‘করোনা’ ভাইরাস! ধর্ম, ধর্মান্ধতা, অসচেতনতা বাংলাদেশ এবং বিশ্ব!

‘করোনা’ ভাইরাসে এখন পর্যন্ত পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা – ২ লক্ষ ৪৯ হাজার।

সুস্থ হয়েছে – ৮৯ হাজার।
মৃতের সংখ্যা – ১০ হাজার।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ভাইরাসটি’কে মোকাবেলায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে।

– ‘করোনা’ ভাইরাসটিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে চীনে।
আক্রান্তের সংখ্যা ৮৯ হাজার।
সুস্থ হয়েছে – ৭১,০০০
মৃতের সংখ্যা – ৩,৩০০

– দ্বিতীয়, ইতালি আক্রান্ত হয়েছে – ৪১ হাজার
সুস্থ হয়েছে – ৪,৫০০
মৃতের সংখ্যা – ৩,৪০০

– তৃতীয়, ইরান, আক্রান্তের সংখ্যা – ১৮,৪০০
সুস্থ হয়েছে – ৬,০০০
মৃতের সংখ্যা -৩,২০০

– সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েও একেবারে কম সংখ্যক মানুষ মারা গেছে জার্মানিতে। জার্মানিতে মোট আক্রান্তের সংখ্যা – ১৮,৩০০
মৃতের সংখ্যা – ৪৮ জন।

ইতিমধ্যেই চীন ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেলেছে। উন্নত বিশ্ব সহ মধ্যপ্রাচ্যের সবকটা দেশই এখন মোটামুটি সচেতন। তারা ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য, সকল প্রকার সভা-সমাবেশ মসজিদ, মন্দির, গির্জা অফিস-আদালত ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে। শুধুমাত্র খাবারের দোকান আর ফার্মেসী ছাড়া আর সবকিছুই এখন বন্ধ আছে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ‘করোনা’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ১৮ জন।
সুস্থ হয়েছে ৩ জন।
মৃতের সংখ্যা – ১ জন।
এই সংখ্যা নিয়েও আছে সন্দেহ, ধারণা করা হচ্ছে আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ‘করোনা’ শনাক্ত করার তেমন কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ‘করোনা’ ভাইরাস সনাক্ত করার জন্য যে কিটের দরকার সে কিটের সংখ্যা বাংলাদেশ একেবারেই কম।

ইতালি মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের পর্যাপ্ত পরিমাণ পরীক্ষা না করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বিমান বন্দরে ‘করোনা’ ভাইরাস সনাক্ত করার জন্য তিনটা যন্ত্র আছে সেগুলোও নষ্ট হয়ে আছে।

আক্রান্ত হওয়ার পর পর্যাপ্ত পরিমাণ চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের হসপিটালগুলোতে তেমন কোন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশের হসপিটালগুলোতে নার্স এবং ডাক্তার এর প্রচুর সংকট, তার মধ্যেও যারা আছে তাদেরকেও পর্যাপ্ত ট্রেনিং দেওয়া হয়নি।

‘করোনা’ আক্রান্ত রোগীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের জন্য হসপিটালগুলোতে কোন প্রকার আলাদা কক্ষ নেই বললেই চলে। ডাক্তার নার্সদের নিজের সুরক্ষার জন্যেও তেমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

কেউ ‘করোনা’ আক্রান্ত হলে তার মৃতদেহ কিভাবে কি করা হবে সেটা নিয়েও আছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব। ‘করোনা’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যে একজন বাংলাদেশে মারা গেছে, তাঁকে কবর দিতেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে হয়েছে সরকারকে। শেষমেষ তাকে আঞ্জুমানে মফিদুল এর সহায়তায় আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। সেখানে দেখা যায় যারা কবর দিয়েছে তারা নিজেরাও কোনো প্রকার প্রটেক্ট ব্যবহার করেনি।

বাংলাদেশে এখনো তিনটা জায়গায় নির্বাচনী প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে সরকার এবং বিরোধী দল। ঢাকা সহ বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে এখনও মানুষ যার যার মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। বিদেশ থেকে ফেরত মানুষরাও নিজের ইচ্ছা মত স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতেছে। এমনকি অনেকেই নতুন বিয়ে করে বউকে নিয়ে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এখনো রাতভর বিভিন্ন জায়গায় ওয়াজ মাহফিল গুলো চলমান। ধর্মীয় প্রার্থনালয়ে এখনো মানুষ নিজের ইচ্ছা মত আসা যাওয়া করতেছে। এমন কি ‘করোনা’ প্রভাব বিস্তার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মধ্যে ধর্ম চর্চাও অনেক বেড়ে গেছে। যেটাকে নিয়ন্ত্রণ করা কোনভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

ওয়াজ মাহফিল গুলোতে হুজুররা উদ্ভট সব কথা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতেছে। এক হুজুর বলেছেন ‘করোনা’ আল্লাহর তরফ থেকে রহমত। আরেক হুজুর বলেছেন এটা এটা আল্লাহর তরফ থেকে একটি গজব। মুফতি কাজী ইব্রাহীম বলেছেন, করোনায় মুসলমানদের কোনো ভয় নেই। মুফতি রফিক উল্লাহ আফসারী বলেছেন, করোনা বলতে কিছুই নেই এগুলো সবই গুজব।

অন্য এক হুজুর বলেছেন, কাবা শরীফ বন্ধ হবে সৌদি আরবের মসজিদ বন্ধ হবে, কুয়েতের মসজিদ বন্ধ হবে, কিন্তু বাংলাদেশের মসজিদ বন্ধ করতে দেওয়া হবে না, দরকার প্রয়োজনে বাংলাদেশে জিহাদ ঘোষণা করা হবে।

কাজী ইব্রাহীম বলেছেন, ‘করোনা’ ভাইরাস মামুন মারুফ নামে এক ব্যক্তিকে স্বপ্নে বলেছে, তারা এসেছে মুসলমানদের রক্ষা করতে এবং বিধর্মীদের ধ্বংস করতে। এইসব উদ্ভট কথা বলে ধর্মীয় হুজুররা বিভিন্ন জায়গায় অপপ্রচার চালিয়ে মানুষকে ভ্রান্ত করে যাচ্ছে।

সরকার এখন পর্যন্ত এসব হুজুরদের ব্যাপারে কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেয়নি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই এইসব হুজুরদের উদ্ভট কথাবার্তা সমর্থন করে। মুসলিম হিসেবে কিছুই হবে না বলে লাফিয়ে-লাফিয়ে নিজের ইচ্ছা মত চলাফেরা করতেছে।

ভারতের পরিস্থিতি বাংলাদেশ থেকেও ভয়াবহ। ইতিমধ্যেই ভারতে ‘করোনা’ ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য গোমূত্র পান করা শুরু হয়ে গেছে। ভারত সরকারের বিভিন্ন এমপিরাও এটাকে সমর্থন করে এটা নিয়ে কাজ করতেছে। এই হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্রের অনেক ধর্মীয় নেতাই মনে করতেছেন, গরুর গোবর, আর গোমূত্র হচ্ছে ‘করোনা’ ভাইরাসের সবচেয়ে বড় ওষুধ।

ভারতে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে, ২২০ জন। মারা গেছে ৫ জন।
সুস্থ হয়েছে ২০ জন।
বাংলাদেশ-ভারত যেহেতু পাশাপাশি দেশ সেই ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত হলে দুইদেশ একসাথেই হবে।

খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মান্ধরাও বসে নেই। দক্ষিণ কোরিয়ায় একই সাথে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হওয়ার কারণ হিসেবে এক মহিলার গির্জায় যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। তারপর থেকেই কোরিয়ায় ধর্মীয় প্রার্থনালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশেও আজকে একটি গির্জায় খ্রিস্টান ধর্মালম্বীরা এই ভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করেছে।

এই হচ্ছে বাংলাদেশ এবং বিশ্ব। ধারণা করা হচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ হতে পারে। যেহেতু বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি, এবং বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আর আমাদের শিক্ষা সেবাও এতটা উন্নত নয়। তাই এটা এখনি নিয়ন্ত্রণ না করতে পারলে বাংলাদেশে এটা মহামারী আকার ধারণ করবে।

বাংলাদেশে ভাইরাসটা নিয়ে আশা করার মত তেমন কিছুই নেই। এখন পর্যন্ত যতটুকু সাফল্য আশাকরা যায় তার মধ্যে একটি হচ্ছে ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’ একপ্রকার ‘কিট’ তৈরি করেছে, যেটা দিয়ে এই ভাইরাসটা সনাক্ত করা যাবে। আর সরকারও এটাকে অনুমোদন দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সকল প্রকার সভা-সমাবেশ এমনকি ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ধর্মান্ধ, বাঙালি জনগণ এটা কতটুকু মানবে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

তৃতীয়ত – সেনাবাহিনীকে ইতিমধ্যেই দুইটি কোয়ারেন্টাইন সেন্টারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিদেশ থেকে ফেরত সকল যাত্রীকেই এখন সরাসরি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখা হবে।

এই ভাইরাস থেকে কিভাবে মুক্ত থাকা যায় এবং ভাইরাসটা নির্মূলে কি কি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
১ – প্রয়োজনীয় কাজ ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া।
২ – কারো বাসায় বেড়াতে না যাওয়া এবং কাউকে বেড়াতে আসতে না দেওয়া।
৩ – বাইরে বের হলে ‘হ্যান্ড গ্লাভস’ এবং ‘মাক্স’ ব্যবহার করা।
৪ – নিয়মিত হাত মুখ শরীর এবং জামা কাপড়, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
৫ – ঘন ঘন পানি পান করা, এবং বারবার হাত সাবান দিয়ে দোয়া।
৬ – অসুস্থ হওয়া রোগীকে দেখতে না যাওয়া, করোনা আক্রান্ত রোগি যে এলাকায় পাওয়া গেছে সেই এলাকার আশেপাশে না যাওয়া।
৭ – মসজিদ, মন্দির, গির্জায় না গিয়ে সকল প্রকার ধর্মীয় এবাদত ঘরেরই মধ্যে পালন করা।

শরীর অসুস্থ থাকলে অথবা করোনাভাইরাস নিয়ে সন্দেহ থাকলে নিচের এই নাম্বারগুলোতে যোগাযোগ করতে পারেন।

– বাংলাদেশ
01937000011 – 01937110011
01927711784 – 01927711785
01401184551 – 01401184555
01401184560

– কলিকাতা
633-23412600
1800-31388-4222

আসুন ধর্মীয় গোঁড়ামি, উগ্রতা, ধর্মান্ধতা পরিহার করে সচেতন হই, নিজে বাঁচি অন্যকে বাঁচাই। মনে রাখবেন ভাইরাস কোন মানুষ না, যে ধর্ম দেখে আক্রমণ করবে। যদি তাই হত, তাহলে কোন ধার্মিকই মারা যেত না।

আমরা বাঙালিরা খুবই ধর্মভীরু, আমরা যেহেতু সব বিষয়ে সৌদি আরবকে অনুসরণ করে চলি, তাই আমাদের উচিত এই ভাইরাসটি নিয়েও সৌদি আরবকে অনুসরণ করে চলা। তারা যেভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে, ঠিক একইভাবে আমাদেরও পদক্ষেপ নেওয়া।

মনে রাখবেন টাকা দিয়ে ভাড়া করে আনা হুজুরদের ওয়াজ মাহফিল শুনে বিভ্রান্ত হবেন না। টাকা ছাড়া তারা কেউই ওয়াজ-মাহফিলে আসে না কারণ এটাই তাদের একমাত্র ব্যবসা। তারা যদি সত্যিই ধর্মের পক্ষের মানুষ হতো, স্রষ্টাকে ভয় করত, মানুষকে ভালবাসতো, তাহলে তারা কখনোই ১/২ ঘন্টা ধর্মীয় আলোচনা করে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে যেতে পারত না।

বাংলার হুজুররা কোন কিছুতেই সৌদি আরব থেকে বেশি জানে না। তারা আপনাকে রাতভর সস্তা বিনোদন দিয়ে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারবেনা। টাকা ছাড়া তারা কখনো কোথাও ওয়াজ মাহফিলে ধর্মীয় আলোচনা করতে চায় না, এই বিষয়টা মাথা খাটিয়ে লক্ষ্য করুন। সবচেয়ে ভালো হয় মধ্যপ্রাচ্যের দিকে লক্ষ্য করুন, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান এখানে কাউকেই ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া হয় না।

যে হুজুর অথবা মন্দিরের পুরোহিত বা গির্জার ফাদার উদ্ভট কথা বলে আপনাদেরকে বিভ্রান্ত করতেছে, তাদেরকে ‘করোনা’ আক্রান্ত রোগীদের কাছে চলে যেতে বলেন, দেখবেন তারা কেউই সেখানে যাবে না। কেননা সবাই স্বর্গে যেতে চায়, কিন্তু কেউ মরতে চায় না।

আমাদের জীবন একটাই, আর আমাদের জীবনকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বটা আমাদের। তাই সচেতনতার শুরুটা আপনার-আমার থেকেই হোক।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 4 =