সমসাময়িক ভাবনা : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পার্বত্য চুক্তি বিরোধী বৈষম্যমূলক কার্যক্রম | মিঠুল চাকমা বিশাল

একটি রাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজ হচ্ছে, দেশের আভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা,জননিরাপত্তা,জল ও স্থল নিরাপত্তা,মাদক চোরাচালান,সন্ত্রাস দমন ইত্যাদি কার্য পরিচালনা এবং সম্পাদন করা। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও যুগ যুগ ধরে এটি ঐতিহাসিকভাবে একটি বিশেষ শাসনব্যবস্থার দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে।আমরা দেখি যে,১৮৬০ সালের পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাধীন রাজাদের অস্তিত্ব ছিল। তার প্রমাণ ১৫৫০ খ্রীঃ Jao De Baros নামক জনৈক পর্তুগীজের আঁকা মানচিত্রে কর্ণফুলী নদীর পূর্বতীরে,শ্রীহট্ট(বর্তমান চট্টগ্রাম) ও ত্রিপুরার দক্ষিণ পূর্বে এবং আরাকানের উত্তরে দুটি নদীর মধ্যবর্তী স্থানে CHACOMAS নামক একটি রাজ্যের উল্লেখ রয়েছে।এছাড়াও ১৭৬০ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী যখন মীর কাসিমের কাছ থেকে চট্টগ্রামের দেওয়ানী লাভ করে,তখন সেই সনদের কোথাও পার্বত্য চট্টগ্রামের উল্লেখ ছিল না।তৎকালে ইসলামাবাদ(বর্তমান চট্টগ্রাম) এর সীমানা ছিল “উত্তরে ফেনী নদী,দক্ষীণে নাফ নদী,পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর ও পূর্বে পার্বত্য অঞ্চলের গিরিরাজি”। এই চতুর্সীমার মধ্যবর্তী ২৪৯৮ বর্গমাইল ভূমিই ছিল ইসলামাবাদ তথা আধুনিক চট্টগ্রাম। এমনকি চট্টগ্রামের প্রথম চীফ “হেনরী ভেরেলস্ট”ও পার্বত্য চট্টগ্রামের উপর কর্তৃত্ব দাবী করেননি। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষদের সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক ও নৃ-তাত্বিক বৈশিষ্ট্য সমতল অঞ্চলের অধিবাসীদের থেকে ভিন্নতর হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৬০ সালে জেলা আইন প্রণয়নের এক যুগ পরে ১৮৭৪ সালে ভারতীয় আইনসভায় ” তফসিলভুক্ত জেলা আইন ১৮৭৪” পাস করে। এর সাথে ভারতের অপরাপর ৩৫ টি জেলার মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামও একটি তফসিলভুক্ত জেলায় পরিণত হয়। তৎপরবর্তী ১৯০০ সালের শাসনবিধি প্রণয়ন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে এক বিশেষ শাসতান্ত্রিক কাঠামো তৈরি করা হয়। এছাড়াও ১৯১৯ সালের “ভারত শাসন আইন”,১৯৩৫ সালের ” ইন্ডিয়ান এ্যাক্ট”,দেশ বিভাগোত্তর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি শাসন বহির্ভূত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। যদিওবা ১৯৬২ সালে “ট্রাইবাল এরিয়া” এবং ১৯৬৩ সালে এই ট্রাইবাল এরিয়ার মর্যাদা তুলে দেওয়া হলেও ১৯৮৯ সালের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন(পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ সংশোধিত),১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি,১৯৯৮ সালের আঞ্চলিক পরিষদ আইনের দ্বারা এটিই প্রতীয়মান হয় যে,পার্বত্য চট্টগ্রাম এক বিশেষ শাসনব্যাবস্থা সম্বলিত এলাকা। তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৈষম্যমূলক নির্দেশনা,পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের প্রতিনিধি ছাড়া বৈঠক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক কোন জনপ্রতিনিধি ছাড়া ঠেগামুখ স্থলবন্দর পরিদর্শন নিঃসন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসনব্যাবস্থার উপর চরম আঘাত।

★স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলয়ের বৈষম্যমূলক ১১টি নির্দেশনা:
গত ৭ জানুয়ারী ২০১৫ খ্রীঃ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিবিরোধী ও বৈষম্যমূলক ১১টি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়,যার মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদী ও ঔপনিবেশিকতার নগ্ন চরিত্রটি আরো একবার উন্মেচিত হয়েছে।
সিদ্বান্তসমূহ:
১. বিগত ১০ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে ইউএনডিপি কর্তৃক ১৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের উন্নয়ন প্রকল্প সমূহের বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও ফলাফল প্রেরণ করতে হবে।
২. শান্তিচুক্তিবিরোধী স্বশস্ত্র সংগঠন এবং স্থনীয় সন্ত্রাসী গ্রুপ কতৃক চাঁদাবাজি,খুন,অপহরণ,মাদকদ্রব্য ও অস্ত্র চোরাচালান রোধকল্পে সেনাবাহিনী,পুলিশ,বিজিবি ও আনসারের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করা।
৩. কোন আইনগত ভিত্তি না থাকায় সিএইচটি কমিশনের নাম সংশোধ করে “কমিশন” শব্দটি বাদ দিয়ে অন্যকোন নাম রাখার বিষয়ে অনুরোধ জ্ঞাপন।
৪. কূটনৈতিক ছাড়া সাধারণ বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্টগ্রামে ভ্রমণ করতে চাইলে অন্তত একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হবে।
৫. কোন দেশি-বিদেশী ব্যাক্তি/সংস্থা কর্তৃক পার্বত্য অঞ্চলে উপজাতীয়দের সাথে সাক্ষাত কিংবা বৈঠক করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন এবং সেনাবাহিনী/বিজিবির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।
৬. পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত ২৪ পদাতিক ডিভিসনের সাথে পারস্পারিক সমন্বয় সাধনের মাধ্যমে অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসমূহ দায়িত্ব পালন করবে।
৭. বিজিবির সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করতে করতে হবে।
৮. ভরত ও মিয়ানমারের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামের অরক্ষিত সীমান্তের সুষ্ঠু ব্যাবস্থপনার নিমিত্তে প্রস্তাব প্রদান।
৯. স্থানীয় জনগণ/উপজাতীয়দের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কার্যক্রম পরিচালনা করা।
১০. পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রবেশ পথে যেসব চেকপোস্ট রয়েছে সেগুলোকে আরো সক্রিয় করা।
১১. পার্বত্য জেলা সমূহে পুলিশ/আনসার বাহিনীতে কর্মরত প্রাক্তন শান্তিবাহিনীর সদস্যদের পর্যায়ক্রমে অন্য জেলায় বদলী করতে হবে।

উল্লেখ্য যে,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উক্ত নির্দেশনা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বিভিন্ন ধারার সাথে সম্পূর্ণ বিরোধাত্মক ও সাংঘর্ষিক। উপরোক্ত নির্দেশনার ৭,৮,৯ নং সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হিসেবে গ্রহণযোগ্য,২নং সিদ্ধন্ত গ্রহণযোগ্য হলেও চুক্তি বিরোধী স্বশস্ত্র সংগঠন ও স্থানীয় সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের নামে কার্যত চুক্তি সমর্থক ব্যাক্তি ও সংগঠনগুলোর উপর হয়রানি এবং ধরপাকড় চালানো হচ্ছে। চুক্তিবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনকে উস্কে দিয়ে চুক্তি বিরোধী বিভিন্ন কার্যকলাপ পরিচালনা করা হচ্ছে। বিদেশী স্বশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান লিবারেশন পার্টি(এএলপি) দের দিয়ে জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়ে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে,তা জনসংহতি সমিতি ও এর অঙ্গসংগঠনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে সুবলং এ গ্রেনেড হামলার দায় পিসিপির উপর এবং ১৮.১১.২০১৯ তারিখে বান্দরবানে রাজভিলা ইউনিয়নে পিছনে হাঁত বাঁধা অবস্থায় তিনজন গ্রামবাসীকে গুলি করে হত্যার দায় ও ২২.০২.২০২০ ইং তারিখে বান্দরবানে জামছড়িতে সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গোলাবর্ষণের ফলে আওয়ামীলীগ কর্মী হত্যার দায়ও জনসংহতি সমিতির উপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বস্তুতঃ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সন্ত্রাস দমন ও চুক্তি বিরোধী কার্যক্রম বন্ধ করার পক্ষে হলেও তা কেবল মুখের বুলি মাত্র।

অন্যদিকে ৫ ও ৬ নং সিদ্ধান্ত দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রের ঔপনিবেশিকতার চিত্রটি চরমভাবে ফুটে উঠেছে। মূলতঃ পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্যাতন-নিপীড়নের ভয়াবহ চিত্রটিকে ধামাচাপা দিতে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার হীন উদ্দেশ্য নিয়ে উক্ত নির্দেশনাগুলো দেয়া হয়েছে। তার জ্বলন্ত উদাহরণ আমরা দেখতে পায়,গত ২৯ আগস্ট ২০১৯ তারিখে বান্দবানে এক নেপালী শিক্ষার্থীকে আটকের মধ্যদিয়ে। উক্ত শিক্ষার্থীর নাম মনিকা জিরেল,সে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটির দর্শন বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী। উল্লেখ্য যে,মনিকা জিরেল তার বন্ধু বান্দরবান নিবাসী পিংকী তঞ্চঙ্গ্যার সাথে বেড়াতে বান্দরবানে গিয়েছিল। এই সমস্ত নির্দেশনা এবং কার্যকলাপের মধ্যদিয়ে রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদী দৃষ্টিভঙ্গীই প্রকাশ পায়। যা সংবিধানের ২৮(১) অনুচ্ছেদে বর্ণিত “কেবল ধর্ম,গোষ্ঠী,বর্ণ,নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য রদান করিবে না” -এর সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

এছাড়া মন্ত্রণালয়ের ৬,১০ এবং ১১ নং সিদ্ধান্ত ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চুক্তির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক এবং বিরোধী। উল্লেখ্য যে,পার্বত্য চট্টগ্রামের তিনটি জেলার সাধারণ প্রশাসন,আইন-শৃঙ্খলা ও উন্নয়নের ব্যাপারে আঞ্চলিক পরিষদ সমন্বয় সাধন করিতে পারিবে -মর্মে উল্লেখ রয়েছে। এবং পার্বত্য চুক্তির ৩৪ ধারায় বর্ণিত জেলা পরিষদের কার্য তালিকাতে স্থনীয়(মিশ্র) পুলিশ বাহিনী গঠনের কথাও বলা আছে। পার্বত্য চুক্তির ঘ খন্ডের ১৭ নং ধারানুসারে সীমান্তরক্ষী বাহিনী(বিজিবি) ও স্থায়ী সেনানিবাস (রুমা,আলীকদম, দীঘিনালা এবং তিন পার্বত্য জেলা সদরে তিনটি) ব্যাতীত সামরিক বাহিনী,আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সমস্ত অস্থায়ী ক্যাম্প প্রত্যাহারের কথা বলা আছে। তাছাড়া চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে কোন আইন প্রবর্তন করতে গেলেও আঞ্চলিক পরিষদের সাথে আলোচনা করার কথা উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সরকার তা না করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে সন্ত্রাস দমনের নামে র্যাপিড এ্যকশন ব্যাটালিয়ন নিয়োগ করেছে,যা খুবই উদ্বেগজনক।

★রাঙামাটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভা:
গত ১৬-১৭ অক্টোবর ২০১৯ ইং রাঙামটিতে পার্বত্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যেগে আইন-শৃঙ্কলা সংক্রান্ত এক সভা আয়োজন করা হয়। উক্ত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস,হানাহানি,চাঁদাবাজি ও অস্ত্রবাজির একতরফা অভিযোগ এনে পার্বত্য চট্টগ্রামে “সামনে ভয়ঙ্কর দিন” আসছে বলে হুমকি ও উস্কানীমূলক বক্তব্য প্রদান করা হয়।
উক্ত সভায় সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিসনের জিওসি মেজর জেনারেল এম.এস মতিউর রহমান,পুলিশের মহাপরিদর্শক মো: জাবেদ পাটোয়ারী,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা বিভাগের সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন,র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ,বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোঃ সাফিনুল ইসলাম,পার্বত্যমন্ত্রী বীর বাহাদূর উশৈসিং এমপি,ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী ও আভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তু পূনর্বাসন সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি,রাঙামাটি আসনের সাংসদ দীপঙ্কর তালুকদার,মহিলা আসনের সাংসদ বাসন্তী চাকমা এবং পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মিসবাহুল ইসলাম ও অতিরিক্ত সচিব সুদত্ত চাকমা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জিওসি,র্য্যাবের মহাপরিচালক,পুলিশের মহাপরিদর্শক ও স্বরাষ্ট্র সচিব প্রমুখ ব্যাক্তিরাও একতরফাভাবে সন্ত্রাস,হানাহানি ও চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে উস্কানিমূলক ও হুমকিমূলক বক্তব্য প্রদান করেন। মাটির তিন ফুটের নিচে লুকিয়ে থাকলেও সন্ত্রাসীদের বের করে আনা হবে,দুই কোটি লোক বসবাসকারী ঢাকায় সন্ত্রাসীদের অনায়াসে খুঁজে বের করা হয়,সেখানে ১৫/১৬ লক্ষ বসবাসকারী পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাসীদের খুঁজে বের করা কোন ব্যাপারই না বলে হুমকি প্রদান করা হয়।
বলাবাহুল্য,রাঙামাটিতে অনুষ্ঠিত সভা কার্যত পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে সরাসরি লঙ্ঘন করে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইনে সাধারণ প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বিষয়টি সমন্বয় ও তত্ত্বনধানের দায়িত্ব এবং জেলা পরিষদ আইন ১৯৮৯ অনুসারে আইন-শৃঙ্খলা সংরক্ষন ও উন্নয়ন এবং পুলিশ(স্থনীয়) বিষয়টি জেলা পরিষদের কার্যাবলীর আওতাধীন একটি বিষয়। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণলয় ও পার্বত্য মন্ত্রণালয় একতরফাভবে উক্ত সভা আয়োজন করে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদকে কেবল আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে মাত্র। সভা আয়োজনের কর্মপরিকল্পনানও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের সাথে কোন আলোচনা করা হয় নি,যা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই নয়।

★স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাজেক-কমলাক সড়ক ও ঠেগামুখ স্থলবন্দর পরিদর্শন:
গত ১০ মার্চ ২০২০ ইং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল হেলিকপ্টারযোগে রাঙামাটির সাজেকে যান,সেখানে তিনি সেনাবাহিনী ও বিজিবির বিভিন্ন ক্যাম্প পরিদর্শন করে বরকলের ঠেগামুখ স্থলবন্দর পরিদর্শন করেন। এসময় তার সাথে উপস্থিত ছিলেন,স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দিন,পুলিশের মহাপরিদর্শক ড. মোঃ জাভেদ পাটোয়ারী,বিজিবির মহাপরিচালক মোঃ সাফিনুল ইসলাম,আনসার ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল কাজী শরীফ কায়কোবাদ,র্য্যাবের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোঃ বেনজীর আহমেদ সহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় ১৯ জন উর্ধ্বতন কর্মকর্তা।

উল্লেখ্য যে,এরকম একটি সফরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ,পার্বত্য জেলা পরিষদ,পার্বত্য মন্ত্রণলয়,টাস্কফোর্স এমনকি সংশ্লিষ্ট সার্কেলের কোন প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। এটি সুস্পষ্টভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ শাসন কাঠামো এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির লঙ্ঘন।
লক্ষণীয় যে,বাংলাদেশ ও ভারত সরকার বাংলাদেশ অংশে বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইইনিয়নের অধীন রুইলুই হতে বড়কমলাক পর্যন্ত প্রায় ৫০ কি.মি. দীর্ঘ এক ট্রানজিট সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। সড়টি সিজকছড়া,দাড়িপাড়া,বলপিয়ে,উপরে চইনালছড়া,নীচে চইনালছড়া ও বড় কমলাক হয়ে সাজেক তীর পর্যন্ত যাবে। প্রায় ৩০০ পরিবার অধ্যুষিত বড় কমলাক,সিজকছড়া ও চইনালছড়া অধবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারকে বিবেচনায় না নিয়ে সড়কটি নির্মাণ করা হলে,পাহাড়ীরা তাদের ভূমি হারাবে।
উল্লেখ্য যে,সাজেকের ৯০% অধিবাসী আভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তু,যারা ১৯৭০ ও ৯০ এর দশকে অস্থিতিশীল সময়ে নিজেদের গ্রাম ও বাড়িঘ হতে উচ্ছদের শিকার হয়েছিল।

অন্যদিকে রাঙামাটির বরকলের ঠেগামুখ স্থলবন্দরের জন্য সরকার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই কার্য সম্পাদনের অংশ হিসেবে সরকার ঠেগামুখ স্থলবন্দর থেকে রাজস্থলী পর্যন্ত একটি ট্রানজিট সড়ক নির্মাণের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং বর্তমানে তার কাজ চলমান রয়েছে। উক্ত ট্রানজিট সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১১৪.৭৫ কি.মি.(রাজস্থলী-বিলাইছড়ি-জুরাছড়ি-বরকল-ঠেগামুখ),এবং নদীপথে ৬৩ কি.মি.(রাঙামটি-ছোট হরিণা) সহ স্থলপথে ৭.৯৮৭ কি.মি.(স্থলপথে),যার নির্মাণ ব্যায় প্রায় BDT.৮০ মিলিয়ন। সড়কটির ফলে প্রায় ৫৬৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে,যার মধ্যে ১৫৭টি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের কাঠামো সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে যাবে এবং ২৪১টি পরিবারের সৃজিত বাগান ধ্বংস হয়ে যাবে। এছাড়া ঠেগামুখে প্রায় ৩০ হাজার জুম্ম পরিবারের বসবাস,যারা তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং তাদের অধিকাংশই আভ্যন্তরীণ উদ্ভাস্তু(ভূষণছড়া গণহত্যার ফলে)। শিক্ষা,চিকিৎসা,বাসস্থান,বিদ্যুৎ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা বঞ্চিত অবস্থায় রয়ে গেছে। কিন্তু সরকার সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে,তাদের সাথে আলাপ-আলেচনা ব্যাতিরকেই,আঞ্চলিক পরিষদ এবং পার্বত্য চট্টগৃরাম জনসংহতি সমিতির বিরোধীতার মুখেও বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থায়নে উক্ত স্থানে স্থলবন্দর স্থাপনের কাজ চালিয়ে নিচ্ছে।

স্মতর্ব্য,পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ভিন্ন ভাষাভষির ১৪টি জাতিগেষ্ঠীর ভষাগত,সাংস্কৃতিকগত বৈচিত্র্যতাকে ধরে রাখতে এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের মাধ্যমে আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘ দুই যুগের অধিক স্বশস্ত্র সংগ্রামের মধ্যদিয়ে সংঘাতময় পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি সম্ভাবনাময় পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিণত করে এতদঞ্চলের সামাজিক,সাংস্কৃতিক,রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মহাপ্রয়াস নিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পক্ষ হতে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্য এক ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়,যা পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে “শান্তিচুক্তি” নামে আখ্যায়িত হয়। চুক্তির শর্তানুসারে “পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হইবে এবং এর বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ ও সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন” মর্মে উল্লেখ থাকিলেও,বস্তুত পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ না করে সরকার উল্টো বাঙালী অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে এর বৈচিত্র্যটাকে ধবংস করার মহাপ্রয়াস নিয়ে অগ্রসরমান। ৮০’র দশকে সমতল থেকে পূনর্বাসিত সেটেলার বাঙালীদেরকে সম্মানজনকভবে সমতলে পূনর্বাসন না করে প্রতিনিয়ত বাইরে থেকে আরে বহিরাগত ভূমিহীন বাঙালীদেরকে পার্বত্য চটগ্রামে অনুপ্রবেশ করানো হচ্ছ। তাদেরকে কাজে লাগিয়ে,সাম্পরদায়িকতাকে উস্কে দিয়ে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় পলিসি বাস্তবায়ন করে চলেছে। সাধারণ প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা বিষয়টি জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদের আওতাধীন হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে অপারেশন দাবানলের পরিবর্তে ২০০১ সালে অপারেশ উত্তরণের নাম দিয়ে সেনাশাসন জারি রাখা হয়েছে। জেলা পরিষদের নির্বাচন না করে উল্টো অন্তঃবর্তীকালীন জেলা পরিষদের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে জেলা পরিষদকে দলীয় পরিষদে রুপান্তরিত করে দূর্নীতির পথকে আরো প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে।জেলা পরিষদ আইনে জেলা পরিষদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচনের জন্য স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়নের কথা থাকলেও সরকার সে বিষয়ে কোন উদ্যেগ গ্রহণ করেনি। অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার লক্ষ্যে সর্বোপরি পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে পার্টির বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দের নামে মিথ্যা ও সাজানো মামলা দিয়ে গৃহহীন করে রাখা হয়েছে। চুক্তিবিরোধী সংগঠনসমুহকে উস্কে দিয়ে চুক্তি সমর্থকদের উপর অত্যাচারের নগ্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিদেশী স্বশস্ত্র গোষ্ঠী এএলপি কে ব্যবহার করে জনমনে আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার করে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার প্রচেষ্ঠা চালানো হচ্ছে,যা নিঃসন্দেহে খুবই উদ্বেগজনকও বটে। বস্তুত যে আশা এবং প্রত্যাশা নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল,তা এখন সুদুর পরাহত৷ অস্ত্র জমাদানের দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর “সংঘাত নয়,শান্তি চাই; ধ্বং নয়,সৃষ্টি চাই; পশ্চাৎপদতা নয়,অগ্রগতি চাই” এই বক্তব্য এখন কেবল ইতিহাস। শান্তির পায়রা আকাশে উড়ার আগেই মাটিতে লুঠোপুঠি খেয়ে মরে পড়েছে।
এমতাবস্থায় জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের জন্য যদি কোন অস্থিতিশীল পরিস্থির উদ্ভবও ঘটে,তাহলে রাষ্ট্র তার দায় কোনভাবেই আগ্রাহ্য করতে পারবে না।
*মহান জুম্ম জনগণের লড়াই সংগ্রাম দীর্ঘ হোক!

সহায়ক গ্রন্থঃ
১. ইসলামাবাদ-মুনশী আব্দুল করিম
২. রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস- এন.এম হাবিবুল্লাহ
৩. বিবর্ণ পাহাড়-মঙ্গল কুমার চাকমা
৪. Consultency servies for feasibility,detailed survay for design of Chittagong Hill Tracts(CHT) connectivity connecting Theghamukh and Chittagong port,2016
৫. The resistance movement in the Chittagong hill tracts: Global and regional connection- Md. Nazmul Hasan Chowdury
৬. PCJSS Archive
৭. স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাজেক-কমলাক সড়ক ও থেগামুখ স্থলবন্দর পরিদর্শনঃপদদলিত জুম্ম সমাজ-সজীব চাকমা

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of