সভ্যতার সংকট করোনা!

পৃথিবীর ইতিহাসে এমন কিছু কিছু ঘটনা সংগঠিত হয় যা পৃথিবীর ইতিহাসকে চিরতরে বদলে দেয়। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যা চিরতরে পৃথিবীকে বদলে দিয়েছিল তেমনি বিশ্ব বর্তমানে এক বিশেষ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে তা হল করোনা সংকট! বহু দেশের বিদগ্ধ পন্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর ইতিহাসে আর এত বড় সংকট কখনও আসেনি, তাই অনেকে একে ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ সঙ্গে ও তুলনা করেছেন! অন্য বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে এই বিশ্বযুদ্ধের তফাত হল সেই বিশ্বযুদ্ধে বন্দুক, বোমা ও বারুদের আঘাতে কোটি কোটি মানুষের জীবন ধ্বংস হয়েছিল, এক্ষেত্রে এক অদৃশ্য ভাইরাস বা এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গোটা মানব সভ্যতা আজ অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে নেমেছে! যদিও মানব সভ্যতার বিবর্তন লক্ষ্য করলে বোঝা যায় মানুষ কিন্তু কোন দিনই হেরে যায় নি, তাই এই সংকট থেকে মানুষ ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে তবে তাঁর প্রতিক্রিয়া কতটা ভয়াবহ হবে তা এখনই বলা মুশকিল!

ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখলে বলা যায় মোটামুটি কয়েক শতাব্দী অন্তর বিশ্বব্যাপী এমন মহামারীর আবির্ভাব হয়, যা মানব সভ্যতাকে তীব্রভাবে সমস্যায় ফেলে কিন্তু মানব সভ্যতা ঠিকই এই সমস্যা থেকে মুক্তি লাভ করে। এখন ঐতিহাসিক আঙ্গিকে কিছু ভয়াবহ মহামারীর দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করা যাক।

□ Antonine Plague বা অ্যান্টোনিন প্লেগ (165-180) খ্রিস্টাব্দ।

Plague of Galen বা গ্যালেনের প্লেগ নামেও পরিচিত (রোমান সম্রাট গ্যালেনের নাম অনুসারে) এই অ্যান্টোনাইন মহামারীতে এশিয়া মাইনর, মিশর, গ্রীস এবং ইতালি প্রভাবিত হয়েছিল। এই রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন 2000 মানুষের মৃত্যু হয়। এর মৃত্যু হার ছিল 25%। এর ফলে প্রায় 5 মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় 50 লক্ষ মানুষ মারা যায়। এর ফলে কোন কোন অঞ্চলে রোমের জনসংখ্যা এক তৃতীয়াংশ কমে যায়!

□ Plauge of Justinian.

সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্ট্যানটিনেপালে 541 খ্রিস্টাব্দে এই মারণ প্লেগ রোগ দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন ইঁদুর, সাপ ইত্যাদি প্রাণী থেকে এই রোগ ছড়িয়ে ছিল। ভূমধ্যসাগর থেকে মিশরে এই রোগ ছড়িয়ে ছিল। ইউরোপ, এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও আরবের প্রায় 30 থেকে 50 মিলিয়ন মানুষ (3-5 কোটি) এই রোগে মারা যায়। এই রোগের প্রাদুর্ভাবে তৎকালীন পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল। সম্রাট জাস্টিনিয়ানের আমলে এই প্লেগ রোগ হয়েছিল তাই একে জাস্টিনিয়ান প্লেগ বা Pleague of Justinian ও বলা হয়।

□ Black Death বা কালো মড়ক।

প্লেগ ভাইরাসের সাদৃশ্যমূলক এই ভাইরাসটি প্রায় 800 বছর পর ইউরোপে আক্রমণ করে। এই ব্ল্যাক ডেথ বা কালো মড়ক মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি বীভৎস, অমানবিক ও কালো অধ্যায় হিসাবে রয়ে গেছে মাত্র চার বছরে এটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং এই মহামারীর কবলে পড়ে ইউরোপ, আফ্রিকা এবং এশিয়া মহাদেশের 200 মিলিয়ন মানুষ (20 কোটি) মৃত্যুবরণ করে! যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন এটির উৎসস্থল ছিল এশিয়া তবে তা ইউরোপে বিস্তার লাভ করে। বিশেষজ্ঞরা ইঁদুর থেকে সংক্রমিত প্লেগ রোগের সঙ্গে এই রোগের বহু সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন!

□ The Great Plague of London.

Black Death বা কালো মড়কের পর প্রায় 20 বছর অন্তর 1348-1665 প্রায় 300 বছরের অধিক সময় 40 বার এই প্লেগ রোগটি ফিরে আসে এবং এরফলে ব্রিটেনের প্রায় 20 শতাংশ নর, নারী ও শিশুর মৃত্যু হয়। তবে এই প্লেগ রোগটি 1665 সালে সর্বোচ্চ মহামারী আকার ধারণ করে! এই রোগে মাত্র 7 মাসে লন্ডনের প্রায় 1,00,000 মানুষ মারা যান। এই মহামারীটি ইতিহাসে The Great Plague of London নামে পরিচিত।

□ Small Pox.

ইউরোপ, এশিয়া ও আরব ভূখন্ডে স্থানীয় ভাবে এই রোগটি শতাব্দী সময় উপস্থিত ছিল, এর ভয়াবহতা এত বেশি ছিল যে এর ফলে প্রায় 10 জন মানুষের মধ্যে তিন জনের মৃত্যু হয়! পঞ্চদশ শতকে এই রোগটি প্রথম ইউরোপে আবিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে আঠারো শতকে আমেরিকা ও ম্যাক্সিকোতে এর ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। 1796 খ্রিস্টাব্দে এডওয়ার্ড জেনার নামে এক জনৈক চিকিৎসক Small Pox এর টিকা আবিষ্কার করে মানব সভ্যতাকে এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেন।

□ Cholera.

ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে (1852-1860) এই কলেরা রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্রিটেনে প্রায় 10 হাজার মানুষ মারা যায়। পরবর্তীকালে এটি ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে ও লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়, অনেকে মনে করেন এতে 10 লক্ষের অধিক মানুষ মারা যায়। এছাড়া এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং আফ্রিকাতেও এটির প্রকোপ দেখা গিয়েছিল।

□ Spanish Flu.

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে 1918 সাল থেকে 1920 সাল পর্যন্ত এই ফ্লু মহামারী আকারে দেখা যায়, ইনফ্লুয়েঞ্জার এই মহামারীর জেরে প্রায় 50 মিলিয়ন বা 5 কোটি মানুষের মৃত্যু হয়! যদিও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন সংখ্যাটি 10 কোটি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছিল। ভারতবর্ষে ও কয়েক মাসের ফ্লুর আঘাত হয়েছিল ভয়াবহ! শুধুমাত্র ভারতবর্ষে এই স্প্যানিশ ফ্লু র আক্রান্তে সরকারি মতে প্রায় 1 কোটি 80 লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়, যদিও বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা ছিল আরও অধিক। এরফলে 1918 সালের তৎকালীন ভারতবর্ষের জনসংখ্যা প্রায় 6 শতাংশ কমে গিয়েছিল। তাই এইরকম মহামারীর ভয়াবহতা কতটা হতে পারে তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতা ভারতবাসীর রয়েছে!

‘স্প্যানিশ ফ্লু’ নামকরণটি অদ্ভুত হবে সংগঠিত হয়েছিল। অনেকে মনে করেন এটি প্রথমে ইংল্যান্ডে দেখা যায়, আবার অনেকে মনে করেন এই ফ্লু টি প্রথমে আমেরিকার কেনসাসে ধরা পড়ে, তারপর আমেরিকা ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। সরকারের চরম দমন নীতি ও পুঁজিপতিদের চাপে আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম এই নিয়ে কোন প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারেনি। এর প্রথম প্রকাশ ঘটে স্পেনের রাজা King Alfonso XIII এই ফ্লু তে আক্রান্ত হলে স্পেনের সংবাদপত্রের মাধ্যমে এর প্রকাশ ঘটে এবং বিশ্ববাসী প্রথম এই বিপদ সম্পর্কে জানতে পারে। তাই সেখান থেকেই এর নামকরণ হয় ‘স্প্যানিশ ফ্লু’!

যাক এবার প্রাসঙ্গিক বিষয়ে আসি বর্তমান বিশ্ব আর এক মহামারীর মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়ে আছে, এর নাম হল COVID-19 যা আমাদের কাছে ‘নভেল করোনা ভাইরাস’ নামে পরিচিত। 2019 সালের 10 ই ডিসেম্বর চীনের উহান প্রদেশে প্রথম এই নভেল করোনা ভাইরাস ধরা পড়ে প্রথম দিকে চীন সরকার এর ব্যাপ্তি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি এবং ঢিলেঢালা মনোভাব নেয়, পরবর্তীকালে গত বছরের শেষ দিন অর্থাৎ 31 শে ডিসেম্বর 2019 তারিখে চীনের দেশীয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আউট ব্রেক ঘোষণা করে, এবং 30 শে জানুয়ারি ‘গ্লোবাল পাবলিক হেলথ এমারজেন্সি’ ঘোষণা করা হয়।

ভয়াবহতার দিক থেকে এই রোগ বিশ্ব ইতিহাসে যেকোন রোগকে হার মানায়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এই রোগের মারণ ক্ষমতা বিশেষ নয় যেমন- সার্সের ক্ষেত্রে 9.8%, মার্সে 34%, সোয়াইন ফ্লুতে 0.2%, ইবোলাতে 40-50% এবং কোভিড-19 বা এই করোনা ভাইরাসের মারণ ক্ষমতা মোটামুটি 4%। তাহলে প্রশ্ন হল এটি আর পাঁচটি রোগের থেকে ভয়াবহ বলা হচ্ছে কেন? তাঁর উত্তর হল এর প্রসারের ব্যাপকতা। এই ভাইরাসের মৃত্যু হার কম হলেও বায়ু বাহিত এই ভাইরাস এত দ্রুত বিস্তার ঘটে যে পৃথিবীর ইতিহাসে এত দ্রুত কোন ভাইরাস বিস্তার ঘটাতে সক্ষম হয়নি। মাত্র 2-3 মাসের মধ্যে এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে। পৃথিবীর মোট 196 টি দেশের মধ্যে প্রায় সব দেশে কম বেশি এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় হাজার হাজার মানুষ নতুন করে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে এবং শত শত মানুষ মারা যাচ্ছে!

এটি এই ভাইরাসের প্রাথমিক অবস্থা জানি না এর চরম অবস্থায় পৌঁছালে কি হবে? মানবতা আদেও টিকে থাকবে কিনা সেটাই বড় প্রশ্ন? এই লেখাটি যখন লিখছি তখন বিশ্বব্যাপী এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা 4,35,374 জন, মৃত্যু হয়েছে 19,618 জন মানুষের এবং 1,11,878 জন মানুষ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে এসেছেন। যদিও বলা ভালো এই পরিসংখ্যান প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় পরিবর্তিত হচ্ছে ও হবে। এই ভাইরাস এত দ্রুত পরিবেশের সঙ্গে পরিবর্তন হয় যে রাতদিন বিশ্বের বিভিন্ন গবেষকরা চেষ্টা করে ও এখনও পর্যন্ত এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের অনুমান এই রোগের ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে ছয় মাস থেকে এক বছর সময় লাগতে পারে, তত দিন পৃথিবী কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে তা চিন্তা করলেই শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়! ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এই মহামারী এখন সবেমাত্র শুরু হচ্ছে তাই এর প্রভাব কতদূর বিস্তৃত হচ্ছে তা অনুমান করতে ও ভয় লাগে!

□ এবার প্রশ্ন হল ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান তথা উপমহাদেশ ও বিশ্বে এই করোনা ভাইরাসের প্রভাব কতটা দেখা যাবে?

এক কথায় বলতে হয় পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় মানবিক বিপর্যয় মনে হয় আর কখনও আসেনি, যে রকম বিপর্যয়ের সম্মুখীন আমরা হতে যাচ্ছি। সভ্যতা শেষ হয়ে যাবে কিনা সেটাও সন্দেহ! সত্যি বলতে কি এটা ‘মানব সভ্যতা বাঁচানোর লড়াই’! আমার এই কথাগুলিকে অনেকে অতিরঞ্জিত বা অলীক কল্পনা মনে করতে পারেন, তবে সত্যটি প্রকাশ করা আমার নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করি তাই সত্যটি প্রকাশ করছি। ইতালির মানুষেরা মনে করেন সত্যটি যদি সরকার আগে প্রকাশ করত তাহলে মানুষ অনেক বেশি সচেতন হতে পারত সরকার সত্যটি গোপন করার ফলে সমস্যা বেড়েছে। তাই আমি দেশের মানুষের স্বার্থে সত্যটি প্রকাশ করছি, সরকার হয়তো সত্য প্রকাশ করতে ভয় পাচ্ছে বা বিশৃঙ্খলা না হয় তাঁর জন্য আশ্বস্ত করছে কিন্তু আমার যুক্তি, বুদ্ধি ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের করোনা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে যা বুঝেছি তা আপনাদের সামনে তুলে ধরব। প্রথমেই বলে রাখি আমার গবেষণা, অনুমান এবং যুক্তি যদি মিথ্যা হয় সবচেয়ে বেশি খুশি হব হয়তো আমি, কিন্তু তা হবে বলে বিশেষ মনে হয় না। ভয় দেখাচ্ছি না, সত্যটি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

বিশেষজ্ঞরা যে তথ্য প্রকাশ করেছেন তা হল মোটামুটি 70% মানুষ এই রোগে সুস্থ হয়ে যাচ্ছে এবং 15% মানুষের সামান্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে, 10% মানুষের অবস্থা সংকটাপন্ন এবং মাত্র 4% মানুষ এই করোনা রোগে মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছেন। এবং এই তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ যুবক যুবতীরা এই রোগ থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন সাধারণ বৃদ্ধ বৃদ্ধা, শিশুরা এবং উচ্চরক্তচাপ, হার্টের অসুখ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, ধূমপায়ী ইত্যাদি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। যেমন ইতালিতে বৃদ্ধ মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বেশি। তাই সরকার বা বিজ্ঞানীদের তরফ থেকে মানুষকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে! কি পাঠক একটু আশ্বস্ত হলেন কি?

কিন্তু এই পরিসংখ্যানের মূলগত কিছু সমস্যা রয়েছে। তাহল এই পরিসংখ্যানটি মূলত আমরা উন্নত বিশ্ব চীন, ইতালি, জার্মানি, ব্রিটেন ইত্যাদি দেশের কাছ থেকে নিয়েছি। এইসব দেশে প্রতি হাজার মানুষ পিছু বেডের সংখ্যা যথেষ্ট ভালো এবং উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। যেমন- জার্মানি প্রতি 1000 মানুষ মাথাপিছু হাসপাতালে বেডের সংখ্যা 8.3% (2013 এর তথ্য অনুযায়ী), গ্রিণল্যান্ড 14.4% (1970), ইউএসএ 2.9% (2013), ইউকে 2.8% (2013), ইতালি 3.1% (2013), চীন 4.2% (2012)। অন্যদিকে ভারতে সেখানে প্রতি হাজারে মাথাপিছু হাসপাতালের বেডের সংখ্যা 0.7% (2011), আফগানিস্তান 0.5% (2018), বাংলাদেশ 0.8% (2015), পাকিস্তান 0.6% (2014)। এখন ভারতের হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে জার্মানি, ইতালি বা ব্রিটেনের চিকিৎসার তফাত নিশ্চিয়ই না বললে ও চলবে। তাহলে প্রশ্ন হল যেখানে এইসব উন্নত দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারছে না, সেখানে ভারতের মত এত জনবহুল ও মধ্যআয়ের দেশের পক্ষে এই লড়াই কতটা কঠিন তা সহজেই অনুমান করা যায়! আর ভারতের যদি এই অবস্থা হয় তাহলে উপমহাদেশের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, নেপাল বা ভুটানের অবস্থা কি হবে তা অনুমান করুন!

তাই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে কিছুদিন আগে সার্ক দেশগুলির বৈঠক হয় এবং সার্ক দেশগুলি যাতে এই মহামারী থেকে রক্ষা পায় তার পরিকল্পনা করা হয়। এই লক্ষ্যে ভারত $10 মিলিয়ন ডলারের একটি ফান্ড গঠন করে এবং বিভিন্ন মেডিক্যাল সামগ্রী ও ডাক্তার দিয়ে উপমহাদেশে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দেয়। উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের এটি নৈতিক কর্তব্য ও বটে উপমহাদেশের মানুষকে এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা করা! প্রকৃতপক্ষে উপমহাদেশ পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা জনবহুল এলাকা এবং এখানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দারিদ্র মানুষ বসবাস করেন। তাই উপমহাদেশের সুরক্ষার জন্য সকলকে একসঙ্গে কাজ করা প্রয়োজন, আশার কথা উপমহাদেশের সকল দেশ ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ একসঙ্গে কাজ করার আঙ্গিকার করেছে। ইহা উপমহাদেশ তথা বিশ্বের জন্য মঙ্গলকর!

প্যানডেমিককে চারটি দফায় ভাগ করা হয়। প্রথম দফায় বিদেশ থেকে এইরোগে আক্রান্ত মানুষ দেশে আসেন। দ্বিতীয় দফায় পজিটিভ কেস থেকে লোকল স্তরে সংক্রমণ ঘটবে। তৃতীয় স্তরে রোগটি কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু জায়গায় বিস্তীর্ন হয়। চতুর্থ দফায় এটি এপিডেমিক হয়ে যায় অর্থাৎ এটা দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে এবং এই রোগের কোন শেষ নেই বলে মনে হয়, যেমন- ইতালি। মনে করা হয় চীন চতুর্থ স্তর পেরিয়ে আসার মুখে তবে সেদেশে যেরকম মিডিয়ার স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ করা হয় সেক্ষেত্রে চীন বিশ্বের কাছে সত্য প্রকাশ করছে কিনা সেটা বড় প্রশ্ন। তবে চীনের মতো একনায়কতান্ত্রিক দেশে যেভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব তা বিশ্বের কোনও গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষেই সম্ভব নয়। তাই ইতালি এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে এখনও সেভাবে সফল হতে পারেনি! এশিয়ার আর এক দেশ ইরান ও করোনা ভাইরাসে ভয়ংকর ভাবে আক্রান্ত!

□ এবার প্রশ্ন হল ভারতের মতো দেশে করোনা কতটা প্রভাব বিস্তার করবে?

এ প্রসঙ্গে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় জার্মানির চ্যান্সেলার অ্যাঞ্জেলা মার্কেল তাঁর এক ভাষণে স্পষ্টভাবে বলেন তিনি মনে করেন জার্মানির 70 শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হবে। অন্যদিকে WHO এর মতে ব্রিটেন বা আমেরিকাতে 50-60% মানুষ এই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হল ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান বা উপমহাদেশে এই সংখ্যা কতদূর যেতে পারে? প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো উপমহাদেশে অশিক্ষিত, মূর্খ ও ধর্মান্ধ মানুষের সংখ্যা প্রচুর। এরা আইন কানুন মানতে চায় না, সাধারণত নাগরিক কর্তব্য পালন করে না এবং সরকারি নিয়ম নীতি মেনে চলতে চায় না। তাই ভারতবর্ষে শহর ও বড় রাস্তায় লক ডাউন হলেও গ্রামেগঞ্জে, পাড়ার মধ্যে মানুষের জটলা ঠিকই লেগে রয়েছে।বড়ো বড়ো কিছু মন্দির, চার্চ বন্ধ হলেও এখনও মন্দির, মসজিদ, ইসলামী জলসা, হরিনাম সংকীর্তন, বিয়ে বাড়ি ইত্যাদি লেগেই রয়েছে এর ফলে সমস্যা আরও গুরুতর হচ্ছে!

সেইসঙ্গে অন্ধবিশ্বাস ও গুজবের ফলে সমস্যা আরও গুরুতর হচ্ছে কেউ কেউ মনে করেন গোমূত্র পান করলে বা গোবর মাখলে করোনা ভাইরাস নির্মূল হবে। আবার অনেকে মনে করেন চিকেন বা আমিষ খেলে করোনা হয়। কোন এক মোল্লা বলেছে থানকুড়ি পাতা আর বাতাসা দোয়া পড়ে খেলে করোনা ভাইরাস হবে না, আবার অনেকে মনে করেন কোরানে করোনা ভাইরাসের কোন উল্লেখ নেই তাই মুসলমানদের করোনা ভাইরাস হবে না, গুজব ছড়ানো হচ্ছে ও তাকিয়াবাজি চলছে যে মুসলমানদের করোনা ভাইরাস আক্রমণ করে না, করোনার দোয়া পড়লে করোনা নির্মূল হয়, আবার কোথাও কোথাও শুনতে পাচ্ছি ‘করোনা বালা’ তাড়াবার জন্য দিনে ‘পাঁচ বারের’ পরিবর্তে ‘সাত বার’ আজান দেওয়া হচ্ছে এবং ছেলে, বুড়ো সকলকে বাধ্যতামূলক ভাবে ‘সাত ওয়াক্ত’ নামাজ পড়তে বাধ্য করা হচ্ছে অর্থাৎ কার্যত হাজার হাজার মানুষকে মৃত্যু মুখে পতিত করা হচ্ছে ইত্যাদি…।

যেখানে কাবা বন্ধ হয়ে গেছে সেখানে এরা তা মানবে না অর্থাৎ অন্ধত্ব ও মূর্খামির চরম নিদর্শন অথচ প্রশাসন এবিষয়ে বিশেষ কিছুই জানে না, আর জানলে ও এত ধর্মান্ধ, উগ্র ও মূর্খ জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নিত সেটাই বড় প্রশ্ন! এক দেশ বা এক জাতির মানুষ কতটা ধর্মান্ধ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন হলে এমন আজগুবি তথ্য বিশ্বাস করে ভাবুন! এর ফলে এক বিরাট অংশের মানুষের মধ্যে সরকারি নির্দেশ না মানার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এর ফলে করোনা মহামারীর সমস্যা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হচ্ছে! অন্যদিকে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে এক ধরনের ইসলামি মৌলবাদীরা সরকারের লকডাউনের বিরোধীতা করছে ও বড় বড় ইসলামি জমায়েত করছে এরফলে দেশের করোনা মহামারীর সম্ভবনা আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে!

ভারতের মতো দেশে এমন বহু মানুষের করোনা আক্রান্ত হওয়ার কথা জানা যাচ্ছে যাঁরা কোন দিন বিদেশে যাননি, বা বিদেশি কারোর সঙ্গে সংস্পর্শে আসেনি অর্থাৎ এথেকেই কিছু চিকিৎসক অনুমান করছেন ভারতে হয়তো করোনা ভাইরাস তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে। করোনাকে দ্বিতীয় স্তরে রুখে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে তা না হলে তৃতীয় স্তরে পৌঁছে গেলে তাঁকে রোখা খুবই মুসকিল, আর একবার তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করলে এপিডেমিক বা মহামারী হতে বেশি সময় লাগবে না এই চতুর্থ স্তরে যদি দেশ একবার পৌঁছে যায়, সেক্ষেত্রে এর প্রভাব কি হবে কল্পনা করতে ও ভয় লাগে! বায়ু বাহিত করোনার প্রসার এত দ্রুত হয় যে একে রোখা যে কোন দেশের প্রশাসনের পক্ষে ভীষণ কঠিন! ইটালিতে প্রথম করোনা ভাইরাস আক্রান্তের খবর পাওয়ার এক থেকে দুই মাসের মধ্যে করোনাতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা 40,000 এ পৌঁছায় এবং বর্তমানে সেখানে মৃত্যুর মিছিল দেখা যাচ্ছে! WHO এর তথ্য অনুযায়ী বিশ্ব জুড়ে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক লক্ষে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল 67 দিন, এক থেকে দুই লক্ষে পৌঁছাতে সময় লেগেছিল 11 দিন এবং তিন থেকে চার লক্ষে পৌঁছাতে সময় লাগে 4 দিন। এ থেকেই বোঝা যায় এই ভাইরাস কত দ্রুত গতিতে প্রসারিত হয়!

একবার এই ভাইরাস যদি ভারতে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে এর ফলে ভারতের সর্বোচ্চ 70-80% মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে অর্থাৎ 13×8= 104 কোটি অর্থাৎ প্রায় 100 কোটি ভাবা যায়! যেহেতু এই দেশে মানুষ আইন কানুন বিশেষ মানেন না, দারিদ্র্যতা, অজ্ঞতা ইত্যাদির জন্য হয়তো সঠিকভাবে মানাও সম্ভব নয়, তাহলে প্রশ্ন হল দেশের কি হবে? বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এপিডেমিক স্তরে যদি এই ভাইরাস ভারতে ছড়িয়ে যায় তাহলে সবচেয়ে কম 20-30 শতাংশ মানুষ করোনায় আক্রান্ত হবে। অর্থাৎ 130 কোটি ভারতবাসীর মধ্যে কম করে 13×3= 39 অর্থাৎ প্রায় 40 কোটি মানুষ এই করোনায় আক্রান্ত হবে এবং যদি সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা হয় তাহলে ও 4% মানুষের মৃত্যুর সম্ভবনা রয়েছে কিন্তু ভারতে সঠিক চিকিৎসার অভাবে মৃত্যুহার 10% ও হতে পারে! সেই হিসাবে কম করে ভারতের 4 কোটি মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হতে পারে। যদিও 40 কোটি মানুষের চিকিৎসা পৃথিবীর কোন ও দেশের কোন ও সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়, তাই ভারতে কার্যত কোটি কোটি মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যেতে পারেন!

ঐতিহাসিক আঙ্গিকে দেখা যায় ‘স্প্যানিশ ফ্লুর’ আঘাতে 1918 সালের তৎকালীন অখণ্ড ভারতে 1 কোটি 80 লক্ষ বা প্রায় 2 কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল যা ছিল তৎকালীন জনসংখ্যার 6%, সেই অর্থে 130 কোটির দেশে 6% অর্থাৎ কম করে প্রায় 7.8-10 কোটি মানুষ মৃত্যু মুখে পতিত হতে পারে! আর সর্বাধিক যদি 70-80% মানুষ আক্রান্ত হয় তাহলে কত মানুষের জীবনহানি ঘটতে পারে তা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আমার নেই! তাই সচেতনতা একান্ত কাম্য!

এরই মধ্যে চীনে নতুন করে ‘হান্টা ভাইরাস’ নামে এক ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে। এই ভাইরাসটি ইঁদুরের কামড়, ইঁদুরের মলমূত্র, লালার সংস্পর্শে এলে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ইঁদুরের মল থেকে বাতাসে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে, এটি শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষের মৃত্যুর কারণ হতে পারে! করোনা ভাইরাসের সঙ্গে এর বহু উপসর্গের মিল রয়েছে। চীনের ইউনান প্রদেশে 1 ব্যাক্তির এই হান্টা ভাইরাসে মৃত্যু হয় এবং তাঁর সঙ্গে বাসে যাতায়াত কারী 32 জন মানুষ আক্রান্ত হয় তাঁদের ও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ভাইরাসের মৃত্যু হার ভয়ংকর 38% অর্থাৎ এই ভাইরাস বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে গেলে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষায় বিপন্ন হয়ে পড়বে। তবে আশার কথা হল এই ভাইরাস মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না। অনেকে মনে করেন করোনার মতো এটি এত দ্রুত ছড়ায় না। তবুও সকলকে সচেতন থাকতে হবে!

করোনা ভাইরাস আজ মানব জাতিকে যে প্রশ্নটির সম্মুখে দাঁড় করিয়েছে তা হল ঈশ্বরের অস্তিত্ব আদেও আছে কি? ঈশ্বর আজ কোথায়? পৃথিবীর ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম কাবা, ভ্যাটিকান, তিরুপতি, ওয়েলিং ওয়াল সবই একসঙ্গে বন্ধ। ঈশ্বর আজ নিজের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারছে না, তা কোটি কোটি মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে কি করে? বিশ্বের কোটি কোটি ধার্মিক মানুষরা তাঁদের ঈশ্বর, আল্লা, ভগবান, গডকে ডাকছে পৃথিবীকে এই মহামারী থেকে রক্ষা করতে। ঈশ্বর, আল্লা, ভগবান, গড আজ কোথায়? জাকির নায়েকের মতো ধর্মান্ধ মোল্লারা বলতে পারেন এটা আল্লা ঈমানের পরীক্ষা নিচ্ছে। তা প্রশ্ন হল এ কেমন পরীক্ষা যেখানে কোটি কোটি মানুষের মৃত্যু নিয়ে ভগবান পরীক্ষা করে? এমন উদ্ভদ, নিষ্ঠুর সৃষ্টিকর্তার কি কোন প্রয়োজন রয়েছে?

মানবতার এই চরম সংকটতম মুহূর্তে ও বিভিন্ন ধর্মের সৃষ্টিকর্তাদের টনক নড়ে না, কোন চমৎকার করে না, মানুষের বিপদে পাশে এসে দাঁড়ায় না, সেই নিস্পৃহ ঈশ্বরকে মানার কারণ কি আছে? এই সৃষ্টিকর্তা মানুষকে শুধু ভয় দেখাতে জানে, প্রার্থনা চাই ও মানুষে মানুষে বিভেদ ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করে, এমন অসুস্থ মনের সৃষ্টিকর্তাকে মানার কি কোন প্রয়োজন রয়েছে? আজ বিশ্বের সমস্ত ধর্মান্ধরা মিলে বেদ, কোরান, বাইবেল, গীতা ইত্যাদি পড়ে ও এই ভাইরাসের কোন ওষুধ আবিষ্কার করতে পারছে না কেন? মানুষকে বাঁচাতে পারছে না কেন? মানুষকে বাঁচাতে সেই মানুষ ও বিজ্ঞান আজ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে। তা আজ আমাদের চিন্তা করতে শিখতে হবে এই ভন্ড, সাম্প্রদায়িক ঈশ্বরকে গ্রহণ করব না মানবিক বিজ্ঞানকে গ্রহণ করব?

এবার প্রশ্ন হল এই মহামারী থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের কি করতে হবে? এই করোনা ভাইরাস বিশ্বকে একটি দেশে, একটি সংস্কৃতিতে পরিণত করেছে! এই বিপদের দিনে মানুষ উপলব্ধি করতে শিখছে মানুষের জীবন কতটা মূল্যবান এবং মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হল সে মানুষ! কিসের জন্য এত ধন সম্পদ, হানাহানি, খুনোখুনি, হিংসা, বিদ্বেষ? মানব সভ্যতার এই সংকট জনক মুহূর্তে সমস্ত ধর্ম, জাতি, বর্ণ, দেশের ভেদাভেদ মুছে যাক এবং সকলকে একসঙ্গে এই সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে তবেই এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী 21 দিনের লকডাউন ঘোষণা করেছে এটা খুবই প্রয়োজন ছিল ভাইরাস রুখতে এটা খুবই কার্যকরি একটি পদক্ষেপ। প্রতিটি মানুষের উচিত এই লক ডাউনকে মেনে চলা যাতে এই ভাইরাস সমাজে না ছড়িয়ে পড়ে, কারণ একবার এটি চতুর্থ স্তরে পৌঁছলে এর কি পরিণতি হতে পারে তা আগেই উল্লেখ করেছি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর লক ডাউনের পদক্ষেপটি উত্তম কিন্তু প্রশ্ন হল শুধু লক ডাউন ঘোষণা করে, হাততালি দিলে ও ঘন্টা বাজালে এই সমস্যার সমাধান হবে না। এভাবে করোনা ভাইরাসকে রোখা যাবে কি? করোনা ভাইরাস রুখতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন করতে হবে এবং ব্যাপকভাবে পরীক্ষা, পরীক্ষা আর শুধুই পরীক্ষা করতে হবে। তবেই কোভিড-19 আক্রান্তদের চিন্হিত করা সম্ভব হবে ও আক্রান্ত ব্যাক্তিদের কোয়ারান্টাইনে রাখতে হবে ও চিকিৎসা করতে হবে, তবেই সমস্যা ধীরে ধীরে সমাধান হবে। তাই সরকারের প্রয়োজন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এই পরীক্ষা করা। পাশাপাশি সরকারি আদেশ ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলা যেমন- ঘন ঘন হাত ধোওয়া ও নিজের বাড়িতে থাকা এগুলিই এই রোগ ছড়ানো আটকাতে সাহায্য করবে। সেই সঙ্গে সচেতনতার প্রসার ঘটানো এবং প্রয়োজন পড়লে জাতির স্বার্থে ভলেন্টিয়ার সার্ভিসে যোগ দান করা!

সরকারকে আর এক দিকে গভীর দৃষ্টি নিক্ষেপ করা প্রয়োজন এই লক ডাউনের ফলে কেউ যেন না খেয়ে মরে, সেদিকে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে! আর প্রকৃতপক্ষে এই লকডাউন কিন্তু সবেমাত্র শুরু হয়েছে, এই লকডাউন কতদিন চলবে তাঁর কোন ধারণা করা এখন সম্ভব নয়। এই অবস্থা তিন থেকে ছয় মাস ও চলতে পারে! এরফলে বিশ্বব্যাপী এক অর্থনৈতিক মহামন্দার সৃষ্টি হতে পারে, এর থেকে রক্ষা করা ও অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রতিটি সরকারের কর্তব্য।

এই সময় সাধারণ মানুষের সরকারকে বিশেষ ভাবে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। কারণ সাধারণ মানুষ যদি সরকারকে সহযোগিতা না করে তাহলে কোন পরিকল্পনায় কার্যকর করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে সরকারকে দেখতে হবে জনতার যেন খাদ্য, বস্ত্র ও আশ্রয়ের কোন অভাব না হয়। সরকারকে সাধারণ মানুষের হাতে অর্থ প্রদান ও কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। কেরালা সরকার যেখানে 20,000 কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকার স্বাস্থ্য খাতে মাত্র 15,000 কোটি টাকার করোনা ফান্ড গঠন করেছে যা এই মহামারী রোখার জন্য পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। আসলে আদানি, আম্বানিদের প্রধান্য না দিয়ে দেশের গরীব মানুষের উপর গুরুত্ব দিলে দেশের অনেক মঙ্গল হতো। 45 বছরে সর্বাধিক বেকারত্ব তাই সরকারকে হিন্দু মুসলমান না করে এই বিপদের দিনে কাজের সুযোগ বৃদ্ধি করা উচিত।

এই করোনা ভাইরাস একই সঙ্গে বিশ্বকে আর একটি প্রশ্নের সম্মুখীন করে তুলেছে পুঁজিবাদী অর্থনীতি কি মানুষের জন কল্যাণে কোন কাজে লাগে? আমেরিকার বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। স্পেনের সরকার এই বিপর্যয় সামাল দিতে সমস্ত বেসরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলিকে অধিগ্রহণ করেছে। যে এয়ার ইন্ডিয়াকে সরকার কিছু দিন আগে বেঁচে দিতে চেয়েছিল সেই এয়ার ইন্ডিয়া বিদেশ থেকে করোনা আক্রান্তদের দেশে ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সরকারকে আজ স্বাস্থ্য সুরক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, নুন্যতম আয় ইত্যাদি নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। তাহলে এ থেকেই প্রমাণিত বাজার অর্থনীতি যদি শুধু মুনাফার জন্য চলে সেটা দেশের গরীব মানুষের কি কাজে লাগবে? তাই প্রয়োজন সমাজতান্ত্রিক মূলবোধের চেতনায় কল্যাণকামী রাষ্ট্র গড়ে তোলা!

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত তথা বিশ্বের অর্থনীতি কোন দিকে যাবে সেটাই বড় প্রশ্ন? বিশ্ব জুড়ে মহামন্দা আসতে পারে এবং ভারতের অর্থনীতি নেগেটিভ ও হয়ে যেতে পারে। চারিদিকে দুর্ভিক্ষ দেখা দিতে পারে। তাই পৃথিবীকে বাঁচাতে পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকারকে আমেরিকার পূর্বতন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মতো ‘New Deal’ বা New economic policy নিতে হবে এই নীতির ফলে দেশের মানুষের সমস্যা দূরীভূত হয় এবং অর্থনীতি সেই 1929 এর মহামন্দা থেকে ধীরে ধীরে বের হতে পেরেছিল। বর্তমানে এক মহামন্দার দিকে ঝুঁকে থাকা পৃথিবীকে বাঁচাতে এইরকম নীতি নেওয়া প্রয়োজন তবেই ধীরে ধীরে এই পরিস্থিতি থেকে আমরা বের হতে পারব। প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক সমাজ ব্যবস্থা ও অর্থনীতি ফিরে পেতে কতদিন সময় লাগবে সেটাই লাখ টাকার প্রশ্ন!

এখন প্রশ্ন হল এই করোনা ভাইরাসের ফলাফল কি হতে পারে? সত্যি বলতে কি এই করোনা ভাইরাসের ফলাফল কি হবে তা জানি না। আমার মতো গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানের কিছু হলে সুচিকিৎসা পাব কিনা জানি না? সত্যি বলতে কি আগামী কয়েক মাস পর পৃথিবীতে আমার অস্তিত্ব থাকবে কিনা জানি না, আমার পরিচিত বহু মানুষ, বহু বুদ্ধিজীবী থাকবেন কিনা জানি না! হয়তো আমরা ইতিহাসের পাতার অংশ হয়ে যেতে পারি, তবে এটা ভেবেই ভালো লাগছে যে পৃথিবীকে সাধ্যমতো কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। পৃথিবীকে অনেক কিছুই দিতে চাই কিন্তু কতটুকু সময় পাব সেটা জানি না। তবে আমি মনে করি যতদিন বাঁচি আনন্দ করে, ভালবাসা নিয়ে, মানুষের জন্য বাঁচি এতেই জীবনের সার্থকতা!

আমরা যদি না থাকি পৃথিবীতে জ্ঞানের আলো জ্বালাতে নতুনদের এগিয়ে আসতে হবে, পৃথিবীতে জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে হবে। এই করোনা ভাইরাস বা তথাকথিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তির পর পৃথিবীকে নতুন করে চিন্তা করতে হবে এত রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজন আছে কিনা? সমস্ত জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সীমান্তের বেড়াজাল ভেঙ্গে আমরা মানব এবং আমাদের একটাই পরিচয় হোক আমরা মানবদরদী বিশ্ববাসী, সেদিকে কি আমরা এগোতে পারি না? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যেমন জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তেমনি এক করোনা বিশ্বযুদ্ধের পর শোষণ মুক্ত, ধর্মান্ধতা মুক্ত, কাঁটাতারের বেড়াজাল মুক্ত এক সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন কি দেখা যায় না?

মানব সভ্যতা রক্ষার এই লড়াইয়ে সকল মানবের সহযোগিতা একান্ত কাম্য, মানবতার প্রসার ঘটুক সেটাই চাই। ভীষণ ভাবেই চাই করোনা নিয়ে আমার সমস্ত অনুমান যেন মিথ্যা হয়ে যায়, সব কিছুই যেন অলীক কাল্পনিক কাব্য হিসাবে রয়ে যায়! জানি না আগামী দিনে পৃথিবীর জন্য কি রয়েছে, আমরা ইতিহাসের যুগ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছি ও ইতিহাস রচনা করছি! শুধু একটাই আশা মানব সভ্যতা কোন দিন হারতে শেখেনি তাই আমাদের সম্মিলিত প্রয়াসে নিশ্চয়ই এই অসীম লড়াইয়ে জয়যুক্ত হব! এই আঘাতে জরাজীর্ণ পৃথিবী নতুন করে, নতুন ভাবে বিকশিত হবে সেটাই আশা রাখি। আমরা আশারাখি ইন্টারনেটের যুগে নিশ্চয়ই আমরা অনেক বেশি সচেতন থাকব, মানুষকে ভালোবাসবো, এবং মানুষকে সহযোগিতা করব! এভাবেই আমরা এই মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয় লাভ করব। আমাদের ছোট ছোট কর্মের মাধ্যমেই আগামী প্রজন্মকে এক সুন্দর পৃথিবী গড়তে সাহায্য করব। সেটাই হয়তো আমাদের জীবনের অনুপ্রেরণা, আমাদের জীবনের সার্থকতা!

তথ্যসূত্র:-
1. উইকিপিডিয়া।
2. আনন্দবাজার পত্রিকা।
3. এই সময়।
4. গণশক্তি।
5. History tv.
https://www.history.com/news/pandemics-end-plague-cholera-black-death-smallpox
6. World bank hospital bed report.
https://data.worldbank.org/indicator/sh.med.beds.zs
7. The Hindu.
https://www.thehindu.com/opinion/lead/a-pandemic-an-economic-blow-and-the-big-fix/article31145451.ece

https://www.thehindu.com/opinion/lead/manmohan-singh-column-an-unrest-a-slowdown-and-a-health-epidemic/article30993765.ece

https://www.thehindu.com/opinion/op-ed/blunting-the-economic-impact-of-a-pandemic/article31122493.ece
8. The firstpost.
https://www.google.com/amp/s/www.firstpost.com/health/man-dies-from-hantavirus-in-china-all-you-need-to-know-about-the-virus-and-how-it-spreads-8184521.html/amp
9. Worldometers.
https://www.worldometers.info/coronavirus/
10. BBC Hindi.

11. Dawn.
https://www.dawn.com/news/1543642/pm-imran-urges-provinces-to-reassess-complete-lockdowns-as-strategy-against-virus

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

11 − 1 =