নীলিমার এক দিন

“এই নিমো, তোর কি মনে হয় মরে যাওয়াটা খুব ভয়ের?”

– “শোন উজান, আমি তো এখনো বেঁচে আছি, তাই মৃত্যুভয়ের কথা বলতে পারিনা। তবে তোমাকে যে আমার মাঝে মধ্যে ভীষণই ভয় লাগে, সেটা জানো কি?”

সরোবরের এই নিঃসঙ্গ প্রাঙ্গনটা যেন হঠাৎই এক ফ্যাকাশে অথচ মেদুর হাসির সঙ্গ পেয়ে চঞ্চল হয়ে ওঠে।

“আমার মতো একটা ভালোবাসাগ্রস্ত মানুষকে ভয়! আমাকে? তুই পাগল নিমো, সত্যি!”

– “ভালোবাসতে পারো বলে যা ইচ্ছা করবে? একা থাকো, একগাদা ওষুধ গেলো রোজ, অবেলায় ঘুমিয়ে আমার ফোনটুকুও ধরোনা, যখন তখন ঘুরতে বেড়িয়ে যাও হাতে শুধু একটা ক্যামেরা নিয়ে, হঠাৎ করেই মুখ ফিরিয়ে নাও সব যোগাযোগ বন্ধ করে! আমাকে যে আর তোমার ভাল্লাগেনা, সেটা বলে দিলেই তো পারো…”

“একা থাকার শুরুটা কি আমি নিজের ইচ্ছায় করেছিলাম নিমো? কোথা থেকে কি হয়ে গেল সবটা আমার নিজের কাছেও স্পষ্ট নয়, আর আমি যতটুকু জানি, বুঝি; ততটুকু তো তোরও অজানা নয়। তোকেও যে বলবো, সব ছেড়ে দিয়ে চল একসাথে থাকি, তাও তো পারিনা। তোর অল্প বয়স, এখনো কত কিছু করা বাকি, আমার মতো পাগলের কাছে বাঁধা পরে গেলে চলবে কি করে? এই যে বললি ওষুধের কথা, তুই তো আবার নিজেই বলিস সবটা সময় মতো খেতে! তুই একবার বললে আমি সব ওষুধই ছেড়ে দিতে পারি, শুধু ওই ঘুমের ওষুধগুলো… ওগুলো না থাকলে আমার রাত কেমন করে কাটবে বল?
আর রইল পরে ক্যামেরার কথা, ওটা একদিন ইতিহাস বলবে, ইতিহাস, বুঝলি! এককালের পর আমি থাকব না, তুই থাকবি না, কিন্তু ওই ছবিগুলো… নিয়তি যেদিন জীবনের সব রং নিংড়ে নিয়ে পালিয়ে যাবে, সেদিন ওই ছবিগুলোই পারবে তাকে নতুন রঙে এঁকে নিতে।”

একসাথে এত কথা বলে একটু দম নিতে থামে উজান। চারিদিক গ্রাস করা নিস্তব্ধতার মাঝে ওই নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের মিহি ধ্বনিও যেন ঝংকারের মতো কানে বাজে। সামনের বাঁধানো জায়গার ধার ধরে দুটো ফড়িং-এর মনের সুখে খেলে বেড়ানো নিমো মন দিয়ে দেখছিল এতক্ষন। উজানের কথা বলা শেষ হলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাটির দিকে তাকায় সে। তার লাল হয়ে আসা চোখ দুটোকে আড়াল করে নীচু গলায় নিমো বলতে থাকে, “সুখ-দুঃখের বেরাজালেই যে আমাদের এই জীবনের বৃত্ত, উজান! সব দিন যেমন সমান ভালো যায় না, সব সময় যে মন্দ তাও তো নয়। অথচ তোমার চোখের দিকে আমি একটু তাকিয়ে থাকতে পারিনা, মনে হয় তোমার ঐ দৃষ্টির সাথে মিশে থাকা উদাসীনতার আঁচ যেন আমার ভেতরটাও পুড়িয়ে দেবে! আমার পাশে থাকা, তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া, তোমার কপালে, চোখের পাতায় আলতো চুম্বনগুলো, তোমার হাত ধরে রাস্তা পার হওয়াগুলো, আমার বুকে তোমায় লুকিয়ে নিয়ে আমাদের একসাথে কান্নাগুলোর কোনোটাই কি তোমার কষ্টের এতটুকু নিরাময় করতে পারে না?”

অনেকটা সময় দুজনেই চুপ থেকে যেন একে অপরের মন-কুঠুরিতে উঁকি মেরে সবটা বুঝে নিতে চায় এক নিমেষে। নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে উজান উদাত্ত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“এই মেয়ে, এদিকে তাকা, আহা: তাকা না! এক বাউন্ডুলের হাত যখন ধরেই ফেলেছিস, একটু সহ্য করে নে আর কয়েকটা দিন। একবার এই অন্ধকার ছিড়ে আলো খুঁজে পেতে দে, তারপর আমাদের এক আকাশ জীবনের মাঝে ঝিকিমিকি তাঁরার মতো স্বপ্নগুলোকে ঠিক পূরণ করব দেখিস…”

ঘুম ভেঙে যায় নীলিমার, চোখের কোণায় থাকা ফোঁটা ফোঁটা জল বালিশের সবটুকু ভিজিয়ে দিয়ে গেছে। বুকের কাছে জাপটে রাখা দোমড়ানো মোচড়ানো এক কাগজ…

“এই নিমো, তোর কি মনে হয় মরে যাওয়াটা খুব ভয়ের? আমার কিন্তু মনে হয় তা একেবারেই নয়। বরং বেঁচে থাকতেই অনেক শক্তি লাগে, লাগে একরাশ ধৈর্য। আমি তো আবার বড্ড অধৈর্য জানিসই! দেখ তুই রাগ করিস নারে, আমি একটু ঘুমাতে যাচ্ছি কেবল। তোর কথা মতো এবারের ঘুমটা আমি ঘুমের ওষুধ না খেয়েই দিতে যাচ্ছি। কিন্তু, ঘুম ভাঙলে তোকে দেখতে পাবো তো? তবে, যেতে যেতে আমার দ্বিতীয় প্রিয় জিনিসটা তোকে দিয়ে গেলাম, আমার ক্যামেরা। এই এই! এখন আবার এটা ভাবতে বসলি না তো যে আমার প্রথম প্রিয় তাহলে কি? তুই, তুই, শুধু তুই…
তোর কাছে যত্ন করে রাখিস, অন্য কাউকে দেখাতে যাস না আবার! তুই ছাড়া ওগুলোর মূল্য আর কেউ বুঝবে না। তার জন্য যে খুব একটা আফসোস করি, তাও না।
তোকে বলেছিলাম না, একদিন আমি থাকবো না, জীবন থাকবে না, কিন্তু এই ছবিগুলো থেকে যাবে!”

আবার আসিব ফিরে…
হয়তো মানুষ নয়
হয়তো শঙ্খচিল শালিকের বেশে…

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 7