কেনো বাড়ছে মুসলিম বিদ্বেষ


ঘৃণার চর্চা জার্মানীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে পৌছে গেছে। এটি অবশ্যই একটি আশংকাজনক খবর। আমি বলবো শুধু জার্মানী না, সারাবিশ্বেই বাড়ছে ঘৃণার চর্চা। সারা বিশ্বই হয়ে উঠছে উত্তপ্ত।

বলা বাহুল্য, এই ঘৃণার বহুলাংশই মুসলমানদের প্রতি। সম্প্রতি ভারতে আমরা এই ঘৃণার জগন্য রুপও আমরা অবলোকন করেছি।

বললেই বলবেন আমি মুসলিম বিদ্বেষী। কিন্তু, সত্যি বলতে কী মুসলমানরা এই ঘৃণাকে অর্জন করেছে। মুসলমানরা নিজেদেরকে সব সময় শ্রেষ্ঠ মনে করে। অমুসলিমদেরকে তারা কখনোই সম্মান করেনি। এই ভাবনাই এদেরকে আজকের পরিণতিতে এনে পৌছে দিয়েছে।

জার্মানীতে আমার বেশিদিন হয়নি, মাত্র বছর তিনেক। এই তিন বছরে বাংলাদেশসহ অনেক মুসলমানের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে। বিশ্বাস করেন, এদের কেউই জার্মানি কিংবা জার্মানদেরকে এতোটুকুন ভালো বাসে না, পছন্দ করে না। প্রকাশ্যে না, এরা নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করে, কাফেরদেরকে ঘৃণা করে।

এই ঘৃণার বড়ো একটা কারণ এখানকার নারীরা। নারীদের নিয়ে এদের একটাই মন্তব্য আমি মুসলমানদের কাছে বেশি শুনেছি যে এখানকার নারীগুলো স্বাক্ষাত শয়তান।

আর আইন কানুন! এরা আইন কানুনের তোয়াক্কা করে না। সেদিন ছেলেদের সাথে রাস্তার আইন কানুন নিয়ে কথা হচ্ছিলো। বয়োসন্ধির শিকার আমার বড়ো মিয়ার মধ্যে ট্রাফিক লাইট অমান্য করার একটা অনুসন্ধিৎসু মন আমি দেখেছি। রাস্তায় গাড়ি না থাকলে লাল বাতি জ্বলা অবস্থায় রাস্তা পার হবার একটা প্রবণতা আমি দেখেছি। তো আমি সেদিন জিজ্ঞেস করলাম, কেনো সে ট্রাফিক আইন মানতে ইচ্ছুক না। উত্তরে জানালো, আউসল্যান্ডার মানে এখানে যারা বহিরাগত, তাদের নাকি এসব আইন না মানলেও চলে। আর এটা সে জেনেছে স্কুল এবং পাড়া প্রতিবেশি আরবি মুসলমান বাচ্চাদের কাছ থেকে। ঐসব বাচ্চাদের বাবা মা নাকি বলে, এতো আইন মানতে হয় না।

এরপরে আবার বড়ো মিয়াকে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি মনে করেন কোনো জার্মান বাচ্চা ট্রাফিক আইন ভাঙবে?” সে জানালো, না, জার্মান ছোটো বড়ো সবাই জেনে শুনে যতো সামান্য নিয়মই হোক, ভাঙে না। ওরা এসবের ব্যপারে খুবই রেসপেক্টফুল।

তো, এই ধরণের মানসিকতার মানুষদেরকে দেখতে দেখতে তাদের প্রতি যদি কারও ঘৃণার জন্ম হয়, তাহলে দায়ী কে?

এবার যাই ভারত বাংলাদেশের দিকে। মুজিব বর্ষ পালন উপলক্ষ্যে নাকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে এবং বাংলাদশের আপামর জনতা তাঁর বিরোধীতা করছে। হ্যাঁ, আমিও করি।
একজন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীকে অবশ্যই বর্জন করতে হবে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কী, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একজন সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী, আমাদের হাটহাজারীর মুরুব্বী শয়তান শফিও একটা সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী। কেউ কি এদেরকে বর্জন করার কথা বলছেন? এদেরকে বর্জন করার ডাক দিয়েছেন? না, দেননি। কারণ এরা দু’জনেই মুসলমান এবং এরা দু’জনেই মুসলমানদেরকে তোষণ করে চলে।

প্রশ্ন আসতে পারে, শেখ হাসিনা বা শফি কীভাবে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী? জানি না, আপনাদের মনে আছে কিনা, দেশে একের পর এক ব্লগার হত্যা যখন হচ্ছিলো তখন শফি শয়তান বলেছিলো যে নাস্তিকদেরকে কতল করা ওয়াজিব হয়ে গেছে। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলো, “ স্যাকুলাররা বিকৃত মস্তিষ্কধারী গাঁজাখোর। এরা যদি এতোই ইসলাম সহ্য করতে না পারে, তাহলে লাগুক মারামারি, আমরা কিছু বলবো না, দেখি কে জেতে।” তো যে মানুষ হত্যাকে ওয়াজিব বলে ফতোয়া দিতে পারে, যে দুইদলকে মারামারিতে উস্কে দিতে চায় সে কি সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী নয়? আমি তো মনে করি, মোদী বরং এদের তুলনায় এখন অনেক ভালো হয়ে গেছে। দিল্লির দাঙ্গা নিয়ে সে কি বলেছে যে দেখি কে জেতে! সে নিজে কি মুসলমানদের হত্যা করার জন্য এখন কোনো বক্তব্য দিয়েছে?

না, আমি মোদীর সাফাই গাইছি না। আমি শুধু তুলনা করলাম। একই কাজ যখন মুসলমানদের পক্ষ নিয়ে করা হয়, তখন মুসলমানরা একে স্বাগত জানায়, আর অন্য কোনো ধর্মের কেউ করলে তার বিরুধীতায় লেগে যায়। তো এরকম একচোখা জাতিগোষ্ঠীর প্রতি মানুষের ঘৃণা জন্মানো খুব বেশি অপ্রত্যাশিত কি!

এবার আবারও ফিরে আসি জার্মানীতে। বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে তুলনা করলে আমি থাকি জার্মানীর একটি জেলা শহরে। আমাদের পাশের একটি থানা শহরে গতকাল দুইজন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান মিলেছে। ওখানকার স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ওই শহর থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের শহরে লোকজনের যাতায়াত আছে। তো, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের শহরের লোকেরা আতঙ্কিত হয়েছে। আমাদের শহর লকড ডাউন হয়ে যেতে পারে এই আশংকায় সবাই দীর্ঘ সময়ের জন্য খাবার সংগ্রহ করে রাখছে। আজ আমিও গিয়েছিলাম একটি কুর্দিস দোকানে চাল কিনতে। দোকানীর সাথে কথায় কথায় আলাপ উঠেছিল করোনা সম্পর্কে। সে বললো, “আমরা মুসলমান, আমাদের ভয় কী! করোনা তো বিধর্মীদের জন্য আল্লাহ্‌র গজব।” আল্লাহ্‌র গজব হোক আর যাই হোক, খেয়াল করুন, সে হুট করে বলে ফেললো “আমরা মুসলমান”। তাকে সে নিজে আলাদা করে ফেললো অন্যদের থেকে। আর অন্যদের বিপদও তাকে এতটুকুও ভাবাচ্ছে না! সত্য হলো, এই দোকানীর মতো প্রতিটা মুসলমানই নিজেদেরকে আলাদা ভাবে। অন্যদের জন্য তাদের এতটুকুন দরদ নাই।

তো যারা নিজেদেরকে সবসময় আলাদা ভাবে, অন্যদের জন্য যারা কোনো অনুভূতি রাখে না, অন্যদের বিপদকে বিপদ মনে করে না তাদের প্রতি মানুষের ঘৃণা জন্মাবে না তো কী জন্মাবে!

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 6 = 2