দ্রুষি ও তার ঋণ শোধের কাহিনি !

সরকারি ছুটির দিন থাকাতে নিজে ড্রাইভ করে এয়ারপোর্ট গিয়েছিলাম এক রোম প্রবাসি বন্ধুকে ছাড়তে। ফেরার পথে মোবাইল রিজার্চ করতে দাঁড়ালাম ফুটপাথের এক দোকানে। ৫০০ টাকা রিচার্জ করার কথা বলাতে, পাশে দাঁড়ানো ১৭/১৮ বছরের একটা মেয়ে বললো – “এক্সুজ মি. স্যার, আমাকে কি ১০০-টাকা রিচার্জ করে দেবেন? একটু বিপদে পড়েছি টাকা হাতে নেই আমার। আমি পরে টাকাটা দিয়ে দেব আপনাকে”! কথা শুনে আর পোশাক পরিচ্ছদ দেখে ভদ্র ঘরের মেয়ে মনে হলো তাকে। মাত্র ১০০-টাকার ব্যাপার। তাই কথা আর না বাড়িয়ে দোকানিকে বললাম, “ওনার নাম্বারেও ১০০-টাকা দাও”। ১০০০ টাকার নোট দেয়াতে ৪০০ টাকা ফেরত দিতে দেরি হচ্ছিল দোকানির। ইতোমধ্যে মেয়েটি আমার নাম্বার নিয়ে হাঁটা দিয়েছে তার পথে।
:
গাড়িতে বসে সিটবেল্ট বেঁধে তা স্টার্ট করে এক্সিলেটরে চাপ দিতেই দেখি, মেয়েটি একটা ট্রলি ব্যাগ টেনে সামনে এগুচ্ছে রাস্তার পাশ দিয়ে। ঔৎসুক্য নিয়ে একদম তার গা ঘেসে গাড়ি থামিয়ে বললাম, “কই যাবে তুমি এ দুপুরের রোদে? বললে হাতে টাকা নেই?” বিমর্ষ মুখে একটু হাসির ভান করে মেয়েটা বললো, “আসলে ঠিক কই যাবো বুঝতে পারছিনা। ১৫/১৬ দিন আগে রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসেছি এ শহরে। হাতে যা টাকা পয়সা ছিল, তাও খরচ হয়ে গেছে, তাই এ মূহূর্তে একটা প্রবলেমেই আছি আমি”!
:
অপরিচিত অল্প বয়সি মেয়ে। হেলপ করতে গিয়ে আবার কোন বিপদে পড়ি। তাই সাত-পাঁচ চিন্তা করে বললাম, “তুমি চাইলে আমার সাথে যেতে পারো, যাবে কি”? মেয়েটা করুণ হেসে বললো, “আপনার ফ্ল্যাটে যেতে বলবেন এখন তাইনা? আসলে আপনি যা ভাবছেন আমি ঐ টাইপের মেয়ে না। একদিন অবশ্যই আপনার ১০০-টাকা পেয়ে যাবেন”। এবার আত্মসম্মানে লাগে আর জেদ চাপে আমার। তাই গলার স্বর কঠোর করে বললাম, “তুমি যা ভাবছো আমি কি সে টাইপের পুরুষ? বরং তোমার ভাগ্য ভাল যে, আমার সাথে পরিচয় হয়েছে তোমার। না হলে কার হাতে পড়তে কে জানে”!
:
গাড়িতে সামনের আসনে বসিয়ে জানলাম, ওর নাম দ্রুষি। এমন নাম এদেশে শুনিনি আগে। মাত্র দুসপ্তাহ হলো দ্রুষির বয়স ১৮ হয়েছে। একটা মফস্বল শহরে থাকে দ্রুষি, তার মা বাবার সাথে। ইন্টারে থাকতে প্রেম হয়ে সহপাঠী রিয়াজের সাথে। কি এক টানে মা বাবার সামনে দ্রোহি হয় সে রিয়াজকে পেতে। কিন্তু কঠোর মা বাবা তাকে মিশতে নিষেধ করে রিয়াজের সাথে। কেবল ১৮-বছর হলেই তার অধিকার জন্মাবে স্বাধীন চিন্তনের, এমন কথাই শাসিয়ে বলে মা বাবা! এবং যেদিন ১৮-বছর পূর্ণ হয় দ্রুষির, সেদিন সে প্রচন্ড দ্রোহ করে ঘরে। বলে আজ চলে যাবে সে বাড়ি ছেড়ে রিয়াজের কাছে। এবং মা বাবার সামনে এ ব্যাগটি নিয়ে সে বেড়িয়ে যায় স্বাধীনতার কথা বলে। মুক্ত জীবন যাপনের কথা বলে। তার পরাধীনতা ভাল লাগেনা এমন কটু কথা শুনিয়ে। কিন্তু মাত্র ১৮ বছরের ভীতু রিয়াজ দ্রুষির এ দ্রোহে শায় দেয়না। ফিরে যেতে বলে তাকে নিজ ঘরে। এ নিয়ে ঝগড়া হয় রিয়াজের সাথে দ্রুষির এবং জেদি মেয়েটি কোন কিছু না ভেবে স্বাধীনতা আর মুক্ত জীবনের খোঁজে চলে আসে ঢাকাতে। পরিচিত এখানে ওখানে ১৪/১৫ দিন কাটায় নানাবিধ কাজ আর বিবিধ জীবন লহমার খোঁজে। এবং হাতের টাকা কটা শেষ হতে সময় লাগেনা তার।
:
দ্রুষি মনে করেছিল আমার ফ্ল্যাটে নিয়ে ওঠাবো তাকে। ফ্ল্যাটে আমার বউ তা মানবে কিনা এমন কথাও জানতে চায় সে। কিন্তু আমি তাকে সরাসরি একটা বড় ভবনের সামনে নিয়ে যাই। যেটা অনেক নামকরা এক অভিজাত “মহিলা-মেস”। আমার পরিচিত এক ভদ্রমহিলা থাকে এ মেসে। ফোনে ডেকে তাকে নিচে নামতে বলি। ছুটির দিন বিধায় পরিচিত নাজমা আক্তার নিচে নামলে দ্রুষিকে সমর্পণ করি তার হাতে। মেসের নিয়মানুসারে ১-মাসের থাকা-খাওয়ার অগ্রিম টাকা পরিশোধ করি নিজ পকেট থেকে আমি।
:
মোবাইলে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি দ্রুষির সাথে। তাকে বুঝিয়ে বলি, “তুমি রাজি হলে তোমার মা-বাবার কাছে পাঠিয়ে দেই তোমাকে। এমনকি তুমি একা যেতে রাজি না হলে, আমি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি তোমার বাড়িতে”। কিন্তু দ্রুুষি দৃঢ়তায় বলে, “না ভাইয়া বাড়ি ফিরবোনা আমি। আমাকে বরং আপনার অফিসে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন”? তাকে বুঝিয়ে বলি, আমি সরকারি জব করি। সরকারি জব বড় কঠিন। তা ছাড়া তুমি মাত্র ইন্টার পরীক্ষা দিয়েছো। এ ক্ষেত্রে সরকারি চাকুরি এতো সহজ ব্যাপার নয়। তারপরো দ্রুষির অনুরোধে সিভিসহ তাকে নিয়ে একদিন হাজির হলাম এক স্বজনের বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে!
:
বন্ধুর এ টাইপের কোন মেয়ে দরকার নেই আপাতত। তা ছাড়া দ্রুষি কোন কাজেই খুব একটা দক্ষ নয়। তারপরো বন্ধুকে অনুরোধ করলাম মেয়েটাকে রাখতে। চোখ টিপে বন্ধু বললো, “তোমার গার্লফ্রেন্ড বুঝি! তাহলে তো রাখতেই হবে”। দ্রুষিকে গালফ্রেন্ড বলাতে আমি ও দ্রুষি দুজনেই বিব্রত হই। বলি, “আরে না এমন কিছু না। তুই রাখবি কিনা বল”! মাসিক দশ হাজার টাকা বেতনে শিক্ষানবিস হিসেবে একটা কাজ পায় দ্রুষি। আমি তাকে বলি কাজের ফাঁকে সে যেন পড়াটা চালিয়ে নেয় এখন।
:
দ্রুষি কখনো মনে করেনি, আমার মত একটা মাঝ বয়সি অচেনা পুরুষ নিজ ফ্ল্যাটে দ্রুষিকে না নিয়ে, কোন কুপ্রস্তাব না দিয়ে, এভাবে সেফলি সেটেল করাবো তাকে। তাই বারবার সে আমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে থাকে ফোনে কিংব কখনো দেখা হলে। এক শুক্রবার তার ও আমার ছুটির দিনে, আমার বাসায় বেড়াতে যেতে চায় দ্রুষি। বলি, আমার ফ্ল্যাটে গেলে আমার স্ত্রী আর সন্তানরা রাগ করবে। তাই যাওয়া বাদ দাও। তারপরো দ্রুষি আমার ও আমার পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে নাছোড়বান্দা হয়ে যেতে চায় আমার মতের বিরুদ্ধে! এবং সত্যি একদিন দ্রুষিকে গাড়িতে তুলে, নানাবিধ শাকসব্জি আর কাঁচা বাজার করে, চলে আসি আমার ভাড়াকরা অভিজাত ফ্ল্যাটে। একদম সুনসান খালি ফ্ল্যাট দেখে বিস্মিত হয় দ্রুষি। জানতে চায়, আমার স্ত্রী আর সন্তানরা কই? হেসে বলি, “আমিতো ব্যাচেলর দ্রুষি। তোমাকে আনতে চাইনি বলে, স্ত্রী সন্তানের মিথ্যে বানানো কথা বলেছি। তুমি কি রান্না করতে পারো”? আমি আর দ্রুষি নানাবিধ সব্জি আর তরকারি যৌথভাবে রান্না করি। অনেকদিন পর পারিবারিক পরিবেশে দুজনে খাই একসাথে। ব্যাচেলর জীবনে এ এক পরম তৃপ্তি।
:
দ্রুষিকে বলি, “তুমি কি যেতে চাও এখন নাকি রেস্ট করবে কিছুক্ষণ”? দুপুরে খাওয়ার পর একটু রেস্ট করি আমি শুয়ে। তুমি তাহলে টিভি দেখো? আমি একটু শুই? মাথা নাড়ে দ্রুষি। টিভি খুলে দিয়ে একটু গা লাগাই আমি বেডে। কিন্তু একটু পর দ্রুষি আসে আমার কাছে, “বলে টিভি ভাল লাগছেনা এখন। এখানে থাকতে ভাল লাগছে আমার। আপনি এতো ভাল মানুষ কখনো চিন্তা করিনি আমি। মানুষ এ যুগে এতো ভাল থাকে? আপনি আমার অনেক উপকার করেছেন তার ঋণ শোধ করতে চাই আমি। দ্রুষিকে বলি, কিভাবে ঋণ শোধ করবে তুমি? কোন সঙ্কোচ বা ভনিতা না করে দ্রুষি বলে, আমি একটা ভার্জিন মেয়ে। সব সময় মনে করতাম, আমার বয়সি কোন হ্যান্ডসাম পুরুষের কাছে সমর্পণ করবো নিজেকে। এবং ঐ দিনটা হবে আমার জীবনের একটা পরম দিন। আপনি মাঝবয়েসি একজন পুরুষ হলেও, আপনাকেই আজ সমর্পণ করবো আমি নিজেকে। সময় না দিয়ে দ্রুষি বুকে আসলো আমার। মাঝবয়েসি এক ব্যাচেলর পুরুষকে সমর্পণ করলো ১৮-বছরের দ্রুষি আকস্মিকভাবে! জানিনা এটা কৃতজ্ঞতার জন্যে নাকি অন্য কিছু। কিন্তু নিষেধ করিনি দ্রুষিকে আমি!
:
আমার ফ্ল্যাটের আশেপাশের সবাই পরিচিত আমার। কজন নিকতাত্মীয়রাও থাকে অন্য ফ্লোরে। তাই দ্রুষিকে ছেড়ে আসলাম তার মেসে। বললাম, আবার যখন মন চাইবে এসো তুমি। দ্রুষির সাথে আমার সম্পর্ক নিবিড়তর হলো কদিনেই। দ্রুষি থাকতে চাইলো আমার ফ্ল্যাটে আমার সাথে কিন্তু নানাবিধ কারণে বললাম, সময় হোক দ্রুষি, তারপর!
:
একদিন ফ্ল্যাটের নিচে এক ছেলে এসে পরিচয় দিল তার নাম রিয়াজ। আমি তার প্রেমিকা দ্রুষিকে ফুসলিয়ে নিয়ে এসেছি তার থেকে এমন অভিযোগ তুললো সে চোখ লাল করে। এ ব্যাপারে দ্রুষির সাথে কথা বলতে বললাম তাকে। রাতে দ্রুষি জানালো, তার কাছে গিয়েছিল রিয়াজ। কিন্তু দ্রুষি তাকে জানিয়ে দিয়েছে, রিয়াজকে ভুলে গেছে দ্রুষি এবং আমাকে সে শুধু ভালই বাসেনা, রেগুলার ফিজিক্যাল রিলেশন করে সে আমার সাথে। চোখ রাঙিয়ে শাসিয়ে চলে গেছে নাকি রিয়াজ। এ কথা বলে খিলখিলিয়ে হাসে দ্রুষি রিয়াজের আবুল মার্কা চেহারার বর্ণনা দিয়ে। সকাল ৮টার দিকে ফোন দেয় নাজমা আক্তার দ্রুষির মেস থেকে। একটু আগে রিয়াজ নামে এক ছেলে গুলি করে খুন করেছে দ্রুষিকে। দারোয়ান আর পথচারীরা আটক করেছে তাকে। কিন্তু দ্রুষি নেই!
:
গ্যারেজের ফ্ল্যোরে কালো রক্তের মাঝে যেন ভাসছে দ্রুষির মৃতদেহ। সবুজ পালকের লিকলিকে মাছরাঙার পাখার গন্ধের মত দ্রুষির মৃতগন্ধ পাই আমি কাছে যেতেই। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মনোবিকলনের অস্থিরতা যেন হৃদয় নদীর ভিতরে কিংবা বাহিরে আড়পাড় করতে থাকে ক্রমাগত আমার! মৃত্যঋণ শোধ দিতে দ্রুষিকে নবমৃত প্রিয়ার আঁচলের গন্ধমাখা টিয়াপাখি মনে হয় আমার। জীবনঘন বিষাদবাতাস কিংবা ভালবাসার বাষ্পঘন করুণ দীর্ঘশ্বাসে বুকটা চিনচিন করে আমার ক্রমাগত। দ্রুষি নামক ব্যথাতুর এ প্রেমিক মেয়েটির অদেখা পাঁজরের সংগোপিত হাড়গুলো যেন দেখতে পাই আমি। পুলিশ আসে, অনেক মানুষে ভরে যায় দ্রুষির চারদিক কিন্তু সুখ কিংবা নিমেষের দুখের উজ্জলতায় অনন্তের মাঝে আমার বোধেরা হাতড়াতে থাকে এক কূল না পাওয়া হরিণচোখা অষ্টাদশী বালিকাকে, যে কিনা ভোর বাতাসের দগদগে রোদ হয়ে ভাসতে থাকে এ বিশ্বমাঝে, আমার হৃদয়মাঝে!

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of