জঙ্গিবাদ : আমরা পরাজয় এড়াতেই লড়ছি!

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় অভিযান চালিয়ে স্পেশাল উইপন্স অ্যান্ড টেকটিস (সোয়াট), র‍্যাব, পুলিশ ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-এর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী ব্যাপক সাফল্য লাভ করে। সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবিরোধি অভিযানগুলোর মধ্যে এটাই উল্লেখযোগ্য সাফল্য বলেই দৃশ্যমান। ওই অভিযানে যৌথ বাহিনীর হাতে ৯ জঙ্গি নিহত হয়েছে, এবং একজন আহত অবস্থায় আটক হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অর্জন আরও আছে, ওখান থেকে জঙ্গিদের বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। আশার কথা হচ্ছে ব্যাপক তদন্তের পর সে সব জব্দ মালামাল থেকে জঙ্গিদের তাত্ত্বিক গুরুদের কোন হদিস পাওয়াও যেতে পারে, যা সময়সাপেক্ষ।

পুলিশের বক্তব্য ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ি একমাস আগে জঙ্গিরা ঐ বাড়ির একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়, বাড়ির মালিক ভাড়াটিয়া সম্পর্কিত কোন তথ্য ঢাকা মহানগর পুলিশের কাছে জমা দেন নি। তথ্যগোপনের কারণে অভিযান শেষে তারা গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর আগে রাতে জঙ্গিরা ওই বাড়িতে রাতের বিভিন্ন সময়ে “নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার” বলে স্লোগান দিয়েছে, নিজেদের উদ্দীপ্ত করতে জেহাদি বক্তব্য দিয়েছে বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এমনকি ভোরে ফজরেরও আজান দিয়েছিল তারা। এ থেকে তাদের উদ্দেশ্য ও পরিচয় প্রমাণ হয়।

আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিশ্বব্যাপী ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষে তাদের ভাষায় জেহাদে নেমেছে। পৃথিবীর সকল গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থাকে তারা ‘তাগুদি সরকার’ বলে মনে করে থাকে। তাদের ভাষায় তারা কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জেহাদে নেমেছে। একমাত্র তারা ছাড়া আর কেউই সহিহ ইসলাম পালন করছে না এটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত। ইরাক, সিরিয়া থেকে উদ্ভূত এ জঙ্গি সংগঠন দেশে দেশে যে তাদের ডালপালা ছড়িয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন নাশকতা ও সন্ত্রাসী হামলা তার উদাহরণ।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গিবাদের যে ভয়াবহ রূপ পরিলক্ষিত হয়েছে সেটার শুরু এ আইএস দিয়ে নয়। জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) নামক এক জঙ্গিগোষ্ঠীর একসঙ্গে মুন্সিগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩টি জেলায় বোমা হামলা চালিয়ে আলোচনায় আসে। এরপর ঐ সংগঠনের দুই শীর্ষ নেতা শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাইয়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘ দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে এরপর ভিন্ন নামে সংগঠিত ও নাশকতা শুরু করে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সেই আবদুর রহমান ও বাংলাভাই এক সময় জামায়াতের রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ছিল। জেএমবি, হিযবুত তাহরির, আনসারুল্লাহ বাংলা টিম কিংবা অন্য নামের এসব সংগঠনগুলো এক সময় তালেবান, আল-কায়েদাকে মুল কেন্দ্র ভাবলেও ওইসব ধর্মীয় সন্ত্রাসী সংগঠনের শক্তিক্ষয়ের পর নতুনভাবে ইসলামিক স্টেট অব সিরিয়া অ্যান্ড ইরাক (আইএসআইএস)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে একই স্টাইলে খেলাফত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে বিভোর। এক্ষেত্রে তাদের জেহাদিদের কাউকে সিরিয়া কিংবা ইরাকে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। ওইসব সংগঠনের কেউ প্রশিক্ষণ নিয়ে আসলে সেই এখানে অন্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। এটা স্বাভাবিকভাবেই একটা ‘চেইন’ হিসেবে কাজ করছে।

আইএস জঙ্গিরা ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার লক্ষে নাশকতা চালাচ্ছে। এতে করে এক শ্রেণির মানুষ ওদের নাশকতা না দেখে ওদের দাবিকেই বড় করে দেখে। আবার যখন নাশকতার প্রসঙ্গ আসে তখন মিনমিন করে বলে এটা সহিহ ইসলাম নয়। গুলশানে জঙ্গি হামলার পর যখন কিছু রহস্যময় লোকের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম “হিজাব দেখে ছেড়ে দিয়েছে, দোয়া-কালেমা জানা লোকদের খাতির করেছে, সেহরি খেয়েছে” এমন প্রচার করে তখনও কিছু লোক জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। জঙ্গিদের নাশকতা, মানুষ হত্যা সেসবকে বড় করে দেখার চাইতে তাদের প্রচারণার মুল বিষয় হিসেবে হঠাত করেই আবির্ভূত হয় ধর্মের প্রতি অনুরাগ। ফলে প্রমাণ হয় জঙ্গিরা আসলে দুইটা পৃথক ফ্রন্টে তাদের কাজ চালাচ্ছে। এর একটা হচ্ছে সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভীতি সঞ্চার করে কথিত খেলাফত প্রতিষ্ঠা, এবং অন্যটি হচ্ছে মানুষের ধর্মীয় অনুরাগকে পুঁজি করে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সমর্থন আদায়। গুলশান পরিস্থিতিকে এক্ষেত্রে যদি ধর্তব্যের মধ্যে নেওয়া হয় তবে বলা যায় তারা ব্যর্থ হয় নি, সফল হয়েছে।

গুলশানে জঙ্গি হামলাকারীদের সকলেই নিহত হয়েছে এটাকে সাফল্য হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। কারণ তারা নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও এমন নাশকতামূলক হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষায় তারা জেহাদে অংশ নিয়ে বেহেস্তে যাচ্ছে, বিধর্মীদের হত্যা করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করছে। গুলশানে জিম্মিদের ১৩ জন জীবিত হিসেবে উদ্ধার করা গেলেও ২০ জন নিহত হয়েছেন, জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন অকুতোভয় দুই পুলিশ কর্মকর্তা। দেশি-বিদেশী এত নিরীহ মানুষের প্রাণহানির পরেও এদেশের কিছু লোক ঠিকই জঙ্গিদের পক্ষে কথা বলেছে। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেকেই জঙ্গিদের জীবিত গ্রেপ্তার করতে না পারার কারণে অভিযান পরিচালনাকারী প্যারা কম্যান্ডো দলের সমালোচনা করেছে। রাতভর অপেক্ষা করে কেন সকালে অপারেশন চালানো হলো, সাথে সাথেই কেন অভিযানে যাওয়া হয় নি- এমন অনেক সমালোচনা হয়েছে। এ সমালোচকদের অনেকেই প্রকাশ্যে জঙ্গিদের পক্ষে কথা বলতে না পারলেও অপ্রকাশ্য এক ধরণের সহানুভূতি দেখিয়েছে জঙ্গিদের প্রতি। আর তার উপর ছিল সে কথিত ধর্মপ্রেম, হিজাব, সুরা-কেরাত জপ সম্পর্কিত বয়ানও।

ফলে ধারণা করাই যায় জঙ্গিরা অনেক গভীর পরিকল্পনার পরেই কেবল মাঠে নেমেছে। এক পরিকল্পনা প্রকাশ্য এবং অন্য যা তা গোপনীয়। প্রকাশ্য পরিকল্পনা অনুযায়ি তারা নাশকতার মাধ্যমে ভীতি সঞ্চার, অতঃপর ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে খেলাফত প্রতিষ্ঠা। আর অন্য পরিকল্পনা অপ্রকাশ্য যা প্রধানত সহানুভূতি আদায়ের মাধ্যমে দলভারী করা। এটা ধর্মের অনুভূতিকে উদ্দেশ করেই চালিত, গুলশানে জঙ্গি হামলার পরবর্তীতে হামলাকারীরা ধর্মের প্রতি অনুগত ছিল এবং ধার্মিকদের প্রতি বিনত ছিল সেটাও প্রমাণের চেষ্টা হয়েছে। তাদের সে চেষ্টা শতভাগ সফল বলেই প্রতীয়মান। একটা সময়ে বিভিন্ন বিশ্লেষণে ধর্মানুরাগ স্রেফ প্রচারের বিষয় ছিল বলে প্রমাণ হলেও সাধারণ মানুষের কাছে যে বার্তা পৌঁছেছে সেটা ভয়াবহ রকমের সহানুভূতি উৎপাদন করেছে।

গুলশানের জঙ্গিরা হামলা করলেও কল্যাণপুরে সেটা করতে পারে নি এলাকাবাসীর তথ্যের ভিত্তিতে এবং সোয়াটের নেতৃত্বে অভিযানের কারণে। কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা ‘জাহাজ বাড়িতে’ জঙ্গিদের উগ্রবাদীতার অনেক প্রমাণ হাজির করা হলেও একশ্রেণির লোক কোনোভাবেই সেটাকে বিশ্বাস করতে রাজি নয়। যে বাড়িতে জঙ্গিরা মারা পড়েছে সেখানকার প্রতিবেশিরা তাদের সে সময়কার অবস্থা বর্ণনা করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই পুলিশের সে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তোলে একে বিভিন্নভাবে সমালোচনা করেছেন। সমালোচকদের ভাষ্য অনুযায়ি, ৯ জন জঙ্গি মারা গেল কিন্তু পুলিশের কিছু হলো না, উদ্ধারকৃত ৪ পিস্তল দিয়ে কিভাবে সারা রাত গুলি করা সম্ভব, নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার স্লোগান দিয়েছিল তারা কি সত্যি সত্যি জঙ্গি ছিল, সবার পেছন দিকে গুলি কেন, জঙ্গিদের সবাই একই রঙের পোশাক পরল কেন, ফ্ল্যাটের বিভিন্ন জায়গায় গুলি কিন্তু ওই অবস্থায় আইএসের পতাকা অক্ষত থাকে কেমনে- এমনতর অগণন প্রশ্ন! তবে সব প্রশ্নের বড় প্রশ্ন এখানে ১০ জন জঙ্গি ছিল যেখানে সেখানে কিভাবে পুলিশ গুলি না খেয়ে, না মরে অভিযান শেষ করে? অবস্থাটা এমন পুলিশের কেউ গুলি খায় নি বলেই সমূহ বিপত্তি!

এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উত্তর- গুলশানের মত কল্যাণপুর ওভাবে আক্রান্ত হয় নি, বরং পুলিশ পূর্বে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান পরিচালনা করেছে। রাতে যখন পুলিশ প্রথম দফায় সে বিল্ডিংয়ে যায় তখন জঙ্গিদের প্রতিরোধের মুখে কিছুটা পিছু হটে আরও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে গেছে। অপেক্ষা করেছে সর্বশক্তি নিয়োগের। সেজন্যে হাজারের মত সদস্য অভিযান পরিচালনা করেছে। যৌথ বাহিনীর চৌকস দল নিশ্চিতভাবেই বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট পরেই এগিয়ে গেছে, এবং নিজেদের সুরক্ষার জন্যে তারা সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষিত হিসেবে নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরাই নিশ্চিত করেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্যে আত্মরক্ষা যেখানে প্রাথমিকভাবেই বিবেচ্য সেখানে নিশ্চিতভাবেই তারা নিজেদের সুরক্ষিত রেখে তাদের প্রশিক্ষণ ও অভিযানকে সফল করেছে। ফলে এ অভিযানে পুলিশের প্রাণহানি ঘটে নি।

অন্য অনেক সমালোচনার মধ্যে চার পিস্তল দিয়ে কিভাবে মুহুর্মুহু গুলি চালানো যায়, এমন আজগুবি প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে পুলিশের পক্ষ থেকে করা সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ দাবি করে নি রাতভর অভিযানের। তারা প্রথম দফা প্রতিরোধের মুখে পড়ে শেষ রাতে সফল অভিযান সমাপ্ত করেছে বলে জানিয়েছে। তাছাড়া জঙ্গি আস্তানা থেকে চার উদ্ধারকৃত পিস্তল একবার ব্যবহারযোগ্য এমন কিছু কেউ বলে নি, সেক্ষেত্রে একবার গুলি শেষ হলে আরও অনেকবার গুলি লোড করা সম্ভব- এ সাধারণ বোধটুকু সমালোচকদের থাকারও দরকার ছিল। এভাবে প্রত্যেক প্রশ্নকে আলাদা করে যৌক্তিক উত্তর দেওয়া যায়, কিন্তু সেটার আর দরকার পড়ে না। কারণ যৌক্তিক প্রশ্ন হলে তবেই উত্তরের প্রসঙ্গ। মোদ্দা কথা, এ সমালোচকদের অনেকেই পুর্বসিদ্ধান্তে অনড়, এবং পুলিশের এ সফলতা কোনোভাবেই মানতে রাজি নয়। তাই সব যুক্তি অযৌক্তিক ঠেকবে তাদের কাছে!

অযৌক্তিক অনেক বিরোধিতা ও প্রশ্নের মাঝেও কিছু যুক্তি নিশ্চিতভাবেই থাকে। কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানা নিয়ে সমালোচকদের অনেকেরই বক্তব্য নাম-পরিচয় না জেনে কিভাবে পুলিশ দাবি করে ওরা উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান? এখানে একমত হওয়া যায়। সাম্প্রতিক সময়ের জঙ্গিবাদী কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িতদের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে পুলিশ এক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষিত বলে সাধারণীকরণ করে থাকে। ১৮-২৫ বছর বয়সী তরুণেরা যাদের অধিকাংশই ব্যাচেলর ডিগ্রি লেবেল পর্যন্ত পাশ করে নি পুলিশ কীভাবে তাদের উচ্চশিক্ষিত বলে আখ্যা দেয়। প্রশ্ন জাগে, তবে কি একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায় পা দেওয়া মাত্রই কারও গায়ে উচ্চশিক্ষিতের লেবেল আঁটা হয়ে যায়?

এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যেতে পারে আগেকার জঙ্গিদের অধিকাংশই মাদরাসা পড়ুয়া ছাত্র-শিক্ষক ছিল বলে ওদের সে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও যাই হোক প্রশাসনের কেউ উচ্চশিক্ষা বলে মানতে রাজি ছিল না। মাদরাসার বাইরে জঙ্গিদের রিক্রুটমেন্ট বর্তমানে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বেসরকারি কলেজ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার কারণেই কি এ উচ্চশিক্ষিত ট্যাগ লেগেছে, আর ওসব প্রতিষ্ঠানে যারা লেখাপড়া করে তাদের আর্থিকভাবে সম্পন্ন বলেই কি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান বলে ধারণা করা হচ্ছে? এটা যদি হয় পুলিশের পূর্বসিদ্ধান্ত আর সে বিষয়ে সাধারণীকরণ করে দেওয়া বক্তব্য তবে সেটা নিশ্চিতভাবেই যৌক্তিক কিছু নয়।

এরসঙ্গে আরও যোগ করা যায়, অতি সম্প্রতি সরকারের শিক্ষামন্ত্রী মাদরাসা শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনার একপর্যায়ে জানিয়েছেন মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের ভুল ভেঙেছে; মাদরাসা থেকেই কেবল জঙ্গি বের হয় না। শিক্ষামন্ত্রী নিজেও জানেন মাদরাসাগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয় না, তিনি সেখানে মাদরাসা শিক্ষকদের জাতীয় সঙ্গীত গাইতে অনুরোধ করেছেন; কিন্তু তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত গাইতেই হবে এমনটা বলেন নি, বা বলতে পারেন নি। অথচ জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বিষয়ে স্থির সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত ছিল, এবং অন্যথা হলে শাস্তির মুখোমুখি করা হবে- সেটাও পরিষ্কারভাবে জানানো উচিত ছিল। ফলে মাদরাসাগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হবে কিনা সেটা সে সব প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের উপরেই পড়ে থাকল। মাদরাসা শিক্ষা নিয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিগত এমন পরিবর্তনের কারণেই কি ঘটনার অব্যবহিত পর এ উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের ট্যাগ লেগেছে কোনো ধরনের তদন্ত ছাড়াই!

কল্যাণপুরের জঙ্গি আস্তানায় যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর কিছু মানুষের সে অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তোলাটা আমাদের চলমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটা অংশ বলেই ধারণা করি। পরস্পরবিরোধী মতামত এখানে শক্তিশালি বলে সবকিছুতে বিরোধিতা করার একটা প্রবণতা লক্ষণীয়। সরকারে যে দলই থাকে দেশের অধিকাংশ মানুষই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় সরকারবিরোধী এক প্রকার মত প্রকাশ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এখন আওয়ামী লীগ সরকারে বলে আওয়ামীবিরোধি মত শক্তিশালি, একইভাবে যখন বিএনপি ক্ষমতায় ছিল তখন সে মত বিএনপিবিরোধিও ছিল। এর মানে এই নয় যে সরকারবিরোধি মত শক্তিশালি বলে সকলেই সরকারকে সমর্থন করছে না। বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ গত কয়েক বছরে পুলিশ বাহিনীর উপর অনেকটা নির্ভরশীল বলে সরকারের পাশাপাশি পুলিশও সমালোচনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। এক্ষেত্রে কল্যাণপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার লোকের অভাব হচ্ছে না। যদিও এসব সমালোচনা সর্বক্ষেত্রে যৌক্তিকতার মানদণ্ডে কতটা যৌক্তিক সে হিসেবটা রাখছে না অনেকেই।

সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গিবাদ বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং দায়িত্বশীলদের ব্যক্তিদের ভূমিকা ও বক্তব্য ব্যাপকভাবে সমালোচিত হলেও এ কাজটা কিন্তু সরকারকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই। আর জাতীয় ঐক্য রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের প্রশাসনিক উদ্যোগের দরকার হলেও সবার আগে দরকার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ সমস্যা থেকে উত্তরণ কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। এজন্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের শরীক ১৪ দল ও জাতীয় পার্টির ঐক্য দিয়েই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটা আংশিক হয়ে পড়বে। এ ঐক্যের প্রয়োজনে বিএনপি, গণফোরাম, সিপিবি সহ বাম দলগুলোকে সঙ্গে নেওয়া দরকার।

বিএনপির পক্ষ থেকে জাতীয় ঐক্যের কথা বলা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দাবি জামায়াতকে বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য হতে পারে। এদিকে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন জাতীয় ঐক্য হয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছেন ঐক্যে যাদের সমর্থনের দরকার ছিল সে সমর্থন তিনি পেয়ে গেছেন। কাদের সমর্থন পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী এটা অবশ্য খোলাসা করে বলেন নি। বিএনপির সে ঐক্যের আহবানকেও সরকার গুরুত্ব দেয় নি, যদিও এ সঙ্কটকালীন সময়ে এটা খুব জরুরি ছিল।

সরকারী দল আওয়ামী লীগ বিএনপিকে পাত্তা দিক, আর না দিক এটা অবিসংবাদিত সত্য যে বিএনপি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান এক রাজনৈতিক দল। দলটি জামায়াতের সঙ্গে ঐক্য অটুট রাখার কারণে সমালোচিত হলেও দলটির জনসমর্থন অনেক। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি দলটি সফল করতে না পারলেও এটা জনসমর্থনে কোন ধরণের প্রভাব পড়ে নি বলেই ধারণা করি। আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় আছে ঠিক এ কারণে দেশের সকলেই যে আওয়ামী লীগ সমর্থন করে এমন ভাবনা বোকার স্বর্গে বসবাস। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরোধিতা সকল স্তরেই আছে, সরকারের বিরোধিতাও আছে; সরকারবিরোধি কোন আন্দোলন দেশে নাই, তার মানে এই নয় যে সরকারের পক্ষে সারা দেশ এমন ভাবনা কোনোমতেই যৌক্তিক নয়। ফলে দেশের বিরাট এক জনগোষ্ঠীর সমর্থনের জন্যে জাতীয় ঐক্যে বিএনপির অংশগ্রহণ জরুরি, জঙ্গিবিরোধি জাতীয় ঐক্যে এটা ত খুব জরুরিই।

তবে ঐক্যের জন্যে জামায়াতে ইসলামিকে ছাড়তে হবে এটা যৌক্তিক দাবি বলেও মনে করি। যুদ্ধাপরাধী এ সংগঠনটি জঙ্গিবাদের নেপথ্যে এবং জঙ্গিবাদে জড়িত হিসেবে গ্রেপ্তার অধিকাংশই জামায়াত-শিবির কর্মী এবং তাদের মালিকানাধীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসা- এটা ত প্রমাণিত। এ সংগঠনটির নির্বাচন কমিশনেও নিবন্ধন নেই, তারা দলীয়ভাবে কোনো নির্বাচনেও অংশ নিতে পারছে না, পারবেও না যতক্ষণ পর্যন্ত হাইকোর্টের দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে করা আপিল তাদের পক্ষে যায়- এক্ষেত্রে বিএনপিকে জামায়াত ছাড়তে অনীহা থাকাটাও অযৌক্তিক। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের জন্যেই কেবল নয়, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বাদ দেওয়ার জন্যেও বিএনপির জামায়াতকে ছাড়া উচিত। আর এটা সম্ভব হলে জাতীয় ঐক্যের কাতারে বিএনপিও চলে আসবে বলে ধারণা; আর তা যদি হয় তবে আংশিক নয়, নিরঙ্কুশ জাতীয় ঐক্য সম্ভব।

কল্যাণপুরের সফল এক অভিযানের পরেও পুলিশ প্রশাসন কিছু লোকের সমালোচনার শিকার হচ্ছে এর কারণ জঙ্গিবাদ নির্মূল বিষয়টি এখন সরকার ও সরকারবিরোধি দুই পক্ষের মধ্যকার ঐক্যগত বিষয়ে মীমাংসা হয় নি। এখনও এ বিষয়ে কেউ কৃতিত্ব নিতে আগ্রহী, আর কেউ কেউ কৃতিত্ব দিতে আগ্রহী না। ফলে পুরো বিষয়টি দুই পক্ষের প্রেস্টিজ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের মনোভাব তোমাদের ছাড়াই জঙ্গি নির্মূল করতে জানি, আর যেটুকু পারিনি তোমাদের বিরোধিতার কারণেই পারছি না। অন্যদিকে, সরকারবিরোধিদের মনোভাবে জঙ্গি নির্মূল তোমাদের দ্বারা সম্ভব না, আর যেটুকু নির্মূল বলে দাবি করছ সেটা আরোপিত ও নাটক। ফলে “কৃতিত্ব নেব, আর কৃতিত্ব দেব না” এই দুই মত ও সিদ্ধান্তের কারণেই স্বাভাবিক এক অভিযানের গায়ে কেউ কেউ আরোপিত বিষয়ের অভিযোগ তুলে কলঙ্কলেপনের অপচেষ্টা করছে।

ধারণা করি, রাজনৈতিক বিরোধিতা আমাদের এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সত্যকে সত্য বলতেও অনেকের দ্বিধা চলে এসেছে। এটা এক ধরনের মহামারি আকার ধারণ করেছে, ফলে জঙ্গিবাদের মত জাতীয় সঙ্কটের সময়েও আমরা ঐক্যে পৌঁছাতে পারছি না। এতে করে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশ, বিভ্রান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।

আমাদের মনে রাখা দরকার যেকোনো অপপ্রচারের শক্তি এতখানি যে এটা প্রচারের জন্যে কাউকে মাইক লাগিয়ে প্রচার করতে হয় না। লোকমুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটা ছড়িয়ে যায়। কল্যাণপুরের অভিযান নিয়ে যে অপপ্রচার হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিভিন্ন মিডিয়ায় তার বিপরীতে যৌক্তিক উত্তর আসলেও কিছু মানুষ সে উত্তরগুলো বিবেচনায় না নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে বসে আছে। নিন্দাপ্রচার যেখানে সহজাত সেখানে প্রশংসার শক্তি ও ধ্বনি খুব কম।

এর বাইরেও আছে অন্য কথা, জাতীয় ঐক্য হয়ে গেলেও কি কিছু লোক এর বিরোধিতা করবে। এদেশে অনেক লোক এখনও জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতিশীল। কেউ কেউ আছেন জঙ্গিবাদের নামে সন্ত্রাস না চাইলেও জঙ্গিদের কথিত ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার পক্ষে। তাছাড়া জঙ্গিবাদ নির্মূলের বিষয়টি আর কেউ না হোক অন্তত জামায়াত চাইবে না, কারণ দলটির আদর্শই জঙ্গিবাদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে কেউ না কেউ বিরোধিতা করবেই। স্মরণ করা যেতে পারে, বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা করেছিল অনেকেই; যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়েও অনেক অজুহাত দাঁড় করে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য বিরোধিতা করছে অনেকেই; সেক্ষেত্রে গুলশান, শোলাকিয়া কিংবা কল্যাণপুরের জঙ্গিদের নিয়ে কেউ কেউ বিরোধিতা না করলে সেটাই হতো অস্বাভাবিক কিছু।

বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান জঙ্গিবাদ নিয়ে স্বীকার-অস্বীকারের অনেক খেলা চলছে। জঙ্গিরা নিজেদের আইএস দাবি করলেও, তাদের আস্তানায় আইএসের পতাকা সহ অন্যান্য প্রমাণাদি থাকার পরেও সরকার-প্রশাসন ওদেরকে আইএস না বলে জেএমবি বলে আত্মতুষ্টি লাভ করে। সরকার-প্রশাসন থেকে এই ধরণের অস্বীকার তত্ত্বের বীজ বপন করা হয়েছে। সে বীজ থেকে চারা হয়েছে, আর এখন সেটা ডালপালা মেলার অপেক্ষায়। সেক্ষেত্রে ওরা জঙ্গি সেটা নিয়েও অনেকের অভ্যাসবিরোধিতা থাকবে। সরকার-প্রশাসনের অবস্থা এমন- তুমি আইএস বললেই হলো, আমরা বিশ্বাস করব না। এদিকে, একই অবস্থা জঙ্গি- সহানুভূতিশীলদের, তাদের অবস্থা- তুমি ওদের জঙ্গি বললেই হলো, আমরা বিশ্বাস করব না!

বাংলাদেশের ক্রমবিকাশমান জঙ্গিবাদ নির্মূলে বিভাজন, বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের রাজনীতি থেকে সরে আসা উচিত। জঙ্গিবাদ নির্মূলকে কৃতিত্ব নেওয়া-দেওয়ার বিষয় হিসেবে দেখলেই কেবল এ নিয়ে অপপ্রচার চলবে। আমাদের মনে রাখা দরকার জঙ্গিবাদ নির্মূল আমাদের কৃতিত্বের কোন অংশ নয়, এটা দায়িত্ব। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ ডালপালা মেলেছে- এটাকে আমাদের জাতীয় বিপর্যয় ও পরাজয় হিসেবে দেখলে কৃতিত্ব দেওয়া-নেওয়ার প্রশ্ন আসবে না।

জঙ্গিবাদ নির্মূল আমাদের কৃতিত্ব নয়, এটা আমাদের পরাজয় থেকে রক্ষা। আমরা এখন সে পরাজয় এড়াতেই লড়ছি!
৩০ জুলাই ২০১৬

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + = 12