বাংলাদেশের শীর্ষ ১০ লুটেরা

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়া, দুর্নীতি ও অপরাধের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হস্তগত করা এবং শেয়ারবাজারসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের টাকা মেরে দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে সম্প্রতি অনেকেইে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে। বিগত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে গত ১০ বছরে কয়েক হাজার লোক এসব উপায় অবলম্বন করে শত শত কোটি টাকার মালিক হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ কেউ বিদেশে এসব টাকা পাচার করে নিজেও সটকে পড়েছেন দেশ থেকে। তবে বড় অংশটি দেশেই অবস্থান করছে এবং লুটপাট অব্যাহত রেখেছে। ক্ষমতা ও টাকার অঙ্কে এগিয়ে থাকা এরকম শীর্ষ ১০ জনের পরিচয় ও তাদের লুটপাটের বৃত্তান্ত এখানে তুলে ধরা হলো।

সালমান এফ রহমান : ১৯৯৬ ও ২০১০ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবেই সবাই তাকে চেনে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান। দেশের শীর্ষ শিল্প গ্রুপ বেক্সিমকোর মালিক হলেও ব্যবসা বাণিজ্য নয়, বরং সরকারি ও ব্যাংকের অর্থ লোপাটের মাধ্যমেই বিলিয়নিয়ার হয়েছেন সালমান। বিগত নির্বাচনের প্রাক্কালে নির্বাচনী হলফনামায় নিজের কোনো বাড়ি, গাড়ি, আসবাব বা ঋণ না থাকার তথ্য দেন তিনি। অথচ গবেষণা সংস্থা হুরুন গ্লোবালের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী বিশ্বের শীর্ষ দুই হাজার ধনী ব্যক্তির মধ্যে তার অবস্থান ১৬৮৫তম এবং একইসঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীও তিনি। কেবল দুই দফায় শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি থেকেই অন্তত ২০ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে চলমান ব্যাংক খাতের লুটপাটেও তিনি জড়িত বলে মনে করা হয়। গত ১২ অক্টোবর এক অনুষ্ঠানে সালমান এফ রহমানকে ইঙ্গিত করে শেয়ারবাজারের অপরাধ তদন্তকারী দলের প্রধান খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, তিনি ব্যাংকের সম্রাট। এই সম্রাটকে ধরতে পারলে সবকিছু ঠিক হবে। শেয়ারবাজার তদন্ত প্রতিবেদনে তার নাম সবার ওপরে রেখেছিলাম। তিনি সব জায়গায় লুট করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার বিরুদ্ধে আগে থাকা সব মামলা এই সরকারের আমলে খারিজ করে দেয়া হয়েছে।

আজিজ খান : বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সামিট গ্রুপের মালিক। তার ভাই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা ফারুক খান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম কমিটির সদস্য। সরকারের বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন ফারুক খান। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জেলা গোপালগঞ্জ-১ আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ তিনি। পুরো পরিবারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে নানা উপায়ে জালিয়াতি করে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করার। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে সামিট গ্রুপের কোম্পানি কেপিসিএল, ওসিএলের মাধ্যমে দেড় হাজার কোটি টাকা লুট করা হয়। বিদেশে অর্থ ও সম্পদ বিনিয়োগের জেরে বিখ্যাত পানামা পেপার্সেও নাম এসেছিল তাদের। ২০১৮ সালে সিঙ্গাপুর সরকারের বরাতে জানা যায় সে দেশের শীর্ষ ৫০ ধনীর মধ্যে আজিজ খান রয়েছেন ৩৪ নম্বরে। সেখানে তার সম্পদের পরিমাণ তখন ছিল প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। সম্প্রতি সংসদে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ খাতে গত ১০ বছরে ৫২ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। এর বিপরীতে বেসরকারি কোম্পানিগুলো কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করে কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবেই নিয়েছে ৫১ হাজার কোটি টাকা। এই টাকার বড় একটি অংশ গেছ সামিটের পেটে। কারণ বিদ্যুৎ খাতের মূল বেসরকারি উদ্যোক্তা তারাই।

আতাউর রহমান ভূঁইয়া : ডাক নাম তার মানিক। কিন্তু লোকে ডাকে তমা মানিক নামে। তমা কনস্ট্রাকশন গ্রুপের মালিক তিনি। গত ১০ বছরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে একের পর এক ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা দেখা গেছে। এ থেকে প্রধানভাবে লাভবান হয়েছে তমা গ্রুপ। কারণ অদৃশ্য জাদুবলে সরকারের সব কাজ যায় তাদের হাতেই। ঢাকা শহরের মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের সাবকন্ট্রাক্টের কাজ তারা করেছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে এ প্রকল্পে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা ব্যয়বৃদ্ধি ঘটাতে সক্ষম হয় তারা এবং এর প্রায় অর্ধেক হস্তগত করে। রাজবাড়ী থেকে শুরু করে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইন তৈরি করার কাজে দুর্নীতির ভয়াবহ নজির সৃষ্টি করে তারা। খুলনায়ও রেল স্টেশন নির্মাণের কাজ করেছে তারা। সেখানেও কাজ চলাকালেই মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। রামপালের কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য যে সংযোগ সড়ক তৈরি হচ্ছে, তার কাজও পেয়েছে তমা গ্রুপ। দোহাজারী-কক্সবাজার রুটে রেলওয়ের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণকাজ চলছে। এই প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। সেখানেও চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিআরইসি) সঙ্গে নির্মাণকাজ করছে তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণেও অবকাঠামো নির্মাণের কাজ পেয়েছে তমা গ্রুপ। একটি প্রতিষ্ঠান এভাবে সরকারের আনুকূল্য ভোগ করছে এবং নিম্নমানের কাজ করে সরকার তথা জনগণের হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কিছুদিন আগে ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া জিকে শামীমের প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের সন্ধান পায় পুলিশ। কিন্তু তমা গ্রুপের মানিকের তুলনায় জিকে শামীম একজন ক্ষুদে ঠিকাদার।

সাইফুল আলম মাসুদ : এস আলম গ্রুপের মালিক তিনি। ১০ বছর ধরে সরকারের আনুকূল্য ভোগ করা আরেক শীর্ষ লুটেরা। গত বছর প্রতিষ্ঠানটিার ৩ হাজার ১৭০ কোটি টাকার কর মওকুফ করেছে সরকার। কিন্তু তাদের ঐতিহ্য মূলত লুটপাট ও পুঁজি পাচারের। সিঙ্গাপুরে নানা ধরনের ব্যবসা ও বাণিজ্যিক ভবন ক্রয়ের নিমিত্তে প্রতিষ্ঠানটি দেশ থেকে পাচার করেছে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। ২০১৩ সালে এস আলম গ্রুপের নামে দুদক ব্যাংকিং খাত থেকে ১৭ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ আনে। কিন্তু পরে আর এ নিয়ে কোনো মামলা এগোয়নি। এ থেকে উৎসাহী হয়ে পরের সাত বছরে তারা আরো অর্থ লোপাট ও পাচার করেছে। ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, আল আরাফাহ ব্যাংক, এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের পাশাপাশি এই গ্রুপের হাতে রয়েছে ইসলামী ব্যাংকেরও অধিকাংশ শেয়ার। সরকারের আহবানে ও প্রত্যক্ষ মদদে এসব ব্যাংক দখলে সহযোগী হয়েছে তারা। এসব ব্যাংক থেকে তারা সামে বেনামে নানা প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিচ্ছে এবং তা বিদেশে পাচার করছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর গণ্ডামারায় এস আলম গ্রুপ তৈরি করছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। চায়না সেবকো এইচটিজির সঙ্গে যৌথভাবে ৬০০ একর জমির ওপর ২০ হাজার কোটি টাকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে এস আলম গ্রুপ। যেখানে তাদের মালিকানা ৭০ ভাগ। বাঁশখালীতে এস আলমের টাকার জোরে অনেক মানুষকে উৎখাত করা হয়েছে। ২০১৬ সালে এর বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিবাদ করলে গুলি করে হত্যা এবং গ্রামকে গ্রাম অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। একুশে টেলিভিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের মালিক হওয়ায় অন্য মিডিয়াগুলো এস আলমের লুটপাট ও অর্থপাচার নিয়ে তেমন কোনো উচ্চবাচ্য করেনি।

ইউনুস বাদল : এক রহস্য মানব। শোনা যায় একসময় পরিবহন শ্রমিক ছিলেন, তারপর কাজ করেছেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের সামান্য কর্মচারী হিসেবে। অতীত যেমনই হোক, বর্তমান সরকারের আমলে তার উত্থান ঘটেছে রূপকতার মতো করে। এখন তিনি ২২টি প্রতিষ্ঠানের মালিকানার সুবাদে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক। এ সময় ব্যাংক যেমন ছিল উদারহস্ত, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছেন একাধিক মন্ত্রীর। তুলনামূলক ভালো অবস্থানে থাকা জনতা ব্যাংককে একাই ধসিয়ে দিয়েছেন তিনি। মাত্র ৬ বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটি থেকে ঋণের নামে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি বের করে নিয়েছেন। নিয়মনীতি না মেনে এভাবে ঋণ দেওয়ায় বিপদে ব্যাংক, গ্রাহকের পাওনা ও ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না ব্যাংকটি। জনতা ব্যাংকের মোট মূলধন ছিল ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৭৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ থাকলেও একক গ্রাহক হিসেবে ইউনুস বাদলের মালিকানাধীন এননটেক্স গ্রুপকে দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। এসব টাকা প্রতিষ্ঠানটি বিনিয়োগ না করে আত্মসাত করেছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি তারা। এই ইস্যুতে গণমাধ্যমে সরকারের অনেক সমালোচনা হলেও ইউনুস বাদলকে কেউ গ্রেপ্তারের সাহস দেখায়নি। জনশ্রুতি আছে যে, হলমার্ক গ্রুপের মালিকের মতো ইউনুস বাদলও ঘুঁটি মাত্র। সরকারের উপরমহলের কারো হয়ে কাজ করছেন তিনি।

এমএ কাদের : ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ কাদেরসহ তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এ ছাড়াও জনতা ব্যাংকের ৪ হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। খেলাপি ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এমএ কাদেরের পারিবারিক তিন প্রতিষ্ঠান। ভুয়া রপ্তানিসহ নানা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যাংক থেকে এ অর্থ নিয়েছেন তারা। ব্যাংক থেকে নেয়া অর্থের বড় অংশই বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের কর্ণধাররা। তবে মাত্র ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা আত্মসাত ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা চালাচ্ছে দুদক। এ সংক্রান্ত পৃথক চার মামলায় এমএ কাদের জেলে ঢুকেছিলেন ৩১ জানুয়ারি ২০২০। রপ্তানির নামে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তা না করে টাকাগুলো আত্মসাত করে বিদেশে পালিয়ে যেতে চেয়েছেন এবং এখনো তার পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে আদালতে দুদকের আইনজীবী জানালেও জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। তার ভাই চলচ্চিত্র প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়ার কর্ণধার আবদুল আজিজও এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। পাচারকৃত অর্থের একটি অংশ নিয়ে তিনি এখন কানাডায় অবস্থান করছেন। তবে মাঝেমধ্যেই দেশে আসেন। যদিও বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আছে তার। কিন্তু দেখার কেউ নেই।

 

প্রশান্ত কুমার হালদার : দেশের পুঁজিবাজার ও অন্তত চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ লুট করেছেন প্রশান্ত কুমার হালদার। বেশ রোমাঞ্চকর ছিল পিকে হালদারের বিদেশ যাত্রা। গ্রেপ্তার এড়াতে অবস্থান করছিলেন রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে। সেখান থেকে ছদ্মবেশে বেরিয়ে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর ব্যবহার করে দেশ থেকে পালিয়েছেন চলতি বছরের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। যদিও গত বছরের অক্টোবর থেকেই তার বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল দুদক। দেশ ছাড়ার পর পিকে হালদারের গন্তব্য ছিল ভারত। সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করে পাড়ি দিয়েছেন কানাডার মন্ট্রিলে। সেখানে আগে থেকেই আবাসন ব্যবসায় পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন তিনি ও তার পরিবার। কানাডা ছাড়াও ভারত, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিপুল বিনিয়োগ আছে পিকে হালদারের। দেশ থেকে লুণ্ঠিত বিপুল অর্থই ওইসব দেশের পাচার ও বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

 

শাহাবুদ্দিন আলম : এস এ গ্রুপের মালিক। বর্তমানে কোনো কারণে সরকারের রোষানলে পড়ে জেলে রয়েছেন। কিন্তু এই জেল গমন সাময়িক। জেলে ঢোকা আরেক লুটেরা ক্রিসেন্ট গ্রুপের মালিক কিছুদিন হলো জামিন পেয়ে মুক্ত হয়েছেন। ঋণ জালিয়াতির মামলায় গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাজধানীর গুলশানের একটি কফি শপ থেকে শাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। শাহাবুদ্দিন আলম তার প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত করেন। এছাড়া এসএ গ্রুপের কর্ণধারদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে শতাধিক মামলা করেছে পাওনাদার বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান। এগুলোর বেশির ভাগই চেক ও অর্থঋণ সংক্রান্ত। ফারমার্স ব্যাংক ডোবানোর অন্যতম কারিগরও তারা।

 

এনায়েতুর রহমান : লুটেরাদের শীর্ষ তালিকার শেষে রয়েছেন ব্যাংক থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের পর বিদেশে পাচার করা বিল্ডট্রেড গ্রুপ ও চ্যানেল নাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এনায়েতুর রহমান। কেবল এবি ব্যাংক থেকেই ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন তিনি। ব্যবসা ও মিডিয়া জগতের রহস্যময় নাম এনায়েতুর রহমান বাপ্পী। সব সরকারের সময়েই তিনি প্রভাবশালী। ব্যবসায়িক সুবিধা নিতে বিএনপি আমলে মোসাদ্দেক আলী ফালু ও হাওয়া ভবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রেখেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তার ব্যবসায়িক অংশীদার হন দলটির তখনকার সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের ভাই সাবেক সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এনায়েত তাকে ঝেড়ে ফেলতে সমর্থ হন এবং খুব সহজে চ্যানেল নাইন দখল করেন। আগে বেসরকারি টিভি চ্যানেল এটিএন বাংলার বিপণন বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন এনায়েতুর রহমান বাপ্পী। ১৯৯৯ সালে বিপণন বিভাগের আর্থিক হিসাব বুঝিয়ে দিতে না পারায় এটিএন বাংলা ছাড়তে হয় তাকে। এটিএন বাংলা ছেড়ে তিনি বিল্ডট্রেডের পরিচালক হন। এখন তিনি প্রতিষ্ঠানটির মূল মালিক। মাঝে এর মালিক ছিলেন ফালু। এ প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ হিসেবে নেয়া অর্থের একটি অংশ এনায়েতুর রহমান সিঙ্গাপুরে পাচার করেছেন। দেশে থাকা তার অন্যান্য সম্পদও সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাচ্ছেন। পুঁজি পাচারের অংশ হিসেবেই তিনি পুরো পরিবার সিঙ্গাপুর নিয়ে গেছেন। কিন্তু তাকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করছে না কেউ।

খাজা সোলেমান চৌধুরী : আলোচিত ব্যবসায়ী পরিবার বিসমিল্লাহ গ্রুপের মালিক। ব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম থাকলেও এই পরিবারই প্রথম ব্যাংক ও অন্যান্য ব্যাপারিদের টাকা মেরে বিদেশে ভেগে যাওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করে। পরে এ ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। চট্টগ্রামভিত্তিক আমদানি, রপ্তানির ব্যবসায় জড়ি অন্তত ১৫ জন শীর্ষ ব্যবসায়ী এরপর খাজা সোলেমানের দেখানো পথে দেশ ছেড়েছেন। ২০১৩ সালে জনতাসহ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে তা বিদেশে পাচার করেন এবং পরিবারসমেত বিদেশ পাড়ি দেন। পাচারকৃত ওই অর্থ দিয়ে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমীরাতের রাজধানী দুবাইয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তারা। তবে এর বাইরে অনেক ব্যবসায়ী পরিবারের অর্থও হাতিয়ে নিয়েছেন তারা। এই অর্থের পরিমাণ এখনো শনাক্ত হয়নি। খাতুন বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সব মিলিয়ে তাদের বাজারে অন্তত তিন হাজার কোটি টাকার দায় আছে। এসব অর্থের একাংশ লন্ডন ও কানাডায় পাচার করা হয়েছে। দেশত্যাগ করায় বিএনপিপন্থি এ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে মামলা হয় এবং মামলায় তার ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যের সাজাও হয়েছে। গত মাসে আদালত খাজা সোলেমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে রেড এলার্ট জারি ও ইন্টারপোলের পরোয়ানা ইস্যু করার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।

পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছিলেন ভারতের হীরা ব্যবসায়ী নীরব মোদি। ব্যাংক কেলেঙ্কারির এ হোতাকে ধরতে সে দেশে জারি করা হয় জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং বিদেশে ইন্টারপোলের রেড নোটিস। লন্ডনে গ্রেপ্তার হয়ে এখন ওয়ান্ডওয়ার্থ কারাগারে আছেন তিনি। কিন্তু বাংলাদেশ কী উদাহরণ সৃষ্টি করেছে? উল্লেখিত লুটেরাদের সবার নামই কম বেশি সংসদে আলোচিত হয়েছে। সম্প্রতি সংসদে বেশ কয়েকবার ঋণ খেলাপিদের তালিকাও উত্থাপন করা হয়েছে। অথচ বিএনপিপন্থী একজন ব্যতিরেকে আর কারো বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। তবে এরা ছাড়াও সরকারের অভ্যন্তরে লুটপাটের সুবিধাভোগী ও সহযোগী অনেকেই রয়েছেন। এদের থামানোর কোনো চেষ্টা না থাকায় অভিযোগ উঠছে যে, সরকারি ছত্রচ্ছায়াই চলছে এই লুটপাট। সম্প্রতি ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে এমন অভিযোগ তুলেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মইনুল হোসেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আর্থিক অপরাধের বিচার না হওয়ায় সবাই অনিয়মে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এসব অপরাধ শক্ত হাতে দমন করা না হলে আর্থিক খাতকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, যার পরিণতি কারও জন্য সুখকর হবে না।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of