কোয়ারেন্টিনে প্রেম

ভেরোনিকার সাথে পরিচয়টা বেশ ইন্টারেস্টিং, গতো বছরের সামারে। সকাল থেকেই ইলশেগুঁড়ি চলছিলো। জার্মানীর এই বাতাসের মতো বৃষ্টি আমার কাছে অবশ্য ভালোই লাগে। অবস্থাটা এমন যে ছাতা হাতে নিলে খামোখা বোঝা মনে হবে, আর না নিলে জামা কাপড় স্যাতস্যাতে হয়ে যাবে। ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক সিজনে তিনটা ছাতা হারিয়ে আর কোনোদিন ছাতা ব্যবহার করিনি। গুড়ি গুড়ি হোক আর ঝুম হোক, সকল ধরনের বৃষ্টিকে আমি উপেক্ষা করে উপভোগ করেছি নিরন্তর। শরীরের জামা শরীরেই শুকিয়েছে। জার্মানীর হালকা পাতলা বৃষ্টি আমার কাছে কিছুই মনে হয় না।

সেদিন মাসের বাজার নিয়ে বাসে উঠেছিলাম। আগের স্টপেজগুলো থেকেই বাস বোঝাই হয়ে আছে, অগত্যা এতো বাজার নিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। পরের স্টপেজে উঠে ভেরোনিকারা, দু’জন চপল কিশোরী অথবা সদ্য কৈশোর পেরোনো তারুন্যে পা দেয়া মানুষী। বার দু’য়েক চোখাচোখি যে হয়নি তা নয়, হয়েছে, আর তার দুই বান্ধবী হাসতে হাসতে একে অন্যের উপর গড়িয়ে পড়েছে। তখনও জার্মান ভাষার কিছুই জানি না, ফলে চপল কিশোরীদের হাসির কারণ বুঝতে পারছিলাম না। হয়তো হীনমন্যতা থেকে মনে হচ্ছিলো ওরা আমাকে নিয়েই হাসাহাসি করছিলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ভেরোনিকা তার গোছানো ছাতাটা অর্ধেক খুলে এমনভাবে বার দু’য়েক ঝাড়া দিলো যেনো পানির ছিটে আমার গায়েই এসে পরে। যার পর নাই বিরক্ত হই, আমি দুই বাচ্চার বাপ, আর আমার সাথে ইয়ার্কি ফাজলামি করছে এরা! পুচকেরা! নিজের খর্বকায় শরীরের জন্য তখন কিছুটা খারাপও লাগে। চরম বিরক্তি প্রকাশ করে কিশোরীদের দিকে তাকাই। ভেরোনিকা মুখে একটা শয়তানি হাসি নিয়ে জার্মান ভাষায় দুঃখিত বলে। আমি জার্মান জানি না বলে ইংরেজীতে বললাম,
– ইটস অকে। পরেরবার ছাতা ঝাড়া দিতে গেলে আরও সাবধান হবেন প্লিজ।
– পরেরবার তো আর ঝাড়া দেবার প্রয়োজনই হবে না পৃথু সাহেব।
– মানে?

অপরিচিত তরুণীর মুখে নিজের নাম শুনে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। জানলাম, কিছুদিন আগে তাদের ক্লাসে সাহিত্য এবং কবিতার উপর একটা ঘরোয়া আলোচনায় গিয়েছিলাম অতিথি হয়ে। গোটা তিরিশেক ছাত্রীদের মধ্যে ভেরোনিকা ছিলো একজন। আমি সাহিত্যের কিছুই বুঝি না, কবিতার তো নয়ই। তবু তাদের ক্লাস টিচার ড্যানিয়েল যে আমার বন্ধু, তাঁর অনুরোধে সেখানে গিয়েছিলাম। আধাঘন্টার মতো কথা বলেছিলাম, নিজের একটা ছোট্ট কবিতা পাঠ আর বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে কথা বলেছিলাম। আমার কথা ভেরোনিকা র বিশ্বাস হয়নি। বলেছিলাম, বাংলাদেশের নারীরা খাঁচায় আবদ্ধ পশুর মতো জীবন যাপন করে, তারা বাইরে বের হলে আতংকগ্রস্থ থাকে সব সময়, এই আতংকে এরা সবাই মানসিক প্রতিবন্ধি, এরা ভুলে গেছে যে তাদেরও আছে নিজস্ব একটা জীবন, এরা নিজেও একটি পূর্ণ সত্বা তা এরা ভুলে গেছে। সে আমার এই কথায় প্রতিবাদ জানিয়েছিলো, তার মতে এ হতেই পারে না।

আমার বছর দুয়েক না ছাটা চুল আর দাড়ি দেখে সে মন্তব্য করে,
– আমি ভেবেছিলাম, আপনার চুল দাড়ি জাস্ট একটা ভং, এখন দেখি আপনি আসলেই ভোলো মনের, ভবঘুরে। আমার কথা আপনার মনে নেই। আপনাকে কতো প্রশ্ন করেছিলাম সেদিন।

সেদিন বাস থেকে নামার আগে ভেরোনিকা আমার হোয়াটসএপ নাম্বারটি নিয়ে যায়। এভাবেই শুরু হয়। এক সময় আবিষ্কার করি আমি তার অদ্ভুত দু’টি সুন্দর চোখ আছে, মাথা কাত করে যখন সে বাঁকা চোখে তাকায়, আমি তার চোখের গভীরতায় ডুবে যাই। এক সময় শুধু চোখ না, তার নাক, ঠোট, মুখ সবকিছুর মধ্যে শিল্পের আবিষ্কার করতে শুরু করি। আবিষ্কার করি ভেরোনিকা শুধু সদ্য কৈশোর পেরোনো তরুনী নয়, সে নারিও। আমি তার প্রেমে পরি, প্রেমে অন্ধ হই, ভুলে যাই চারপাশ, ভুলে যাই আমার ঘর, সংসার, বউ-বাচ্চা। ভেরোনিকা কে প্রেমিকা বলেই ডাকি। তাদের ক্লাসে পাঠ করা আমার কবিতার লাইন যা তার মাথায় গেথে গিয়েছিলো আমাকে শুনিয়ে ভেরোনিকা শুধায়, সে যদি কোনোদিন সত্যি সত্যি পাষান হৃদয়ের কেউ হয়, সত্যি সত্যি কাঠ হয়, তখনো ভালোবাসবো কিনা। লাইনটা ছিলো, “ সখী, তুই যদি কাঠও হোস, তবুও ভালোবাসি।”

আজ প্রায় তিন সপ্তাহ হয়ে গেলো ভেরোনিকার সাথে দেখা হয় না। করোনা সংকটে ভুগছে সারা বিশ্ব, ভুগছি আমি, ভুগছে ভেরোনিকা, আমারদের প্রেম, আমাদের পরকিয়া। জার্মানীর অন্যান্য শহরের মতো আমাদের শহরেও জারী করা হয়েছে অলিখিত কার্ফিও, শহরের বিপনি বিতান বন্ধ, বন্ধ রেস্তোরাগুলো। পার্কেও যে দেখা করবো সে সুযোগটা পর্যন্ত নেই। একই পরিবারের না হলে খোলা আকাশের নিচে দু’জন পাশাপাশি অথবা মুখোমুখী হওয়া বারণ, স্থানে স্থানে বেরসিক পুলিশ, আইডি কার্ড চেক করে। আইডি কার্ডে থাকা বাসার ঠিকানা দেখে বুঝে ফেলে একই পরিবারের কিনা। অথচ এমন নয় যে ভেরোনিকার সাথে প্রতিদিন দেখা হয়েছে বা হতো। মাসে এক অথবা সর্বোচ্চ দুইবার দেখা করেছি আমরা, পার্কে। হোটেলের নিভৃত কামরায় মাত্র এই এক বছরে একবার। আর সেবার প্রথম এবং শেষবারের মতো আমাদের বাসায়, বেডরুমে।

বাচ্চারা স্কুলে, বউ ভাষা শেখার ক্লাসে। একাকী বাসায় আমি আর ভেরোনিকা। বিধি বাম বলে একটা কথা থাকে না! আমাদেরও তাই ঘটেছিলো। বউয়ের শরীর খারাপ হওয়াতে ক্লাস থেকে ফিরে আসে। আর হাতে বর্গায় ধরা পরে যাই। প্রগতিশীলতার দোহাই দিয়ে আমরা বন্ধু বলে কাটিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু পরবি তো পর শালা মালির ঘাড়েই। বউ যখন ঘরে প্রবেশ করে, তখন বিবসনা ভেরোনিকা স্নানঘরে। আর তার জামা-জুতো অন্তর্বাস সব বিছানায়, আমার কোলে।

এরপর আর কী! যেমন হয়, তেমনি হয়েছে। আট দশটা নারীর মতো ভেরোনিকার গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে বউ তাকে ঘর থেকে বের করে দেয়, আমাকে দেয়নি। নারীরা মনে করে তাদের স্বামীরা নির্দোষ, আলাভোলা স্বামীদেরকে ফুসলিয়ে নষ্ট করে যতোসব নষ্ট মেয়েরা। এইসব নারীদের তালিকায় বাঙালি যেমন, বিদেশিনিরাও তেমন। ভাষার ক্লাসে এক বান্ধবী ছিলো যার স্বামীও পাশের রুমে ভাষা শিখতো। বান্ধবীটি প্রতি বিরতিতে পাশের রুমে গিয়ে স্বামীর সাথে দেখা করে আসতো। আমি একদিন ঢং করে বলেছিলাম, আহা কী ভালোবাসা, ওয়াক্তে ওয়াক্তে নিয়ম করে স্বামীকে দেখে আসিস। সে বলেছিলো, এটা ভালোবাসা নয়, এটা নিরাপত্তা। ক্লাসের অন্য মেয়েদেরকে বুঝিয়ে দেয়া যে সে বিবাহিত, তার দিকে যেনো নজর না দেয়।

আমিও সে যাত্রায় বেঁচে যাই, সবকিছু ভেরোনিকার উপর দিয়েই যায়। যতোই যা কিছু হোক, যে একবার গন্ধমের স্বাদ পেয়েছে সে কি আর সহজে গন্ধম ছাড়তে পারে! একটা বিরতি দিয়েই আমাদের প্রেম আবার জমে উঠে। তবে, একটা কথা বলে রাখা ভালো। মনে হতে পারে নিজের সাফাই গাইছি, আসলে তা নয়। ভেরোনিকার সাথে আমার প্রেম যতোটা না শারীরিক তার চেয়ে বেশি মানসিক। আমরা ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছি পৃথিবীর নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। হাজারটা আলোচনার মাঝে এক কি দুইবার আমরা মানুষ মানুষীর শরীর নিয়ে কথা বলেছি। সত্যি বলতে কি শরীর নয়, ভেরোনিকার এইসব আলোচনা, কথোপকথন, বিতর্ক আমাকে তার দিকে তাকাতে বলে।

অলিখিত কার্ফিউ উপেক্ষা করে আজ গিয়েছিলাম ভেরোনিকার সাথে দেখা করতে। না, কোনো পার্কে নয়, রেস্টুরেন্ট কিংবা হোটেলগুলো তো খোলাই নেই। আমরা রাস্তায় রাস্তায় হেটেছি, হেটেছি নিরাপদ দুরত্ব রেখে। বেরসিক পুলিশ যেনো এসে আইডি কার্ড চেক করার উছিলা না পায়, তাই দুর থেকেই কথা বলেছি আমরা। বিদায় নেবার সময় ভেরোনিকা ওয়ান টাইম গ্লাবস হাতে এগিয়ে এসে আমার হাত ধরতে চায়, বাধা দিই। তাকে বলি, আমার ঘরে দুটি ছেলে আছে, আমার কিছু হলে তাদের কী হবে! হাত সরিয়ে নিয়ে সে, আবার সামাজিক দুরত্বে চলে যায়। মুখটা নিচু করে বলে, তবে তাই হোক। সামাজিক দুরত্বের মতো আমাদের প্রেমও থাক কোয়ারেন্টিনে।

ভেরোনিকার চোখ থেকে জল ঝরছিলো কিনা, সেটা আর খেয়াল করিনি। করোনার দিনগুলোতে থাকনা কোয়ারেন্টিনে প্রেম, সামাজিক দুরত্বে।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

54 − = 44