কৈশোরের ডায়েরি: তৃতীয় পর্ব

বিভিন্ন ধর্মমত, সংস্কার ও তুলনামূলক আলোচনা।

□ পৃথিবীর ইতিহাসে যে বিষয়টি মানব সভ্যতাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে তা হল ধর্ম! সৃষ্টির আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত এই ধর্মকে রক্ষা করতে গিয়েই কত মানুষের রক্ত গেল, কত দেশের ভৌগলিক মানচিত্র চিরতরে বদলে গেল, কত মননে চিরস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি হল তাঁর কোন হিসাব নেই! ধর্ম রক্ষা করতে গিয়েই মানুষ সবচেয়ে বেশি অমানবিক, নিষ্ঠুর ও পাশবিক হয়েছে! এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষ মেরে মনে করছে নিজেদের ঈমানি দায়িত্ব বা কর্তব্য পালন করলাম! ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ চেতনার প্রসার ঘটায়, মানুষকে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, জৈন, শিখ, বৌদ্ধ, ইহুদি, পার্সি ইত্যাদি ভাগে ভাগ করে! এক ধর্মের মানুষ অন্য ধর্মের মানুষকে খুব একটা পছন্দ করে না! যে যত ধার্মিক তাঁর মধ্যে গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতা তত বেশি! সে তত বেশি মানুষকে ধর্ম, জাতি, বর্ণে ভাগ করে! অথচ তথাকথিত কিছু বুদ্ধিজীবীরা বলেন প্রকৃত মুসলমান ও প্রকৃত হিন্দুর মধ্যে নাকি কোন বিরোধ নেই? প্রকৃতপক্ষে এই কথাটি ‘সোনার পাথর বাটির সমতুল্য’। যেমন- রামকৃষ্ণ দেব বলেছেন, ‘যত মত তত পথ, কালি, খৃষ্ট, আল্লা সব এক’। এই কথাটি শিশুদের সমন্বয়ধর্মী মানসিকতার বিকাশ ঘটাতে সাহায্য করে কিন্তু এর বাস্তবধর্মী কোন প্রয়োগ নেই!

যে যত ধার্মিক তাঁর মধ্যে সংস্কার তত তীব্র এবং এই সংস্কারের কারণে এক ধর্মের মানুষের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের মিলন তত দূরহ হয়ে পড়েছে বরং দেখা যায় যেখানে ধর্ম যত কম সেখানে এক ধর্মের মানুষের সঙ্গে অন্য ধর্মের মানুষের মিলন তত সহজ হয়েছে। হিন্দুদের শিব, আর মুসলমানদের আল্লাহ সম্পূর্ণ আলাদা শক্তি, আবার খৃষ্টানদের গড ও ইহুদিদের যিহোবা এগুলি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় এই আরাধ্য শক্তি গুলির মধ্যে পরস্পর সাংঘর্ঘিক অবস্থান দেখা যায়। যেমন- গরু হিন্দুদের পূজনীয় পশু, কিন্তু খৃষ্টান বা ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে তা সাধারণ পশু ও ভক্ষণযোগ্য। এই গরুকে রক্ষা করতে গিয়েই কত মানুষের প্রাণ গেল কত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি হয়ে চলেছে তাঁর কোন হিসাব নেই!

আসলে যাঁদের কাছে গরুর মূল্য মানুষের চেয়ে বেশি তাঁরা এর চেয়ে বেশি কি বুঝবে? এই জন্য এরা গরুর মূত্র, গো ময় এগুলিকে পবিত্র মনে করে! আবার অদ্ভুত বিষয় হল মুসলমানদের শূকর হরাম অথচ খৃষ্টানদের কাছে গরু ও শূকর উভয়ই ভক্ষণ যোগ্য! পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ এগুলিকে খাদ্য হিসাবে গ্রহণ করে সেক্ষেত্রে এই সংকীর্ণতার কারণ কি? আসলে ধর্ম মানুষকে একপ্রকার মানসিক বিকারগ্রস্ত প্রাণীতে পরিণত করে, তাই অনেকেই মনে করেন গোমূত্র পান করলে ক্যান্সারের মতো রোগ সেরে যাবে। অবশ্য ধর্মান্ধদের কোন জাত, ধর্ম থাকে না হিন্দুত্ববাদীরা মনে করেন গোমূত্র পবিত্র, আবার মুসলমান মৌলবাদীরা মনে করেন উটের মূত্র পবিত্র! আদপে ধর্ম মানুষকে কতটা মূর্খ, সংকীর্ণ ও উগ্র বানিয়ে রাখে এগুলি তাঁর নিদর্শন!

ধর্ম মানুষের চিন্তাকে একটি সংকীর্ণ গন্ডিতে বেঁধে রাখে, যাঁর বাইরে গিয়ে এই মহাবিশ্বের জ্ঞান আহরণ ধর্মান্ধদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই তাঁরা নিজেদের সংকীর্ণ গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থেকেই মনে করে এর মধ্যেই পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান নিহিত রয়েছে। এই সংকীর্ণতার মধ্যেই তাঁরা সারাজীবন আবদ্ধ থাকে! ধর্ম চিরকাল মুক্ত চিন্তা, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞানের বিরোধীতা করেছে। কারণ ধর্মের মূল ভিত্তিই হল বিশ্বাস, অন্যদিকে বিজ্ঞানের মূল ভিত্তিই হল প্রশ্ন করা, যুক্তির কষ্টিপাথরে কোন কিছুকে যাচাই করে তারপর গ্রহণ করা। বিজ্ঞান নিত্য নৈমিত্তিক জিনিস আবিষ্কার করে, অন্যদিকে ধর্ম পুরাতন জরাজীর্ণ সংস্কারকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই, তাই প্রকৃতপক্ষে ধর্ম ও বিজ্ঞানের পথ সাংঘর্ঘিক!

ধার্মিক ব্যক্তি চিরকাল এক জায়গায় অবস্থান করে সেখান থেকে সে বের হতে পারে না। যেমন- বিজ্ঞান যখন প্রথম বলল, মানুষ চাঁদে যাবে তখন ধার্মিক ব্যক্তিরা বলে আল্লা, ভগবান বা গডের তৈরী চাঁদে যাওয়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, অথচ আজ মানুষ চাঁদে গিয়ে প্রমাণ করেছে, ‘মানুষ চাঁদে যেতে সক্ষম’! সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল আজও বহু ধর্মান্ধ মানুষ বিশ্বাস করেন, মানুষ কোনও দিন চাঁদে যায় নি, এগুলি সবই আমেরিকা ও পশ্চিমা সভ্যতার চাল! তা প্রশ্ন হল বিজ্ঞানের অগ্রগতি ছাড়া আজকের আধুনিক চিকিৎসা, আধুনিক প্রযুক্তি বিদ্যার ব্যবহার কিভাবে সম্ভব?

যদি মানুষের প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের উন্নতি না হত তাহলে আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম, আধুনিক জীবন ব্যবস্থা গড়ে উঠল কিভাবে? ধার্মিক ব্যক্তিরা নতুন কিছু চিন্তা করতে পারে না। যেমন- বর্তমানে গোটা বিশ্ব করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। ধার্মিক ব্যক্তিরা এগুলি আল্লার গজব, ভগবানের রোষ ইত্যাদি বলে মন্দির, মসজিদে যাওয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন যাতে ভগবান, গড, আল্লা তাঁদের এই ভাইরাস থেকে রক্ষা করে। অথচ দেখা যাচ্ছে চীন, গোটা বিশ্ব সহ, আল্লার ঘর মধ্যপ্রাচ্যে হাজার হাজার মানুষ এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে, অথচ আল্লা, ভগবান, গড বা তথাকথিত কোন সৃষ্টিকর্তা এখানে কোন রূপ সাহায্য করছে না, মানুষকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করছে না! তাহলে প্রশ্ন হল এই বিপদ থেকে কারা মানুষকে রক্ষা করছে? এই বিপদ থেকে মানবজাতিকে রক্ষা করতে পৃথিবীর সমস্ত বিজ্ঞানীরা নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে, আশাবাদী খুব দ্রুতই বিজ্ঞানীরা এর চিকিৎসা আবিষ্কার করতে পারবে! তাহলে প্রশ্ন হল এই নিষ্ক্রিয় ঈশ্বরের চিন্তা না করে বিজ্ঞানের চর্চা করলে কি মানবজাতির বেশি মঙ্গল হতো না? এত কিছু সত্ত্বেও ধর্মান্ধদের ধর্মের প্রতি মোহ কাটছে কি?

1:50 P.M                                       23/10/2007

□ ধর্ম কি?

আপেক্ষিক অর্থে ‘ধর্ম’ কথার অর্থ হল ধারণ করা, ধর্ম মানে আমরা বৈশিষ্ট্য ও বলতে পারি। এখন পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ হাজার হাজার ধর্ম পালন করে। একটি বেসরকারি পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় পৃথিবীতে প্রায় 4,200 টির মত ধর্মমত প্রচলিত রয়েছে। কত ধর্মমত যে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়েছে তাঁর কোন হিসাব নেই। প্রবল পরাক্রমশালী এক একটি ধর্ম দশ হাজার বছর বা কুড়ি হাজার বছর টিকে আজ বিলুপ্ত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ বছরের মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে মাত্র কয়েক হাজার বছর আগে, অথচ ধর্মান্ধরা দাবি করে সৃষ্টির আদি থেকেই নাকি ধর্মের উৎপত্তি হয়েছে?

ধর্মের মজার বিষয় হল ধার্মিক ব্যক্তি নিজের ধর্ম ছাড়া পৃথিবীর বাকি সমস্ত ধর্মকে মিথ্যা ও ভন্ড মনে করে। তাই প্রকৃতপক্ষে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ, বিদ্বেষ, ঘৃণা ও বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়! ধর্মের অপর নাম হল বৈশিষ্ট্য। যেমন-মানুষের ধর্ম হল মানুষের সাহায্য করা, হনুমানের ধর্ম হল গাছে চড়া, মাছের ধর্ম হল জলে সাঁতার কাটা। তেমনি পৃথিবীতে যখনই অত্যাচার, অনাচার ইত্যাদি বেড়েছে তখন যুগে যুগে কিছু বুদ্ধিমান মানুষ সমাজ জীবনে চলার জন্য কিছু নীতি বা পথ নির্দেশ করেছেন, বলা হয় এই নীতি বা পথ অনুসারে চললে মানুষের জীবনের জটিলতা কমবে ও সমাজ সুস্থভাবে চলবে। পরবর্তীকালে এই নীতি আদর্শ গুলিই এক একটি ধর্মে পরিণত হয়েছে।

তাহলে হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন ইত্যাদি ধর্ম বলতে কি বিভিন্ন ধর্মের বৈশিষ্ট্যকে বোঝানো হয়? তাহলে কি মন্দির, মসজিদ, গির্জা, গুরুদ্বার ইত্যাদি কে আমরা আলাদা আলাদা ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব বোঝাতে ব্যবহার করি? তাহলে আমরা যে মন্দিরে পুজা দিয়, মসজিদে নামাজ পড়ি, গির্জায় প্রেয়ার করি বা গুরুদ্বারে প্রার্থনা করি এগুলি করি কেন? আমরা একে অপরের থেকে আলাদা এই বৈশিষ্ট্য প্রমাণের জন্যই কি এগুলির চর্চা করি? তাহলে প্রশ্ন হল আমরা যে মানুষ, মানবতায় আমাদের প্রধান ধর্ম, এই শিক্ষা কি ধর্ম আমাদের দিচ্ছে? ধর্ম কি বিচ্ছিন্নতাবাদের শিক্ষা দিচ্ছে না? তাহলে প্রশ্ন হল ঈশ্বর, আল্লা বা ভগবান সকল ধর্মের মানুষের রক্ত আলাদা সৃষ্টি করল না কেন? জন্ম থেকেই কেউ হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন, নাস্তিক নয় কেন? তাহলে প্রশ্ন হল ঈশ্বর আমাদের তৈরী করে; না, আমরা ঈশ্বরকে তৈরী করি? উল্লেখ্য হাজার হাজার ধর্মের কোটি কোটি ঈশ্বরের বর্তমানে আর কোন অস্তিত্ব নেই, তাহলে প্রশ্ন হল ঈশ্বরের অস্তিত্বের উপর মানুষ নির্ভরশীল, না মানুষের উপর ঈশ্বরের অস্তিত্ব নির্ভরশীল?

□ ধর্মের সৃষ্টি হল কিভাবে?

বিশ্ব প্রকৃতি এক রহস্যময় জায়গা এখানে পরতে পরতে বহু বিস্ময়কর ও আশ্চর্য ঘটনা লুকিয়ে রয়েছে! মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত প্রাণী। মানুষ চিরকাল এই পৃথিবীর সৃষ্টি হল কিভাবে? আমরা কোথা থেকে এসেছি? আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য কি? ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করেছে। সৃষ্টির আদিতে মানুষ আজকের মতো এত উন্নত হয়নি। জীবনে টিকে থাকার জন্য তাঁকে ও পৃথিবীর অন্যান্য জীবজন্তুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়েছে। তাই আদিম মানুষ জীবন নির্ধারণের জন্য প্রকৃতির উপর বহুল পরিমাণে নির্ভরশীল ছিল, প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি কেন ঘটে তাঁর সঠিক ব্যাখ্যা তখন তাঁরা জানত না। জীবনে বেঁচে থাকার জন্য তাঁরা গাছের ফলমূল, পশু ও পাখির মাংসের উপর নির্ভরশীল ছিল। তাই তাঁরা গাছকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করত। পরে দেখা গেল বনে দাবানল দেখা দিলে মানুষ বনের আগুনকে ভয় পেত, আগুনের এই শক্তিকে ভয় পেয়ে মানুষ যাগযজ্ঞের মাধ্যমে তাঁকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শুরু করল, এভাবে আগ্নি পূজার শুরু হল।

আবার দেখা গেল দাবানলের সময় হঠাৎ কোন মেঘ থেকে বৃষ্টি হল, এই বৃষ্টির ফলে আদিম মানুষের প্রাণ বাঁচল তখন তাঁরা মেঘকে পূজা করতে শুরু করল। এভাবে চাষের জন্য মাটি, জল, বাতাস, নদ নদী, পাহাড় পর্বত, পশুপাখি সমস্ত জিনিসকে মানুষ দেবতা জ্ঞানে পূজা করতে শুরু করল। এর উদ্দেশ্য ছিল যাতে মানুষের রোগ ব্যাধি না হয় এবং বিভিন্ন বিপদ থেকে মানুষ রক্ষা পেতে পারে, এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীতে বহু-ঈশ্বরবাদের পূজার প্রচলন শুরু হল। পরবর্তীকালে যখন এই বহু ঈশ্বরের জটিল নিয়মকানুন, খরচ সাপেক্ষ যাগযজ্ঞ, জাতিভেদ প্রথা ও ব্রাম্ভণ্যবাদের প্রভাবে সাধারণ মানুষের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠল তখন তাঁরা ধীরে ধীরে একেশ্বরবাদী মতাদর্শের দিকে ঝুঁকতে থাকে যেমন- খৃষ্ট ধর্ম, ইহুদি ধর্ম, ইসলাম ধর্ম প্রভৃতি। এভাবে পৃথিবীতে ধীরে ধীরে বহু ধর্মের সৃষ্টি হল। আবার ধর্মের গোঁড়ামি ও অনাচার যখন মানবতাকে রক্তাক্ত করতে শুরু করল তখন সমাজের চিন্তাশীল মানুষেরা ধর্মের কুসংস্কার ও সংকীর্ণ দিকগুলি তুলে ধরতে শুরু করল, তখন থেকে পৃথিবীতে নিরশ্বরবাদী দর্শনের ব্যাপক প্রাসার ঘটতে লাগল! এভাবেই বর্তমান সময়ের সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে!

□ বিভিন্ন ধর্মমত, সংস্কার ও প্রচলিত কিছু কথা।

○ এবার বহুল প্রচলিত কিছু ধর্মমতের সৃষ্টি ও তাঁর অলৈকিকতা নিয়ে প্রচলিত ধ্যান ধারণার চর্চা।

◇ ইসলাম ধর্ম- ইসলাম ধর্মের প্রবর্তন হয় নবী মহম্মদের হাত ধরে। প্রচলিত মতানুসারে তিনি জিব্রাইল ফেরেস্তা মারফত কোরান পান, এই কোরানই হল ইসলাম ধর্মের মূল বাণী। ধার্মিক ব্যক্তিরা মনে করেন নবী মহম্মদ একজন আদর্শ মানুষ ছিলেন। তিনি বলে গেছেন- কেউ ছোট নয়, সকলে সমান, নারীদের সন্মান কর, নারীদের উপযুক্ত মর্যাদা দাও, সকলের সঙ্গে ভালো ব্যবহার কর, কেউ তোমার ক্ষতি করলে ও তুমি তাঁর ক্ষতি করবে না, অন্য ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা করবে, দ্বীনের ব্যাপারে কোন জোরজবরদস্তি নেই ইত্যাদি…।

ধর্মান্ধরা মনে করেন নবী মহম্মদের চেয়ে মানবিক মানুষ পৃথিবীতে আর একটি ও নেই, যদিও বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন! যাইহোক তাকিয়া বাজি করেই এত দিন এই ধর্মের মহত্ব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও আজ ইন্টারনেটের যুগে ইসলামের বহু বর্বরতা, সংকীর্ণতা, অমানবিকতা মানুষের কাছে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে তাই তাকিয়াবাজি করে আর বেশি দিন এভাবে মানুষকে মূর্খ বানিয়ে রাখা যাবে না। সত্য একদিন ঠিকই প্রকাশ পাবে ও নবী মহম্মদের আসল চেহারা বিশ্বব্যাপী মানুষ জানতে পারবে, সেটাই আশা রাখি!

◇ বৌদ্ধ ধর্ম- বৌদ্ধ ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হলেন গৌতম বুদ্ধ। প্রচলিত মতানুসারে সংসারের মায়া ত্যাগ করে তিনি এক অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে তপস্যা করেন এবং এখান থেকেই তিনি দিব্য জ্ঞান লাভ করেন ও বুদ্ধ নামে পরিচিত হন। প্রশ্ন হল তিনি এই দিব্য জ্ঞান কোথা থেকে পেলেন? যাইহোক, তাঁর অনুসারীদের বৌদ্ধ বলা হয়। বৌদ্ধধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। এই ত্রিপিটকে বুদ্ধদেবের বাণী ও বৌদ্ধদের নানা নিয়ম কানুন, আচার অনুষ্ঠান লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মের চারটি মহান সত্যের কথা বলা হয়েছে যা আর্যসত্য নামে পরিচিত। এগুলি হল- সংসারে দুঃখকষ্ট আছে, এই দুঃখ কষ্টের কারণ রয়েছে, দুঃখ নিবারণের উপায় রয়েছে, দুঃখ কষ্টের নিবারণের জন্য সত্য পথ অনুসরণ করতে হবে। বৌদ্ধ ধর্মের মানুষকে সৎ পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য গৌতম বুদ্ধ আটটি নির্দেশ দেন একে অষ্টাঙ্গিক মার্গ বলে এগুলি হল- সৎ বাক্য, সৎ চিন্তা, সৎ দৃষ্টি, সৎ ব্যবহার, সৎ সংকল্প, সৎ প্রচেষ্টা, সৎ জীবন ও সম্যক সমাধি! বৌদ্ধ ধর্ম মতে এগুলি পালন করে মানুষের মোক্ষলাভ সম্ভব!

◇ জৈন ধর্ম- জৈন ধর্ম মহাবীর প্রবর্তিত ধর্ম। এই ধর্মের মূল গ্রন্থকে অঙ্গ ও উপাঙ্গ বলা হয়। জৈনরা কঠোর কৃচ্ছ সাধনে বিশ্বাসী। জৈন ধর্মনুসারে তাঁরা সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী। তাই জৈন ধর্ম অনুসারে ছোটখাটো কীট পতঙ্গ হত্যা ও মহাপাপ! জৈন্য ধর্ম মূলত শেতাম্বর ও দিগম্বর এই দুই ভাগে বিভক্ত! বলা হয় মহাবীর ও কঠোর তপস্যার মাধ্যমে দিব্য জ্ঞান লাভ করেন। তা প্রশ্ন হল মহাবীর এই দিব্য জ্ঞান লাভ করল কোথা থেকে?

◇ খ্রিস্টান ধর্ম- খৃষ্ট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হলেন যিশুখৃষ্ট। যিশুর বাবার নাম যোসেফ এবং মায়ের নাম মেরি। তাঁর জন্ম হয় জেরুজালেমের কাছে বেথলেহেম নামক শহরের এক ঘোড়ার আস্তাবলে। যিশুর জন্ম নিয়ে বিতর্ক আছে যিশুকে বলা হয় ঈশ্বরের সন্তান। যদিও বহু গবেষকের মতে এটা তাঁর জন্ম সংক্রান্ত বিতর্ককে চাপা দেওয়া জন্যই বলা হয়। কথিত আছে যিশুর যখন জন্ম হয় তখন এক ফেরেস্তা সারা পৃথিবীতে এই খুশির খবর শুনিয়ে বেড়ায় এবং সকলকে বলে- “পৃথিবীতে ঈশ্বরের সন্তানের জন্ম হয়েছে”!

যিশু পরবর্তীকালে তাঁর ধর্মের বাণী প্রচার করেন। রোমান সম্রাট তাঁর নতুন ধর্ম প্রচারের অপরাধে যিশুকে ক্রুশকাঠে বিদ্ধ করেন। শোনা যায় এই সময় যিশু বলেছিলেন- “হে ঈশ্বর এরা জানে না, এরা কি ভুল করছে, তুমি এদের ক্ষমা কর”! যিশুর প্রবর্তিত ধর্মের অনুসারীদের খ্রিস্টান বলা হয়। খ্রিস্টানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থের নাম বাইবেল। কথিত রয়েছে যিশু মারা যাওয়ার তিন দিন পর তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন, এ থেকেই প্রমাণিত হয় তিনি ছিলেন ঈশ্বরের সন্তান। সত্যিই কি যিশু ঈশ্বরের সন্তান ছিলেন? সত্যিই কি যিশু তিন দিন পর তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন?

◇ হিন্দু ধর্ম- হিন্দু ধর্ম কেউ একা সৃষ্টি করেনি যুগ যুগ ধরে নানা মুনি, ঋষিদের প্রচেষ্টায় ধীরে ধীরে হিন্দু সমাজের বর্তমান স্বরূপ গড়ে উঠেছে। এই ধর্মে তেত্রিশ কোটি দেব দেবীর পূজার প্রচলন রয়েছে। পৃথিবীতে এত দেব দেবী, এত সংস্কার আর অন্য কোন ধর্মে দেখা যায় কি না সন্দেহ? হিন্দু ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ গুলি হল- বেদ, উপনিষদ, গীতা, পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি! হিন্দু ধর্মে এত বৈচিত্র্য থাকার জন্য অঞ্চল ভেদে হিন্দু ধর্ম পালনে বৈচিত্র্য দেখা যায়। যেমন- উত্তর ভারতে রাম প্রধান আরাধ্য দেবতা, মহারাষ্ট্রে গণপতি উৎসব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলায় দুর্গা অন্যতম আরাধ্য দেবী, বিহারে ছট পূজা ইত্যাদি। বলা হয় হিন্দু ধর্মের মুল কথা হল- ‘জীব সেবাই শিব সেবা’ বা ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’! অথচ এই হিন্দু ধর্মেই বলা হয় ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছে ব্রাম্ভণ, বাহু থেকে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত্রিয়, উরু থেকে বৈশ্য ও পদ যুগল থেকে শূদ্র। তাই চিরকাল উপরের সমস্ত শ্রেণী শূদ্রদের শোষণ করে যাবে। শূদ্ররা অচ্ছুত, তাঁদের স্পর্শ করলে জাত যাবে এ কেমন ধর্ম? এ কেমন জীব সেবাই শিব সেবার নিদর্শন?

হিন্দু ধর্মে অলৌকিক কথার কোন শেষ নেই তেমনি কয়েকটি উল্লেখ করা হল। উত্তর প্রদেশের মথুরার কাছে এক বন আছে। এই বনটি নাকি খুব রহস্যময়, মনে করা হয় এখানে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন! কথিত রয়েছে সকালে এখানে প্রচুর মানুষ জন ও পশুপাখির ভীড় থাকলেও রাতে কিন্তু টু শব্দটি ও থাকে না। সকালে যেখানে এত শব্দ হয় যে কানের কাছে মুখ রেখে জোরে কথা বললে ও ভালোভাবে শোনা যায় না; সেখানে রাত্রিবেলা কয়েক কিমি দূর থেকেও পিন পড়ার শব্দ শুনতে পাওয়া যায়। সকালবেলা এই বনে মন্দির চত্বরে বিভিন্ন ধরণের খাদ্য সামগ্রী পড়ে থাকতে দেখা যায়। কারা এ কাজ করে তাঁর কোন উত্তর পাওয়া যায় নি। শোনা যায় আজ পর্যন্ত যেই এই সমস্যার সমাধান করতে গেছে তাঁর হয় মৃত্যু হয়েছে, না হলে সে পাগল হয়ে গেছে! ভক্তরা মনে করেন রাত্রিবেলা এখানে রাধা কৃষ্ণের প্রেম লীলা চলে তাই রাত্রে এই স্থানে যাওয়া সাধারণ মানুষের জন্য নিষিদ্ধ। তা প্রশ্ন হল রাধা কৃষ্ণ পৃথিবীর এত জায়গা থাকতে এখানেই এসে প্রেম লীলা দেখান কেন? ভক্তদের নিজেদের দর্শন দেন না কেন?

অন্য আর একটি ঘটনা হল গঙ্গার ধারে ঋষীকেশ শহরে এক বিশেষ জায়গায় তপস্যা করলে নাকি সব বিশেষ শক্তি পাওয়া যায়? এই শহরে মানুষ মনের শান্তির জন্য আসে এবং এখানে গঙ্গার পূজা করা হয়। তা প্রশ্ন হল এই তপস্যার মাধ্যমে অর্জিত বিশেষ শক্তি মানব সমাজের কি কাজে লেগেছে? এই শক্তি দিয়ে কি দেশের দারিদ্র্যতা কমেছে, কোন অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছে, মানুষের সমস্যার সমাধান হয়েছে? তাহলে প্রশ্ন হল এই বিশেষ শক্তি পেয়ে লাভ কি? এই শক্তি কেমন শক্তি যার উল্লেখ শুধু কাব্য, ধর্মীয় সাহিত্যেই দেখা যায়, যার বাস্তবে কোন প্রয়োগ নেই? এই শক্তির আদেও কোন অস্তিত্ব রয়েছে কি?

3:25 P.M                                        24/10/2007

◇ ইহুদি ধর্ম- ইহুদি ধর্ম পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীনতম এক ধর্ম। ইহুদি ধর্মের ইতিহাস থেকে জানা যায় এদের আদি বাসস্থান ছিল প্যালেস্টাইন। এখানকার কঠোর ভূমিরূপ ও অনুর্বর ভূমির জন্য কষ্ট লাঘব করার উদ্দেশ্যে এরা মিশরে চলে যায়। মিশরে যতদিন হিকসাসদের শাসন ছিল ততদিন ইহুদিরা সুখী ছিল। পরে মিশরের রাজারা যখন স্বাধীন হয়ে রাজ্য শাসন করে, তখন তাঁদের কাছে ইহুদিরা কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। এই মিশরের রাজাদের ফ্যারাও বলা হত। এরা প্রকাশ্যে ইহুদিদের উপর অত্যাচার চালাতে থাকে। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ইহুদিরা মিশর ছাড়ার পরিকল্পনা করে। এই সময় ইহুদিদের নেতা ছিলেন মোজেস। তিনি ইহুদিদের নিয়ে পূর্বদিকে লোহিত সাগরের তীরে উপস্থিত হন এবং পিছনে ফ্যারাও তাঁদের সৈন্যসামন্ত নিয়ে এই ইহুদিদের পিছু ধাওয়া করে। সামনে সমুদ্র ও পিছনে মিশরের সৈন্য। এই চরম বিপদে মোজেস তাদের রক্ষা করেন। প্রশ্ন হল কিভাবে?

কথিত আছে ইহুদিদের নেতা বা ঈশ্বরের দূত মোজেস সমুদ্রের জলে হাত দেওয়া মাত্র সমুদ্র দুভাগে বিভক্ত হয়ে মাঝখান থেকে রাস্তা করে দেয়। ইহুদিরা ওই রাস্তা দিয়ে সমুদ্র পার হয়, মিশরের সৈন্যরা ওই পথ দিয়ে যাবার সময় সমুদ্র আবার জুড়ে গেল, মিশরের সৈন্যরা সব সমুদ্রের জলে ডুবে মারা গেল। এভাবে মোজেস ইহুদিদের চরম বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে! এভাবে ইহুদিরা প্যালেস্টাইনে চলে আসে। বর্তমানে ইহুদিদের একমাত্র রাষ্ট্র হল ইজরায়েল। ইহুদিদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল- ওল্ড টেস্টামেন্ট বা হিব্রু বাইবেল।

মোজেস ইহুদিদের কিছু উপদেশ দিয়ে যান। মোজেস ইহুদিদের একমাত্র দেবতা ‘যিহোবার উপাসনা’ করতে বলেন। তাঁর উপদেশগুলি হল- একমাত্র যিহোবার উপাসনা করবে, মূর্তিপূজা করবে না, মাতা পিতাকে ভক্তি করবে, পবিত্র জীবন যাপন করবে, পরের দ্রব্যে লোভ করবে না, চুরি করবে না, কাউকে হত্যা করবে না, মিথ্যা সাক্ষী দেবে না, স্ত্রী জাতিকে সন্মান করবে, ঈশ্বরের নামে অকারণে শপথ গ্রহণ করবে না। বলাইবাহুল্য মোজেসের এই উপদেশগুলি আজও ইহুদিরা পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করে!

মোজেস কি সত্যিই ঈশ্বরের দূত ছিল? মোজেস কি সত্যিই সমুদ্র ভাগ করেছিল? আজ কেন আর সমুদ্র ভাগের এইরকম ঘটনা দেখা যায় না? যিহোবার কুদরত, চমৎকারি শক্তি কি বর্তমানে শেষ?

◇ শিখ ধর্ম- চারিদিকে যখন হিংসা ও হানাহানি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে এমতাবস্থায় এক মহামানবের আবির্ভাব হয়। তিনি ছিলেন শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক। নানক একেশ্বরবাদে বিশ্বাসী ছিলেন, তাঁর ধর্মের মূল কথা ছিল ধর্মের জটিল আচার থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানের কাছে আত্মসমর্পণ করা। তিনি মূর্তিপূজা, জাতিভেদ প্রথা, তীর্থযাত্রা প্রভৃতি ধর্মীয় আড়ম্বরের বিরোধী ছিলেন। নানকের উপদেশে প্রভাবিত হয়ে হিন্দু মুসলমান সকলেই দলে দলে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। এরা পরবর্তীকালে শিখ নামে পরিচিত হয়। শিখ কথার অর্থ হল শিষ্য। শিখদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ হল গুরু গ্রন্থসাহেব।

শিখদের ধর্মস্থানকে গুরুদ্বার বলে। শিখদের প্রধান গুরুদ্বার ‘স্বর্ণ মন্দির’ পাঞ্জাবের অমৃতসরে অবস্থিত! এই স্বর্ণমন্দির নিয়ে একটা প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রচলিত মতানুসারে কোন এক গুরুকে এক গায়েবি আওয়াজ ‘স্বর্ণ মন্দির’ স্থাপনের কথা বলে। সম্ভবত চতুর্থ গুরু রাম দাস সম্পর্কে এই প্রবাদটি প্রচলিত রয়েছে। আকবরের নিঃষ্কর ভূমিদানের পর পঞ্চম গুরু অর্জুনের সময় 1581 খ্রিস্টাব্দে এই স্বর্ণ মন্দিরের নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং মাত্র আট বছরের মধ্যে এর নির্মাণ কার্য সম্পন্ন হয়।

প্রশ্ন হল কে এই শিখ গুরুকে স্বর্ণ মন্দির নির্মাণের আদেশ দিল? এই গুরু ছাড়া আর কি কেউ এই আওয়াজ শুনেছে? না পুরো বিষয়টি একটা গুজব কাহিনি?

1:40 P.M                                         26/10/2007

◇ দ্বীন-ই-ইলাহি ধর্মমত- মহান মোঘল সম্রাট আকবর তাঁর রাজ্য পরিচালনা করতে গিয়ে লক্ষ্য করলেন ইসলামের বিভিন্ন গোষ্ঠী যথা শিয়া, সুন্নি, সালাফি, সুফি প্রভৃতি গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা যাচ্ছে। ইসলামের সঙ্গে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মের বিভেদ আকবরকে চিন্তান্বিত করে তোলে।
এই ধর্মীয় সংকীর্ণতার কারণে তাঁর রাজ্যে স্থায়ী শান্তি আসছে না, স্থায়ী শান্তি স্থাপন তখনই সম্ভব যখন ধর্মীয় সংকীর্ণতা দূরীভূত হবে। এই ধর্মীয় সংকীর্ণতা দূরীভূত করতে ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে তিনি এক নতুন ধর্মমতের সৃষ্টি করলেন এই ধর্মমতটি ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ নামে পরিচিত। আসলে অনুসন্ধিৎসু সম্রাট নিজের জ্ঞান পিপাসা মেটাতে 1575 খ্রিস্টাব্দে ফতেপুর সিক্রিতে ‘ইবাদত খানা’ নামে এক উপাসনা গৃহ নির্মাণ করেন। এখানে সকল ধর্মের পন্ডিত ব্যক্তিরা সমবেত হতেন ও প্রত্যেকে নিজেদের ধর্মমত সম্পর্কে বলতেন? আকবর খুব মনোযোগ সহকারে এই বিতর্কগুলি শুনতেন।

বিভিন্ন ধর্মের এই সব মতামত শুনে আকবর উপলব্ধি করেন সব ধর্মের মূলেই এক অখন্ড সত্য অন্তর্নিহিত রয়েছে। সব ধর্মের মূল কথা ও ভালো ভালো গুন গুলিকে নিয়ে 1582 খ্রিস্টাব্দে আকবর ‘দ্বীন-ই-ইলাহি’ ধর্মমতের প্রবর্তন করেন। এই ধর্মমত ছিল একান্ত যুক্তিবাদী ধর্মমত। আকবরের সময় আবুল ফজল ও বদাউনি এই ধর্মমতের নাম করণ করেন। ‘আও হিন্দ-ই-ইলাহি’ যার অর্থ হল স্বর্গীয় একেশ্বরবাদ (Divine Monotheism)। এই ধর্মের মূল কথা হল- নিরামিষ ভোজন, দান ধর্ম পালন, পরস্পরকে ‘আল্লাহ আকবর’ বলে সম্বোধন, সম্রাটের জন্য ধন, প্রাণ, মান সমস্ত কিছু দিতে সম্মত হওয়া, সকল মানুষ সমান’ ইত্যাদি। আকবর এই ধর্মমত কারোর উপর চাপিয়ে দেননি, তাই দ্বীন-ই-ইলাহি মতবাদ তাঁর কিছু সভাসদ ছাড়া আর কেউ গ্রহণ করেনি। তাই আকবরের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রবর্তিত নতুন ধর্মমতের ও সলিল সমাধি ঘটে! আকবরের এই নতুন ধর্মমত প্রবর্তনের জন্য উলেমারা আকবরকে ইসলামের শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করেছিল! আর আকবরের এই উদারতার জন্য আজ ও বহু সংখ্যক মুসলমানের চোখে আকবর একজন ঘৃণিত সম্রাট!

আকবর কি সত্যিই ইসলামের শত্রু ছিল? দ্বীন-ই-ইলাহি ধর্মমত কি মানবতার কথা বলত? এই ধর্ম কি মানুষের গ্রহণ করা উচিত ছিল? মোল্লা, উলেমা, পীর এরা কি সবসময় ঠিক কথা বলে? এদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন? দ্বীন-ই-ইলাহি ধর্মমত যদি মানুষ বেশি বেশি গ্রহণ করত তাহলে কি আজকের এই সংকীর্ণ সমাজ ব্যবস্থা থেকে আমরা অনেকটা মুক্তি লাভ করতাম?

◇ পার্সি ধর্ম- পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রাচীনতম ধর্মমতের একটি হল পার্সি ধর্মমত। এই ধর্মমতের বিকাশ ঘটেছিল পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে, বর্তমানে এই অঞ্চলটি ইরানের অন্তর্গত। প্রাচীন পার্সি ধর্মমতের উৎপত্তি হয়েছিল জরাথুষ্টের হাত ধরে, তাই এই প্রাচীন মতবাদকে Zoroastrianism ও বলা হয়। মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন ধর্মমত যেমন- ইসলাম, ইহুদি বা খ্রিস্টান ধর্মমতের উৎপত্তিতে এই জেরোস্ট্রিয়ান ধর্মমতের বিরাট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। পার্সিরা মূলত অগ্নির উপাসক ছিলেন। এদের প্রধান ধর্মগ্রন্থের নাম জেন্দা আবেস্তা। পার্সিদের প্রধান দেবতা হল আহুর মাজদা। ইসলামের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই পার্সি মতবাদ গভীর সংকটের মধ্যে পড়ে। তাই শেষ পর্যন্ত এই পার্সি মতবাদের মানুষ তাঁদের বাসভূমি পারস্য বা ইরান ছেড়ে বর্তমানে ভারতে বিকশিত হচ্ছে ও তাঁদের সংস্কৃতির প্রসার ঘটাচ্ছে!

এই পার্সি ধর্মমতের মানুষের সংখ্যা অল্প হলেও ভারতের সমাজ, ধর্ম, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতিতে এদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। তবে এই ধর্মের অদ্ভুত রীতি হল মৃতদেহকে এরা দাহ বা সমাধিস্থ করে না। এরা মনে করে মাটি, অগ্নি, জল, বায়ু ইত্যাদি খুবই পবিত্র জিনিস তাই তাঁরা মৃতদেহকে এতে নিক্ষিপ্ত করে না। এরা মৃত্যুর পর মৃতদেহকে কোন পাহাড় বা উচু স্থানে রেখে আসে সেখানে এদের মৃতদেহগুলি শকুনে খায় এভাবে এরা এদের অন্তষ্ঠিক্রিয়া সম্পন্ন করে। শকুনকে এভাবে মৃতদেহ খাওয়ানোর পিছনে এদের যুক্তি হল এতে পরিবেশ দূষণ হয় না, এর ফলে এক ক্ষুধার্থ প্রাণী খাবার পেল, মানুষ এভাবে প্রকৃতির কাছে ফিরে গেল এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল এরা মনে করে শকুন আকাশের বহু উপরে ওড়ে তাই শকুন সূর্যের খুব কাছে থাকে। তাই সূর্যের দেবতার সঙ্গে মানব আত্মার মিলনের ক্ষেত্রে শকুন একটি মাধ্যম মাত্র। এভাবেই শকুনের মাধ্যমেই তাঁদের মোক্ষলাভের পথ প্রস্তুত হয়! এভাবেই তাঁদের মোক্ষলাভ সম্পূর্ণ হয় ও তাঁদের আত্মা স্বর্গে যায়। ভারতের মুম্বাই, কলকাতা, দিল্লি ইত্যাদি বড় বড় শহরে এই রকম বহু পার্সি মন্দির ও পার্সি মৃতদেহ সৎকারের স্থান রয়েছে।

◇ ব্রিসলাব মতবাদ- এই ধর্মমত সম্পর্কে কিছু লেখার আগে কয়েকটি কথা উল্লেখ্য এটি একটি খুবই স্বল্প প্রচলিত ধর্মমত। এই ধর্মের অনুসারীরা পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক পাওয়া যায়। ডিসকভারি বা ন্যাচরাল জিওগ্রাফির মত কোন এক স্বনামধন্য চ্যানেলে এই ধর্ম নিয়ে ডকুমেন্টারি দেখেছিলাম, তখন তা মনে করে ডায়েরিতে এই ধর্ম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য লিখে রেখেছিলাম। আজ এতগুলি বছর পরে মূলত ডায়েরিতে লেখা তথ্যসূত্রকে ভিত্তি করে ও স্মৃতির উপর নির্ভর করে এই লেখাটি সম্পূর্ণ করলাম। বর্তমানে এই ধর্ম সম্পর্কে সঠিক তথ্যসূত্র ইন্টারনেটে ও বিশেষ পেলাম না, হয়ত ধর্মের নাম কিছুটা ভুল হতে পারে, হয়তো এই সামান্য বিষয়টি নিয়ে তৈরী ডকুমেন্টারি এতবছর পর ঠিকভাবে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে এই ধর্মমতের সঙ্গে ইহুদি ধর্মের বহু অংশে মিল রয়েছে, এটি ইহুদি ধর্মের কোন একটি অংশ বা ইহুদি ধর্ম থেকে অনুপ্রাণিত কোন ধর্মমত ও হতে পারে!
যাক তবুও যতটা তথ্য সংগ্রহ করেছিলাম তাঁর ভিত্তিতেই এই লেখাটি লিখলাম, কোন তথ্যের গোলমাল থাকলে বা এ বিষয়ে নতুন কোন তথ্য পেলে জানানোর অনুরোধ রইল!

এই ধর্মমতটি কোন দেশে প্রচলিত তা সঠিকভাবে জানা নেই, সম্ভবত উত্তর পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে এই ধর্মমত প্রচলিত রয়েছে। এই ধর্মমতের দর্শন আমাদের প্রচলিত আর পাঁচটি ধর্মের চেয়ে আলাদা এবং বেশ মজাদার, তাই এই ধর্মমতের বিষয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করলাম। ব্রিসলাব মতাদর্শের মূল কথা হল- ‘ঈশ্বর আমাদের পাঠিয়েছেন তাই তিনি নিশ্চয় চান না, আমরা কোন কষ্টে থাকি! আমরা যদি কারোর কোন রকম ক্ষতি না করে আনন্দ করি সেটিই ঈশ্বরের প্রতি আরাধনা’!

এই দর্শনের কারণেই এরা হয়তো কোথাও কিছু নেই, কোন কারণ ছাড়া সকলে মিলে রাস্তার একধারে গানবাজনা করল। আবার সকলে মিলে একসঙ্গে পিকনিক করতে গেল, একসঙ্গে বন্ধুরা আড্ডা মারল। এগুলিই এদের কাছে ঈশ্বরের উপাসনার সমতুল্য! মুসলমানরা মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজনের আজাবের (শাস্তি) হাত থেকে রক্ষা করতে আল্লার কাছে কান্নাকাটি করে, অন্যান্য ধর্মে ও ঈশ্বরের কাছে মৃত আত্মার শান্তির জন্য প্রার্থনা করা হয় কিন্তু এই ধর্মে বিশ্বাসীরা প্রিয়জনের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে কবরে গিয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মিষ্টি সুরে গান করে! এভাবেই তাঁরা ঈশ্বরের উপাসনা ও মৃত আত্মার শান্তি কামনা করে!

তবে ব্রিসলাবরা একটা পাহাড়কে খুব পবিত্র মনে করে। যে কোন ভালো কাজের আগে এখানে এসে প্রার্থনা করে। এই পাহাড় থেকে একটি ঝর্ণা বয়ে গেছে, এই ঝর্ণাকে এরা খুব পবিত্র মনে করে। তাই বিয়ের আগে নতুন জীবন শুরুর আগে হবু স্বামী ও স্ত্রীকে এই ঝর্ণায় স্নান করানো হয়। এরা মনে করে এরফলে এই দম্পতির ভবিষ্যৎ জীবন সুখী হবে!

□ এবার চিন্তা করা যাক পৃথিবীতে এত ধর্মের এত মোজেজা এত অলৌকিকতার যৌক্তিকতা কতটা?

ইসলাম ধর্মমতে জিব্রাইল ফেরেস্তা কর্তৃক নবী মহম্মদের কোরান হাসিল, নবীর বুরাকে চড়ে আল্লার সঙ্গে সাক্ষাৎ, হাত দিয়ে চাঁদ দুভাগ করা কতটা যৌক্তিক? অন্যদিকে গৌতম বুদ্ধের দিব্য জ্ঞান লাভ, যিশু খৃষ্টের নিজেকে ঈশ্বরের সন্তান দাবি করা, মৃত্যুর তিন দিন পর ফিরে আসা, মোজেসের হাত দিয়ে সাগরের জল ভাগ করা, হনুমানের পাহাড় চাগিয়ে নিয়ে আসা, রাম নাম লিখে ইট জলে ফেললে জলে ভাসা, রথ আকাশে উড়ছে এগুলি কি গাঁজাখুরি গল্প নয়? অবশ্য বিশ্বাসী লোকেদের কাছে ধর্মের কোন কিছু অবিশ্বাস করাই সম্ভব নয়! তাহলে প্রশ্ন হল আপনি যদি বিশ্বাস করেন গাধার পিঠে চড়ে নবী মহম্মদ আল্লার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল বা হাত দিয়ে চাঁদ দুইভাগ করেছিল তাহলে আপনাকে এটাও বিশ্বাস করতে হবে যে হনুমান পাহাড় চাগিয়ে ছিল, হাতির মাথা থেকে গনেশের মাথা তৈরী, মোজেস হাত দিয়ে সমুদ্র ভাগ করেছিল, যিশু ঈশ্বরের সন্তান ইত্যাদি!

তাহলে আপনাকে স্বীকার করতে হবে সব ধর্মের সব সংস্কারই সত্য, তা না হলে আপনাকে স্বীকার করতে হবে কোন সংস্কারই সত্য নয়। যদিও ধার্মিকরা তা বিশ্বাস করবে কি করে? এখন কোন মুসলমান যদি বিশ্বাস করে রাম, আল্লার দূত বা হনুমান পাহাড় চাগিয়েছিল বা কোন হিন্দু যদি বিশ্বাস করে নবী মহম্মদ আল্লার রসুল ও তিনি গাধার পিঠে চড়ে আল্লার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তাহলে কি আর ঈমান থাকে? তাহলে কি আর প্রকৃত মুসলমান বা প্রকৃত হিন্দু বলে দাবি করা যাবে? তাই প্রকৃতপক্ষে ধর্ম তাঁর নিজের স্বার্থে মানুষকে এক হতে দেবে না, মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি করে!

□ এবার প্রশ্ন হল ধর্মের এই কুসংস্কার শেষ হচ্ছে না কেন?

তার সবচেয়ে বড় কারণ হল ব্যাক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করণ। প্রকৃতপক্ষে যারা ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করেন। যেমন- মৌলবি, মোল্লা, পাদ্রি, পন্ডিত এদের ধর্মান্ধ শিক্ষা ব্যাক্তিগত জীবন ও সামাজিক জীবনে কোন কাজে লাগে না। তাই জীবনের এক পর্বে এসে এই ধর্মজীবিরা উপলব্ধি করেন, তাঁদের এই ধর্মান্ধ শিক্ষা কোন কাজের নয়, জীবনে টিকে থাকতে হলে অর্থের প্রয়োজন। তাই তখন মানুষকে আরও বেশি ধর্মের দিকে চালিত করে, কারণ ধর্ম না থাকলে তাঁদের ব্যবসা উঠে যাবে। তাই ধর্ম হচ্ছে সবচেয়ে বড় ব্যবসা, এটি এমন এক ব্যবসা যার কোনদিন মন্দা নেই! এই ধর্ম ব্যবসা করেই মানুষ কোটি কোটি টাকা উপার্জন করছে অথচ সাধারণ মানুষের অবস্থা দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে! অথচ, ধর্মান্ধদের সে কথা বোঝাই কে?

□ ঈশ্বরের অস্তিত্ব আছে কি?

মানুষের যখন চিন্তার বিকাশ ঘটে তখন সে প্রশ্ন করতে শেখে, সে ভাবে পৃথিবীর মতো এত সুন্দর স্থানের সৃষ্টি হল কিভাবে? কে এটিকে সৃষ্টি করল? এই প্রশ্নগুলির বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা রয়েছে ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুসারে এগুলি কোন এক বা একধিক সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সৃষ্টি হয়েছে। আবার অন্যদিকে বিজ্ঞান মনে করে মহাবিশ্বে কোন কিছুই এমনি এমনি সৃষ্টি হয়নি। মহাবিশ্বে সূর্যের সঙ্গে অন্য নক্ষত্রের ক্রিয়ার ফলে সূর্যের কিছু অংশ বের হয়ে সূর্যের চারিদিকে ঘুরতে থাকে এভাবে কোটি কোটি বছর ধরে ঠান্ডা হয়ে আজকের পৃথিবী সৃষ্টি হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হল সূর্যের সৃষ্টি হল কিভাবে? সূর্যের সৃষ্টি হল বিভিন্ন মহাজাগতিক ক্রিয়ার ফলে। তাহলে প্রশ্ন হল মহাজাগতিক ক্রিয়ার সৃষ্টি হল কিভাবে? মহাকাশ কে সৃষ্টি করল? প্রাণের সৃষ্টি হল কিভাবে? প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে এককোষী প্রাণী থেকে পরবর্তী কালে এক কোষী প্রাণী থেকে বহু কোষী প্রাণীর সৃষ্টি হয়, তা প্রশ্ন হল এককোষী প্রাণীর সৃষ্টি হল কিভাবে? ইত্যাদি…। এভাবে প্রশ্ন করতে করতে একসময় এমন অবস্থায় উপস্থিত হব, যেখানে এই প্রশ্নগুলির সঠিক কোন ব্যাখ্যা এখনও বিজ্ঞানের কাছে নেই, বিজ্ঞান কোনও একদিন হয়তো এর সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারবে!

বিজ্ঞানের এই উত্তর না দিতে পারার বিষয়টি ধর্মান্ধরা সুযোগ নিয়ে বলতে চেষ্টা করে এথেকেই প্রমাণিত হয় কোন সৃষ্টিকর্তা রয়েছে এবং এই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছাতেই পৃথিবী চলছে। এখন তর্কের সাপেক্ষে মনে নিলাম সৃষ্টিকর্তা রয়েছে। তাহলে আরও কিছু প্রশ্ন এসে যায় এগুলি হল- এই সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করল? এই সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করল? সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টিকর্তাকে কে সৃষ্টি করল? ইত্যাদি…। এবার প্রশ্ন হল সৃষ্টিকর্তা নারী না পুরুষ, জীব না জড়? সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতি এত মানুষ মানুষ কেন?

পৃথিবীতে এত কোটি কোটি প্রাণী রয়েছে তাঁদের কারোর সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই মানুষের সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন কেন রয়েছে? সৃষ্টিকর্তা আল্লা, গড, ঈশ্বর, আহুর মাজদা কে? সৃষ্টিকর্তা যদি আল্লা হয় তাহলে বাকি সব ধর্মের মানুষ জাহান্নমের আগুনে জ্বলবে! সৃষ্টিকর্তা যদি শিব বা গড হয় তাহলে বিধর্মীদের একই শাস্তি দেবেন। সৃষ্টিকর্তা এত নিষ্ঠুর কেন? সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতি এত মানুষ মানুষ কেন, প্রশংসা করলে খুশি হন এবং প্রশংসা না পেলে রাগ করেন এবং জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করেন? সৃষ্টিকর্তা এত বর্বর, হিংস্র ও সাম্প্রদায়িক কেন? এমন সাম্প্রদায়িক সৃষ্টিকর্তাকে কি মানার কোন প্রয়োজন রয়েছে?

সৃষ্টিকর্তা যদি থাকত তাহলে মানব সভ্যতার বিকাশে এত কোটি কোটি বছর সময় লাগল কেন? ইনকা প্রভৃতি সভ্যতায় হাজার হাজার মানুষকে নরবলি দেওয়া হত ঈশ্বরকে সন্তুষ্ট করার জন্য, তা ঈশ্বর এমন জঘন্য নরবলি রুখল না কেন? বর্তমানে ও কুরবানী, পশুবলি ইত্যাদির নামে যে অমানবিকতার চর্চা হয় ঈশ্বর তাঁর বিরুদ্ধে কিছু বলে না কেন? পৃথিবীতে এত বৈষম্য এত অনাচার কেন? পৃথিবীতে সবলের উপর দুর্বলের এত অত্যাচার অথচ ঈশ্বর কেন কিছু করেন না? যদিও ধর্মান্ধরা এগুলিকে ঈশ্বরের পরীক্ষা বলে চালিয়ে দিতে চায়।

আসলে ঈশ্বর হল সবচেয়ে বড় শোষণের হাতিয়ার! প্রাচীনকালে যখন রাজা বা শাসকরা সাধারণ মানুষের অধিকার ছিনিয়ে নিত, দমনপীড়ন করত তখন তাঁদের বোঝানো হত এগুলি সবই ঈশ্বরের ইচ্ছা। আসলে তা না হলে রাজশক্তি টিকিয়ে রাখা মুসকিল হত। তাই যুগ যুগ ধরে মানুষ ধর্মের নামে এই শাসন, অন্যায়, অত্যাচারকে মনে নিয়েছে এবং রাষ্ট্রের শোষণযন্ত্রে এভাবেই নিষ্পেষিত হয়ে চলেছে। তাই ধর্ম হল মানুষকে অসহায় ও সন্ত্রাসী তৈরী করার প্রধান হাতিয়ার!

□ তাহলে প্রশ্ন হল সত্যিই কি ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই?

এর সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য উত্তর হল পৃথিবীতে কোন ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। কারণ এই মহাবিশ্ব কত বড় তাঁর এখন ও সঠিক কোন ব্যাখ্যা মানুষের জানা নেই, অথচ কত কোটি কোটি নক্ষত্র নিয়ে পৃথিবী গঠিত তাঁর কোন সঠিক হিসাব নেই। এত বড় মহাবিশ্বে পৃথিবীর মতো কত কোটি কোটি গ্রহ আছে তার কোন হিসাব নেই। সেখানে কি রকম প্রাণীরা থাকে তাঁর সম্পর্কে ও আমাদের কোন ধারণা নেই। বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন সেখানে মানুষের চেয়ে অনেক উন্নত জীবের অস্তিত্ব থাকতে পারে। হয়তো পৃথিবীতে মানুষ কোন ল্যাবরেটরিতে গবেষণার মত এই উন্নত জীবের সৃষ্টি ইত্যাদি। এই উন্নত প্রাণী গুলির কি কোন ঈশ্বরের প্রয়োজন রয়েছে? সৃষ্টিকর্তা থাকলে পৃথিবীর রহস্য উন্মোচনে এত দেরি হয় কেন? মানব সভ্যতার বিকাশ এত ধীর গতিতে হয় কেন? ঈশ্বর থাকলে তো, হয় বললেই সব কিছু হওয়ার কথা কিন্তু তা হয় না কেন? ঈশ্বরের সৃষ্ট বিভিন্ন প্রাণীর এত সমস্যা কেন?

মানুষের চোখ, কান, বুদ্ধির বিকাশ ঘটতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লাগল কেন? এত অনাচারের পরেও ঈশ্বরের কোন হেলদোল নেই কেন? কোটি কোটি মানুষ না খেতে পেয়ে মারা গেলেও ঈশ্বর কোন ব্যবস্থা নেয় না কেন? ঈশ্বর এত রক্ত হিংসাতেও প্রতিক্রিয়া করে না কেন? সর্বোপরি ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানুষের উপর নির্ভরশীল, কারণ মানুষ যদি কোন ঈশ্বরকে না মানে তাহলে পৃথিবীতে ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ব থাকে না। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ রয়েছে যাঁরা ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাসী নয়। এক্ষেত্রে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানুষের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে গোরু, ছাগল ইত্যাদি প্রাণীরা ও ঈশ্বর মানে না তাদের বিকাশ ঘটছে কিভাবে? লক্ষ লক্ষ বছরের মানব সভ্যতার ইতিহাসে ঈশ্বরকে না মেনেই মানব সভ্যতা এগিয়েছে, তাই ঈশ্বরকে মানার কি প্রয়োজন রয়েছে? পৃথিবীতে কোটি কোটি ঈশ্বরের অস্তিত্ব ছিল, সেই ধর্মের অনুসারীরা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সর্বশক্তিমান এইসব ঈশ্বরের অস্তিত্ব ও শেষ হয়ে গেছে। এগুলি থেকে যদি অনুমান করা যায়, ঈশ্বরের কোন অস্তিত্ব নেই এবং ঈশ্বর বিষয়টি পুরোপুরি মানুষের কল্পনাপ্রসূত তাহলে কি খুব ভুল কিছু বলা হবে?

□ ঈশ্বর যদি থেকেও থাকে তাঁর স্বরূপ কি রকম হতে পারে?

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটা বোঝা যায় যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব মানুষের কল্পনার ফসল। তবুও অনেক বিশ্বাসী মানুষ মনে করেন ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে, তাহলে তাঁদের প্রশ্ন হল ঈশ্বর কেমন হবে? তর্কের সাপেক্ষে ধরে নিলাম ঈশ্বর রয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হল সেই ঈশ্বর অবশ্যই আমাদের কল্পিত সৃষ্টিকর্তা নয়। যে সৃষ্টিকর্তা মানুষকে ঘৃণা করতে শেখাবে, এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে লড়াই করতে শেখাবে। যে প্রশংসা পেলে খুশি হয় এবং প্রশংসা না পেলে রাগ করে। মানুষকে জান্নাত জাহান্নমের ভয় দেখায়। রক্ত পেলে খুশি হয়, বর্বরতার চর্চা করে। যে তাঁর রক্ষার জন্য মানুষকে দায়িত্ব দেয়, যাঁর জন্য কোটি কোটি মানুষের জীবন ধ্বংস হয়। সৃষ্টিকর্তা এত নিষ্ঠুর, এত ঘৃণ্য হতে পারে না! যদি সৃষ্টিকর্তা থেকেও থাকে তিনি এইরকম প্রশংসা, নামাজ, পুজার মুখাপেক্ষি হবেন না। তিনি মানুষকে ধর্মে ও বর্ণে ভাগ করবেন না। তিনি মানুষকে ভালোবাসবেন ও ভালবাসার কথা বলবেন।

□ আমাদের কেমন সমাজ ব্যবস্থা প্রয়োজন?

আমরা এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা চাই যেখানে মানুষে মানুষে, ধর্মে ধর্মে, বর্ণে বর্ণে মানুষের মধ্যে কোন বিভেদ সৃষ্টি না হয়, মানুষের মধ্যে যেন মানবতার প্রসার ঘটে ও ভালোবাসার চর্চা বৃদ্ধি পায়। এই সমাজ ব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠবে যখন ধর্ম মুক্ত সমাজ গড়ে উঠবে। ধর্ম শেষ হলেই পৃথিবীর 95% সমস্যা এমনিতেই সমাধান হয়ে যাবে। পৃথিবীর দিকে তাকালে দেখা যায় যে দেশে যত ধর্মের চর্চা হয়, সে দেশ তত বেশি পিছিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে যে দেশে যত কম ধর্ম পালন করা হয়, সে দেশ তত বেশি উন্নত! আশাবাদী একদিন আগামীর জন্য ধর্মান্ধতা মুক্ত মানবিক পৃথিবী রেখে যেতে পারব! আমরা কি আমাদের স্বপ্ন সফল করতে পারব?

(☆ লেখাটির মূলভাষা ও ভাব অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে ক্ষেত্র বিশেষে লেখার প্রয়োজনে কোথাও কোথাও ভাষার ভাব কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে বা কোথাও কোথাও নতুন কিছু বিষয় সংযোজন করা হয়েছে। ধন্যবাদ!)

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°° সমাপ্ত °°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.