১৯৯: বানু জাধিমা হত্যাকাণ্ড-২: খালিদ বিন ওয়ালিদের নৃশংসতা!

“যে মুহাম্মদ (সাঃ) কে জানে সে ইসলাম জানে, যে তাঁকে জানে না সে ইসলাম জানে না।”

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদের বর্ণনায় যা আমরা নিশ্চিতরূপে জানি, তা হলো, ‘মুসলমান বনাম মুসলমানদের’ মধ্যে সর্বপ্রথম হানাহানি ও নৃশংসতার দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছিল স্বঘোষিত আখেরি নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এরই জীবদ্দশায়। তাঁর মক্কা বিজয়ের প্রাক্কালে (জানুয়ারি, ৬৩০ সাল), নিরপরাধ বানু জাধিমা গোত্রের ওপর তাঁর অনুসারীদের হামলার মাধ্যমে। এই অমানুষিক নৃশংস ঘটনাটি যার নেতৃত্বে সংঘটিত হয়েছিল, তিনি ছিলেন মুহাম্মদেরই প্রিয় অনুসারী খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ। খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ছিলেন মুহাম্মদের সেই অনুসারী, যিনি “মুহাম্মদের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধির কারণে ভীত হয়ে” নিরাপত্তা প্রত্যাশায়, মুহাম্মদের মক্কা বিজয়ের মাত্র সাত মাস আগে (মে-জুন, ৬২৯ সাল), মদিনায় মুহাম্মদের নিকট গমন ও ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন (পর্ব: ১৭৮)। মুতা যুদ্ধের পর যাকে মুহাম্মদ “ইসলামের তরবারি” খেতাবে ভূষিত করেছিলেন (পর্ব:১৮৬)।

ইসলামের ইতিহাসের পর্যালোচনায় আমরা জানতে পারি, মুহাম্মদ কিংবা তাঁর মৃত্যু-পরবর্তী অনুসারীদের আগ্রাসী আক্রমণ ও নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচার প্রচেষ্টায় একদা যারা ‘ইসলামে দীক্ষিত’ হতে বাধ্য হয়েছিলেন; ইসলাম গ্রহণের পর পরবর্তীতে তাদের অনেকেই আবার “মুহাম্মদেরই” পথ অনুসরণ করে নিরীহ জনপদের ওপর আগ্রাসী আক্রমণ ও নিপীড়ন চালিয়ে অন্যের নিরাপত্তা হুমকির কারণ হয়েছিলেন। খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ ছিলেন তাদেরই একজন।

নিজেদের বারংবার মুসলমান হিসাবে পরিচয়, বিনা শর্তে সকল অস্ত্রশস্ত্র জমা ও আত্মসমর্পণ করার পরেও বানু জাধিমা গোত্রের লোকেরা খালিদ ও তার অনুসারীদের নৃশংসতার হাত থেকে পরিত্রাণ পান নাই! খালিদ তাঁদের নারী-শিশু ও পুরুষদের বন্দী করেন; অতঃপর তিনি নারী-শিশু বন্দিদের আলাদা করে পুরুষ বন্দিদের তাঁর সঙ্গীদের মাঝে বিতরণ করেন। অতঃপর পরদিন সকালে তিনি তাঁর সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে এই ঘোষণা দেন যে, তাঁরা যেন এই পুরুষ বন্দীদের হত্যা করে। তাঁর আদেশে বানু সুলায়েম গোত্রের মুহাম্মদ অনুসারীরা তাদের সকল বন্দীদের হত্যা করে! কিন্তু মুহাজির (আদি মক্কাবাসী মদিনায় হিজরতকারী মুহাম্মদ অনুসারী) ও আনসাররা (আদি মদিনা-বাসী মুহাম্মদ অনুসারী) তার সেই আদেশে অমান্য করে তাদের বন্দীদের মুক্ত করে দেয়। মুহাজির ও আনসারদের বন্দী-মুক্তির এই সিদ্ধান্ত কোন মানবতার মাপকাঠি-তে নির্ধারিত হয় নাই। কী কারণে তাঁরা তা করেছিলেন, তা আদি উৎসের মুসলিম ঐতিহাসিকরা তাঁদের নিজ নিজ গ্রন্থে বিভিন্নভাবে লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন।

আল-ওয়াকিদির (৭৪৭-৮২৩ সাল) বর্ণনার পুনরারম্ভ – কবিতা পঙক্তি পরিহার: [1]
(ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর বর্ণনা, আল-ওয়াকিদির বর্ণনারই অনুরূপ) [2] [3]

পূর্ব প্রকাশিতের (পর্ব: ১৯৮) পর:

যখন সকাল হয়, মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে মতবিরোধে শুরু করে। এক বক্তা বলে, “আমরা তাদের বন্দিত্ব চাই না। আমরা তাদের নবীর কাছে ধরে নিয়ে যাব।” আরেক জন বলে, “আমরা দেখবো যে তারা কী ভাবে আমাদের কথা শোনে ও হুকুম পালন করে। সুতরাং, এসো আমরা তাদের পরীক্ষা করি।” লোকেরা এই দুই বক্তার মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যখন সকাল হয়, খালিদ বিন ওয়ালিদ ঘোষণা দেয়:

“তোমাদের মধ্যে যাদের কাছে যে বন্দী আছে, তাকে খুন করো। তাকে তরোয়াল দিয়ে হত্যা করো।” বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা তাদের সকল বন্দীদের হত্যা করে।

আর মুহাজির ও আনসারদের বিষয়টি হলো, তারা তাদের বন্দীদের মুক্ত করে দেয়।

তিনি বলেছেন: মুসা বিন উবাইদা আমাকে <আইয়াস বিন সালামা হইত < তার পিতা [সালামা] হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, তিনি বলেছেন: আমি খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের সাথে ছিলাম ও আমার সাথে ছিল এক বন্দী। আমি তাকে মুক্ত করে দিই ও তাকে বলি, “তোমার যেখানে ইচ্ছা হয়, সেখানে চলে যাও।” আনসারদের কাছেও ছিল বন্দীরা, তারা তাদের মুক্ত করে দেয়।

তিনি বলেছেন: মামর আমাকে < আল যুহরি হইতে < সালিম হইতে < ইবনে উমর হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, তিনি বলেছেন: খালিদ যখন ঘোষণা দেয়, “তোমাদের যাদের কাছে যে বন্দী আছে, তাকে হত্যা করো,” আমি আমার বন্দী-কে মুক্ত করে দেই। [4]

তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ বিন ইয়াজিদ আমাকে < দামরা বিন সাইদ হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, তিনি বলেছেন: আমি যে কথাটি আবু বাশির আল মাযনি-কে বলতে শুনেছি, তা হলো:

‘আমার কাছে ছিল বন্দী লোকগুলোর একজন। যখন খালিদ ঘোষণা দেয়, “তোমাদের যাদের কাছে যে বন্দী আছে, তাকে হত্যা করো”, আমি তার কল্লা কেটে ফেলার জন্য আমার তরোয়ালটি টেনে বের করি। কিন্তু সেই বন্দী লোকটি আমাকে বলে, “হে আনসার ভাই, নিশ্চিতই এই লোক তোমার কাছ থেকে ভেগে যাবে না। তোমার সম্প্রদায়ের লোকদের দিকে তাকিয়ে দেখো!” তিনি বলেছেন: তাই আমি তাদের দিকে তাকাই ও দেখতে পাই যে, কোনরূপ ব্যতিক্রম ছাড়াই আনসারদের সকলেই তাদের বন্দীদের মুক্ত করে দিয়েছে। তিনি বলেছেন: আমি তাকে বলি, “তোমার যেখানে ইচ্ছা, সেখানে চলে যাও!” সে বলে, ‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করুন। তোমাদের সাথে আমাদের সম্পর্কের চেয়েও যারা আমাদের বেশী নিকটবর্তী – বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা – তারাই আমাদের-কে হত্যা করেছে!”’

তিনি বলেছেন: ইশাক বিন আবদুল্লাহ আমাকে <খারিজা বিন যায়েদ বিন থাবিত হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন, তিনি বলেছেন:
খালিদ বিন আল ওয়ালিদ যখন আমাদের ডেকে এই নির্দেশ জারী করে যে আমরা যেন বন্দীদের হত্যা করি, তখন বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা তাদের বন্দীদের উপর হামলা চালায় ও তাদের হত্যা করে। আর মুহাজির ও আনসারদের বিষয়টি হলো এই যে, তারা তাদের মুক্ত করে দেয়। আনসারদের যে লোকগুলো বন্দীদের মুক্ত করে দিয়েছিল, খালিদ তাদের ওপর রাগান্বিত হয়। সেই সময়, আবু উসায়েদ আল-সায়েদি তাকে যে কথাগুলো বলে, তা হলো:

“হে খালিদ, আল্লাহ-কে ভয় করো! কারণ, আল্লাহর কসম, মুসলমান সম্প্রদায়ের কোন লোক-কে আমরা হত্যা করতে পারি না!”

সে জবাবে বলে, “তোমার সমস্যা-টি কী?” সে বলে, “আমরা তাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি শুনেছি। তাদের চত্বরে আছে এই মসজিদগুলো।”’

তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ বিন ইয়াজিদ বিন কুসায়েত আমাকে < তার পিতা হইতে < আবদ আল রাহমান বিন আবি আবদুল্লাহ বিন আবি হাদরাদ হইতে < তার পিতা [আবি আবদুল্লাহ বিন আবি হাদরাদ] হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (আল তাবারী: ‘সাইদ বিন ইয়াহিয়া আল-উমায়ি < তার পিতা (ইয়াহিয়া বিন সাইদ) হইতে, এবং ইবনে হুমায়েদ < সালামা হইতে – দু’টি বর্ণনারই উৎস হলো ইবনে ইশাক < ইয়াকুব বিন উতবা বিন আল-মুঘিরাহ বিন আল-আখনাস বিন সারিক হইতে < ইবনে শিহাব আল-যুহরী হইতে < ইবনে আবদুল্লাহ বিন আবি হাদরাদ আল-আসলামি হইতে < তার পিতা, আবদুল্লাহ বিন আবি হাদরাদ হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে) বলেছেন, তিনি বলেছেন:

‘নিশ্চিতই, আমরা সেনাদলের সঙ্গে ছিলাম। বানু জাধিমার লোকদের বেঁধে ফেলা হয়। তাদের কিছু লোক-কে এই হুকুম করা হয় যে, তারা যেন তাদের কিছু লোককে বেঁধে ফেলে।
বন্দিদের মধ্যে একজন বলে, “হে যুবক!”
আমি বলি, “তুমি কী চাও?”
সে জবাবে বলে, “তুমি কি আমার এই দড়িটি ধরে আমাকে নারীদের কাছে নিয়ে যাবে ও অতঃপর আমাকে নিয়ে এসে আমার সঙ্গীদের সাথে যা করা হয়েছে তা আমার সাথে করবে?” তিনি বলেছেন: আমি তার দড়িটি ধরে তাকে নারীদের কাছে পৌঁছায়। অবশেষে যখন সে তাদের কাছে গিয়ে পৌঁছে, সে তাদের ওখানে এক রমণীর সাথে কথা বলে যা সে তাকে বলতে চেয়েছিল। তিনি বলেছেন,

“অতঃপর আমি তাকে বন্দিদের কাছে ফেরত নিয়ে আসি, কিছু লোক উঠে দাঁড়ায় ও তার কল্লাটি কেটে ফেলে।”

যা বলা হয়েছে, তা হলো:
বাস্তবিকই, সেনাদল সন্ধ্যায় বানু জাধিমা গোত্রের এক যুবক-কে আটক করে। সে লোকদের তার কাছ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। যারা তাকে ধরতে চেয়েছিল তারা হলো, বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা। বুরযা ও অন্যান্য স্থানে সংঘটিত পূর্ববর্তী যুদ্ধের কারণে তারা তার ওপর রাগান্বিত ছিল। বুরযায় বানু জাধিমা গোত্রের লোকেরা তাদের বন্দী করেছিল ও তাদের জীবননাশের কারণ হয়েছিল। প্রতিশোধ স্পৃহায় তারা তাই তাকে আক্রমণ করে। যখন সে বুঝতে পারে যে তাদের ইচ্ছা শুধুই তাকে হত্যা করা, সে তাদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে ও তাদের একজন-কে হত্যা করে। অতঃপর সে তাদের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বার প্রতিরোধ তৈরি করে ও তাদের আর একজন-কে হত্যা করে। অতঃপর অন্ধকার ঘনীভূত হয় ও তা একে অপরের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, যুবকটি স্বস্তি পায়। প্রত্যুষে যখন সে জেগে উঠে তখন সে বুঝতে পারে যে সে সম্প্রদায়টির দুইজন লোক-কে হত্যা করেছে ও তাদের নারী ও শিশুরা রয়েছে খালিদের হাতে বন্দি। তাই সে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করে ও তার ঘোড়াটিকে ঘুরিয়ে সরিয়ে নিয়ে আসে। যখন তারা তাকে দেখতে পায় ও বলে, “এই সেই লোক, গতকাল যা হয়েছিল তা সেই করেছিল,” তখন তারা তাকে দিনের কিছু সময় ধরে আক্রমণ করে, আর সে তাদের আক্রমণ-কে দুর্বল করে দেয় ও তাদের-কে আক্রমণ করে। সে তাদের বলে:

“যদি তোমরা চাও যে আমি ধরা দিই, তবে তোমারা আমার সাথে চুক্তি-নামায় চুক্তিবদ্ধ হও এই শর্তে যে, তোমারা মহিলাদের সাথে যেরূপ ব্যবহার করবে, আমার সাথেও তাই করবে। যদি তোমরা তাদের বাঁচিয়ে রাখো, তবে আমি চাই যে তোমারা আমাকেও বাঁচিয়ে রাখবে; যদি তোমরা তাদের হত্যা করো, আমাকেও হত্যা করবে।”

তারা বলে, “তুমি তা পাবে।”
তাই সে আল্লাহ প্রদত্ত চুক্তি ও চুক্তিপত্র সহকারে ধরা দেয়।

কিন্তু যখন সে ধরা দেয়, বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা বলে, “এ হলো আমাদের সহচর, গতকাল যা ঘটেছিল, তা সে করেছে।” তারা বলে, “তাকে বন্দী পুরুষদের সাথে রাখো। যদি খালিদ তাকে হত্যা করে, সে আমাদের নেতা ও আমরা তার অনুসারী; আর সে যদি তাকে ক্ষমা করে, তবে সে হবে তাদের মতই একজন।” তাদের কিছু লোক বলে, “নিশ্চিতই আমারা তাকে চুক্তিপত্র দিয়েছি ও চুক্তিবদ্ধ হয়েছি এই শর্তে যে, সে নারীদের সাথে থাকবে; আর তোমরা জানো যে খালিদ নারীদের হত্যা করবে না। হয় সে তাদের ভাগ-বাটোয়ারা করে দেবে, অথবা তাদের ক্ষমা করবে।”

যুবক-টি বলে, “যেহেতু তোমরা আমার সাথে যা করতে চেয়েছিলে তাই করেছো, আমাকে তোমারা সেখানকার নারীদের কাছে নিয়ে যাও। তারপর যা ইচ্ছে হয়, তাই করো।” তিনি বলেছেন: তারা তা করেছিল। যখন সে সেখানকার এক রমণীর সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন তাকে রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল। সে মাটিতে স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল ও বলেছিল,

“হুবায়েশ, প্রীতি সম্ভাষণ (ইবনে ইশাক: ‘বিদায় তোমাকে’)! জীবনের শেষ মুহূর্ত! আমি কোন পাপ করি নি!” —

(ইবনে ইশাকের অতিরিক্ত বর্ণনা: সেই একই কর্তাব্যক্তি আমাকে জানিয়েছেন যে, সে [মেয়েটি] বলে, “তোমার জীবন দীর্ঘায়িত হোক একটানা সাত ও দশ বছর ও তারপরে আট।” অতঃপর আমি তাকে দূরে নিয়ে যাই ও তাকে শিরশ্ছেদ করা হয়।’)

তিনি বলেছেন: আবদুল্লাহ বিন আবি হুররা আমাকে < ওয়ালিদ হইতে < সাইদ হইতে < হানযালা বিন আলী হইতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে (আল তাবারী: ‘ইবনে হুমায়েদ < সালামা হইতে < ইবনে ইশাক হইতে < আবু ফিরাস বিন আবি সুনবুলাহ আল আসলামি হইতে < (বানু আসলাম গোত্রের) কিছু বয়স্ক লোক হইতে < কিছু লোক যারা সেখানে উপস্থিত ছিল তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে) বলেছেন, তিনি বলেছেন:

সেই সময়, তার কল্লাটি কেটে ফেলার পর, এক রমণী সম্মুখে এগিয়ে আসে। সে তার মুখটি তার মুখে স্থাপন করে ও তা তার মুখের মধ্যে নেয়। সে তাকে চুমু খাওয়া বন্ধ করে না, যতক্ষণে না সে (ইবনে ইশাক: ‘তার পাশে’) মৃত্যুবরণ করে।

ইমাম বুখারীর (৮১০ -৮৭০ সাল) বর্ণনা: [5]
(সহি বুখারী: ভলুম ৫, বই ৫৯, হাদিস নম্বর ৬২৮)

সালিমের পিতা হইতে বর্ণিত: আল্লাহর নবী খালিদ বিন আল-ওয়ালিদ কে বানু জাধিমা গোত্রের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। খালিদ তাদের-কে ইসলামের দাওয়াত দেয়। কিন্তু তারা “আসলামনা (অর্থাৎ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি) বলে নিজেদের-কে প্রকাশ করতে পারে না; তারা বলা শুরু করে, “সাবা’না! সাবা’না (অর্থাৎ, আমরা এক ধর্ম থেকে অন্য ধর্মে এসেছি)।” খালিদ তাদের হত্যা করতে থাকে (কিছু লোক-কে) ও তাদের-কে বন্দী করে (কিছু লোক-কে) ও আমাদের প্রত্যেককে তার বন্দীগুলো ভাগ করে দেয়। যখন দিনের আগমন ঘটে, তখন খালিদ এই নির্দেশ জারী করে যে, প্রত্যেক লোক (অর্থাৎ মুসলিম সৈনিক) যেন তার বন্দীকে অবশ্যই হত্যা করে। আমি বলি, “আল্লাহর কসম, আমি আমার বন্দী-কে হত্যা করবো না ও আমার সহচরদের কেউই তার বন্দীদের হত্যা করবে না।” আল্লাহর নাবীর কাছে পৌঁছার পর সম্পূর্ণ ঘটনাটি আমরা তাঁর কাছে উল্লেখ করি। তথায়, আল্লাহর নবী তার উভয় হাত উত্তোলন করেন ও দুইবার বলেন, “হে আল্লাহ! খালিদ যা করেছে তা থেকে আমি মুক্ত।”

(Narrated By Salim’s father: The Prophet sent Khalid bin Al-Walid to the tribe of Jadhima and Khalid invited them to Islam but they could not express themselves by saying, “Aslamna (i.e. we have embraced Islam),” but they started saying “Saba’na! Saba’na (i.e. we have come out of one religion to another).” Khalid kept on killing (some of) them and taking (some of) them as captives and gave every one of us his Captive. When there came the day then Khalid ordered that each man (i.e. Muslim soldier) should kill his captive, I said, “By Allah, I will not kill my captive, and none of my companions will kill his captive.” When we reached the Prophet, we mentioned to him the whole story. On that, the Prophet raised both his hands and said twice, “O Allah! I am free from what Khalid has done.”)

– অনুবাদ, টাইটেল, ও [**] যোগ – লেখক।

আদি উৎসের বিশিষ্ট মুসলিম ঐতিহাসিকদেরই ওপরে বর্ণিত বর্ণনায় যা অত্যন্ত সুস্পষ্ট তা হলো, যে কারণে খালিদ বিন আল-ওয়ালিদের আদেশে বানু সুলায়েম গোত্রের লোকেরা বানু জাধিমা গোত্রের লোকদের হত্যা করেছিল, তা হলো, “প্রতিহিংসা।”

“বুরযায় বানু জাধিমা গোত্রের লোকেরা তাদের বন্দী করেছিল ও তাদের জীবননাশের কারণ হয়েছিল। প্রতিশোধ স্পৃহায় তাই তারা তাকে আক্রমণ করে।”

আর, যে কারণে মুহাজির ও আনসাররা বানু জাধিমা গোত্রের লোকদের বন্দি-দশা থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তা হলো, “তাঁরা ছিলেন মুসলমান!” আনসার আবু উসায়েদ আল-সায়েদির উক্তি:

“হে খালিদ, আল্লাহ-কে ভয় করো! কারণ, আল্লাহর কসম, মুসলমান সম্প্রদায়ের কোন লোক-কে আমরা হত্যা করতে পারি না! —আমরা তাদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি শুনেছি। তাদের চত্বরে আছে এই মসজিদগুলো।”

“ইসলামের” মানবিক মূল্যবোধের প্রায় সমস্তই মুসলমান বনাম মুসলমান আচরণের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অবিশ্বাসী মুনাফিক-মুরতাদ-কাফেরদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। এ বিষয়ের বিস্তারিত আলোচনা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে (পর্ব: ১৭৯)

[ইসলামী ইতিহাসের ঊষালগ্ন থেকে আজ অবধি প্রায় প্রতিটি ইসলাম বিশ্বাসী প্রকৃত ইতিহাস জেনে বা না জেনে ইতিহাসের এ সকল অমানবিক অধ্যায়গুলো যাবতীয় চতুরতার মাধ্যমে বৈধতা দিয়ে এসেছেন। বিষয়গুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিধায় বাংলা অনুবাদের সাথে আল ওয়াকিদির প্রাসঙ্গিক বর্ণনার মূল ইংরেজি অনুবাদ সংযুক্ত করছি (ইবনে ইশাক ও আল তাবারীর রেফারেন্স: বিনামূল্যে ইন্টারনেট ডাউন-লোড লিংক তথ্যসূত্র দুই ও তিন):]

The narratives of Al-Waqidi: [1]

‘—-When it was dawn, the Muslims disagreed among themselves. A sayer says, “We do not want their imprisonment. We will take them to the Prophet.” Another says, “We will observe how they hear or obey. So let us test them.” The people were divided between these two speakers. When it was dawn, Khālid b. al-Walīd called out, “Whoever has a prisoner with him dispatch him. Finish him off with the sword.” The Banū Sulaym killed all their captives. As for the Muhājirūn and the Anṣār, they released their prisoners.

He said: Mūsā b. ‛Ubayda related to me from Iyās b. Salama from his father, who said: I was with Khālid b. al-Walīd and there was a prisoner in my hands. I released him and said, “Go where you wish!” There were prisoners with the Anṣār, and they released them. [Page 877] He said: ‛Abdullah b. Nāfi‛ related to me from his father from Ibn ‛Umar, who said: I released my prisoner. I did not like to kill him, nor that it depended on me whether the sun rose over him or set. My people who were with me from the Anṣār released their prisoners.
He said: Ma‛mar related to me from al-Zuhrī from Sālim from Ibn ‛Umar, who said: When Khālid called out, “Who has a prisoner with him, dispatch him,” I released my prisoner.
He said: ‛Abdullah b. Yazīd related to me from Ḍamra b. Sa‛īd, who said: I heard Abū Bashīr al-Māzinī say, “I had one of the captives with me.” He said: When Khālid called out, “Who has with him a prisoner dispatch him,” I pulled out my sword to cut off his head, but the prisoner said to me, “O Brother from the Anṣār, indeed, this will not escape you. Observe your community!” He said: So I looked, and lo and behold, the Anṣār without exception had released their prisoners. He said: I said, “Go where you wish!” And he said, “May God bless you. But those who are of closer kinship than you—the Banū Sulaym—have killed us!”
He said: Isḥāq b. ‛Abdullah related to me from Khārija b. Zayd b. Thābit, who said: When Khālid b. al-Walīd called out about dispatching the prisoners, the Banū Sulaym pounced on their prisoners and killed them; as for the Muhājirūn and Anṣār, they released them. Khālid was angry with the Anṣār who released the prisoners. Abū Usayd al-Sā‛idī spoke to him at that time and said, “Fear God, O Khālid, for by God, we may not kill a community of Muslims!” He said, “What is the matter with you?” He said, “We heard their acceptance of Islam. These mosques are in their courtyards.”

He said: ‛Abdullah b. Yazīd b. Qusayṭ related to me from his father from ‛Abd al-Raḥmān b. ‛Abdullah b. Abī Ḥadrad from his father, who said: Indeed, we were in the army and the Banū Jadhīma were tied up. Some of them were commanded to tie up some. A man from the prisoners said, “O young man!” [Page 878] And I said, “What do you want?” He replied, “Will you take me by this rope of mine and lead me to the women, then return me and do with me what is done with my companions?” He said: I took him by his rope and reached the women. When he finally reached them he spoke to a woman among them about some of what he desired. He said: Then I turned back with him until I returned him with the prisoners and some of them rose and cut off his head.
It was said: Indeed, the army took a youth from the Banū Jadhīma in the evening. He called to the people to desist from him. Those who wanted him were the Banū Sulaym. They were irritated with him because of previous wars that had taken place in Burza and other places. The Banū Jadhīma had captured them in Burza, and they had suffered death and desired vengeance from them, so they attacked him. When he saw that they would only kill him, he strengthened against them and he killed a man from them. Then he strengthened against them a second time and killed another of them. Then darkness came and obstructed them from each other and the youth found relief. When he rose in the morning he realized that he had killed two men from the community, while the women and children were in the hands of Khālid. So he asked for protection and turned his horse away. When they looked at him they said, “This is he who did what he did yesterday.” They attacked him a part of the day, then he weakened them and attacked them. He said, “If you want I will alight, provided that you grant me a contract and an agreement to do with me what you do with the women. If you let them live, I ask that I live, if you kill them I will be killed.” They said, “You shall have that.” So he alighted with an agreement from God and a contract. But when he alighted the Banū Sulaym said, “This is our companion who did what he did yesterday.” They said, “Leave him with the male captives. If Khālid kills him he is our leader and we are his followers, and if he forgives him, he is like one of them.” Some of them said, “Surely we gave him a contract and an agreement that he will be with the women, and you know [Page 879] Khālid will not kill the women. He will either apportion them or forgive them.” The youth said, “Since you have done with me what you did, take me to the women there. Then do whatever you wish.” He said: They did. He was tied up with a rope when he stood before one of the women. He stayed fixed to the ground and said, “Greetings Ḥubaysh, life is at an end! I have not sinned!” ––

He said: ‛Abdullah b. Abī Ḥurra related to me from Walīd from Sa‛īd from Ḥanẓala b. ‛Alī, who said: A woman came forward at that time, after his head was cut off. He says: [Page 880] She placed her mouth on his and took his mouth in hers. She did not stop kissing him until she died.

(চলবে)

তথ্যসূত্র ও পাদটীকা:

[1] আল-ওয়াকিদি: ভলুম ৩, পৃষ্ঠা ৮৭৬-৮৮০, ইংরেজি অনুবাদ- পৃষ্ঠা ৪৩০-৪৩২
https://books.google.com/books?id=gZknAAAAQBAJ&printsec=frontcover&dq=kitab+al+Magazi-

[2] অনুরূপ বর্ণনা: মুহাম্মদ ইবনে ইশাক (৭০৪-৭৬৮ সাল): পৃষ্ঠা ৫৬২-৫৬৪
http://www.justislam.co.uk/images/Ibn%20Ishaq%20-%20Sirat%20Rasul%20Allah.pdf

[3] অনুরূপ বর্ণনা: আল-তাবারী (৮৩৯-৯২৩ সাল): ভলুউম ৮; পৃষ্ঠা ১৯১-১৯২
https://onedrive.live.com/?authkey=%21AJVawKo7BvZDSm0&cid=E641880779F3274B&id=E641880779F3274B%21292&parId=E641880779F3274B%21274&o=OneUp

[4] মামর ইবনে রশিদ (৭১৪-৭৭০ সাল) ছিলেন মুহাম্মদ ইবনে ইশাকের সম-সাময়িক এক ‘সিরাত’ লেখক। তাঁর বইটির ইংরেজি অনুবাদ: The Expeditions: An Early Biography of Muhammad. অনুবাদ করেছেন, Sean W. Anthony; Assistant Professor of History at University of Oregon, USA.
https://www.amazon.com/Expeditions-Biography-Muhammad-Library-Literature/dp/0814769632#reader_0814769632

[5] সহি বুখারী, ভলুম ৫, বই ৫৯, হাদিস নম্বর ৬২৮
https://quranx.com/hadith/Bukhari/USC-MSA/Volume-5/Book-59/Hadith-628/

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 2