আশংকা

গত কিছুদিন ধরে আমাকে অনেক মানুষজন মেসেজ দিয়ে আমার প্রতি তাদের আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করে যাচ্ছে। তারা ধরেই নিয়েছে যে- আমি করোনাভাইরাসের দ্বারা মারা যাবো! হয়তো তারা অনেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ বলেই তাদের স্মৃতির ভাণ্ডারে আমাকে যুক্ত করে নিতে চাইছে।

আমি যেহেতু ইউরোপে অবস্থান করছি, অর্থাৎ জার্মানির মত ডেনজার জোনে আছি, তাই- কমবেশি সকলেই আক্রান্ত ও যে কেউ মৃত্যুবরণ করতে পারে তা ধারণা করাও আবার হাস্যকর বা অযৌক্তিক নয়। আমি বিদ্রূপ করে বলছি না, পরিচিত-অপরিচিত সকলেই ভালোবেসে খোঁজখবর নিচ্ছে।

আমি যেহেতু একাকী জীবনযাপন করছি এবং উড়নচণ্ডী স্বভাবের তাই আমার আশেপাশের মানুষজনেরও আমাকে নিয়ে অনেক দুশ্চিন্তা।

জীবন আমার কাছে তুচ্ছ এক মায়াভরা ইন্দ্রিয়ের স্বাদ ও অক্লান্ত পরিশ্রমের খাটুনি। তবে, জীবন এক মধুর স্বপ্নিল আকাঙ্খাভরাময় আলোকরশ্মির খেলা। জীবন নিরর্থক; বৃষ্টিভেজা বিকেলে প্রেয়সীর শরীরে স্পর্শ করার মতই উন্মাদনা। চড়ুই পাখির কিচিরমিচির শব্দের মতই আবেগ অনুভূতির ওঠাবসা। মায়ের শরীরের ঘ্রাণের মতই কল্পনাকে বাস্তবায়িত করার ব্যাকুলতা।

গত পাঁচ বছর যাবত জীবনের প্রতি আমার খুব একটা মায়া নেই। তবে এতো দ্রুত অন্ধকারে প্রবেশ করতেও চাই না। অন্তত ৫৭ বছর আমি তাৎপর্যহীন জীবন কাটাতে চাই। মনের ভাব ও শরীরের উগ্রতা মেটাতে চাই। নিত্যনতুন অনুভূতি ও কুৎসিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে চাই। এবং সৃষ্টিশীলতার সাথে গেঁথে থাকতে চাই। নতুন নতুন মানুষের সঙ্গ ও তর্ক-সমালোচনায় প্রবন্ধ ও বেশকয়েকটি সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করতে চাই।

সম্ভবত, আমি একজন বেহিসেবি মানুষ। এবং অর্থের প্রতি আমার কোন লোভ নেই। বরঞ্চ জীবনকে উপভোগ করার জন্য পানি অপচয়ের মতই টাকা খরচ করতে আগ্রহী। এবং টিপিকাল বাঙালিদের মত মনে করি না যে, চল্লিশ ঊর্ধ্ব হলে একটা গাড়ি হবে আর পঞ্চাশ ঊর্ধ্বে একটা ফ্ল্যাট পেলেই জীবন পরিপূর্ণ।

জীবন উপভোগ, আমোদ, উন্মাদনা, কামজাগরণ, উদ্দীপনার একটি অসাধারণ সময় তারুণ্যে। প্রতিটি বয়সের একেকটি চরিত্র থাকে; বৈশিষ্ট্য থাকে, প্রথাগত জীবনে সেইসব চরিত্র ধুলোয় মিশে যায়। আর আমি প্রথাহীন। আমি এই ঊনত্রিশ বছরের জীবন- জীবনের মত উপভোগ করেছি। জীবনে যা চেয়েছি, তা নিজের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়িত করেছি। যদিও আমার জীবন সহজ ছিল না, এখনও নেই। রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নানা ধরনের কঠিন, কষ্টকর, যন্ত্রণাদায়ক অসংখ্য বাঁধার সম্মুখীনও হতে হয়েছিল। কিন্তু থেমে থাকি নি। কারো দয়াতেও বাঁচি নি। তবে আমি কিছু মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। এখন পর্যন্ত প্রায় নয় লক্ষ টাকা মানুষের কাছে পাওনা আছে। কিন্তু অর্থ খুবই তুচ্ছ, তবে বিলাসী; পুঁজিবাদের পৃথিবীতে উপভোগের জন্য হয়তো কারো তোষামোদ করে সুখী হতে হয়, নয়তো নিজ পরিশ্রমে।

জীবন তাৎপর্যহীন, নিরর্থক; তবে জীবন সুন্দর, বিস্ময়কর, অনিন্দ্য সুগন্ধি ফুলের মতো। এই অর্থহীন জীবনে, নিজের জীবনকে অর্থবহ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টার পর হঠাৎ ঘূর্ণিঝড়। জীবন শেষ, জীবন যে কখনো শুরু হয়েছিলো, জীবনে যে কোন প্রাপ্তি ছিল, সাধনা ছিল- তা মৃত্যুর সাথেই বিলীন হয়ে যাবে।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =