ম্যালেরিয়া রোগের ঔষধ করোনাভাইরাসে আক্রান্তদের জন্য ব্যবহার হবে।

France24 ফ্রান্সের এটি একটি নির্ভরযোগ্য ও জনপ্রিয় পত্রিকা গত ২০/০৩/২০২০ ইং তারিখে রিপোর্ট করেছে ম্যালেরিয়া ঔষধ হয়তো করোনাভাইরাস মোকাবলায় সহযোগিতা করতে পারবে। তবে ফরাসী ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ অ্যান্ড মেডিকেল রিসার্চ, যা ইউরোপীয় Clinical Trail প্রোগ্রামটি চালাচ্ছে। তারা বলেছে- ম্যালেরিয়া ঔষধ হাইড্রোক্সাইক্লোরোকুইনের কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের রোগীদের যদি অতিরিক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে এটি ইউরোপে বৃহৎ আকারে করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহৃত ওষুধের তালিকায় যুক্ত করা হবে।

জীবন থেকে নেয়া আমার ক্ষুদ্র আলোচনা:

(১) আমার ছেলেবেলা বনজঙ্গল ঘেরা পাহাড়েই বেড়ে ঔঠা। ম্যালেরিয়া রোগ গ্রামে এই ঘরে ঐ ঘরে লেগেই থাকতো। পাহাড়ে খুব কম পরিবার পাওয়া যাবে, যাদের জীবনে একবার ম্যালেরিয়া রোগ হয়নি। এই রোগটা মূলত পাহাড়ি বন-ঘেষা অঞ্চলে মশার কামড়ের মাধ্যমে জীবানু প্রবাহিত একটি রোগ। সবাই কম বেশি এই রোগটা সম্পর্কে জানেন। আমি যখন হাইস্কুলে পড়তাম তখন আমার একবার ম্যালেরিয়া হয়েছিল। পরে আমার বড় ভাইও আমার মাধ্যমে সংক্রমিত হন এই রোগে। এই রোগটি যতদূর জানি যার হয় তাকে কামড়ানো মশা যদি অপরকে কামড়ায় তবে জীবানু পরের ব্যাক্তির শরীরে প্রবেশ করে রোগ ছড়ায়। আর শরীরে ম্যালেরিয়া জীবানু বাসা বাঁধলে অগণিত জীবানু বংশবৃদ্ধি হয়ে সংক্রমিত হতে থাকে সারা শরীরে। ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হতো “জেসোকুইন বা ক্লোরোকুইন”। একসময় আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে এই ম্যালেরিয়া রোগের প্রভাব খুব বেশি ছিল। যার কারনে দিনে দিনে চিকিৎসা ব্যবস্থাও যথেচ্ছ ভালোভাবে পাহাড়ে গড়ে ওঠেছে। সমতল অঞ্চলে এ রোগের পরিচিতি বা প্রভাব ততটা ছিল না। কারন সমতলে এই রোগ নেই বললে চলে। ঠিক চিকিৎসাব্যবস্থাও তেমন সমতলে ভালো নয়। এমনও শুনেছি তখনকার সময়ে সমতলের কোন বাঙালী পুলিশ চাকুরীর বদলীসূত্রে পাহাড়ে এসে যদি ম্যালেরিয়া রোগে আক্রান্ত হন, ভালো হওয়ার পর যদি সমতলে গিয়ে পুনরায় ম্যালেরিয়া হয়, আবার পাহাড়ে ম্যালেরিয়া চিকিৎসা করাতে গেছেন।

(২) যাক এখন মূল কথায় আসি: পাহাড়ে যখন আমার ম্যালেরিয়া হয়েছিলো, তখন সমতল থেকে তেমন একটা এমবিবিএস পাশ করা ডাক্টার চোখে পড়তো না। পুরো থানায় একজন কি দুই’জন ডাক্টার কালেভদ্রে পোস্টিং পেতেন। আবার কয়েকমাস পর বদলী হয়ে অন্যত্র চলে যেতেন। আর যারা আসতেন তারাও নবীন ডাক্টার ম্যালেরিয়া রোগ সম্পর্কে তেমন চিকিৎসার ধারনা রাখতেন না। সেইসময় আমাদের এলাকায় বয়সে নবীন অত্যন্ত সুদর্শন এমবিবিএস ডাক্টার ছিলেন ডা: শহীদ। বাবা ফ্যামিলি প্লানিং অফিসে চাকুরির সুবাধে বাসাতে প্রথমে ডাক্টার শহীদকে ডেকে নিয়ে আসা হয়। জ্বরের তাপমাত্রা বেশি থাকায় ম্যালেরিয়া পরীক্ষা করানো হয়। এরপর রিপোর্টে ম্যালেরিয়া আসায় আমাকে চিকিৎসা করিয়েছেন আমার সম্পর্কের মেসোমশাই Medical Assistant প্রয়াত ডা: সুরেন্দ্রীয় চাকমা। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। এলাকায় ডাক্টার সুরেন একনামে সবাই চিনতেন এবং তার ম্যালেরিয়া রোগ চিকিৎসার জন্য খুব নাম ডাক ছিলো। চাকমা রেজিস্টার্ড ডিপ্লোমা চিকিৎসক ছিলেন একমাত্র তিনি। আমার রোগ নির্ণয় হওয়ার পরে তিনি এক সপ্তাহ সেবনের জন্য ঔষধ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন ম্যালেরিয়া এবার পালাবে। তার প্রেসক্রাইব করা ঔষধ কোর্স সেবনের পরে সত্যি ম্যালেরিয়া পালিয়েছিলো আর জীবনে এখন পর্যন্ত ম্যালেরিয়া হয়নি। তিনি এ গ্রাম ঐ গ্রামে এভাবে অনেক ম্যালেরিয়া রোগী ও অন্যান্য রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্য করেছিলেন। এমনও অভিজ্ঞ ছিলেন রোগীর সিমটম দেখেই বুঝতে পারতেন এই রোগী ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত। যার কারনে নতুন এমবিবিএস ডাক্টাররা তার সহায়তা নিতে কার্পণ্য করতেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের তার মেধা ও পারদর্শিতাকে কম বয়সে হারিয়েছি। ম্যালেরিয়া এমন রোগ প্রচন্ড জ্বর, মাথাধরাসহ সারাশরীর ব্যাথা অনুভূত হয়। একবার ভালো হলেও যদি কোন একটা জীবাণু শরীরে বেঁচে থেকে যায় আবার হবার সম্ভাবনা থাকে। এই রোগে শরীরে জ্বরের তাপমাত্রা ১০২ থেকে সর্বোচ্চ ১০৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রা পর্যন্ত উঠে। মনে আছে আমার শরীরে তাপমাত্রা তখন ১০৩ ডিগ্রী পর্যন্ত ঔঠেছিলো। আমি নাকি জ্বরের ঘোরে অনেক আবুল তাবুল বকেছিলাম সারারাত্রি। ভালো হবার পরেও মুখে খাবার রুচি একদম উঠে গিয়েছিলো। এরকম ম্যালেরিয়া, সেরিব্রাল ম্যালেরিয়ার রোগীর বাস্তব অভিজ্ঞতা কাহিনী বলে শেষ করা যাবেনা।

(৩) করোনাভাইরাস রোগটা ম্যালেরিয়া রোগ থেকে ভিন্ন হলেও রোগের সিমটমের তফাৎ কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বেশি দেখছেন না। সম্ভবত ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে ৭০ বছর আগেও এই ম্যালেরিয়ার প্রভাব বিস্তার যথেষ্ট ছিলো। যার কারনে এখন তারা এই ঔষধটা নিয়ে গবেষণা করছে করোনাভাইরাস মোকাবেলায় প্রয়োগ করা যায় কিনা।

(৪) আশার কথা হলো পাহাড়ের মানুষ বনজ শাকসবজি খান বলে ম্যালেরিয়া রোগ তেমন একটা কাবু করতে পারেনি। হয়তো বনজ লতাপাতা শাকসবজির বা পাহাড়িদের প্রাকৃতিক খাদ্যভ্যাসের মধ্যেই এই রোগ প্রতিরোধের ঔষধ ছিলো। এছাড়া পাহাড়ি ভূমি পুত্র বলে Resistance Power ও জেনেথিকেলি পাহাড়ীদের বেশী থাকে। তাই আমি বিশ্বাস করি পাহাড়ে মানুষের বিশেষ করে আদিবাসীদের এই করোনাভাইরাস রোগে আক্রান্ত হলেও মারা যাওয়ার হার অন্যান্যদের থেকে অনেক কম হবে বা নাও হতে পারে। তবে সচেতনতা সবসময় মূল্যায়ন করেই চলা উচিত। কারন আমরা পুরো বিশ্বে জনসংখ্যায় অনেক কম। বাংলাদেশের বৃহৎ বাঙালি জাতির জনসমুদ্রের তুলনায় আমরা সংখ্যায় খুবিই খুবিই নগণ্য। একজনও যদি এই ভাইরাসে মারা যায় তা নি:সন্দেহে জনসংখ্যার অনুপাতে অপূরণীয় ক্ষতি হবে। তাই আসুন পাহাড়ে ও সমতলে সকলে করোনাভাইরাস রোগ সম্পর্কে আমরা সচেতন হই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও সরকারি নিয়ম-বিধিগুলো মেনে চলি।
তথ্যসূত্র:https://www.france24.com/en/20200320-will-an-old-malaria-drug-help-fight-the-coronavirus

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of