মানুষ মহামারী প্রকৃতি

পৃথিবীতে এমন কোনো প্রজন্ম বাদ নাই, যে প্রজন্ম মহামারীর সম্মুখীন হয়নি । কখনো কখনো তো প্রাকৃতিক মহামারীর মাঝেই মানুষ নিজেই যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধ করে মহামারী ঘটিয়েছে । মানুষ নিজেই নিজেদের মেরেছে । তবে প্রাকৃতিক মহামারী কৃত্রিম মহামারীর থেকে বহুগুণে বেশি ভয়ঙ্কর । মানুষ যখন থেকে কোনো ঘটনাকে লেখায় বা লিপিতে সীমাবদ্ধ করতে শিখেছে, সেই সময় থেকে ইতিহাস অন্তত তাই বলেছে ।
সৃষ্টির শুরু থেকেই হয়তো মহামারী বিদ্যমান, তবে আমাদের বলতে পারার,জানতে পারার দৌড় প্রাচীনে যতদূর পর্যন্ত আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক বা লিখিত ইতিহাসের দৌড় । প্রাচীন যুগেও মহামারী হয়েছিল, এ যুগেও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে । এটাই প্রকৃতির নিয়ম- সে মানুষ যত কিছুই আবিষ্কার করুক না কেন, যত নতুন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার করুক না কেন, পৃথিবীতে টিকে থাকতে যা কিছুই আবিষ্কার করুক না কেন ! মানুষ একটার পর একটা ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া,অসুখকে প্রতিহত করতে প্রতিষেধক আবিষ্কার করে যাবে; প্রকৃতিও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে একটার পর একটা নতুন করে রুপ পাল্টে দিয়ে অসুখ,ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়ার অবতরণ করে যাবে । এটাই প্রকৃতির রহস্য, হয়তো এটাই প্রকৃতির নিয়ম । আর এজন্যই হয়তো মানুষ এককালে প্রকৃতির শক্তির বা রহস্যের কাছে হার মেনে প্রকৃতিকে কল্পনার জগতে বসিয়ে দিয়ে মনেই আবিষ্কার করে ফেলেছে এক অলৌকিক বা কাল্পনিক প্রকৃতি এবং যেখান থেকে মানুষ মুক্তি পেতে চেয়েছে বাস্তব প্রকৃতির বিভিন্ন অমানবিক চক্র থেকে । মুক্তি পেতে মনের কল্পনা জগতেই বসিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন দৈবিক চরিত্রকে, স্থান,গোষ্ঠীসমাজ বিশেষে যে দৈবিক চরিত্রগুলোর রুপ ভিন্ন । যার অনেক পরে ধীরে ধীরে মানুষ তাঁর মনের মধ্যে বাসা বেঁধে থাকা বিশ্বাসের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটিয়ে জন্ম দিয়েছে ধর্মের; সামাজিক ভাবে সিস্টেমেটিক্যালি চলার জন্য । ….এরপরে যুগে যুগে ধর্মের বর্তমান অবস্থা পর্যন্ত । প্রাচীনের গ্রীক, সেলটিক(ভারতীয় ধর্মের আর্য সংস্কৃতি ও দেবতাগুলোর সঙ্গে এই সেল্টিক সংস্কৃতি এবং দেবতার অনেক মিল আছে), প্যাগান(ইব্রাহিমীয় ধর্মের পূর্বসূরি এই প্যাগান ধর্ম । বর্তমান ইসলাম ধর্মের ‘আল্লাহ’ সেই প্যাগানদের মধ্যে প্রচলিত ‘আল্লাহ’ নামের দেবতা; যে লাত,মানাত ও উজ্জাতের পিতা ছিল যেকারনে ইব্রাহিমীও যেকোনো ধর্মের ধর্মগ্রন্থে ‘আল্লাহ’ শব্দটি পাওয়া যায়), ভুডু, নর্সের মতো বহু ধর্ম বিলুপ্ত হয়ে গেছে । এখন বর্তমানে যে ধর্মগুলো পৃথিবীতে বিদ্যমান এগুলো ঐ প্রাচীন ধর্মগুলোই কিছুটা নতুনত্বের খোলস পড়ে কিছুটা আধুনিক হয়েছিল, যে ধর্ম গুলো এখনো বর্তমান সমাজের সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ । বর্তমান যুগের সঙ্গে যতটুকু সামঞ্জস্যপূর্ণ মানুষ ততটুকুই এখন মেনে চলতে পারে ধর্মের, বাকিটা বা সম্পূর্ণ মানতে পারেনা কারন বর্তমান জেনারেশনের সঙ্গে ১৫০০/২০০০/২৫০০ বছর আগের জেনারেশনের মিল নাই । বর্তমানের এই ধর্মগুলোও জেনারেশন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ভবিষ্যতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, কিংবা পুরাতন খোলস ছেড়ে নতুনত্ব ধারণ করে নতুন পরিচয় বহন করবে ।

যাইহোক; মানুষ যুগে যুগে নিজেকে, নিজেদের সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে এসেছে প্রকৃতির সঙ্গে বিভিন্ন ভাবে । প্রকৃতিও তাঁর নিজের মতো করেই কালের পর কাল চলছে; হয়তো মানুষ প্রকৃতিকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পেরেছে ।
ইতিহাসের পাতায় মহামারী নতুন কিছু নয় । ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া কিংবা যেকোনো অসুখ বিসুখও নতুন কিছু নয় । যুগে যুগেই এই সংক্রমণ, মহামারী জীবজগতে আছড়ে পরেছে-
৪৩০ খ্রিষ্টপূর্ব: ‘দ্য প্লেগ অব এথেন্স’ নামে পরিচিত পৃথিবীর প্রথম ঐতিহাসিক দলিলকৃত প্লেগ মহামারী। এ সংক্রামকে গ্রীসের এথেন্সে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা যায়, যা ছিল ওই নগরের ২০ শতাংশ মানুষ ।
৫৪১ খ্রিষ্টাব্দ: দ্য প্লেগ অব জাস্টিনিয়ানবাইজান্টাইন । ৫৪০-৫৪১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে মিশরে এক ভয়ানক প্লেগের উৎপত্তি ঘটে। ইতিহাসবিদদের মতে, এ সময় মহামারীর চূড়ান্ত পর্যায়ে সেখানে প্রতিদিন গড়ে ৫ হাজার মানুষ মারা যেত!প্রায় ৫০ বছর টিকে থাকা এই মহামারী আড়াই কোটি মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়। কিছু সূত্রে সংখ্যাটা ১০ কোটিতেও ঠেকেছে । প্রাচীন পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক এই মহামারীই ইউরোপে ‘ডার্ক এজ’র সূচনা করেছিল ।
১৩৪৭-৫১ খ্রিষ্টাব্দ সময়কালই ছিল ব্ল্যাক ডেথের সবচেয়ে বিধ্বংসী সময়। প্রায় ২০০ বছর ধরে টিকে থাকা এই সংক্রামকে ১০ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন!
১৮৬০ সাল: দ্য থার্ড প্লেগ প্যানডেমিক । উৎপত্তিস্থল চীনে । ভারত,আফ্রিকা,ইকুয়েডর,যুক্তরাষ্ট্র সহ বিভিন্ন দেশে প্রায় দুই দশক স্থায়ী এ মহামারীতে প্রাণ হারায় ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মানুষ।
১৭৯৩ সাল: ইয়েলো ফিভার এপিডেমিক অব আমেরিকা । আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ায় ১৭৯৩ সালে ইয়েলো ফিভার মহামারী আকার ধারণ করে। এতে প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ মারা যায়।
১৫১৯ সাল: স্মলপক্স এপিডেমিক অব মেক্সিকো ।বর্তমান মেক্সিকোতে ১৫১৯ সালে স্মলপক্স ছড়িয়ে পড়লে দুই বছরে মারা যায় প্রায় ৮০ লাখ মানুষ ।
১৯১৬ সাল: দ্য পোলিও এপিডেমিক অব আমেরিকা । ১৯১৬ সালে পোলিও রোগ প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে।
১৯১০ সাল: দ্য প্লেগ এপিডেমিক অব ফার্স্ট ডিকেড । বিশ শতকের সবচেয়ে বড় প্লেগ মহামারী দেখা দেয় ১৯১০ সালে। চীনের মাঞ্চুরিয়ায় দুই বছরে মারা যায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষ।
২০০৯ সাল: সোয়াইন ফ্লু এপিডেমিক । বিশ্বজুড়ে ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লুতে ১৮,৫০০ জন মারা গেছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।
২০১৪ সাল: ইবোলা এপিডেমিক । পশ্চিম আফ্রিকায় ২০১৪ সালে ইবোলা জ্বরে মারা যায় অন্তত ১১,৩০০ জন ।
এগুলো গেল বিখ্যাত কুখ্যাত যাই বলেন সেই মহামারীগুলো । এছাড়াও আরো বহু মহামারী মনুষ্য সমাজের মাথার উপর দিয়ে স্রোতের মতো গেছে । কলেরা,টাইফয়েড,এইচআইভি সংক্রমণ আরও অনেক অনেক । তাঁর মাঝেই ঘটেছে বড়ো বড়ো বন্য বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ,যা একেক সময় মহামারীর রুপ নিয়েছিল । তাঁরপরেও জীবজগত বেঁচে আছে । উদ্ভিদ নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে প্রকৃতিকেই কাজে লাগিয়ে অভিযোজন প্রক্রিয়ায় নিজেকে বাঁচিয়ে রেখেছে, প্রাণী বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতে করতে যুগে যুগে বিবর্তিত হয়েছে । যারা সংগ্রাম করতে পারেনি তাঁরা বিলুপ্ত হয়েছে ।
এখন এই একুবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে আমরা সম্মুখীন হয়েছি 2019 novel coronavirus(COVID-19) বা দ্য করোনা প্যানডেমিক-এর । আমরা মুখোমুখি হয়েছি আরো এক সংগ্রামের । ভাইরাস যখন এসেছে তখন তা রটিয়ে-ঘটিয়েই যাবে, পূর্বে ইতিহাসে অন্যান্য ভাইরাস যা ঘটিয়ে গিয়েছিল । হয়তো হাজার বা লক্ষাধিক প্রাণ কেড়ে নেবে, কিংবা কোটিতে ছুবে । হয়তো আমি থাকবো না, অথবা আপনি । হয়তো আমাদের অনেক পরিচিত মানুষই হারিয়ে যাবে । হয়তো কোথাও শ্মশান বানিয়ে দিয়ে যাবে । তবুও আমাদেরকে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে সংগ্রাম করতে হবে । এবারই শেষ নয়, প্রকৃতি ভবিষ্যতেও এরকম আরো অনেক ভাইরাস, ব্যকটেরিয়া অবতরণ করবে, মানুষকেও প্রতিবার ভ্যাক্সিন, প্রতিষেধক, ওষুধ আবিষ্কার করে যেতে হবে । কোনো দৈবিক অলৌকিক শক্তি এসে আমাদের বাঁচাবে না, পূর্বেও বাঁচায়নি, কেউ এসে বাঁচিয়ে দিয়ে চলে যায়নি । মানুষ নিজেই বেঁচেছে, আমাদের নিজেদেরকে বেঁচে থাকার কৌশল অবলম্বন করতে হবে । এজন্য আমাদের সচেতন থাকতে হবে, ভাইরাস থেকে কিভাবে দূরে থাকা যায় সেই চেষ্টা করতে হবে ।

পৃথিবীতে যতবার ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া জনিত মহামারী আঁচড়ে পরেছে, তাঁরপরে অনেক সময় লেগেছে তাঁর প্রতিষেধক তৈরি করতে । হয়তো মানুষ যদি বিশ্বাসে ডুবে না থেকে বর্তমানের মতো নিজের মস্তিষ্ককে উন্মুক্ত করতো তাহলে সম্ভবত সময় লাগতো না বেশি । হয়তো মানুষ যদি হিন্দু মুসলমান খৃষ্টান বৌদ্ধ করে ব্যতিব্যস্ত হয়ে না থাকতো,বাস্তব সম্মত হতো, প্রকৃতিকে বোঝার চেষ্টা করতো তাহলে হয়তো সময় লাগতো না বেশি ।
গত কয়েক শতক থেকে মানুষ বিজ্ঞানসম্মত হতে শিখছে যার জন্যেই গত শতাব্দীর মহামারী গুলো তাড়াতাড়ি আটকানো গেছে ।
এবারের ভাইরাসও নেমেছে শক্ত হাতে, যে প্রতিমুহূর্তে নিজের রুপ পরিবর্তন করতে সক্ষম; আমরা কেউই জানিনা এই ভাইরাসের প্রতিষেধক কবে আবিস্কার হবে, আশা রাখি খুব তাড়াতাড়িই হবে ।
তাই এখন আমরা যত তাড়াতাড়ি ধর্ম, অন্ধবিশ্বাস, কাল্পনিক জগতের মাতলামি থেকে মুক্ত হবো তত তাড়াতাড়িই আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতে সুস্থ জীবনযাপন করতে শুরু করবো । নাহলে এখন যেমন করোনা ভাইরাসের সামনে হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান, বৌদ্ধ, আল্লাহ, ভগবান,ভারত পাকিস্তান বাংলাদেশ লড়াই যুদ্ধ সবকিছুই তুচ্ছ মনে হচ্ছে সেরকমই ভবিষ্যতে আরো মনে হবে । আবারো আমাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারে আরো একটা “ডার্ক এজ” । সুতরাং আমাদের উচিত নিজেদের মস্তিষ্ককে উন্মুক্ত করে বিজ্ঞান সম্মত হওয়া কাল্পনিক জগত ছেড়ে । আমাদের বেঁচে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে বাস্তবসম্মত ভাবে কোনো অলৌকিক শক্তির উপর ভরসা না করে ।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

64 − 55 =