পাপিয়া চিন্তায় পুরুষের থাবা !

কোথায় করোনা ভাইরাসের খবর দিয়ে পত্রিকার এপাশ-ওপাশ বড় বড় অক্ষরে লাল রঙে ছাপিয়ে তুলবে সেখানে নতুন করে জুটে বসলো পাপিয়া। নেহাত পাপিয়া একজন নারী। এ সমাজে বা এ রাষ্ট্রে যখন কোন নারীর সামাজিক মাধ্যমে সামান্য কোন ক্ষত দেখতে পায় ঠিক তখন এ সমাজের হর্তা-কর্তা মানে আমরা তথা পুরুষেরা সেটাকে প্রথমে নষ্ট করি, তারপর সেটাকে আখ্যা দেই ক্যান্সার কিংবা এর থেকেও জঘন্য কিছুর সাথে।

এই বলে আমি পাপিয়ার সাফাই গাচ্ছি না। যদিও কেউ কেউ পাপিয়ার যৌন ব্যাবসাকে অনৈতিক কর্মকাণ্ড ইত্যাদি ইত্যাদি বলে পাপি বলা শুরু করেছে। অথচ,তারা জানেন না। পাপ একটি নির্থক ব্যক্তিগত শব্দ। প্রখ্যাত ভাষাবিদ, দার্শনিক, প্রথাবিরোধী লেখক স্যার হুমায়ুন আজাদ পাপ নিয়ে একটি প্রবচন তৈরি করেছিলেন।

সেটা ছিলো এমনপাপ কখনো অন্যায় নয়,অপরাধ অন্যায়।পাপ ব্যক্তিগত, তাতে সমাজের বা অন্যের, এমনকি পাপীর নিজেরও কোন ক্ষতি হয় না;কিন্তু অপরাধ সামাজিক,তাতে উপকার হয় অপরাধীর,আর ক্ষতি হয় অন্যের বা সমাজের।
তো এখানে পাপিয়া পাপী যাদের কাছে তাঁরা পাপ সম্পর্কে অবগত। যে অভিযোগে পাপিয়াকে পাপী বলে সাবস্ত করছে সে নিশ্চয়ই পাপিয়ার সে কাজের সাথে জড়িত কিংবা নির্লিপ্ত। বিশেষ করে পাপিয়ার যৌন ব্যবসা,মোবাইলে অশ্লিল দৃশ্য নিয়েই লোকজন বেশ উত্তেজনা প্রকাশ করছে ফেইসবুক,ইউটিউবে।এবং পাব্লিক খাচ্ছে। খাবে নাই বা কেন পাপিয়া যে নারী। নারী’র চুল,নারী’র মাথা,পেট,পিঠ,পা,বুক নিয়ে আলোচনা করতে আলোচনা শুনতে পছন্দ করে আর তাই হচ্ছে।
বর্তমান প্রগতিশীল ট্যাগ নেওয়া কিছু নর-নারী বন্ধুও দেখছি পাপিয়া’কে নিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। যেমন ধরুন-
পাপিয়া মোটা মাগি।
পাপিয়া জলহস্তির গোসল করে।
পাপিয়া ভুস্কি নাচে।
পাপিয়া মুডি বেশ্যা বসন্ত পালন করে।
মোট কথা একজন নারী যৌন কর্মি সে নাচতে পারবে না,উৎসব পালন করতে পারবে না, গাইতে পারবে না। তার উপরে স্বাস্থ্যবান। তাই তাদের নিম্নমানের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ গুলো এক চমৎকার মাত্রা পায়। যদিও পাপিয়া চিকোন হলে এদের কাছ থেকে এর থেকেও ভয়ংক কিছু আশাকরা যেতো।

এর উপরে বাংলাদেশ হলো খবরের কারখানা। যাঁরা মনে করেন দেশে রাজনীতি নেই বলে খবরও নেই, তাঁরা ভুল করেন। প্রতিদিনই নতুন নতুন খবর পাওয়া যায়। আগের খবরটি থেকে পরের খবরটিতে আরও বেশি চমক থাকে।
আজ শিশু ধর্ষণ,কাল মাদ্রাসায় ছাত্র বলৎকার হুজুরের কাছে,পরশু হিন্দুর বাড়িতে আগুন,এর পরের দিন এর থেকেও চমৎকার নেক্কার কিছু। একদিন করোনা নিয়ে সাংবাদিক কাকুদের চিন্তা থাকলেও আজ কাল এবং আগামী কদিনের জন্য পাপিয়াকে নিয়েও ব্যস্ত থাকবে।

গত বছর সেপ্টেম্বরে যখন ক্যাসিনো-রাজা ইসমাইল হোসেন সম্রাট ধরা পড়লেন, তখন অনেকেই অবাক হয়েছিলেন, নিষিদ্ধ ক্যাসিনোর দেশে ক্যাসিনো-সম্রাট। তিনি আবার যুবলীগের নেতাও। এরপর আরও ক্যাসিনো-মোগল ধরা পড়লেন। কিন্তু কয়েক দিন পরই আবিষ্কৃত হলো বাংলাদেশে শুধু ক্যাসিনো-সম্রাট নেই, টেন্ডার-সম্রাটও আছেন। এক জি কে শামীম সরকারের গণপূর্ত বিভাগের প্রায় অর্ধেক কাজ বাগিয়ে নিয়ে গেছেন। এ কারণে সরকারের মন্ত্রী-নেতাদের সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরমের কথাও চাউর হয়ে যায়।
যাহোক বাদ দেই এই সব। এই ধরণের আলাপ করতে হাই প্রোফাইল লোক দরকার। তাহলে লোকে খাবে। আমি বল্লে খাবে না। মারজুক ডগি স্টাইলে সেক্স করতে পছন্দ করে,তাই সে তার টি-শার্ট ছবি এঁকে নিয়েছেন ‘আই লাভ ডগি স্টাইল’ ঠিক এই বাক্যটি আমি যদি অন্যরকম বলি- ‘আই লাভ ইরোটিক’ তাহলে সবাই আমাকে ঘেন্না গেন্না বলে উড়িয়ে দিবে। এক কথা থেকে অন্য কথায় যাওয়া আমার অভ্যেস। মার্জনা করবেন। পাপিয়ায় ফিরি!
পাপিয়া আমার কেউ নয়,কিছু হতেও চাই না আশাকরি কমেন্টে পাপিয়ার আত্মীয় বানাবেন না।

উপরোক্ত কথা গুলো বলার মূল কারণ হলো বর্তমান সমাজে একজন নারী অপরাধী বলে বিবেচিত হলে সামাজিক পর্যায়ে কী কী প্রভাব পরে তারই একটি ছোট্ট আলোচনা। একবার ভাবুন তো পাপিয়া যদি পুরুষ হতো তাহলে কী এতো আলোচনা হত! এর থেকেও তো কত কত অন্যায় বাঙালেদেশে ঘটছে। ছাত্রদের পাছা মারছে মাদ্রাসায়,নিজের বোন-মেয়েকে ধর্ষণ করছে, লেখক,প্রাকাশদের কুপিয়ে মারছে,সমকামীদের মারছে,পার্কে বসা সুন্দর দৃশ্য প্রেমিক প্রেমিকাদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, দিনের পর দিন শ্রমিকদের ঠকাচ্ছে,খাদ্যে বিষ ঢেলে দিচ্ছে। অথচ,এগুলো পেছনে কাদের জ্ঞান গুন সবই আপনারা জানেন। তবুও অভ্যেসের বসে আজও জানেন না নীরবে, নিভৃতে চাষ করে যাচ্ছে ভয়াবহ বৈষম্য।

পাপিয়া আদালতে বলেছে আমি কী দোষ করেছি?

এই বাক্যটি আমাকে ভাবাচ্ছে!

তবে,
-নৈতিকতাকে সমাজ যখন আবর্জনার মত ছূড়ে ফেলে,
-মানবিক গুনাবলির বিকাশের যেখানে অবকাশ নেই,
– মিথ্যাচারিতা উপজীব্য করে ধর্মীয় অনুভূতিগুলির দোহাই দিয়ে রাজনৈতিক নেতাগন যখন দেশের সম্পদ লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পরে,
– বাস্তবমূখি শিক্ষার বিস্তার না করে মাদ্রাসা শিক্ষায় উদ্ভূত করে,
– বিচারহীনতা অপসংস্কৃতি যখন সমাজ জুড়ে বিদ্যমান হয়
তখন অপরাধে বেড়ে উঠা সাধারণ মানুষরা মনে করে ব্যাঙের আবার সর্দি!

মনে রাখা উচিৎ, সমাজের তথাকথিত নীতিমালা নির্ধারণকারীরা পাপিয়া আপুদের তৈরী করতে সহায়তা করে।

সুতরাং এক বুক ঘৃণা রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি।

ধন্যবাদ
টিটপ হালদার

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

89 + = 94