ছোট্ট একটা শব্দ “মা”। বিশাল তার পরিধি!

না বলা কথা, একটু বলতে চাই:
(১) এরশাদ ক্ষমতায়, ১৯৮৬ সাল ১ লা মে থেকে শুরু করে পুরো মে মাস জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে অনেক কালো মেঘ, যেন সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছে কৃত্রিমভাবে। বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর প্রত্যক্ষ মদদে সেটেলার মৌলবাদী বাঙ্গালিদের দ্বারা খাগড়াছড়ি জেলায় পানছড়ি, দীঘিনালা, মাটিরাঙ্গা, তাইন্দং ও পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের গ্রামে পরিকল্পনামাফিক নিষ্ঠুরভাবে হামলা করা হয়। মিডিয়া রাষ্ট্রের যন্ত্র ধারা নিয়ন্ত্রিত, বাইরে খবর প্রকাশ হওয়ার জোঁ নেই। শত শত নিরীহ পাহাড়ি হত্যার শিকার হয়, অনেক গ্রাম আগুনে পুড়ে ছারখার করে দেওয়া হয়, অনেক মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠন করা হয়, আর সেই আক্রমণে অনেক পাহাড়ি আহত হয়ে এখনো পঙ্গুত বরণ করে আছেন। অনেক পরিবার দুগ্ধপোষ্য সন্তান সমেত বাঁচার তাগিদে দলবদ্ধ হয়ে গহীন অরণ্যে আশ্রয় নেয়, মানবতাহীন উদ্বাস্তু জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়। সারাদিন জুম ঘরে সময় পার করলেও রাত্রিযাপন করে নিরব গহীন অরণ্যে। তখন হাহাকার ও কষ্টের চিৎকার যেন শুধু পাহাড়ের আকাশে-বাতাসে। এক দুগ্ধপোষ্য সন্তান তখন মাত্র ২ বছর বয়স, নাম “সুজু (ছদ্মনাম)”, অযাচিত আতংকে মা ঠিকমতো দুধ খাওয়াতে পারেনা তাই ক্ষুধায় সুজু খুব কান্নাকাটি করতো। ভোর হয়, দিন শেষে রাত্রি নামে। রাত্রির গভীরে আরো বেশি বেশি করে রাষ্ট্রীয়বাহিনী ও মৌলবাদী সেটেলার বাঙ্গালিদের নিপীড়ন, আক্রমণ, অত্যাচারের আতংক বৃদ্ধি পায়। অনেক পাহাড়ি গ্রামে রাষ্ট্রীয় বাহিনী আর সেটেলার বাঙ্গালিরা মিলে হানা দেয়। কেউ কেউ নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে ভারতে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেয়। আর সুজু’ ক্ষুধায় অতিষ্ঠ হয়ে কান্নার রোল বৃদ্ধি করা শুরু করে। অত:পর গ্রামের লোকজন সিদ্ধান্ত নিল বাচ্চাটিকে পাহাড় থেকে জঙ্গলে ছুড়ে ফেলতে হবে, না হয় তারা সকলে ধরা খেয়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং সেটেলারদের আক্রমনের শিকার হয়ে মারা যেতে পারে। আর সুজু’র মাকে বুঝানো হয় তোমার যেহেতু আরো সন্তান আছে, তাই এ সন্তানকে নিয়ে ভেবোনা। কারন এক বাচ্চা সন্তানের জন্য কয়েকশ মানুষ মারা যাওয়া ঠিক হবেনা, ইত্যাদি। একথা সুজু’র মায়ের কানে শুনামাত্র মায়ের অজ্ঞান হওয়ার উপক্রম। অবশেষে ‘মা’ সকলের কাছে সন্তানের প্রাণভিক্ষা চেয়ে সন্তানটিকে বয়স্ক শ্বশুড়-শ্বাশুড়ির কাছে রেখে অন্য সন্তানদের নিয়ে গহীন অরণ্যে রাত্রি যাপন করতে চলে যায়। পরে অবশ্য রেখে যাওয়া সুজু’ নাকি সেদিন কোন কান্নাকাটি করেনি তাই সে এখনো বেঁচে আছে। অথচ মৃত্যুর শিকার হওয়া ছিল অবধারিত। বাস্তবটা তখন পাহাড়ে ছিল সত্যিই কঠিন, জীবন ছিলো যেন এক ঠুনকো!

(২) এ ১৯৮৬ সালটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও সেটেলার বাঙ্গালিরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকেও হার মানিয়েছে। কারন তারা পাহাড়ি আদিবাসীদের গ্রামে একাধারে গণহত্যা, গণধর্ষণ, গুম, লুটপাত, গ্রামের পর গ্রাম জুম্মদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেছে। অনেক সেটেলার বাঙ্গালি সমতল থেকে গিয়ে লুটপাতের সম্পদ নিয়ে পাহাড়ে রাতারাতি আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ ও রাজনৈতিক নেতা হয়েছে। এসব সাম্প্রদায়িক বর্বরতা তখন তেমন একটা মিডিয়াতে আসতে পারেনি। পাহাড়ি আদিবাসীদের মনে এমন ভয় সৃষ্টি করা হয় দীর্ঘ ১ যুগেরও বেশি সময় ধরে ভারতের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের থাকার পর আবার যখন ধনমনি মা'(ছন্দনাম) পার্বত্য চুক্তির ফলে পাহাড়ে ফেরত আসে, হঠাৎ একদিন ধোরাকাটা বাহিনীদের দেখতে পেয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। কারন নাকি তার ১ যুগ আগে বর্বর আক্রমণের দৃশ্যপট মনে উদয় হয়েছিল।

পৃথিবীতে সবচেয়ে মায়ের ভালোবাসায় অকৃত্রিম। আজ আন্তর্জাতিক মা’ দিবস উপলক্ষ্যে পৃথিবীর সকল মা’দেরকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সেলুট। সবসময় শ্রদ্ধার সহিত ভালোবাসার বন্ধন সুদৃঢ় হোক প্রতিটি মা’র সাথে সন্তানদের। আর দুর্যোগেও যেন ভালো থাকেন সকল মায়েরা এই কামনা করছি।

ফেসবুক মন্তব্য

১ thought on “ছোট্ট একটা শব্দ “মা”। বিশাল তার পরিধি!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

7 + 2 =