মানবিক কিছু আবেদন

বর্তমান পৃথিবী করোনা ভাইরাসের সঙ্গে অস্তিত্বের সংগ্রামে লড়ছে। এমন মুহূর্তে আমাদের প্রয়োজন সকল জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের পাশে থাকা তবেই মানবতা জয় যুক্ত হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে 21 দিনের লক ডাউন ঘোষণা করেছে এবং এই দিনগুলি আমাদের বাড়িতে থাকতে বলেছেন। তাই সচেতন নাগরিক হিসাবে আমরা বাড়িতে থাকব কিন্তু এরই সঙ্গে বেশ কিছু সামাজিক সমস্যা এসে উপস্থিত হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা 21 দিন লক ডাউনের ফলে দেশের দিন আনি দিন খায় মানুষের জীবনে ব্যাপক দুর্বিষহ দিন নেমে এসেছে, যদিও সরকার আশ্বস্ত করেছে ও সেইসঙ্গে ঘোষণা করেছে ‘কাউকে যেন না খেয়ে মরতে হয়, সরকার সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করবে’, সেই লক্ষ্যে 1 লক্ষ 70 হাজার কোটি টাকার অর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছে।

এটা অবশ্যই সাধুবাদ যোগ্য পদক্ষেপ কিন্তু আমাদের দেশে এই প্যাকেজ যথেষ্ট নয় প্রয়োজনে আরও বড় আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল সরকার ঘোষণা করেছে ঠিকই এবং সেই সাহায্য পেতে বেশ কিছু সময় লাগবে, আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে কেউ যেন না খেয়ে মরে! না খেতে পাওয়া মানুষ দেখলে তাঁকে খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যদি অর্থনৈতিক সামর্থ্য থাকে তাহলে গরীব, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে, কেউ যেন অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় না মরে সেদিকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কোন কিছু খারাপ দেখলে প্রতিবাদ করতে হবে এবং সরকারকে চাপ দিতে হবে যাতে তাঁরা সাধারণ মানুষের জীবন যন্ত্রণা রক্ষার উপর আরও যত্নশীল হয়!

সরকারের দায়িত্ব আছে ঠিকই কিন্তু জনগণ হিসাবে ও আমাদের কিছু কর্তব্য রয়েছে, দেশের এই দুর্দিনে আমাদের নাগরিক কর্তব্য পালন করতে হবে। জাতির লজ্জা দেশের এই দুর্দিনে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী কালোবাজারি করতে শুরু করেছে এর ফলে জিনিসপত্রের দাম প্রভূত বৃদ্ধি পাচ্ছে, সরকারকে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করার আবেদন রইল এবং জনগণের কাছে অনুরোধ এমন অসাধু ব্যবসায়ীদের দেখলে প্রশাসনকে জানান। শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় সচেতন করলেই হবে না গরীব নিরন্ন মানুষের দুঃখ কষ্ট লাঘব করতে বাস্তবিক কার্যকরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

একটি সমস্যা দেখা যাচ্ছে লক ডাউনের ফলে বহু মানুষ হাওড়া, মুম্বাই, দিল্লি ইত্যাদি জায়গায় আটকে রয়েছে তাঁরা যাতে সুস্থ ভাবে বাড়ি ফিরতে পারেন সেদিকে সরকারকে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে বা তাদের থাকা খাওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করতে হবে। সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে দেশের বহু দিন আনি দিন খায় শ্রমিক, মজদুর মানুষ এই লক ডাউনের ফলে ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে, পরিবার সমেত পায়ে হেঁটে দিল্লি ও অন্যান্য বড় বড় শহর থেকে নিজেদের গ্রামের দিকে যাত্রা করছেন। এতদীর্ঘ পথে এই সমস্ত মানুষগুলি মারা যেতে পারে! সরকারের উচিত এই সমস্ত মানুষদের তাদের বাড়ি নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা, তাঁদের খাদ্যের ব্যবস্থা করা ও যাদের ঘর নেই তাদের থাকার ব্যবস্থা করা। রাস্তায় সারি সারি ট্রাক ড্রাইভার লক ডাউনের পর তাঁদের পণ্য নিয়ে আটকে পড়ে রয়েছে তাই তাঁদের সাময়িক ছাড় দেওয়া ও তাঁদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত।

আমাদের যাদের সামর্থ্য রয়েছে তাঁরা কিছুদিন এভাবেই থাকতে পারব, কিন্তু শ্রমিক, গরীব, মানুষের কি হবে? এই বিষয়গুলি সকলকে ভাবতে হবে। তাই সকলের সহযোগিতা একান্ত কাম্য। একটা দেশ ততটাই উন্নত, যতটা সে দেশের মানুষ উন্নত হয়। নাগরিক হিসাবে আমাদের কর্তব্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো ও মানবতার পাশে দাঁড়ানো। সারা জীবন আমরা যে এত অর্থের পিছনে ছুটলাম, ভাই ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, মানুষ মানুষকে হত্যা করছে, যে সম্পদের জন্য এত বিদ্বেষ, এত হানাহানি সেই সম্পদ কি আজ আপনার কোন কাজে লাগবে? আজ করোনা ভাইরাসে যদি ঠিক ভাবে আমরা সচেতন না হয় তাহলে আমরা বাঁচবো কিনা তার নিশ্চয়তা আছে কি?

তা এত অর্থ, সম্পদ আমাদের কি কাজে লাগবে?
মন্দির, মসজিদ, গির্জাতে দান করে, পশুবলি, কুরবানী দিয়ে কি লাভ হবে? এগুলি মানব সমাজের কি কাজে লাগবে? এর ফলে আপনি পুণ্য করলেন ও স্বর্গ বা জান্নাতে যাব বলে নিজের স্বার্থ সিদ্ধি সম্পন্ন করলেন, এভাবে মানবের সমস্যাকে গুরুত্ব না দিয়ে কি জান্নাত বা স্বর্গ লাভ সম্ভব? স্বর্গ, জান্নাত বা হেভেন আছে তাঁর প্রমাণ কি রয়েছে? স্বর্গ, জান্নাত বা হেভেনে গিয়ে লাভ কি? মানব সভ্যতার এই চরম দুর্দিনে ঈশ্বর, আল্লা, ভগবান বা গড আজ কোথায়? কোথায় তাঁর চমৎকার? কোথায় তাঁর মানবতা? কিসের এমন পরীক্ষা? যে ঈশ্বর মানুষের দুঃখে দুঃখিত নয়, তেমন ঘৃণ্য ঈশ্বরকে কি আমাদের গ্রহণ করা উচিত?

বরং মানুষের পাশে থাকুন মানবতার পাশে থাকুন, মানুষের জন্য কিছু করলে দেখবেন এই পৃথিবীই আপনার কাছে স্বর্গসুখে পরিণত হবে! নিরন্ন মানুষকে অন্ন দিলে, তাঁদের মুখে হাসি ফোটালে যে সুখ, আনন্দের অনুভূতি পাবেন তা কোটি কোটি টাকা দিয়ে ও পাওয়া যায় না! তাই মানবতা রক্ষার এই লড়াইয়ে সকলকে একসঙ্গে সহযোগিতা করতে হবে। আর একটি আবেদন সামর্থ্য থাকলে সরকারি কোষাগারে ‘অর্থ সাহায্য’ করুন, সরকারকে সাহায্য করুন তবেই সরকার মানুষকে আরও সাহায্য করতে পারবে। আর প্রতিটি মানুষ তৈরি থাকুন দেশের স্বার্থে ভলেন্টিয়ার সার্ভিসে যোগ দেওয়ার আহব্বান এলে, সকলকে সহযোগিতা করতে হবে তবেই দেশ বাঁচবে!

সরকারের প্রতি আবেদন এত কম সংখ্যক বেড ও হাসপাতাল দিয়ে ‘করোনার মতো মহামারীকে’ হারানো সম্ভব নয়, দেশে লক্ষ লক্ষ বেড ও হাজার হাজার হাসপাতালের প্রয়োজন রয়েছে। তাই যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করতে হবে, না হলে দেশবাসীকে বাঁচানো সম্ভব নয়! আমাদের দেশের জনগণের প্রতি আবেদন, দেশের জনগণের সচেতনতা খুবই কম, দেশের জনগণ সরকারের এই পদক্ষেপের গুরুত্ব বুঝতে পারছেন না, অনেকেই এর জন্য সরকারকে গালমন্দ করছে ও আইন মানছে না। আসলে গরীব মানুষের পেটের জ্বালা বড় জ্বালা তাঁরা আর করোনার ভয়াবহতা কি বুঝবে! তাঁদের মত হল এমনিতেই আমরা মরে আছি, তাই করোনাতে মরে গেলে আমাদের কিছু যায় আসে না, তাই তারা ভাবিত নয়। আসলে আধুনিক সমাজ সভ্যতার প্রতি এভাবেই তাঁদের বিদ্রুপের বহিঃপ্রকাশ!

আমাদের দেশের ছোট ছোট ঘরে, গাদাগাদি করে থাকা মানুষ গুলির পক্ষে হোম কোয়ারান্টাই কি আদেও সম্ভব? তাই অনেকেই ঘরে থাকতে অস্বাচ্ছান্দ্যতা অনুভব করছেন তাই তাঁরা কোন নির্দেশ মানছেন না। সরকার লক ডাউন করাই বড় রাস্তায় যাচ্ছে না, পাড়ার মোড়ে থাকে, পাড়ার মোড়ে পুলিশের আবির্ভাব হলে তাঁরা এখন মাঠে জমায়েত হচ্ছে, সেখানেই আড্ডা, ফুটবল খেলার আসর, বাজার বসিয়ে ফেলছে। আমাদের দেশের আর্থ সামাজিক পরিস্থিতিতে এই মানুষকে বোঝানো কিভাবে সম্ভব জানি না, সেই সঙ্গে ধর্মান্ধতা ও কুসংস্কারাচ্ছনতা সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। মসজিদ, মন্দিরে যাওয়া ও পীর, ফকির, বাবা, পুরোহিতদের পরামর্শ মেলে চলার ফলে সমস্যা আরও বেড়ে চলেছে। তবুও আমাদের দেশের জনগণকে বোঝানো আমাদের সামাজিক কর্তব্য, তাই আমরা অবশ্যই সচেতন থাকব ও নাগরিক কর্তব্য পালন করব!

সত্যি বলতে কি এটা মানব সভ্যতা রক্ষার লড়াই, আমাদের মতো গরীব দেশে সকলকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই লড়াই করতে হবে এবং পৃথিবীকে বাঁচাতে হবে! তাই আজ হিন্দু মুসলমান, উচু জাত নিচু জাত, ছোট বড়, ধনী দরিদ্র, ডান বাম, দল মত নির্বিশেষে সকল ভেদ ভুলে, সরকার, মিডিয়া, জনগণ সকলকে একসঙ্গে লড়াই করতে হবে। তবেই আমাদের দেশ, সমাজ সভ্যতা ও পৃথিবী বাঁচবে! আমাদের একটাই পরিচয় হোক আমরা মানব সন্তান! আশাবাদী আমাদের এই সমূহ বিপদের দিনে মানবের মানবিকতার হার না মানার লড়াই থেকেই আমরা ‘করোনা’ নামক এই বিশ্ব মহামারীর হাত থেকে আমাদের সমাজ সভ্যতাকে রক্ষা করতে পারব এবং মানবতার জয় হবে সেটাই আশা রাখি!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

99 − = 91