মা ও লিলুয়া মেয়েটি ! (লিলুয়া মা, লিলুয়া বৃক্ষ এবং লিলুয়া স্টেশনের ২য় পর্ব)

বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে বর্ধমান দেখার সখ আমার অনেক দিনের। ফেসবুক বন্ধুদের সাথে আগাম প্লান করে তাই হাওড়া থেকে বর্ধমান যাচ্ছিলাম। কিন্তু ১৩-বছর পর ‘লিলুয়া’ নামের স্টেশন দেখে মোহময় জীবন যন্ত্রণার কবন্ধ একেঁ একেঁ এক শূন্যতার মাঝে আমি যেন ইচ্ছের বিরুদ্ধে এগুতে থাকি বর্ধমানের দিকে। পথে কত মানুষ, কত স্মৃতি, কত স্টেশনে দাঁড়ায় ট্রেন কিন্তু আমার দু:খময় জীবনে এক ঘনদুধের স্বাদ লয়ে জেগে থাকে ফেলে আসা ‘লিলুয়া’ স্টেশন। পরিকল্পনা ছিল বর্ধমানের রাজবাড়ি, ব্যান্ডেল, পাণ্ডুয়া, বৈঁচি, মেমারি, বার্নপুর নেহেরু পার্ক, ভারতী ভবন, প্রতাপেশ্বর মন্দির, কৃষ্ণচন্দ্রজি মন্দির, লালজি মন্দির, ১০৮ শিবমন্দির, কবি নজরুলের আসানসোলের চুরুলিয়া গ্রামে যাবো; মানববাদী অক্ষয়কুমার দত্তের কালনার চুপি গ্রামে যাবো; বিকেলে বসবো ভাগীরথী, অজয় কিংবা দামোদর নদীর তীরে। কিন্তু এসব কিছুই আর ভাল লাগেনা আমার। এক প্রতারকের গরলবিশ্বাসী প্রেমজ ভাস্কর্যের মত সব ফানুস মনে হয় কেন যেন। পুরণো প্রেমের আক্ষেপের অনলে জ্বলতে থাকা ‘লিলুয়া’ যেন ডাকতে থাকে আমায় চুপিচুপি। অবশেষে দুদিনের মাথায় বন্ধুদের নাখোশ করে ট্রেন ধরলাম অচেনা অজানা ‘লিলুয়া’য় যেতে।
:
দুপুরের ট্রেন প্রায় খালিই ছিল। তাই জানালার কাছে বসে বাইরে দেখছিলাম প্রকৃতি, শস্য, সংগ্রাম, মানুষ আর চলমান জীবনকে। ‘হিন্দমোটর’ ট্রেন থামলে স্কুলড্রেস পরা অনেকগুলো অল্পবয়সি মেয়ে উঠলো ট্রেনে। খালি সিট পেয়ে সবাই বসলো আমারই আশেপাশে। তাদের কলকাকলিতে মুখরিত হলো ট্রেন অল্পক্ষণেই। কাছের ছোট কাজলি মেয়েটিকে বললাম, ‘লিলুয়া’ স্টেশন আর কটার পর জানো সোনা? খিলখিলিয়ে ছোট মেয়েটি বললো, ‘লিলুয়া দিদি তুমি বলোতো, লিলুয়া আর কটার পর’? উঠে ১২/১৩ বছরের অপেক্ষাকৃত লম্বা মেয়েটি আমার কাছে সরে এসে বললো, ‘কই যাবেন আপনি লিলুয়া’? হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াতে সে আমার পাশে এসে বসে বললো, ‘লিলুয়া কার বাড়ি যাবেন’? বললাম, ‘কারো বাড়ি নয় লিলুয়ার বাড়ি’। মেয়েটি বিস্ময়সূচকভাবে তাকালো আমার দিকে। বললো, ‘আমার বাড়ি লিলুয়াতে। আমার নামও লিলুয়া। সেখানের সাইকা গার্লস হাইস্কুলে এইটে পড়ি আমি। আমার বাড়ি লিলুয়া স্টেশনের কাছেই শান্তিনগরে। তবে কি আপনি আমাদের বাড়ি যাবেন’? হৃদয় ছুঁলে ঘুম থেকে জেগে ওঠা স্বপ্নেরা একসাথে যেমন কোরাস করে, তেমনি করেই বলে উঠলাম, ‘হ্যা তোমার বাড়িই যাবো লিলুয়া’!
:
ট্রেন থামলে লিলুয়া মুচকি হেসে বললো, ‘সত্যি যাবেন আমাদের বাড়ি’? বিস্ময়করভাবে ক্ষিপ্তোন্মত্ত মেঘমালা আর নীল সমুদ্রের জলের মত আমি লিলুয়ার সাথে তার বাড়ির দিকেই হাঁটতে থাকি। ১০-মিনিটের মাথায় শান্তিনগরের একতলা দেয়ালঘেরা বাড়িতে পৌঁছলাম লিলুয়ার সাথে হেঁটে হেঁটে। এবং ঢোকার আগে বাড়ির ঠিক সামনেই একটা বৃক্ষ চো্খে পড়লো আমার, যার পাতা দেখেই চিনতে পারলাম আমি এ যেন ১৩-বছর আগে নানা বাড়িতে মারা যাওয়া মায়ের প্রতিভূ ‘লিলুয়া’ বৃক্ষটি। ঘরে ঢোকার আগেই বৃক্ষটি ছুঁতে চাইলাম আমি এবং শিহরিত হলাম যেন। অবোধ বালিকার চোখের জলের মত ব্যথাতুর বৃক্ষটি যেন হেসে কথা কইলো আমার ছোঁয়ায়!
:
লিলুয়ার মা ঘরেই ছিলেন। বাবা ছিলেন পাশের বাড়িতে। আকস্মিক অপরিচিত এক মাঝ বয়েসি পুরুষকে দেখে কিছুটা বিস্মিত হলেন তিনি। তার বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে আমিই শুরু করলাম কথা। বললাম, ‘অনেক দুরের বাংলাদেশ থেকে এসেছি আমি। আমার মায়ের নাম এবং এমন একটি বৃক্ষ ছিল মায়ের নামে আমার গাঁয়ে। মা এবং বৃক্ষটি মারা যায় প্রায় ১২/১৩ বছর আগে একই দিনে’। মহিলাটি আমার কথা শুনে কিছুটা ভয় পেলো মনে হলো আমার। তাই মোবাইলে ডাকলো পাশের বাড়ি থেকে তার স্বামীকে। লিলুয়ার সামনেই আমার মা লিলুয়া, মায়ের বাবার বাড়িতে লিলুয়া গাছের জন্ম এবং একই দিন মা ও বৃক্ষটির মৃত্যুর ঘটনা শুনে ৩-জনেই বিস্মিত হলো খুব। আমাকে বিস্ময়সমুদ্রে নিমজ্জিত করে লিলুয়ার বাবা বললো, ‘লিলুয়া তাদের একমাত্র সন্তান। ১৩-বছর আগে ২৯মে গভীর রাতে বৃষ্টির দিনে লিলুয়ার জন্ম। জন্মের কদিন পরই ঘরের সামনে এ অচেনা গাছটি দেখতে পান তিনি। কিন্তু নানা কারণে আর কাটেননি। এখন মেয়েটি ঐ গাছটি ছাড়া থাকতেই পারেনা। আমরা বলি গাছটি তার যমজবোন’।
:
লিলুয়ার বাড়ি থেকেই দেশে বোনকে ফোন করে কনফার্ম করি যে, আমার মা-ও ১৩-বছর আগে ২৯মে তারিখেই মারা যান, যেদিন লিলুয়ার জন্ম হয়েছিল হাওড়ার এ লিলুয়া গাঁয়ে। একই তারিখে মায়ের মৃত্যু ও এ লিলুয়া গাঁয়ে এ ছোট লিলুয়ার জন্মে আমার বস্তুবাদি দর্শন এক পাগল প্রলয়ের প্রকোপে পড়ে যেন। মৃত্যুর সময় মাকে দেখিনি আমি বিদেশ থাকার কারণে। তাই ১৩-বছর আগের মৃত মায়ের লাভাস্রোতের মত দু:খদের নিয়ে সঙ্গকাতরতার দেহতত্ত্বে কিশোরী লিলুয়ার দিকে তাকাই আমি। কৈশোরে কি আমার মা এমন ছিলেন? আমি কি এই ছোট লিলুয়াকে মা বলে ডাক দেবো? এই অচেনা ঘরের আনন্দ বেদনার সমান্তরাল পথের বাঁকে এবার সত্যি আমার মা এসে দাঁড়ায় ঐ ছোট্ট লিলুয়ার মাঝে। তার ভালবাসার জঠরে গর্ভবতী হয়ে তার প্রেমজ শরীরের অংশ হয়ে যেন লিন হই আমি লিলুয়ার মাটিতে।
:
ভাললাগার তুমুল আনন্দ-কাতরতায় আমি ক্লেদঘন স্বরে বলি, ‘লিলুয়া তুমি কি আমার মা হবে’? সুখের অধোঘুমন্ত ঝলমলে আলোয় মুখ এনে লিলুয়া বলে, ‘তুমি আমার ছেলে’? ফুলের পাপড়িতে লুটোপুটি খেয়ে ঝরাপাতার মত জলদ চোখে হাত বাড়াই আমি লিলুয়ার দিকে। লিলুয়া বলে, ‘তবে ঐ গাছটিকেও তোমার মা ডাকতে হবে’। অতৃপ্ততায় নির্বাক স্বর্গপুষ্পঘ্রাণে ভরা বৃক্ষের স্পর্শে সত্যি বৃক্ষপাতায় মায়ের শরীরি ওম আর সেই হারাণো ঘ্রাণটি পাই আমি। লিলুয়া বৃক্ষপত্রে কার হাওয়ায় যেন দোলায়িত হয়ে ঐ গান বাজে, যে গান শুনেছিলাম আমি গভীর বর্ষাস্নাত রাতে অনেক দিন আগে। পুনর্জন্মের কথা শুনে শান্তিনগরের মানুষ ঐ রাতেই ভেঙে পড়ে লিলুয়াদের বাড়ি। তার স্কুল সহপাঠীরাও ভোর না হতেই জড় হয় লিলুয়াদের ছোট উঠোনে।
:
অবশেষে দুপুর ভেঙে ভালবাসার রৌদ্রছায়ায় হাঁটি আমি কষ্টের শীতলপাটি ছেড়ে। ফিরে যাওয়ার কথা বললে কিশোরি লিলুয়া মারূপী অমল বালিকা হয়ে থাকে যেন। আমার ভালবাসার মা চরের সঞ্চিত বিষাদের পলি ধুয়ে সত্যিই এক দিন লিলুয়া স্টেশনে আসি হাওড়ার ট্রেন ধরতে। লিলুয়া আর তার মা-বাবা আসে আমায় বিদায় জানাতে স্টেশনে। লিলুয়ার বন্ধন-সুতো ছিঁড়ে উদাসীন বেদনার বেনোজলের ট্রেনে উঠে পড়ি আমি। ছাড়ার প্রাকলগ্নে মেঘের আয়নায় মাকে দেখি, বৃক্ষকে দেখি এবং সত্যি ট্রেনটা ছেড়ে দেয় এবার। ঝড়গতিপ্রাপ্ত হলে ট্রেন, মৃত ফিনিক্স পাখিরা উড়ে যায় লিলুয়ার আকাশে। মা-হীন হৃদয়ের গভীর গহ্বরে অন্ধকার লিলুয়া বাতাস বয়ে যায় তখন রিণরিণে শব্দে। ট্রেন চলতে চলতে অন্তহীন জীবনের এক বিশাল নস্টালজিক গ্রন্থ রচিত হয় ক্রমশ জীবমৃত্যুর। হাওড়া না পৌঁছা পর্যন্ত হৃদয় মেঘনার জলে পাড় ভাঙার শব্দে এ পৃথিবীর ভালবাসার বনাঞ্চল ধ্বসিয়ে দেয় আমার। তারপরো লিলুয়া মা আর লিলুয়া বৃক্ষের গন্ধ মৃত্যুলোকে জেগে থাকে বহুদিন আমার, যে বৃক্ষের সোনালী পাখিরা সারাক্ষণ কষ্টের রূপোলী ধান খুঁটে খায় দু:খবাতাসে। আর ভালবাসাময় লিলুয়ার আকাশে মৃত নক্ষত্রেরা জেগে থাকে, জেগে থাকে মা আর লিলুয়া বৃক্ষটি বহুদিন, বহুবছর, বহুকাল !

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

67 + = 70