দক্ষিণ এশিয়া কী অগ্নিগর্ভ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠছে?

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড নিশ্চয় এক জিনিস নয়। দিল্লিতে সংগঠিত ঘটনা কোনভাবেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নয়। এটি ভারত রাষ্ট্র কর্তৃক রাষ্ট্রীয় হত্যাকান্ড এবং সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, ভারতের সংখ্যালঘু জনগোষ্টীর প্রতি ভারত রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় আয়োজনে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী কর্মকান্ড। হিন্দুবাদী ভারত রাষ্ট্রের ধর্মীয় উন্মাদনার বহিপ্রকাশ ঘটেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্রমোদী এবং নষ্ট ও পঁচে যাওয়া ভারতের রাজনীতির প্রত্যক্ষ সহযোগীতায়। তথাকথিত অসাম্প্রদায়িক ও সেক্যুলার ভারতের মুখোশ বিশ্ববাসীর কাছে উন্মোচন হয়ে গেছে।

ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোর চরিত্র আসলে দেশভাগ পূর্ব সময় থেকে কখনই অসাম্প্রদায়িক ছিল না। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ নামক দেশগুলোকে উগ্রজাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় মৌলবাদের জলাভূমি হিসাবে রেখে গিয়েছে বৃটিশরা। জাতীয়তাবাদ আর ধর্মের বিষাক্ত রাসায়নিক বোমার বিষ্ফোরণ ঘটিয়ে বৃটিশরা এই উপমহাদেশ থেকে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে এই উপমহাদেশ এখনো জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনামক বিষ রাজনীতিতে বহন করে চলছে। খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ। রাজনীতিবিদরা তাদের আখের ঘুচিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রপতি ট্রাম্প এর নেতৃত্বে এই উপমহাদেশের দেশগুলোতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগানোর ‘ইঙ্গ-মার্কিন’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র এখন একটি উগ্রজাতীয়তাবাদী দেশ। একইভাবে এই উপমহাদেশের ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দেশ হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে পরিকল্পনা মাফিক। জাতিয়তাবাদ ও ধর্ম একই গোত্রের বিষ। তাই যাহা ট্রাম্প, তাহাই মোদী, শেখ হাসিনা আর ইমরান খান। নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে ট্রাম্পের ভারত সফর আর মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর একই প্রকল্পের কর্মসূচী। ঘটনাগুলোর ধারাবাহিকতা ও ফলাফল একই ধরনের হবে। জাতীয়তাবাদি ট্রাম্প এবং ধর্মবাদী নরেন্দ্র মোদী, শেখ হাসিনা ও ইমরান খান একই বাগানের মালী। ভারতের দিল্লীর মত একই ঘটনা ঘটবে মোদির বাংলাদেশ সফরের সময়। ধার্মিক বাংলাদেশ দিল্লীর মত পরিস্থিতি মোকাবেলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে নিশ্চয়!

ধর্মীয় দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে বৃহত্তর ভারতের যে ভাঙন শুরু হয়েছিল দেশভাগের সময়, অল্প কিছুদিনের মধ্যে সেই ভারত দু’টি রাষ্ট্র থেকে তিনটিতে গিয়ে ঠেকেছে। ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ভাগ হয়েছে জাতীয়তার ভিত্তিতে। বৃটিশদের ভারতবর্ষকে টুকরো টুকরো করার প্রকল্প বাতিল হয়নি এখনো। যেখানে জাতীয়তার ভিত্তিতে সম্ভব সেখানে সেই চেষ্টা চলছে, যেখানে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজন করা সম্ভব সেখানে সেই প্রচেষ্টা চলছে। মোদির নেতৃত্বে ভারতের হিন্দুবাদী রাষ্ট্র হয়ে উঠার প্রতিক্রিয়ায় ভারত আরো কয়েক টুকরো হওয়া এখন সময়ের উপর নির্ভর করছে। এটা ঠেকানোর উপায় ভারতের কোন রাজনৈতিক দলের নেই। মোদির মত একজন গণহত্যাকারী ও তার হিন্দুবাদী দলকে পরপর দুইবার ভারত শাসন করার ম্যান্ডেট দিয়ে ভারতের জনগণ ভারতকে টুকরো টুকরো করার সুযোগ দ্রুততর করে দিয়েছে। আমরা বর্তমান ভারতের মধ্য থেকে আরো কয়েকটি নতুন দেশ দেখার জন্য চিন্তাহীনভাবে অপেক্ষা করতে পারি। এর দায় ভারতের জনগণের। পাকিস্তানও ভেঙে আরো অন্তত দু’টি নতুন রাষ্ট্র হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। এর দায় পাকিস্তানের ধর্মান্ধ জনগণ কোনভাবেই এড়াতে পারবে না।

ঠিক একইভাবে বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদী শাসক শেখ হাসিনার ধর্ম নিয়ে খেলাধুলা করার দায় চুপ মেরে থাকা জনগণ কোনভাবেই এড়াতে পারবে না। রাজনীতিতে ধর্মকে ব্যবহারের পরিণতি শেষ পর্যন্ত কতটা খারাপ হতে পারে ইতিহাস ঘাটলে খুঁজে পাওয়া যাবে। মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে এর কোন সুফল কেউ দেখাতে পারবে না। রাজনীতিবিদদের রাজনীতিতে ধর্মকে এবং জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করার সুযোগ আমাদের মত সাধারণ জনগণ তৈরি করে দিই, এটা ভুলে গেলে চলবেনা।

যে ট্রাম্প মোদির সাথে গলাগালি করে মুসলিম সন্ত্রাস পৃথিবী থেকে নির্মূল করার ঘোষনা দিয়েছে সেই ট্রাম্পের দেশ পৃথিবীতে সন্ত্রাসকে মহামারী আকারে ছড়িয়ে দিতে কি পরিমাণ মানুষ মেরেছে এবং এখনো নির্বাচারে মারছে, তার বিচার ইতিহাস একদিন করবেই। ট্রাম্প ও মোদির মত সন্ত্রাসীর মুখে সন্ত্রাস নির্মূলের যৌথ ইসতিহার হাস্যকরই বটে।

এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের একমাত্র উপায় হচ্ছে সাধারণ মানুষের জেগে উঠা; এছাড়া বিকল্প কোন পথ নাই। ধর্ম ও জাতীয়তাবাদকে ছুঁড়ে ফেলে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ জেগে না উঠলে দক্ষিণ এশিয়া আরেকটি মধ্যপ্রাচ্য হয়ে উঠাকে কেউ ঠেকাতে পারবে না।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

68 − = 62