বেঁচে থাকলে দেখা হবে মা, কথা হবে।

প্রতিদিন  সন্ধা নামে আমার শহরে রাত গভীর থেকে গভীর হয়নিয়ম করে সূর্য জাগে আঙ্গিনার সদ্য ফোটা ফুলে সূর্যের সোনালীআলো ঝিলমিল করে আমি ঘরের জানালা দিয়ে আমার প্রিয়ফুলগুলি দেখি, স্পর্শ করতে পারি না নীরবে ডাকপিয়ন আসে ঘরেরদরজায়, কোন শব্দ করেনা একটি বাক্য খরচ করে বলে নাগুডমর্নিং তাঁর মুখে মাস্ক পরা, হাতে গ্লাভস , সাইড পকেটে রাখা হেন্ডস্যানিটাইজার  খুব কষ্ট হয় চেনা মানুষটাকে অচেনা রূপে দেখে

দৌড়ে যাই লেটার বক্সের কাছে ততক্ষনে ডাকপিয়ন চলে যায় দুইমিটারের চেয়ে অনেক অনেক দূরে আমি অনেক কৌতুহল নিয়েচিঠির সামনে দাঁড়াই কিন্তু  চিঠি স্পর্শ করি না  ভেতরের  অজানাআতঙ্ক রক্ত হিমশীতল করে দেয় খবরের কাগজ চোখের সামনেভেসে উঠে গত কয়েক সপ্তাহ  যাব তাজা খবরের কাগজ পাঠ করিনা কাগজের টাকা  হাতে ধরি না বন্ধুর সাথে হাত মিলাই না, কোলাকুলি করিনা জেনিফারের পোষা কুকুরটাকে স্পর্শ করে আদরকরি না  পাশের ঘরের মিলার কফির আড্ডায়  নিমন্ত্রন করে না চারদিকে শুধু না না না  নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় দুর্বল মনউঁকি দিয়ে বলে হে মানুষ তোর বাহাদুরি গেলো কই?

সাদা খামের চিঠিটা  প্রধানমন্ত্রী পাঠিয়েছেন টেন ডাউনিং স্ট্রিট থেকেআবেগ, ভালোবাসা দিকনির্দেশনায় ভরা চিঠি এক নিঃশ্বাসে চিঠিপাঠ করি কিছুক্ষনের জন্য চুপ হয়ে যাই ডাক্তার সেবিকারা জীবনহাতের মুঠোয় নিয়ে আমাদের বাঁচাতে শেষ চেষ্টা করছে সবাই একহয়ে লড়ছে কোরোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের বাঁচাতে গিয়েহাসি মুখে মৃত্যুকে তাঁরা আলিঙ্গন করছে চোখের জল প্রধানমন্ত্রীরচিঠি ভিজিয়ে দেয় সাহস পাই, প্রধামন্ত্রী সহ সবাই আমাদের পশেআছে আমরা একা নই

হোম কেয়ারেন্টাইনে আছি রাতদিন কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর , শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  শেকসপিয়রের  বই পড়িপুরানো বইগুলি আবার নতুন করে পড়ি মুঠোফোনে যোজন যোজনদূরে থাকা  প্রিয়তমা বনলতাকে  কবিতা আবৃত্তি করে শুনাই নিজেকেবাঁচাতে অন্যকে রক্ষা করতে ঘর থেকে মোটেও বের হই না যে বন্ধুসকালবিকাল নিয়ম করে দিনে দুই বার ফোন দিতো তাঁর ফোন আরআসে না দিনের পর দিন তাঁকে ফোন দেই তাঁর ফোন বাজেনা অজানা আতঙ্কে কুঁকড়ে যাই চারদিকের দুঃসংবাদ ভয় পাইয়ে দেয় ইচ্ছে করে এক দৌড়ে  ঘর, পুলিশ স্টেশন হাসপাতালে গিয়ে ওকেখুঁজি শহরে আমাদের আপন বলে কেউ নেই  আমরাই আমাদেরআপন  ফোন হাতে নেই, একএক করে পুলিশ স্টেশন হাসপাতালেফোন দেই, কই কেউ আমার বন্ধুর খবর দেয় না মনের সাথে যুদ্ধকরি  মনকে বলি আমার বন্ধু ভালো আছে দিন চোদ্দ পরে অচেনাফোনে আমার বিষন্ন দুপুর প্রাণ পায় অপর প্রান্ত থেকে বন্ধু মলিনকণ্ঠে বলে, মাকে বলিও আমি ভালো আছি বন্ধু চুপ হয়ে যায়, তাঁরনীরবতার আমার বুকের পাঁজরগুলি একএক করে ভেঙ্গে দেয়অবশেষে মুখ খুলে শুধুই বললো বেঁচে থাকলে দেখা হবে কথা হবেফোনটা কেটে যায় বিষন্ন দুপুর আমায় বেদনার নীল সাগরে ভাসিয়ে দেয় আজও ফোন হাতে বসে থাকি কিন্তু বন্ধুর ফোন আসে না  

এভাবে কী বাঁচে থাকা যায়? হায়রে জীবন! এক কানে খবর আসেসুগন্ধি শহর প্যারিসের হাসপাতালে আমার নিকট আত্মীয় করোনা আক্রান্ত অন্য কানে খবর আসে রোমের হাসপাতালে বন্ধুর পিতাঘুম থেকে জেগে শুনি ছোট্ট বেলার বন্ধু আর নেই আমেরিকারহাসপাতালের মর্গে ওর লাশ  পড়ে আছে  মায়ের আদরের ছেলের কপালে জুটেনা শেষকৃত্য পোড়া কপালে জুটেনা মুঠো দেশের মাটি কেমন করে বেঁচে আছি শুধু সৃষ্টির মালিক জানেন

দিন কেটে যায়, রাত আসে নিজেকে সামলে নেই সোশ্যাল মিডিয়া, ইলেকট্রনিক মিডিয়া খবরের কাগজ থেকে দূরে থাকি প্রাণেরবাংলাদেশের কোনো খবর শুনিনা সবকিছু ভুলে থাকি ভুলে থাকতেচাইলেও ভুলে থাকতে পারি না যে বনলতা আমাকে দুদণ্ড শান্তি দেয়তাঁর ফোন আসে গভীর রাতে অন্ধকার রাত, তাঁর আবেগী কণ্ঠশুনতে পাই  

তুমি ভালো আছো তো?

আছি…….

আমার ভয় হয়, তোমাকে নিয়ে সাবধানে থাকবা, ঘরের বাহিরেযাবেনা কথা দাও?

কথা দিলাম ……….

আর শোন! তুমি মিথ্যা বলতে পারোনা কেন বল? কেন তুমি বলোতুমি ভালো আছো?

চাপা কান্নার কণ্ঠে বলে আমি খবর শুনি, খবরের কাগজে তোমারশহরের খবর পাই

আমি চুপ হয়ে থাকি কথা খুঁজে পাই না মুখের উপর বলে দেই এখনঅনেক রাত সকালে তোমাকে ফোন করবো  

অন্ধকারে তাকিয়ে অন্ধকার দেখি  বিশাল পৃথিবীকে খুব ছোট্ট মনেহয় খুব  ইচ্ছে করে তাঁর হাতটা ধরতে ইচ্ছে করে তাঁর শাড়ির ভাঁজগুলি ঠিক করে দিতে  মোবাইলের স্ক্রিনে তাঁর ছবি দেখি চোখটলমল করে…….. ভালো থাকার মিথ্যা বলতে বলতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়েপড়ি

সকাল হয়, সকালের নিয়মে জানালার পর্দা টেনে সকালের সূর্যদেখি  চারদিকে সুনসান নীরবতা  যত দূর তাকাই মানুষ দেখি না পুষ্পের পাশে পুস্প দেখি, মন ভালো হয়ে যায় গরম চা নিয়ে টেবিলেবসি  ফুলের যত্ন নেই , বইয়ের যত্ন নেই, যত্ন নেই পুরানো সাইকেলেরএই দুঃসময়ে ওরাই আমার বন্ধু, আপনজন  আজ ডাকপিয়ন আসেনাই  কোন চিঠি নাই লেটার বক্সয়ে বেলা গড়িয়ে মাঝ দুপুর মায়েরদেওয়া কল বেজে উঠে ফোন ধরে চুপ করে থাকি কি বলবো ভেবেপাই না

ওপর প্রান্ত থেকে মা বলে, কেমন আছো বাবা ?

অনেক ভালো মা …….

মা আপনি কেমন আছেন? আর বাবা !

আমরা ভালো আছিরে বাবা ….

মা মিথ্যা বলে  মা ভালো নেই, তা আমি জানি………

সন্তানকে দূরে রেখে মায়েরা ভালো থাকে না

মা মিথ্যা বলে, আমি মিথ্যা বলি

কথা চলতে থাকে ……… মায়ের কণ্ঠ  ভারী হয়ে যায় মা আচমকাবলে উঠে, বনলতা কে বলিও তুমি ভালো আছো ওর অনেক চিন্তা হয়তোমাকে নিয়ে

মা কান্না চেপে রাখতে পারলোনা, হাউ মাউ করে কেঁদে দিলো

আমি অসহায়ের মত ফোন কল কেটে দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়েথাকি মায়ের কান্না আর নিতে পারছিলাম না যদি বেঁচে থাকি দেখাহবে মা, কথা হবে এই বলে নিজেকে সান্তনা দেই

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 24 = 31