেই বাংলা ভাষার প্রতি টান, বাঙালী চেতনাবোধ ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ আর বিদ্যমান নেই। আজ অধিকাংশ বাংলাদেশীদের মনে বিরাজ করে আরব্য সংস্কৃতি তথা মুসলমান জাতীয়তাবাদ। এখন দেশাত্মবোধক গানের চেয়ে বেশি শোনা যায় ওয়াজ। যে ওয়াজগুলোতে বলা হয়, শহীদ বেদীতে ফুল দেয়া হারাম, এগুলো ইসলাম বিরোধী কাজ, এগুলো শিরক। চোখের সামনে দেখলাম তিলে তিলে আরব্য সংস্কৃতির কাছে আমাদের পূর্ব মানুষের বাঙালীয়ানাকে হেরে যেতে।

২০০০ সালে আগেও এদেশের রাষ্ট্রনীতি এতোটা পঁচে যায়নি। দেশটা এতোটা মৌল্লা কেন্দ্রিক হয়নি। সাঈদির ওয়াজ মাঝে মাঝে শোনা যেতো। তবে তা উল্লেখ করার মতো ছিলো না। ২০০১ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার এসে বাংলাদেশকে পুরোপুরি মৌল্লা কেন্দ্রিক করার উপর জোর দেয়। সারা দেশের আদালতগুলোতে এক যোগে বোমা হামলা হয়, এই হামলা করে তারা বার্তা দিয়েছিলো যে, বর্তমানের ব্রিটিশীয় পশ্চিমা বিচার ব্যবস্থা তারা মানছে। তারা চায় ইসলামি শরীয়াহ আইন । রমনা বটমূলে বোমা হামলা হয়। ২১ই আগষ্ট গ্রেনেড হামলা। একে একে বেছে বেছে কবি বুদ্ধিজীবি সাহিত্যিকদের হত্যা করা হয়। কিবরিয়া, আহসানুল্লাহ মাস্টার, গোপালকৃষ্ণ মুহুরী, হুমায়ুন আজাদ….. সংখ্যালঘুদের উপর নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ আতংকের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। সেই সময় এক প্রকার বাঙালীয়ানা, বাঙালী চেতনা, বাঙালী জাতীয়তাবাদের এক রকম মৃত্যুই হয়েছিলো। ২১শে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এসবের প্রাণই ছিলো না। এরপর বিএনপির-জামাতের সেই অপ শাসনের দিনগুলি অতীত হয়। বিএনপি-জামাত জোট সরকার পতিত হবার পর দেশে চলে দুই বছর জরুরি অবস্থা। ফখরুদ্দিনের শাসনামল। এর পর আবার নির্বাচন হয়। নির্বাচনে আওয়ামিলীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়, আর বিএনপি-জামাতের ভূমিধস পরাজয় হয়। এরপর আশায় বুক বেঁধে ছিলাম, মৌল্লাতন্ত্রকে থেকে বেড়িয়ে আওয়ামিলীগের হাত ধরে দেশটা আবার অসম্প্রদায়িক নীতিতে জেগে উঠবে। কিন্তু আশায় ছাই! ১৩ সালে ঢাকার মতিঝিলে হেফাজত ইসলামের নাস্তিক বিরোধী উত্থান দেখে এই আওয়ামীলীগ আমূল পালটে যায়। রাষ্ট্রীয় নীতিকে একের পর এক ইসলামি করন করতে থাকে। মদিনা সনদে দেশ চালানোর কথা ঘোষনা করে। গনতন্ত্র ও বাক-স্বাধীনতা বিরোধী কালো আইন ৫৭ ধারা পাশ করে। জেলায় জেলায় সরকারি অনুদান দিয়ে সারা দেশকে মসজিদের দেশ হিসেবে গড়ে তোলে। আজ আমাদের দেশটা এমন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে আছে যে, দেশের একজন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের চেয়ে দুই পয়সার আরবী জানা মুর্খ আলেম সমাজকেই সম্মান করা হয় বেশি। একজন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারের চেয়ে একজন ওয়াজকারীকে সমাজে আদর্শ ও বিবেকবান ভাবা হয়। ওয়াজে যে যত বেশি ইসলামিক কট্টর সাম্প্রদায়িকতা ও ঘৃণা প্রদর্শন করতে পারবে, এই বাংলায় তার কদর তত বেশি। তিনিই বেশি করে ওয়াজে বক্তব্য রাখার ডাক পান। আর এই ওয়াজকারীরা বাংলাদেশে ইসলামের ধর্ম ও সহিংসতাকে প্রচার করে বাঙালী সংস্কৃতিকে অনেকটা ধ্বংসের কিনারে নিয়ে গেছেন।

-মাঝে মাঝে শৈশবটা ফিরে পেতে খুব ইচ্ছে করে। সেই বাঙালীয়ানা, সেই অসম্প্রদায়িক মানুষগুলো। বোরখা হিজাব না পড়া রবীন্দ্র, নজরুল ও লোক সংগীত গাওয়া সেই আপুগুলোর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে স্কুলের সেই গান-নাচের প্রতিযোগিতাগুলো। মনে পড়ে সেই স্বাধীনতা দিবস, সেই বিজয় দিবসের উৎসব মুখর দিনগুলি। এখন খুব দুঃখ হয়, সেই শৈশবের বড়ভাই কামাল, জামাল, রফিক, দিদার, মোর্শেদ, বুলবুল আদর্শ দেখে। এরা আর অসম্প্রদায়িক নেই। তাঁরা আজ অমুসলিমদের সাথে উঠা বসা করা, তাদের সাথে আন্তরিক ভাবে মেলামেশা করা, একসাথে ইফতার করা, নিজেদের স্বধর্মের অবমাননা মনে করে। আজ তাদের সন্তানরা বেড়ে উঠে অমুসলিমদের প্রতি তীব্র এক ঘৃণা-বিদ্ধেষ ও বিশাল একটা দুরত্ব নিয়ে। আজ সেই বড়ভাইরা তক্কে তক্কে থাকে কোথাও ইসলামের অবমাননা হচ্ছে কিনা, কোথাও ইসলাম বিরোধী বেদাতি শিরক কাজ কেউ করছে কিনা? আযানের সময় কোনো অনুষ্ঠানের মাইক বাজছে কিনা? আজ ঘুম থেকে উঠতে উঠতে অনেকটা দুপুরই হয়ে গিয়েছিলো। ঘুম থেকে উঠেই স্নান সেরে দুপুরের খাবার খেতে বসলাম। তখন পাশের মসজিদের মাইক থেকে হুজুরের গলা ভেসে আসছিল, আমার আল্লাহ প্রিয়, আমার নবী রসুল প্রিয়, এই ৯৩% ধর্মপ্রাণ মুসলমানের দেশে একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল দেয়া এসব শিরক কাজ। এসব ঘোরতর ইসলাম বিরোধী। এসব ইসলামে নেই। এসব হেন্দুয়ানী সংস্কৃতি, এসব হেঁন্দুরাই করে…..

২১–২–২০২০

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 2