সাংবাদিকদের নিষ্কৃতি দিলে জয়ের ‘জয়’ হবে!

সজীব ওয়াজেদ জয়ের দুইটা পরিচয় সর্বমহলে প্রচারিত; তার একটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র এবং অন্যটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে। দ্বিতীয় পরিচয়টি সর্বক্ষেত্রে আলোচনায় থাকে না, বলা যায় প্রথম পরিচয়কে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠে ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছাকৃতভাবে হলেও তাঁর বিভিন্ন বিষয়ে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে। এ পরিচয়ে ক্ষমতাধরদের দাপটের বিষয়টি সামনে আসে, যদিও সর্বক্ষেত্রে নিজে যে সে সব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট তা না হলেও।

তিনি বাংলাদেশে থাকেন না, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। মাঝে-মাঝে বাংলাদেশে আসেন, বিভিন্ন সভা-সেমিনারে এবং সরকারি কিছু কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর বাইরে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ সম্পর্কে মতামত দেন, যার অধিকাংশই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক কেন্দ্রিক। সে সব ফেসবুক স্ট্যাটাসে “আমাদের সরকার” শব্দদ্বয় ব্যবহার করেন। ধারণা করি প্রধানমন্ত্রীর একজন অবৈতনিক উপদেষ্টা হিসেবে তাঁর এ “আমাদের” শব্দ ব্যবহার। এছাড়াও মনে হয় তিনিই সম্ভবত একমাত্র ফেসবুক এক্টিভিস্ট যিনি ফেসবুকের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জড়িত। এখানে অবশ্য আপত্তির কিছু দেখছি না।

এর বাইরে আরও আছে, সজীব ওয়াজেদ জয় সম্ভবত বাংলাদেশের একমাত্র রাজনীতিবিদ যার প্রতি ফেসবুক স্ট্যাটাস বাংলাদেশের অনলাইন ও প্রিন্টেড মিডিয়ায় প্রকাশ হয়, আলোচিত হয়। যেকোনো বিষয়ে তাঁর সরাসরি এবং টেলিফোনে বক্তব্য কিংবা মতামত নেওয়া সহজ কাজ নয় বলে ফেসবুকই একমাত্র তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের অনেকক্ষেত্রে একপাক্ষিক ও একমাত্র মাধ্যম।

তিনি কেবল সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ, উদ্যোগ, সিদ্ধান্ত বিষয়েই মতামত দেন না। মাঝে মাঝে ব্যক্তিমত খুব জোরালোভাবে চাপিয়ে দেওয়ামূলক আহবানও জানান। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায়, দেশের বহুল প্রচারিত একটি জাতীয় দৈনিককে বর্জন ও শাহবাগকেন্দ্রিক একজন ব্যক্তিকে ফেসবুকে আনফলো, পেজ আনলাইক করার মত আহ্বানও জানিয়েছিলেন। ধারণা করি, ওগুলো সরকারের পরিষ্কার কোন সিদ্ধান্ত ছিল না। ফলে ধারণা করা যায়, কেবল সরকারপ্রধানের একজন উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনের বাইরেও তিনি ফেসবুক নিজস্ব ব্যক্তিচিন্তার একটা আয়না হিসেবে ব্যবহার করতেও আগ্রহী। এখানেও আপত্তির কিছু নেই, একজন ব্যক্তি তাঁর ফেসবুককে কীভাবে ব্যবহার করবেন সেটা তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।

আগেকার দুই বর্জন আহ্বানের সময়ে তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিলেন। লক্ষাধিক লাইকদাতাদের কজন তাঁর সে আহবানে সাড়া দিয়েছিল এমন তথ্য কেউ কখনও প্রকাশ করে নি, কিংবা এমন গবেষণা হয় নি বলে জানা যায় নি আদতে সেক্ষেত্রে তিনি কতখানি প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন। তবে এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হয়েছিল, এবং সে আলোচনা-সমালোচনায় ইতিবাচক সাড়া দেওয়া লোকের সংখ্যা খুব বেশি ছিল তা বলাও যাবে না।

অদ্য তিনি নতুন করে আলোচনায় এসেছেন। এবার তিন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার ও তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার পর অনেকেই জানতে পারে তাঁকে ঘিরে এক মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল অনলাইন নিউজপোর্টালে। মিথ্যা এ সংবাদের মূল বক্তব্য ছিল বিমান দুর্ঘটনায় জয় নিহত। সংবাদটি প্রকাশ করে অনলাইন নিউজপোর্টাল টুডেনিউজ৭১ডটকম। মিথ্যা সংবাদ ও সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার, মামলা এসব নিয়ে আলোচনা হলে প্রথমেই ভাবা হবে তাহলে ওই নিউজপোর্টালের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিন্তু না! গুজব ছড়িয়েছে যারা তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয় নি, উলটো যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা বাংলামেইল২৪ডটকমের। তাহলে?

বাংলামেইলের অপরাধ এখানে মিথ্যা সে সংবাদ যে মিথ্যা সেটা তারা প্রকাশ করেছিল, তবে সংবাদের শিরোনামে জয়ের নিহত হওয়ার সংবাদ তারা বিস্ময়সূচক (!) চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করেছিল। সংবাদমাধ্যমে যারা কাজ করেন এবং যারা কাজ না করেও এ বিস্ময়সূচক চিহ্নের ব্যবহার জানেন তারা অবশ্যই জানেন যে এর মাধ্যমে শিরোনামের বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত করা হয় না, বরং এখানে সন্দেহের যথেষ্ট উপকরণ আছে সে নির্দেশনা দেওয়া হয়। বাংলামেইলের সে প্রতিবেদনের ভাষ্যটাও ছিল সজীব ওয়াজেদ জয় বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন সে সংবাদ মিথ্যা ছিল সেটা তুলে ধরা। এ প্রসঙ্গে তারা এক আওয়ামী লীগ নেতার বক্তব্যও সে প্রতিবেদনে যোগ করেছিল। এতে করে গুজব ছড়ানো তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল না সেটা পরিষ্কার।

এতটুকু পর্যন্ত হয়ত ঠিক ছিল, কিন্তু অতি উৎসাহী জনৈক কর্তাব্যক্তির দৃশ্যপটে আগমনের পর সবকিছু পাল্টে যায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বাংলামেইলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেদককে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে,“বাংলামেইলে ওই প্রতিবেদন আসার পর প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এক কর্মকর্তা সংবাদটি সরিয়ে নিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু বাংলামেইলের ঊর্ধ্বতনরা তা করেননি।(৮ আগস্ট ২০১৬)” প্রতিবেদনে অবশ্য ঐ কর্মকর্তার পরিচয় প্রকাশ হয় নি। এরপরই রাতের আধারে বাংলামেইলের অফিসে অভিযান চালায় র্যাব। গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় তিন সাংবাদিককে, এবং এরপর তাঁদেরকে তথ্য প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গ্রেপ্তার এ তিন সাংবাদিকের মধ্যে রয়েছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর পরিবারের সদস্য মাকসুদুল হায়দার চৌধুরী, কবি প্রান্ত পলাশ ও বাংলামেইলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাহাদাত উল্যাহ খান এবং এদের সঙ্গে পরবর্তীতে দায়ের হওয়া মামলায় আরও রয়েছেন বাংলামেইলের মালিক সাবেক সংসদ সদস্য ও ব্যবসায়ী ফজলুল আজিম, তিনি বাইরে আছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পাসপোর্টধারী সজীব ওয়াজেদ জয় যখন সেদেশে যাচ্ছিলেন তখন সে মৃত্যুর ভুল সংবাদে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা উদ্বিগ্ন হতেই পারে। টুডেনিউজ৭১ডটকম এ মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করে অপরাধ করতে পারে, বাংলামেইল সে মিথ্যা সংবাদ যে মিথ্যা ছিল সেটা প্রমাণ করতে গিয়ে অপরাধটা কোথায় করল? বাংলামেইলের সে সংবাদটা সৎ সাংবাদিকতার নজির বললে কি এখানে অত্যুক্তি হবে? হ্যাঁ, হতে পারে শিরোনামে বিস্ময়সূচক চিহ্ন ব্যবহারের মর্মার্থ প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের সে কর্মকর্তা বুঝতে পারেন নি, কিন্তু তাই বলে কি পুরো একটা প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দিয়ে মিডিয়ার কণ্ঠরোধের বাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে? সাংবাদিকদের দড়ি দিয়ে বেঁধে আদালতে তুলতে হবে? একটা মিথ্যা সংবাদের বিপরীতে সৎ সাংবাদিকতার একি প্রতিদান?

তবে কি এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের কোন কর্মকর্তার আবদার রক্ষা না করার খেসারত? যদি তাই হয় তবে বলতেই হবে- একটা গণতান্ত্রিক দেশে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের এত ক্ষমতা থাকতে পারে তা রীতিমত অবাক হওয়ার মতই ঘটনা। যদি তাই হয় তবে এটা ইগোর লড়াই, এবং এ সম্পর্কে কি প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় অবগত?

আমরা জানি না সজীব ওয়াজেদ জয় তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তার এবং একটা নিউজপোর্টাল বন্ধ করে দিতে কোন ভূমিকা রেখেছেন কিনা? তবে সরল বিশ্বাসে বিশ্বাস করতে চাই, এ সম্পর্কে তিনি অবগত নন। কৃপাপ্রার্থী কারও অতি উৎসাহ ও ইগোর লড়াইয়ের কারণেই ঘটছে হয়ত এতকিছু। যদি তাই হয় তবে সজীব ওয়াজেদ জয় এ ঘটনায় নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, আওয়ামী লীগের একজন অনুমিত ভবিষ্যৎ কর্ণধার হিসেবে তাঁর কাছ থেকে বিশাল এক আশাবাদের বিপরীতে হতাশাজনক এক নজির হবে। গ্রেপ্তার, মামলা বিষয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় নিজে সম্পৃক্ত না হলেও এখন যদি পুরো ঘটনাকে অপ্রকাশ্য হলেও সমর্থন দেন তবেও সেটা হবে বাজে এক দৃষ্টান্ত। ব্যক্তিচিন্তায় বিশালত্বের বিষয়টি মার খাবে প্রবলভাবে। জানি না তিনি এটা কিভাবে দেখছেন!

সজীব ওয়াজেদ জয়ের মৃত্যুর ভুল সংবাদ প্রকাশ করেও টুডেনিউজ৭১-এর কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এমন কোন সংবাদ চোখে পড়েনি। অথচ সে নিউজপোর্টালের খবর অনলাইনে ভাইরাল হয়েছিল। অখ্যাত এক পোর্টাল বলে ওদের কর্মকাণ্ডকে হালকা করে দেখার অবকাশ নেই, যখন বাংলামেইলের মত পরিচিত এক নিউজপোর্টালকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অথচ তারা টুডেনিউজ৭১-এর মত কোন কাণ্ড ঘটায় নি। মিথ্যাকে মিথ্যা বলতে গিয়ে কারও ব্যক্তি আক্রোশের শিকার হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের তরফে যে ভূমিকা নেওয়া হয়েছে সেটাকে ভুল বলেই মনে করছি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের প্রতি এমন আচরণকে নিপীড়নমূলক বলেও উল্লেখ করছি। এটা যদি অব্যাহত থাকে, যদি বাংলামেইল খুলে না দেওয়া হয় তবে সত্যিকার অর্থে বাক-স্বাধীনতার বিষয়টি ক্ষমতাধরদের কাছে ফেলনা বলেই মনে হবে।

বাংলামেইল সজীব ওয়াজেদ জয়ের মৃত্যুর মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করেনি, তারা এর প্রতিক্রিয়া ও ভুল গুজবের বিষয়টি তোলে এনেছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে দেশে-দেশে ক্ষমতাধরদের মৃত্যুর ভুল সংবাদের বিষয়টি, যেখানে ওই সব ক্ষেত্রে কেউ কোনদিন শাস্তির মুখে পড়েছে এমন নজির সম্ভবত নেইও। এর আগে জর্জ ডব্লিউ বুশের মৃত্যুর সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল, ফিডেল ক্যাস্ট্রোর হয়েছিল, মার্গারেট থ্যাচারের হয়েছিল, মার্ক টোয়েনের হয়েছিল, দ্বিতীয় পোপ জন পলের হয়েছিল, সাহিত্যিক এস.টি. কোলেরিজ সহ আরও অনেকেরই হয়েছিল; কিন্তু এর বিপরীতে কাউকে শাস্তি হিসেবে দড়ি বেঁধে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় নি, জেলে পুরেনি, মিডিয়ার মুখ জোর করে বন্ধ করে দেওয়া হয় নি। তারা ভুলকে সাধারণভাবে দেখে নিজের মহত্ব দিয়ে ক্ষমা করে দিয়েছেন; আবার কেউ কেউ সেখান থেকেও মজা নিয়েছেন। যে বুশের অঙুলি হেলনে দেশে দেশে যুদ্ধের দামামা ছিল সময়ের ব্যাপার সে বুশ চাইলে সংশ্লিষ্টদের একেবারে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে পারতেন, কিন্তু করেননি। রাষ্ট্র ক্ষমতায় না থাকলেও তাঁদের সে ক্ষমতা ছিল, তবু তারা বিষয়টিকে সাধারণভাবে দেখেছেন। এর বাইরে বলাও যায়, কারও মৃত্যুর ভুল সংবাদ ছাপা হলে সে ব্যক্তি পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্যে হারিয়ে যান এমন না। তবে বাংলাদেশে কেন এমন হলো? কেন আমরা এটাকে সাধারণ দৃষ্টিতে দেখতে পারছি না? কী এমন হয় বিষয়টিকে সাধারণ চোখে দেখে নিলে?

বাংলামেইল বন্ধ ও সাংবাদিকদের মামলায় জড়ানোর বিপরিতে এখন পর্যন্ত সাংবাদিকদের কোন সংগঠনের পক্ষে উল্লেখ করার মত কোন প্রতিবাদ নেই। এ বিষয়টিকে লজ্জা, নাকি হতাশার বিষয়ে দেখতে হবে সে সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছি। সাংবাদিক ও সাংবাদিকদের কোন সংগঠন যদি এর প্রতিবাদ না করে তবে এমন অবস্থায় কারা এগিয়ে আসবে? আজ তিন সাংবাদিক ও এক নিউজপোর্টাল আক্রান্ত হয়েছে, কাল অন্য কেউও এমন পরিস্থিতিতে পড়তেও পারে। এখানে অন্যকে দোষারোপের সুযোগ সীমিত, কারণ ক্ষমতাধররা ক্ষমতার বৃত্ত থেকে বাকিদের অধস্তন ভাবতে ভালোবাসেন। অনেকক্ষেত্রে তাঁদের বিশ্লেষণি মনোভাব বৃত্তস্থিত বলে সেখানে যুক্তির প্রচলন সীমিত।

অবাক কল্পনা নয়, এটা বাস্তবতা যে, বাংলাদেশের প্রায় সবকিছুই দলীয় সংস্কৃতির মোড়কে রূপান্তর হচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকার ও প্রশাসনের অধিকাংশ পদক্ষেপ এক পক্ষ বিনা বাক্যব্যয়ে সমর্থন করে যাচ্ছে, আবার অন্যপক্ষ এর বিরোধিতা করেই যাচ্ছে। অন্য সকল শ্রেণি-পেশার মত সাংবাদিক সমাজও ক্রমশ এ বৃত্তে ডুকে পড়ছে, এতে করে আদতে মুল ক্ষতিটা হচ্ছে সমাজের; রাষ্ট্রের। একজন সাংবাদিক ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো রাজনৈতিক দলের নীতি আদর্শের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করতেই পারেন, কিন্তু যখন পেশাগত বিষয় সামনে আসে তখন তিনি ঘটনার এক ধারাবর্ণনাকারী। পেশাগত বিষয়টাই মুখ্য তাঁর কাছে। বাংলামেইল সহ এর তিন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যে পদক্ষেপ নিয়েছে এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ করা উচিত ছিল। এখানে আওয়ামী লীগ কিংবা সজীব ওয়াজেদ জয়কে দেখার চাইতে ঘটনার প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে ভাবা দরকার ছিল। দুঃখজনক বাস্তবতা হচ্ছে, তা হয় নি।

বাংলামেইলের তিন সাংবাদিক বিতর্কিত আইসিটি আইনের শিকার হয়ে কারাগারে আছেন, এ বিষয়টিকে তিন ব্যক্তি হিসেবে না দেখে তাঁদের সাংবাদিক পরিচয় ও সত্ত্বাকে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এখানে অন্য কিছু ভাবাভাবির কিছু নেই, এখানে এটা ভাবার কিছু নেই আমি নিরাপদ,তাই চুপ থাকি। কিন্তু আদতে কেউ কি নিরাপদ? আজ যিনি নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন,একই পেশার লোক হয়েও চুপ করে বসে আছেন;কাল তিনি বা তারা এমন অবস্থায় পড়লে তখন অন্যরাও একই ভূমিকা পালন করলে তাঁর অথবা তাঁদের কি কিছু করার থাকবে?

হ্যাঁ, ভাবতে পারেন- আমি ত ভুল করিনি, কিংবা করব না। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কী কেউ- চাইলে অবিসংবাদিত কোন সত্যেও অন্য কেউ ভুল ধরে কিংবা নিজের খেয়ালখুশিমত বিশ্লেষণ করে অনুভূতি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে দাবি করে বসতে পারে। আর তা যদি হয় ক্ষমতাধরদের কারও মাধ্যমে তখন সেখানে যুক্তির ব্যাপারটা হয়ে পড়বে ঠুনকো। তখন?

খুব বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে- যখন লেখক-ব্লগারদের ওপর ধর্মীয় সন্ত্রাসীদের একের পর এক আক্রমণ হতে থাকল তখন এক শ্রেণির লোক বিচারের দাবি ত দূরের কথা খুনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের দোষত্রুটি খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। এরপর একে একে যখন অন্য শ্রেণী-পেশা এমনকি মসজিদের ইমামও একইভাবে আক্রোশের শিকার হচ্ছেন এবং ক্রমাগত আস্কারা দিয়ে বড় হতে সাহায্য করা সংঘবদ্ধ জঙ্গি হামলায় পুরো দেশ হুমকির মুখে পড়েছে তখন অনেকেই বুঝতে পারছেন সমস্যার ভয়াবহতা। অথচ দেরিতে বুঝার কারণে পিছনে খুব বেশি জায়গা নেই নিজেদের রক্ষা করার! দেখুন,একদা যাকে ছোট ব্যাপার বলে, সকলেই ব্যক্তিগতভাবে নিজে আক্রান্ত হচ্ছেন না ভেবে চুপ করে বসে থাকার দলে ছিলেন, কিন্তু সেটা আজ কোথায় গিয়ে পৌঁছেছে?

সরকার সাংবাদিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে, সিনিয়র সাংবাদিকদের কেউ কেউ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন, রাষ্ট্রীয় সফরে মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হচ্ছেন- এগুলো হয়ত শুভসংবাদ। কিন্তু এর বিপরিতে ছোট্ট এক উদাহরণ হিসেবে যখন প্রধানমন্ত্রীর যেকোনো প্রেস ব্রিফিংয়ে কিছু লোকের বিনত ভঙ্গি আর অতিপ্রশংসার প্রতিযোগিতা দেখা যায় তখন মাঝে-মাঝে মাথা গুনতে হয় কৃপাপ্রার্থীর। এত কৃপাপ্রার্থী যদি হয় দেশে, তবে কৃপাদাতারা কত বিলাবে কৃপার গোলাপজল?

গণমাধ্যম এবং ওখানে কর্মরত কোন সাংবাদিক সরকার কিংবা সজীব ওয়াজেদ জয়ের শত্রু নয়, বরং বন্ধুই বলা যায়। আরও একটু খোলাসা করলে বলা যায় সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রতি গণমাধ্যমগুলো বন্ধুত্বের হাত একটু বেশি করেই বাড়িয়ে দিয়েছে। সজীব ওয়াজেদ জয় বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে যা কিছু বলেন তার অধিকাংশই ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে হয়ে থাকে। সে কথাগুলো ফেসবুকে শেয়ার হয়, লাইকের মাধ্যমে অনেকের কাছে যায়। এ সংখ্যা দেশের মোট জনসংখ্যার তুলনায় খুব বেশি নয়। আবার তাঁর সে স্ট্যাটাসগুলো দেশের মিডিয়ায় সংবাদ আকারে প্রকাশ হয়, এবং সেখান থেকে আবারও ছড়িয়ে পড়ে। একটা পেইজের একটা পোস্টের মানুষের কাছে পৌঁছানোর তুলনায় সেটা অনেক বেশি। অনলাইনের বাইরে যখন প্রিন্ট মিডিয়ায়ও তাঁর সে স্ট্যাটাসগুলো আবার প্রকাশ পায় তখন অনলাইনের বাইরের মানুষজনের কাছে সেটা পৌঁছায়।

শহর দিয়ে আর ফেসবুক দিয়ে বাংলাদেশের সামগ্রিক চিত্র পরিমাপ করা উচিত না। একটা পেইজের কয়েক লক্ষ লাইক দিয়ে যদি ভাবা হয় কোটি মানুষের কাছে বার্তা পোঁছাচ্ছে তাহলে সঠিক হবে না। এ বার্তা পৌঁছানোর কাজটা করছে মিডিয়া। এ হিসেবে মিডিয়ার প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞ থাকা ত উচিত। মিডিয়া যদি সজীব ওয়াজেদ জয়কে এভাবে অগ্রাধিকার দেয় তাহলে তিনিও ত এর প্রতিদান দিতে পারেন ইতিবাচকভাবে, সুস্থ মিডিয়াকে আরও বেশি সহযোগিতা করে। তিনিও নিশ্চয়ই জানেন দেশের মিডিয়ায় কর্মরত কারও মন্ত্রী কিংবা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার উচ্চাভিলাষ খুব একটা নেই, সেক্ষেত্রে কেউ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং বলা যায় সহযোগি, বন্ধু। তাই তিনি কি পারেন না সামান্য হলেও কৃতজ্ঞ থাকতে; বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে?

শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী পরিবারের সদস্য মাকসুদুল হায়দার চৌধুরী, কবি প্রান্ত পলাশ ও বাংলামেইলের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি। সজীব ওয়াজেদ জয় এ ইস্যুতে কতিপয় কৃপাপ্রার্থীর ফাঁদে পা দিয়েছেন কিনা সেটা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছি।এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যেতে পারে, এর আগে প্রবীর সিকদার ইস্যুতে কৃপাপ্রার্থী “স্বপন পাল”-দের কারণে সমালোচিত হয়েছিলেন শেখ হাসিনা, এবার হচ্ছেন, হবেন সজীব ওয়াজেদ জয়। মনে রাখা দরকার কৃপাপ্রার্থীদের কারও কাছে জবাবদিহির দরকার হয় না, মানসম্মান যাওয়ারও প্রশ্ন থাকে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দয়া করে অতি উৎসাহী ও কৃপাপ্রার্থীদের থামান! ওদেরকে সতর্ক করার পাশাপাশি এই বার্তাটুকুও পৌঁছে দিন সজীব ওয়াজেদ জয়ের ফেসবুকের রাজনীতি সংক্রান্ত স্ট্যাটাসগুলো এই মিডিয়াই প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়। তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস মিডিয়া গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করে বলেই তিনি বাংলাদেশে সার্বক্ষণিক না থেকেও আলোচনায় আছেন প্রবলভাবে।

মিডিয়াকে শত্রু ভাববেন না; বন্ধু ভাবুন। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে তাঁদের কাজ করতে দিন স্বাধীনভাবে। বাংলামেইলের তিন সাংবাদিককে নিষ্কৃতি দিলে জয় পরাজিত হবেন না; জয়ীই হবেন!
১৩ আগস্ট ২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

80 − = 75