হুমায়ুন আজাদঃ পাঠ ও পর্যালোচনা

ব্যক্তিগতভাবে আমি হুমায়ুন আজাদের কাছে ঋণী বিভিন্ন কারণে। যার অন্যতম একটা কারণ হলো, সন্দেহপ্রবণতা। আমার ধারণা, হুমায়ুন আজাদ প্রথাগত কোনকিছুই পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়া গ্রহণ করেন নি। এবং তিনি তার সমকালীন সমাজ ব্যবস্থা, রাষ্ট্র ব্যবস্থা, শিল্প-সাহিত্য কোনকিছু নিয়েই সন্তুষ্ট হতে পারেন নি।
ভালো হোক, খারাপ হোক, তিনি এই বাতিকটা আমার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। সম্ভবত, এটাকে ‘বাতিক’ বলাটা ঠিক হবে না। চিন্তাশীল কোন মানুষই কখনো সন্তুষ্ট থাকতে পারেন না, অন্তত আমাদের এই বদ্বীপে।

এখন আমার এই সন্দেহপ্রবণতার ফল গিয়ে দাড়ালো, আমি অনেক ক্ষেত্রে হুমায়ুন আজাদকে বাতিল বলে মনে করি। আমার বিশ্বাস এটাকে তিনি ভালো চোখেই দেখতেন। কারণ, তিনি ভক্তিবাদী ছিলেন না, ছিলেন যুক্তিবাদী।

হুমায়ুন আজাদ

হুমায়ুন আজাদের গুটিকয়েক প্রবন্ধ আর দু’একটা উপন্যাস ছাড়া বাকিসবই আমার পড়া হয়েছে।
এবং উনার সম্পর্কে আমার উপলব্ধি হলো, উনি কবি হিসেবে নিজের ভালো একটা অবস্থান করে নিতে পেরেছেন, যদিওবা অনেককেই অভিযোগ করতে শুনেছি উনি নাকি ইয়েটস, ব্রাউনিং, টমাস ডিলানদের থেকে কপি বা থিম নিয়েছেন। এটা আমার যাচাই করার সুযোগ এখনো হয় নি।

প্রাবন্ধিক হিসেবে উনাকে আমার ভালো লাগে। বিশেষ করে, উনার শব্দ চয়ন ও শব্দের বুনট এবং বাক্যের গঠন বেশ ভালো। তবে আমার মনে হয় তিনি প্রবন্ধে যা বলতে চেয়েছেন তা সবসময় গুছিয়ে বলতে পারেন নি। উনি একটা প্রবন্ধে অনেকগুলো বিষয়ের অবতারণা করেন। এটা অবশ্যই প্রশংসনীয়, কিন্তু সেগুলোর যে গুছিয়ে তুলে একটা মন্তব্যে এসে সিদ্ধি অর্জন সেটা অনেক ক্ষেত্রেই করে উঠতে পারেন নি। আগেই বলেছি উনি কোনকিছু নিয়েই সন্তুষ্ট হতে পারতেন না। এটা একটা কারণ হতে পারে।

ঔপন্যাসিক হিসেবে আমি হুমায়ুন আজাদকে যারপরনাই ব্যর্থ বলে মনে করি। উনার উপন্যাসগুলো প্রথার বিরোধিতা করে ঠিক আছে, কিন্তু উপন্যাসের চরিত্রগুলো প্রাণবন্ত হয়ে উঠে না। মনে হয়, যে চরিত্রগুলো তিনি তৈরি করেছেন তাতে তার নিজের চেহারাটাই ভেসে উঠছে। মনে হয় চরিত্রগুলোর সাথে জোর-জবরদস্তি করে চালিয়ে নিচ্ছেন। এগুলো অনেকটা ‘স্টিরিয়োটাইপ’ এর মত, গভীর কোন ভাবনা বা দর্শনের ছাপ এখানে নেই। আর উপন্যাসের শুরু, ঘটনাপ্রবাহ, সমাপ্তি কোনটাই কোনটার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে হয় না।
তিনি ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে লিখেছেন বা লিখার সাহস দেখিয়েছেন সেটা খুবই প্রশংসনীয়। কিন্তু গোড়ামির থিসিস মোকাবিলা করতে গিয়ে তিনি যখন একটা এন্টি-থিসিস তৈরি করে ফেলেন তখন তার সাথে ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য থাকে না।
একটা গোড়ামির মোকাবিলা করতে গিয়ে নতুন একটা গোড়ামির জন্ম হয়ে যায়।

ভাষাবিজ্ঞানী হিসেবে উনি কতটা সফল সেটা আমার পক্ষে বিচার করা সম্ভব নয়, আমি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভাষাবিজ্ঞান বা সাহিত্যের ছাত্র নই। যদি কখনো ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ হয় তখন মন্তব্য করা যাবে।

সর্বশেষ, হুমায়ুন আজাদ আমাদের নষ্ট-ভ্রষ্ট এই বদ্বীপে একটা উজ্জ্বল দ্যুতি। দালাল, ত্যান্দোড়, চাটুকার, ছ্যাচড়া, পা-চাটা, ইতরে পরিপূর্ণ আমাদের সমাজ, শিল্প, সাহিত্য। এসব অসভ্য, বর্বর নষ্টদের মধ্যেও সমাজটাকে মানবিক চিন্তা চেতনায় উদ্ভুদ্ধ করে মানবিক চেতনা বাঁচিয়ে রাখার জন্য হুমায়ুন আজাদদের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। তবে এখানে সতর্ক হতে হবে যেন আমরা কেউ উনার মতো কাউকে দেবতা ভেবে পূজা শুরু না করি। যেটা তিনি নিজেও পছন্দ করতেন না। ভালো-মন্দ মিলিয়েই মানুষ, আমরা ভালোটাই নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 3 =