লৌকিক লোকলীলা (উপন্যাস: পর্ব-দশ)

পাঁচ

বেশ কিছুক্ষণ দৌড়নোর পর পাকা রাস্তার কাছাকাছি এসে আবার হাঁটতে থাকে ওরা তিনজন, ওদের ডানদিকে গাছপালা-ঝোপঝাড়ের পরেই চন্দনা নদী, বামদিকে রাস্তার পাশে যাদবপুর কালী মন্দির, মন্দির চত্ত্বরে বিশাল অশ্বত্থগাছ। পাকা রাস্তাটি চন্দনা নদীর ওপরের ব্রিজ থেকে শুরু হয়ে ঈষৎ দক্ষিণে বেঁকে মন্দিরের পিছন দিয়ে চলে গেছে পশ্চিমদিকে গ্রামের ভেতর দিয়ে, আর চন্দনা নদীর পশ্চিমপাড়ের উত্তর-দক্ষিণমুখী কাঁচা রাস্তাটি মন্দিরের পূর্বপাশ দিয়ে মিশেছে পাকা রাস্তার সাথে। অমলদের শৈশবে চন্দনা নদীর ওপর ব্রিজ ছিল না, সঙ্গত কারণেই ব্রিজে উঠার রাস্তাও ছিল না। মন্দিরের পিছনের পাকা রাস্তাটি তখন ছিল কাঁচা, বর্ষায় এক হাঁটু কাদা হত আর গ্রীষ্মে হত ধুলো। রাস্তাটি শেষ হয়েছিল এখানেই চন্দনা নদীর ঘাটে। তখনও চন্দনার এখনকার মত মৃতপ্রায় খালের দশা হয়নি, বেশ চওড়া ছিল চন্দনার বুক, গুরুত্ব ছিল চন্দনার। চন্দনার পূর্বপাড়েই জামালপুর বাজার, দু-পাড়েই ছিল জমজমাট ঘাট, দিন-রাত খেয়া নৌকা চলত তখন। এপারের বহু গ্রামের মানুষ তাদের ক্ষেতের ফসল বিক্রি করতে আর সংসারের প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনতে খেয়া নৌকায় চন্দনা পার হয়ে যেত জামালপুর বাজারে, আর নদীপাড়ের গ্রামগুলির মানুষেরা নৌকা বোঝাই করে মালপত্র নিয়ে হাঁটে আসত। হাঁটের দিনে অসংখ্য নৌকা ভিড়ত বাজারের ঘাটে। অমলদের বাল্যকালে ব্রিজ হওয়ার পর খেয়া নৌকার দিন শেষ হয়। সুশান্ত, নিজামউদ্দিন, অধীর, হাসান আলী, নিমাইসহ আরো অনেক মাঝি; যারা বংশ পরম্পরায় খেয়া নৌকা চালাত, ব্রিজ হওয়ার পর তারা সবাই বেকার হয়ে পড়ে, কেউ দিনমজুরের কাজ শুরু করে, কেউ ভ্যান চালানো শুরু করে। তাদের কেউ কেউ আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু যারা বেঁচে আছে, এই মৃতপ্রায় চন্দনাকে দেখে তাদের বুকের ভেতর কি হাহাকার জাগে না? হয়তো জাগে।

চন্দনার দুই পাড়ের ঘাট এখন কেবল পরিত্যক্তই নয়, ঘাটের চি‎‎হ্নমাত্র নেই, নৌকা দূরে থাক, গলুইভাঙা একটুকরো কাঠও চোখে পড়ে না! চোখে পড়ে কেবল ঘাস-লতাগুল্মের ঝোপঝাড়। চন্দনাও আর আগের মতো নেই, গত বিশ-পঁচিশ বছরে নদীখেকোদের দৌড়াত্মে চন্দনা আরো ক্ষীণকায় হয়েছে আর চন্দনার জমি উদ্ধার এবং খনন না করার কারণে নদীর গোত্রচ্যূত হয়ে চন্দনা পরিণত হয়েছে নেহাত এক খালে! চন্দনার দুই পাড় দখল করে মানুষ এখন সবজী চাষ করে, কেউ কলাবাগান করেছে, কেউবা কাঠের গাছ লাগিয়েছে। কোথাও কোথাও চন্দনার বুক ভরাট করে কোনো অর্বাচীন তার বাড়ির সীমানা বাড়িয়েছে, কোথাও বা এমনিই পড়ে আছে আর সেখানে বেড়ে উঠেছে ঝোপ-জঙ্গল। এই এলাকার এককালের মঞ্চমাতানো তুখোর নৃত্যশিল্পী লিপিকা রানীর শরীর যেমনি শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে বয়সের ভারে, তেমনি এককালের চঞ্চল চন্দনার বুকের উজানের জল এখন বর্ষাকালে কোনোরকম ছলাকলা বা কলানৈপূণ্য ছাড়াই মেটে সাপের মতো শান্তভাবে নেমে যায় ভাটির দিকে, আর গ্রীষ্মকালে মৃত হরিয়াল পাখির চোখের মতো স্থির থাকে!

পাকা রাস্তায় উঠে সতর্কভাবে ব্রিজের দিকে এগোতেই ওদের নজরে পড়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে কেউ একজন আসছে, ওরা দ্রুত রাস্তা ছেড়ে ডানদিকের গাছপালা আর ঝোপ-ঝাড়ের আড়ালে লুকোয়। কিন্তু সাইকেলওয়ালা ওদের দিকে আসে না। ব্রিজ থেকে নেমেই উত্তরদিকে নদীর পাড় দিয়ে যে মাটির উঁচু রাস্তাটি চলে গেছে, সেই রাস্তার অন্ধকারে বিলীন হয়ে যায় সাইকেলওয়ালা। গাছপালা-ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে ওরা আবার রাস্তায় উঠে ব্রিজের দিকে হাঁটতে থাকে।

ব্রিজে উঠার পরই ওদের কানে ভেসে আসে শ্মশানযাত্রীদের ধ্বনি, একজন প্রথমে ধ্বনি দেয়, ‘হরিধ্বনি বল।’

অন্যরা সমস্বরে বলে-‘হরি বল।’

এভাবে তিনবার ধ্বনি দেবার পর শ্মশানযাত্রীদের কণ্ঠস্বর আর শোনা যায় না। ওরা ব্রিজের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়, নদীর পূর্বপাড়ের কয়েকটি গৃহস্থবাড়ি এবং গাছপালার মাথার ওপর দিয়ে আড়ালে থাকা শ্মশানের দিকে তাকায়, জলন্ত চিতা দেখতে না পেলেও হতাশ নয়নে তাকিয়ে থাকে গাছপালার মাথার উপরে চিতার আগুনের লাল আভার দিকে।

‘কিডা মোলো রে?’ জানতে চায় অমল।

উত্তর দেয় পরিমল, ‘কী জানি বাল! মরার আর দিন পালো না!’

বিলাস বলে, ‘মরা পুড়াতি পুড়াতি যদি সহাল অয়ে যায়?’

‘তালি তো তেস মারা!’

হতাশা ঝরে পড়ে বিলাসের কণ্ঠ থেকে, ‘আজ কুফা লাগিছে বারা!’

ওদের গন্তব্য নদীর ওপারের ওই শ্মশান, ব্রিজ থেকে সোজা একটি ইট বিছানো ভাঙাচোরা রাস্তা পূর্বদিকে গিয়ে মিশেছে উত্তর-দক্ষিণে লম্বা আরেকটি রাস্তার সঙ্গে। ওই রাস্তাটি দক্ষিণে চলে গেছে জামালপুর বাজারের ভেতরের দিকে, আর উত্তর দিকে শ্মশানের পূর্বপাশ দিয়ে গিয়ে মিশেছে বালিয়াকান্দী-মধুখালী সড়কে।

ব্রিজের পূর্বদিকের ডানপাশ লাগোয়া চন্দনার ঢালে নরেশ কামারের দোকান থেকে কাশির শব্দ শোনা যায়, নদীর দুই পাড় মাটি ভরাট করে যে যেমনি পারে দখলে নেয়, দরিদ্র কামার নরেশও সুযোগ বুঝে ব্রিজের পাশে মাটি ফেলে ছোট্ট একটা টঙ তুলে কাকাতো ভাই সুবলকে সঙ্গে নিয়ে হাপর খুলে বসেছে; দা, কাঁচি, নিড়ানি, বঁটি, খুন্তা, কুড়াল, শাবল ইত্যাদি গৃহস্থালী কর্মের অস্ত্র বানায় আর অর্ডার পেলে রামদা কিংবা খড়গও বানায়। কাশির শব্দ নিশ্চিত করে যে নরেশ আজকে বাড়ি যায়নি, নিশ্চয় বউয়ের সাথে আবার ঝগড়া হয়েছে, বউয়ের সাথে ঝগড়া হলে নরেশ বাড়ি যায় না, দিনভর দোকানে কাজ করার পর রাতে তার সহযোগী সুবলকে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়, বাজারের টিউবয়েল থেকে স্নান করে বিমলের হোটেল থেকে ভাত খেয়ে দোকানে এসে মন চাইলে ঢোলটা কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ তাল ঠোকে আর নিচু স্বরে গান গায়, তারপর ঘুমায়। সপ্তাহে দু-দিন সোম আর শুক্রবার রাতে নরেশের দোকানে গানের আসর বসে, ঢোল আছে, পুরোনো একটা হারমনিয়াম সংগ্রহ করেছে, করতাল-কৃষ্ণকাঠিও আছে। প্রতি আসরেই জগনান্দী, যাদবপুর, সর্দারপাড়া আর বাজার থেকে দশ-বারোজন জুটে যায়; সর্দারপাড়ার মাখন বাড়িতে বানানো মদ নিয়ে আসে, তাই গলাধঃগরন করে গান-বাজনা চলে রাত একটা-দুটো পর্যন্ত, বাজারের পাহাড়াদার হাজরা সরকার পাহাড়া দেবার ফাঁকে ফাঁকে এসে একটা-দুটো গান গেয়ে আবার ছুটে যায় বাঁশিতে ফুঁ দিতে। বউয়ের সাথে নরেশের ঝগড়া বাধে মদ খাওয়া আর গানের আসর নিয়ে।

ঝগড়ার প্রথম দু-তিনদিন বউও দেমাগ দেখিয়ে এমুখো হয় না, তারপর তিন কি চারদিনের মাথায় বউ এসে হাজির হয়। প্রথমে চিৎকার চেঁচামিচি করে কিছুক্ষণ, দু-একখানা দা-কাঁচি মাটিতে কি বেড়ায় ছুড়ে মারে, দা দিয়ে ঢোলের চামড়া ফুটো করতে গেলে কিংবা হারমনিয়াম কুপিয়ে ভাঙতে চাইলে নরেশের বাধায় ব্যর্থ হয়ে কেঁদে-কেটে মাথার চুল খুলে হাপরের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে, ‘তুমি বাড়ি যাবা কি না কও, নয়ত এই তুমার সামনেই আগুনি মাথা দিয়ে মরব।’

হাপরের জ্বলন্ত কয়লায় মাথা দিতে উদ্যত বউকে তখন জাপটে ধরে নরেশ, বউ নরেশের ঝাঁকড়া চুল দুই হাতের মুঠোয় ধরে মাথা ঝাঁকায়, তারপর নরেশকে জাপটে ধরে বুকে মাথা রেখে আপন মনে কাঁদে। নরেশের চোখও তখন ছলছল করে ওঠে, রাগ-অভিমান ভুলে বউয়ের সঙ্গে বাড়ি যায়। কিছুদিন তারা সুখে-শান্তিতে কাটায়, তারপর আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে! নরেশের কাশির শব্দ কানে আসায় পরিমল নিচু স্বরে বলে, ‘নরেশদা মনে হয় আবার বউয়ের ঠাপ খাইছে!’

‘হুম, হবার পারে।’ বলে অমল।

পুনরায় শ্মশানযাত্রীদের ধ্বনি শোনা যায়, একজন আগে ধ্বনি দেয়, ‘হরি হরি বল।’

অন্যরা সমস্বরে বলে, ‘হরি বল।’

তিনবার ধ্বনির পরই আবার নৈঃশব্দ বিরাজ করে চারিদিকে। ব্রিজ থেকে নেমে সোজা রাস্তায় না গিয়ে ব্রিজের উত্তরদিকে নদীপাড়ের কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকে ওরা। রাস্তার পূর্বপাশে পর পর কয়েকটা বাড়ি, তারপর মাঠের মধ্যে মেহগনি আর কলাগাছের বাগান, এরপর ধানক্ষেতের ওপাশে শ্মশান। একটা বাড়ি থেকে হাসনাহেনার গন্ধ নাকে ভেসে আসায় অমলের পা থমকে যায়, হাসনাহেনার গন্ধে ওর ঘোর লেগে যায়, আশালতার স্মৃতির গভীর ঘোর!

পরিমল বলে, ‘দাঁড়ালি যে?’

অমল উত্তর দেয় না। জোরে শ্বাস নিয়ে বুক ভরে হাসনাহেনার ঘ্রাণ নেয়।

পরিমল আবার বলে, ‘কী হলো রে?’

‘কিছু না।’ বলে পুনরায় পা চালায় অমল, কিন্তু তার মন ডুবসাঁতার কাটে আশালতার স্মৃতির পুকুরে, ডুবসাঁতার কাটকে কাটতে ডুবে যায় সাঁতার না জানা জল পান করতে করতে হাল ছেড়ে দেওয়া মানুষের মতো! ডোবে অমল, ক্রমশ ডুবতেই থাকে আশালতার স্মৃতির অতল পুকুরে। ক্লাস টেনে পড়ার সময় একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আশালতা বলেছিল, ‘হাসনাহেনার ঘ্রাণ আমার খুব ভাল লাগে, আমার বাগানে হাসনাহেনার গাছ লাগাবো। চারা কই পাই ক তো?’

অমল বলেছিল, ‘বাজারের কাছের নার্সারিতে পাওয়া যায়।’

ক’দিন পর স্কুলের খেলার মাঠের সবুজ ঘাসে বসে আড্ডা দেবার সময় অমল আশালতাকে বলে, ‘আমি আজ ভোরবেলায় স্বপ্ন দেখছি, তোগের পুকুরপাড়ের কাঁঠালগাছের গোড়ায় গুপ্তধন আছে!’

আশালতা হেসে উড়িয়ে দেয়, ‘যাঃ, বাজে কথা!’

‘বাজে কথা না, তুই আজ বাড়ি ফিরে যায়ে দেহিস।’

‘তুই যায়ে মাটি খুঁড়ে গুপ্তধন নিগে যা।’

‘আরে মাটির তলায় না, মাটির উপরে!’

আশালতা অমলের ঘাড় ধরে ঝাঁকিয়ে বলে, ‘তোরে কলাম তুই নিগে যা।’

অমল আশালতার হাত থেকে নিজের ঘাড় ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, ‘তুই আজ যায়ে দেখপি, কাঁঠালগাছের গোড়ায় যদি কিছু না পাস, তাইলে কাল স্কুলে আসে আমারে যা ইচ্ছে তাই শাস্তি দিস।’

স্কুল থেকে ফিরে কৌতুহলবশত সত্যি সত্যি পুকুরপাড়ে কাঁঠালগাছের কাছে গিয়ে দুটো হাসনাহেনার চারা দেখতে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায় আশালতা, পরম যত্নে গাছ দুটো লাগায় ওর থাকার ঘরের জানালা থেকে অল্প দূরের বাগানে। পরদিন স্কুলে যাবার পথে অমলের সঙ্গে দেখা হতেই আশালতা হাসে, অমল ওর হাসির অর্থ বুঝতে পেরে বলে, ‘আমার কথা সত্যি হলো তো!’

আশালতা আদুরে হাতে অমলের চুল টেনে বলে, ‘তুই একটা…! কই পালি চারা দুডে?’

অমল বিকেলবেলা সাইকেল চালিয়ে নার্সারি থেকে দুটো হাসনাহেনার চারা কিনে এনে কিভাবে রাতেরবেলা আশালতাদের পুকুরপাড়ের কাঁঠালগাছের গোড়ায় লুকিয়ে রেখে এসেছিল, সে কথা জানায়। তারপর বলে, ‘গাছ দুডে লাগাইছিস?’

‘হুম। আমার জানালা বরাবর।’

‘সর্বনাশ, জানালার কাছে লাগাইছিস ক্যান!’

‘একেবারে কাছে লাগাই নাই, পাঁচ-ছয় হাত দূরে।’

‘আরো দূরি লাগাতি, হাসনাহেনার ঘ্রাণে রাততিরি সাপ আসে!’

‘আসে আসুক, বেশি দূরে লাগালি তো ফুলের ঘ্রাণ পাবান না। রাততিরি শুয়ে হাসনাহেনার ঘ্রাণ শুকতে শুকতে ঘুমাব।’

দুটো হাসনাহেনার চারা উপহার পেয়ে আশালতার মুখ শরতের শেষ বিকেলের অস্তগামী সূর্যকিরণে শুভ্র মেঘের টুকরোর মত দীপ্তোজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, আর আবেগে-আনন্দে আপ্লুত অমল চোখের জোয়ার লুকিয়েছিল!

 

(চলবে…..)

1
Leave a Reply

avatar
1 Comment threads
0 Thread replies
0 Followers
 
Most reacted comment
Hottest comment thread
1 Comment authors
Everettvow Recent comment authors
  Subscribe  
newest oldest most voted
Notify of
Everettvow
পথচারী

Рад общению , вот что это лофт мебель
Парни инстаграмм тут есть цех Делают норм кто подскажет
Для для дома хочу,ну может быть вам понадобится ! подключайтесь по разговариваем =) металлоконструкции любой сложности