মরণ ও মশকারি

সিগারেট কিনতে দোকানে গিয়েছিলাম। একটি গলির মধ্য দিয়ে প্রায় ৯০০ মিটার হেঁটে যেতে হচ্ছিলো। সেই গলিতে একমাত্র মানুষ আমি। আজকে অনেক রোদ উঠেছে। অথচ, জার্মানেরা বাড়ি থেকে বের হয় নি। মানুষজন না দেখতে পেরে আমার খুব অস্বস্তি লাগছিল। কোন সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ করেই আমি হাততালির শব্দ শুনি।

আমি আশেপাশে তাকাই, কিন্তু কাউকে দেখতে পাই না। দু’চার কদম হেঁটে যেতেই আমি গিটারের শব্দ শুনতে পাই। আমি থেমে যাই। গলির দুপাশের বিল্ডিং এর দিকে তাকালে দেখতে পাই- প্রতিটি ফ্লোরের বারান্দা ও জানালা দিয়ে মানুষজন তাকিয়ে আছে। আমার একটু অস্বস্তি লাগে। একটু আগে, মানুষজন না দেখতে পেরে আমার অস্বস্তি লাগছিল। আর এখন এতোগুলো মানুষ আমার দিকে তাকিয়ে আছে- এটা দেখে আরও অস্বস্তি লাগতে থাকে।

কোন এক বারান্দা বা জানালা থেকে কোন একজন উচ্চস্বরে আমাকে বলে- হ্যালো আমার প্রিয় বন্ধু, আশা করি তুমি সুস্থ আছো!

আমি উত্তর দেওয়ার আগেই দুদিক থেকে গিটারের শব্দ শুনতে পাই। আমার মুখে হাসি ফুটে উঠে। সবাই মিলে গান গাইতে শুরু করে। জার্মান গান। অর্ধেক বুঝেছি। যতোটুক বুঝেছি তা হল- বসন্ত এসে গেছে, গাছের পাতাও ঘুম থেকে জাগতে শুরু করেছে, পাখিরাও আবার ফিরে আসতে শুরু করেছে, পার্কের বেঞ্চগুলো মানুষের জন্য অপেক্ষা করছে, মানুষ তার ভালোবাসার মানুষের সাথে সময় কাটাবে আর একদিন স্মৃতি রেখে চলে যাবে।

গান শেষ হলে তাদেরকে বিদায় জানিয়ে আমি সামনের দিকে উৎফুল্লের সাথে দোকানের উদ্দেশ্যে আবারও হন্টন করতে থাকি। একটু সামনে গেলেই দেখি বিশাল লম্বা চওড়া দুজন পুলিশ। তারা আরও কয়েকজনের সাথে হাসিমুখে কথা বলছে। তাদের দেখে আমার ভালো লাগে।

দুজন পুলিশের সামনে গেলে তারা আমাকে শুভ দিন বলে শুভেচ্ছা জানায়। আমিও তাদের শুভ দিন বলি।

পুলিশ আমাকে জিজ্ঞেসা করে- কোথাও যাচ্ছেন?
আমি বলি, সিগারেট কিনতে।
পুলিশ জিজ্ঞেস করে, এটা কি আপনার খুবই দরকার?
আমি বলি, হ্যাঁ। আমার চাহিদা।
পুলিশ মাথা নাড়িয়ে বলে, তাহলে তো খুব জরুরী!

আমি তাদের কাছে বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাই।
তারা আমাকে জার্মানিসহ ইউরোপের করোনার ভয়াবহতা সম্বন্ধে অবগত করে। এবং কয়েকটি ফোন নাম্বার দেয়।
পুলিশ জিজ্ঞেস করে, আপনি কোথা থেকে? এবং পরিস্থিতি কী?

আমি বলি, বাঙলাদেশ। অবস্থা খুব একটা ভালো না। মৃত ২/৩ আর আক্রান্তের সংখ্যা ৩০/৪০ হবে।

পুলিশ বলে, ওয়াও, তাহলে তো তোমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা অনেক উন্নত এবং রাষ্ট্র অনেক ভালো ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে

আমার খুব হাসি পায়। কিন্তু আমি কোন উত্তর দেই না। মিথ্যে বলা আমার পক্ষে সম্ভব না আর সত্য বলার আগ্রহও কেনো জানি হচ্ছিল না।

তাদের দিন যেন ভালো কাটুক – এই বলে স্থান ত্যাগ করি। বাড়ি ফেরার সময় বারবার ওবায়দুল কাদের এর ‘করোনার চেয়েও আওয়ামীলীগের শক্তি অনেক বেশি’ মনে পড়ছিল।

Leave a Reply

avatar
  Subscribe  
Notify of