অবিশ্বাসীর সহযাত্রী

(১)
আমরা মোটামুটি পরিচিত যারা তাঁকে সবাই ‘অনন্তদা’ বলেই সম্বোধন করতাম। আমরা মানে আমি, লিটন দাস, সৈকত চোধুরী আর আমাদের সংগঠনের প্রথম সভাপতি মাহমুদ আলী, দ্বিতীয় সভাপতি হাসান শাহরিয়ার সহ যারা অনন্ত বিজয় দাশের সিনিয়র ছিলেন, প্রায় সবাই-ই তাঁকে ‘দাদা’ বলেই সম্বোধন করতাম। ‘বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলে’র সিনিয়র-জুনিয়র প্রায় সবাই তাঁকে ‘দাদা’ বলতো। অনন্ত বিজয় দাশ আমাদের সবার কাছে এই ‘দাদা’ হয়ে ওঠা নিয়ে আজও মাঝে মাঝে ভাবি। এই লোকটা আস্তে আস্তে সবার কাছে কেমন করে জানি না ‘দাদা’ হয়ে উঠেছিলো। তা আজ ভাবলে একটু অবাকই লাগে। বয়সের তুলনায় তো এই বয়সে তার ‘দাদা’ হয়ে উঠার কথা না। অনন্ত বিজয় তখন হয়তো বছর বাইশের যুবক হবেন। তারপরও কেমন করে জানি তিনি সবার ‘দাদা’ হয়ে উঠেছিলেন। অনন্ত বিজয়ের সাথে আমার আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে পরিচয় হয়। লিটন দাস, সৈকত চৌধুরীর সাথে পরিচয়ও প্রায় একই সময়ে। হয়তো মাস দু’য়েক আগে বা পরে এরকম হতে পারে। তবে একই বছরে আমাদের পরিচয় হয়। আমরা সবাই তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কেউবা পড়ি ফার্স্ট ইয়ারে, কেউবা সেকেন্ড ইয়ারে। বয়সেও সবাই প্রায় একই রকমই। সময়টা খুব সম্ভব ২০০৪ সালের শেষ দিকের ঘটনা। আমি তখন সিলেট শহরের আম্বরখানা এলাকাতে একটা গণমেসে থাকতাম। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে স্নাতক কোর্সে ভর্তি হয়েছি। ২০০৪ সালে বোধকরি নভেম্বর-ডিসেম্বরেই হবে, এই সময়েই কীভাবে জানি খবর পাই সিলেটে কয়েকজন তরুণ সংঘবদ্ধ আছে। প্রতি শুক্রবার কিংবা শনিবার তারা একটি নির্দিষ্ট জায়গায় বসে। অনেকটা ঘরোয়া আড্ডার মতো। সেখানে উন্মুক্ত আলোচনা চলে। অনেকটা পাঠচক্রের মতো। সবচেয়ে বড় কথা যুক্তিবাদ-ধর্ম–বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনায় সমমনা যে কাউকে তাঁরা সাদরে আমন্ত্রণ জানায়। আমার কৌতূহল বেশ বেড়ে গেলো। খোঁজ করতে লাগলাম। সমমনা দু’য়েকজন ক্লাসমেট-বন্ধুদেরও বলি সেই কথা। তারাও দেখি বেশ আগ্রহ প্রকাশ করে। এভাবেই একদিন খোঁজ পেয়ে গেলাম সেই আড্ডাবাজ বুদ্ধিদীপ্ত লোকেদের ঠিকানা। উপশহর, সিলেট। কোন ব্লক তা আজ আর মনে নেই। খুব সম্ভবত আমাদের মধ্য থেকে কেউ একজন ফোন করেছিলো। আর ফোনেই আমাদের বলা হয়েছিল কিভাবে যেতে হবে। তো আমরা মানে আমি আমরা গিয়েছিলাম। তিন জন ছিলাম। তিনজনেই বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়ি। ওই দিন আসলে আমি ঠিক অনন্ত বিজয়কে তেমন ভালোভাবে এতোটা খেয়াল করিনি। কারণও ছিলো। কারণ যিনি তখন এই আড্ডার আয়োজন করতেন তিনি অসম্ভব ভালো বক্তা ছিলেন। যেকোনো বক্তব্য সহজভাবে উপস্থাপন করতে অত্যন্ত পটু ছিলেন। যাকে এক কথায় বলে বাকপটু। খুব জোরালো ও রসসিক্ত করে তিনি যেকোনো বিষয়ই উপস্থাপন করতে পারতেন। তাঁর কথা ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। তাই সঙ্গত কারণেই অনন্ত বিজয় দাশকে আমার মতো নতুন অনেকেই তখন চিনেছে দেরিতে। আমরা তাঁকে ধীরে ধীরে চিনতে শুরু করি। শুরুটা মূলত এভাবেই হয়। এই আলাপ-পরিচয়ের ফাঁকে ফাঁকে ধীরে ধীরে বাকি সদস্যদের সাথে আমার পরিচয় হয়। তখনও আমি আমার ক্লাসমেট দু’জনকে নিয়ে ওই উপশহরের আড্ডায় যাই। অনন্ত বিজয় তখন রেগুলারই আসতেন। লিটন দাস, সৈকত চৌধুরী এদের কারো সাথেই আমার তখনও সম্ভবত পরিচয় হয়ে উঠেনি। চিনি একমাত্র অনন্ত বিজয়কে। তো এই আড্ডার সূত্র ধরে আমরা সবাই সবার মোবাইল নাম্বার, এড্রেস এসব বিনিময় করি। সম্ভবত তখন একটা ফর্ম জাতীয় কিছু একটা ছিলো। যা আমরা পূরণ করি। আর প্রত্যেকেই প্রত্যকের মোবাইল নাম্বার সেভ করে রাখি। তখন জম্পেশ এই আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে চলতো পিঁয়াজু-মুড়ি মাখা আর লাল চা। আড্ডা সেই সকালে শুরু হতো তা কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়ে যেতো খুব বেশি টের পেতাম না। উঠতে উঠতে সেই সন্ধ্যে হয়ে হতো। সাধারণত আড্ডাগুলো শুক্রবারেই হতো। না হয় বিশেষ কোনো ছুটির দিনে।

অনন্ত বিজয় দাশ

(২)
এই আড্ডা ধীরে ধীরে বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। তখন মাহমুদ আলী, হাসান শাহরিয়ার, লিটন দাস ও সৈকত চৌধুরীসহ অনেকেই আমরা একে অন্যকে সবে চিনতে শুরু করেছি। প্রতি শুক্রবারেই আমরা যে জায়গাই থাকি না কেনো, কিভাবে জানি আমরা ঠিকঠাক উপস্থিত হয়ে যেতাম। মাঝেমধ্যে অবশ্য ব্যতিক্রম হতো। তা করতো বেশি সৈকতে। সে মাঝেমধ্যে আসতে পারতো না। তো এই ফাঁকে সৈকতের সাথে আমার দেখা হওয়ার ব্যাপারটা বলে নিই। কারণ তার সাথে আগে আমার ব্যক্তিগত যোগাযোগ হয়। সম্ভবত তখন রমজান মাস। রাত দশ কি এগারোটা হবে। একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে। আমি রিসিভ করতেই ওপ্রান্তে কেউ একজন সরাসরি বলে, আপনি কি মনির? বেশ অবাক হয়ে বললাম, হ্যাঁ। কেনো বলুন তো? আর আপনিইবা কে? এভাবে বেশ কিছুক্ষণ আলাপের পর সে বলে সে মোবাইল নাম্বারটি কোথা থেকে সংগ্রহ করেছে। তারপর সেদিন আমরা মোবাইলে প্রায় মিনিট দশেক আলাপ করি। ফোন রাখার আগে আগে সৈকত ধুম করে বলে, আমি যদি এখন আম্বরখানায় আসি তাহলে কি আমরা দেখা করতে পারি? বেশ অবাক হলেও আমি বললাম, হ্যাঁ। নিশ্চয়ই! ফোন রাখার মিনিট বিশেক পরেই সম্ভবত সৈকত একেবারে আমার ম্যাসে এসে হাজির হয়েছিলো। সে রাতে আমরা প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের মতো আলাপ করেছিলাম। বেশিরভাগ প্রশ্নই ছিলো ধর্ম বিষয়ে। আমরা একে অন্যে ধর্ম নিয়ে কী ভাবি, কিভাবে এই পরিবর্তনটা নিজের মধ্যে আসলো এসবই ঘুরেফিরে একে অন্যকে আমরা জিজ্ঞেস করি। তারপর কি কি অবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের যেতে হচ্ছে, এখন কি অবস্থা এসব একে অন্যের সাথে শেয়ার করি। এক অর্থে অনন্ত বিজয় ও লিটন দাসের আগে আমার সাথে সৈকতের চেনাজানাটা ভালোভাবে হয়ে উঠে। এভাবেই আমরা আপনি থেকে তুমি তারপর তুই’য়ের দিকে যাই। আর এই তুই-তোকারি শুধু আমাদের তিনজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। অনন্ত বিজয় আমাদেরকে তুমি বলতেন।

(৩)
তখন আমরা উপশরের আড্ডাটি ছেড়ে এসেছি। সে আরেক লম্বা কাহিনি। আপাতত অন্য কোনো লেখার জন্য তোলা থাকুক। যদি কখনও প্রসঙ্গ আসে সে হয়তোবা বলা যাবে। আমরা তখন স্থানাভাবে সিলেট শহিদ মিনারে শুক্রবারে নিয়ম করে আড্ডা দেই। এছাড়া আমাদের আর কোথাও বসার মতো স্থান তখন ছিলো না। তাই বাধ্য হয়েই শহিদ মিনারকেই আমাদের বেছে নিতে হয়। শহিদ মিনারের ‘কবি পরিষদে’র কবিতা পাঠ কিংবা নানান সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তখন শহিদ মিনারে প্রায় শুক্রবারে লেগেই থাকতো। এসব অনুষ্ঠানাদি যখন হতো তখন আমাদের আর এক সাথে বসে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগই থাকতো না। চারদিক লোকে গিজগিজ করতো। অনুষ্ঠান হলে মাইকের উচ্চস্বরের আওয়াজের কারণে কোনোকিছুই বলা সম্ভব হতো না। আমরা তাই তখন বাধ্য হয়েই শহিদ মিনারের পাশের শহিদ শামসুদ্দীন আহমদ কবরস্থানের মূল বেদির নিচে গিয়ে বসতাম। জুতা খুলেই যেতাম। এসব আমরা যথা নিয়মেই করতাম। সিলেট সিটি কর্পোরেশনে দরখাস্ত করে লিখিত অনুমুতি নিয়ে তখন বসার অনুমতিও পেয়েছিলাম। কিন্তু বৃষ্টি হলে অগত্য দৌড়াতে হতো। জিন্দাবাজেরের ‘ইটালি রেস্টুরেন্ট’ই ছিলো আমাদের তখনকার আড্ডা। পিঁয়াজু-বেগুনি, ডালপুরি, ছোলাভোনা হয়ে চা-সিঙাড়া এসবের উপর দিয়ে ঝড় বইতো। এই চায়ের সাথে সিঙাড়া খাওয়া এটা অনন্ত বিজয়ের কাছে এক মজার খাবার ছিলো। চা আসবে আর সিঙাড়া থাকবে না তা তো হয় না। সে ঠাণ্ডা হোক কিংবা বাসি সিঙাড়া তার চাইই চাই! এভাবেই মূলত আমরা আমাদের পাঠচক্রের আলাপ-আলোচনা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন ধীরে ধীরে কিছু নতুন সদস্যও যুক্ত হচ্ছিলো। এর পাশাপাশি আমরা ষোলো ডিসেম্বর, একুশে ফেব্রুয়ারি, ছাব্বিশে মার্চ উপলক্ষে আমাদের সব সদস্যদের নিয়ে শহরে র‍্যালি করতাম। পুস্পস্তবক অর্পণ করতাম। পাশাপাশি শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোড়ে বেশ বড় সাইজের কাপড়ের ব্যানারও টানিয়ে দিয়েছিলাম। আমাদের তখনও কোনো অফিস ছিলো না। ব্যানারে ‘বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিল’র একটা ইমেইল আইডি দেওয়া ছিলো। নিচে যোগাযোগের নাম্বার। একটা অনন্ত বিজয়ের। আরেকটা আমার। বেশ ভালোই সাড়া পেয়েছিলাম। এটা আমাদের সবার কাছেই বেশ আনন্দের ছিলো। তখন ফোন করে কেউ কেউ বলতেন কিভাবে তিনি ধর্মমুক্ত হলেন। এখন কি অবস্থায় আছেন। ইত্যাদি। মাঝেমধ্যে হুমকিও যে আসতো না, তা না। আসতো। অন্তত সেসময় যেসব হুমকি আসতো তখন বেশ ভালোভাবেই আমরা সামাল দিয়েছি। দুই হাজার দশ সাল পরবর্তী অবস্থা গোটা দেশের ধর্মীয় উত্তেজনা, জঙ্গিবাদ ছিলো ভয়ানক। যদিও শেষতক অনন্ত বিজয়দেরকে হত্যার মধ্য দিয়েই ইসলামি জঙ্গিরা সফল হয়!

(৪)
তখন সম্ভবত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসেনি। সাল সম্ভবত ২০০৬ সাল হবে। অনন্ত বিজয় দাশ আমাদেরকে বললেন, চলো ঢাকা থেকে দিন দু’য়েক বেড়িয়ে আসি। এই বেড়ানোটা আসলে ঠিক বেড়ানোও না। কিছু দরকারি কাজও আছে। এক দু’জনের সাথে সরাসরি দেখা সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা আছে। সুতরাং এ ঠিক বেড়ানো না। আমরা মোটামুটি তখন প্রায় সবাই-ই যেতে রাজি। এই ফাঁকে সবাই দলগতভাবে ঢাকায় বেড়াতে পারলাম, পাশাপাশি কয়েকজন বিশিষ্ট লোকেদের সাথে দেখাসাক্ষাতও করলাম এ তো বেশ আনন্দের খবর। তখন সবাই বললাম যাওয়ার সময় ও টিকেট এসবের একটা প্ল্যান করি। সে প্ল্যান মোতাবেক টিকিট কাটা হয়। তিন জন। সৈকত চৌধুরী শেষতক কোনো কারণে জানি যেতে পারেনি। লিটন দাস, অনন্ত বিজয় আর আমি। আমরা বাসে করেই রওয়ানা দেই। সকালের বাস ধরে প্রায় বিকেলে নাগাদই ঢাকায় পৌঁছাই। উঠি ফকিরাপুলের কোনো এক হোটেলে। হোটেলে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের খাবার খেয়ে একজনের সাথে দেখা করতে যাই। তখনকার কোনো এক বামদলের কর্মী ছিলো ওই লোক। এখন খাঁটি আওয়ামিলিগার! তার বিশাল ফ্ল্যাট। মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে যা যা থাকে তার সবই আছে। ঝা তকতকে মেঝে। তেমনি হালকা ক্রিম কালারের রঙ করা ওয়াল। বিশাল টিভি। কি নেই সেই বাসায়? কিন্তু এতোসব কেনো বলছি? কারণ তার দলের নেতার আসলে কোনো বাড়িগাড়ি সে অর্থে নেই। যা আছে সবই দলের নামে। অথচ এই লোকের সবই আছে। নেতাও আছে। দলও আছে। তেমনি শ্রমিক-কৃষকও আছে। যা নাই তা হলো, বিপ্লব! বিপ্লব যেনো এই ফ্ল্যাট বাড়িতেই বন্দী হয়ে গুমরে গুমরে কান্নাকাটি করে মরছে! যাই হোক এই এক কিম্ভূতকিমাকার অবস্থা থেকে বেরিয়ে আমরা পরদিন যাই অধ্যাপক অজয় রায়ের বাসায়। তখন অজয় স্যার অনেকটাই নজরবন্দী। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে সহ দেশের তখনকার তাঁর সমমানের প্রায় সবাইকেই এভাবেই নজরবন্দী করে রেখেছিলো। আমরা আগেই এসব জেনেবুঝেই যথাসময়ে তাঁর বাসায় পৌঁছে যাই। তখন অজয় স্যার শারীরিকভাবে বেশ শক্তপোক্তই ছিলেন। একে একে আমাদের সবার পরিচয় জানলেন। পাশাপাশি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নানান প্রশ্ন করলেন। তখন বিজ্ঞান-যুক্তিবাদ নির্ভর ‘মুক্তান্বেষা’ ছোটোকাগজ নিয়ে পরিকল্পনা চলছে। মাসিক হবে, না ত্রৈমাসিক হবে তা তখনও ডিসিশন হয়নি। পত্রিকার বিষয়ে অনেক আলাপ করলেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানালেন। পাশাপাশি ‘মুক্তমনা’র লেখালেখি নিয়েও নানান কথা বললেন। তখনকার দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে তাঁর চিন্তা-ভাবনা, লেখালেখি সমস্তই একে একে এই ব্যস্ততার মধ্যেও বলে গেলেন। সেদিন অধ্যাপক রায় শারীরিকভাবে খুব সুস্থ ছিলেন এমন না। কিন্তু আমাদেরকে পেয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে শারীরিক অসুস্থতা থাকা সত্বেও আলাপ চালিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা তিনজনই তখন তাঁর কথা কতোটকু ভালো বুঝতে পেরেছিলাম জানি না। তবে অধ্যাপক অজয় রায়কে খুব কাছ থেকে তাঁকে সেদিন দেখতে পেয়েছিলাম, আলাপ করতে পেরেছিলাম এটাই ছিলো বড়ো পাওয়া। আজ আর আমাদের মাঝে অধ্যাপক অজয় রায় নেই। বিজ্ঞান লেখক-ব্লগার অভিজিৎ রায় ও অনন্ত বিজয় দাশও আর বেঁচে নেই! অধ্যাপক অজয় রায় পুত্র শোক বুকে চেপে স্বাভাবিক মৃত্যু হলেও অভিজিৎ রায়-অনন্ত বিজয় দাশদের টগবগে তারুণ্যকালীন দেশি ইসলামি মৌলবাদী জঙ্গিরা প্রকাশ্যে কুপিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। আজন্ম সংগ্রামী এক শিক্ষক-বিজ্ঞানী বাবার কোলে তার সন্তানের লাশ ধরিয়ে দেয় তাঁরই সংগ্রামের ফসল এই জাতি-রাষ্ট্রটি!

(৫)
তারপরের দিন খুব সম্ভবত আমরা কবি-লেখক ওয়াহিদ রেজার বাসায় যাই। নারায়ণগঞ্জ শহরে। আগে থেকেই তিনি আমাদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বলেছিলেন সকালের দিকে যেতে। যাতে আমরা নারায়ণগঞ্জ শহরটা এদিকওদিক ঘুরে ফিরে দেখতে পারি। কিন্তু আমরা আর আসলে ঠিক সকাল সকাল যেতে পারি নি। যেতে যেতে তখন প্রায় দুপুরই বলা চলে। শহরে পৌঁছেই ফোন দেই তাঁকে। বললেন সরাসরি তাঁর চেম্বারে যেতে। গিয়ে দেখি ওয়াহিদ রেজা নামে কোনো দাঁতের ডাক্তারও সেখানে নেই। তেমনি এই নামে কোনো চেম্বারও সেখানে নেই। অগত্য পরে তাঁকে আবার ফোন দেই। ফোনের ওপ্রান্তে হো হো হো করে হেসে তিনি বলেন, বুঝেছি! তা উপরে উঠে আসো। আমি তোমাদের তিনজনকেই দেখতে পাচ্ছি। ফোন রাখতে না রাখতেই ওয়াহিদ ভাই চেম্বার থেকে বেরিয়ে এসে আমাদেরকে তাঁর চেম্বারে নিয়ে যান। ওয়াহিদ ভাইয়ের প্রকৃত নাম সম্ভবত আনিসুর রাব্বী। তাঁর ডেন্টাল চেম্বারেরও ওইরকম নাম ছিলো। রাব্বি ডেন্টাল হল মনে হয়। তো চেম্বার থেকে আমরা তাঁর বাসার দিকে রওয়ানা দিই। বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। ওয়াহিদ ভাই সমানে তখন নানান বিষয়ে আলাপ করে যাচ্ছেন। সরদার ফজলুল করিম, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফা, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ, তসলিমা নাসরিন, প্রবীর ঘোষ এঁদের প্রসঙ্গে নানানরকম স্মৃতিচারণামূলক বলে যাচ্ছেন। এর পাশাপাশি সিলেটে বেড়াতে গিয়ে তিনি কিভাবে রোড এক্সিডেন্ট করে তাঁর স্ত্রীকে হারান তাও বিস্তারিত বলেন। এলবাম খোলে পারিবারিক ছবি দেখান। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আর বিয়েথা করেন নি। এক মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে এভাবেই আজও আছেন। আমরা এসব নানান আলাপ সবাই খুব মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনে যাচ্ছি। খেয়াল করলাম ওয়াহিদ ভাই কথা যখন বলেন তখন কারো দিকে সরাসরি চোখ তোলে তাকিয়ে কথা বলেন না। কেমন নিজের মতো ঘোরলাগা হয়ে বলে যান। বেশ উঁচু স্বরে কথা বলেন। কথা বলতে বলতে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাহাহা করে হাসেন। হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল গড়ায়! আর একটার পর একটা সিগারেট টানতেই থাকেন। কালো পাইপযুক্ত করে সিগারেট টানেন। এক সময় নিয়ম মেনে আমাদের পেটেও ক্ষিধে জানান দেয়। তিনি টেবিলে খাবার সাজিয়ে ডাকেন। খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি শীতলক্ষ্যা নদীর পাঙ্গাস মাছ রান্না করিয়েছেন। প্রথমেই বললেন, তোমাদের জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর তরতাজা পাঙ্গাস মাছ এনে রান্না করিয়েছি। কিন্তু আমরা আসলে পাঙ্গাসের নাম শোনে কেমন যেনো এই ডিশকে এভয়েড করা শুরু করলাম। কারণ পাঙ্গাস তো ততোদিনে ইয়া বিশাল সাইজের হয়ে ফার্মেই উৎপাদন হওয়া শুরু করেছে! আর আমাদের মধ্যে বিশেষ করে অনন্ত বিজয়ের অস্বস্তি ছিলো একটু বেশিই। তাঁর মাছ খাওয়াখাওয়ি নিয়ে বেশ বাঁধাধরা কিছু নিয়ম আছে। সব মাছ খেতেন না। পাঙ্গাসঃ তো নয়ই। ফার্মের মুরগি হলেই অনন্ত বিজয় বেজায় খুশি। আর খুব প্রিয় ছিলো বিরিয়ানি। তো যাইহোক সব মিলিয়ে সে এক এলাহি খানাপিনার আয়োজন করিয়ে রেখেছেন ওয়াহিদ ভাই। নিজেও এটাওটা এগিয়ে দিচ্ছেন। আমাদের সাথে খাচ্ছেন আবার সমানে গল্পও চালাচ্ছেন। খাওয়াদাওয়া শেষে আমরা ঘন্টা দেড়েক মতো আড্ডা দেই। আড্ডা তো ফুরাবে না জানি। কিন্তু নিয়ম মেনে তো আমাদের উঠতেই হয়। তার আগে আগে তাঁর সম্পাদিত ছোটো কাগজ ‘ড্যাফোডিল’র কয়েকটি সংখ্যা দিলেন। আর তাঁর নিজের লেখা কিছু বইয়ে অটোগ্রাফ সহ আমাদের তিনজনকেই দিলেন। সেদিনের মতো আমাদের উঠতেই হলো। কবি-লেখক ওয়াহিদ রেজাও আজ আর বেঁচে নেই। হঠাৎ করেই যেনো আচমকা চলে গেলেন। অথচ কতো কথা বলবেন বলে তাঁর সময় আমার সময়ের ব্যবধানের কারণে আর সেসব বলে উঠতে পারেন নি! এই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ঘোরাঘুরি প্রসঙ্গে এক মজার ঘটনা মনে পড়লো। আমরা তিনজনেই হোটেলে উঠেছি একই রুমে। তো তখন আমি আর লিটন সিগারেট খাই। এটা দাদা সম্ভবত সরাসরি দেখেন নি। তাঁকে লুকিয়ে খাই। সামনাসামনি খাই না। এবার ঢাকায় এসে এভাবে তাঁকে কোথাও একা রেখে একজন একজন করে আলাদা করে আমরা দু’জন সিগারেট টানতে যেতাম। হোটেলে এক সন্ধ্যেয় তাঁকে টিভির সামনে রেখে আমরা দু’জন বাইরে বসে সিগারেট টানতে যাই। রুমে ঢুকতেই দেখি দাদা ঠোঁট চেপে মুচকি মুচকি হাসছেন। এক পর্যায় সরাসরি বললেন, সিগারেট তো আমিও খাই। এতে লজ্জার কি আছে! আমাকে সঙ্গে নিয়েই তোমরা সিগারেট টানো। আমাকে এভাবে একা একা রেখে তোমরা দুইজন এখানে সেখানে গিয়ে ফুঁক ফুঁক করে সিগারেট টানতেছো, এটা কিন্তু ঠিক না! তারপর তিনজন মিলে সে কি হাসাহাসি।

(৬)
এবার সিলেটে আমাদের একটা বসার জায়গা হয়েছে। আমরা ততোদিনে রিকাবিবাজারে ছোটোখাটো একটি অফিস নিয়ে নিয়েছি। প্রায় প্রতিদিনই আমরা সেখানে আড্ডা দেই। সংগঠনের সাইনবোর্ডও টানিয়ে দিয়েছি। আমরা কিছু ফার্নিচারও কিনতে শুরু করেছি। কিছু বইপত্রও ধীরে ধীরে সংগ্রহ করা শুরু করি। অফিসের জন্য। তো এবার আমরা সিদ্ধান্ত নিই সংগঠনের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করবো। লেখক অনন্ত বিজয়ই সমস্ত কিছুর মূলে। তো সেই লক্ষেই ফান্ড সংগ্রহ থেকে শুরু করে মূল অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করা শুরু হলো। আমরা যে যার মতো সারাদিন ক্লাস-টিউশনি শেষ করে অফিসে গিয়ে তা নিয়ে আলাপ চালিয়ে যাই। এক পর্যায় সিদ্ধান্ত হয় বিজ্ঞান বক্তা আসিফ ও তাঁর ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’কে আমরা নিমন্ত্রণ করবো। তাদেরকে নিমন্ত্রণ করতেই তারা রাজিও হয়। এজন্য খরচাপাতি থেকে হোটেলে থাকা নিয়ে তারা কেউই আমাদের এতটুকু কোনোকিছু ছাড় দেয়নি। তারপরেও আমরা সিদ্ধান্ত নিই, না আমরা বিজ্ঞানবক্তা আসিফকে কেন্দ্র করেই মূল অনুষ্ঠান করবোই করবো। কিন্তু অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব কে করবেন তা নিয়ে বেশ সমস্যা দেখা দিলো। কারণ অনেকেই তখন সরাসরি না বললেও ইনিয়েবিনিয়ে সোজা এড়িয়ে গেলো। সে আমার বিভাগের শিক্ষক থেকে সিলেটের অনেকেই। তেমনি অনন্ত বিজয়ের শিক্ষকেরাও এড়িয়ে গেলো! যাইহোক এক পর্যায় আমাকে বলা হলো, আমি যদি এমসি কলেজের বাংলা বিভাগের তৎকালীন প্রধানকে রাজি করাতে পারি তবে খুব ভালো হয়। তিনি আমার শিক্ষকও। যাইহোক আমি গেলাম তাঁর কাছে। তিনি সব শুনলেন। অনুষ্ঠানের সূচি দিলাম। মূল প্রবন্ধ যেটা পাঠ হবে তারও একটা ফটোকপি দিলাম। বললাম স্যার আপনাকে এখনই কোনোকিছু জানানোর দরকার নেই। পরে জানালেও হবে। দিন দুই পর আবার আমি তাঁর কাছে যাই। তিনি আমাকে দেখে বেশ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে বললেন, আমি সভাপতিত্ব করবো। আপনারা অনুষ্ঠানের কার্ড ছাপাতে পারেন। আমিও খুশি। তো এভাবেই সবকিছু বেশ ভালোই এগুচ্ছিলো। কিন্তু বিধিবাম! হ্যাঁ, তখন দিন চারেক পরে দেখি বিভাগের প্রধান আমাকে ডেকে নিয়ে বেশ অনুতপ্ত হয়েই বললেন, বাবারে আমি আপনাদের অনুষ্ঠানে থাকতে পারবো না। আমার কিছু প্রশাসনিক সমস্যা আছে! ইনি সবাইকেই আপনি সম্বোধন করতেন। তাঁর কথায় আমার মাথায় যেনো বজ্রাঘাত হলো! এখন প্রায় সব গুছিয়ে এনেছি আর ইনি কী না বলেন অনুষ্ঠানে থাকতে পারবেন না! সেদিন তাঁকে রাগের মাথায় অবশ্য বেশ কড়া কথাই বলেছিলাম। মাথা আসলে কাজ করছিলো না। পরে যাই হোক আমরা সবাই বসে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই অনেক চিন্তাভাবনা করে অধ্যাপক ড. আবুল ফতে ফাত্তাহ স্যারকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে সক্ষম হই। তিনি রাজি হন। আমরা তখন যেনো অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। কিন্তু এদিকে আমার তো দুরুদুরু বক্ষ। কারণ আমাকে অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে হবে। প্রবন্ধ লেখা যেমনতেমন উপস্থিত সবার সামনে এভাবে আমি স্কুলে পড়াকালীন এক আধবার দাঁড়ালেও তা তো বুঝে না বুঝে করেছি। কিন্তু এবার উপস্থিত সমজদার সবার সামনে নিজের লেখা নিজে পাঠ করতে হবে এ এক কঠিন পরীক্ষা! তো সব মিলিয়েই সে অনুযায়ী প্ল্যান চলে যেমন অফিসে, তেমনি আমার ম্যাসেও। লেখালেখি থেকে নানান বিষয়ে অনন্ত বিজয় নিজে এটাওটা দেখিয়ে দিচ্ছেন। বইটই ধরিয়ে দিচ্ছেন। আমার তখন সে সময় দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাও চলছিলো। সব মিলিয়ে বিরাট টেনশন। এর মাঝে সিলেটি উচ্চারণ নিয়ে সমস্যা তো আর আছেই। সৈকত-লিটনরা তো মোটামুটি তখন আমার উচ্চারণের ক্লাস নেওয়া শুরু করে দিয়েছে! প্রবন্ধ একটা লেখেছিলাম বটে তবে তা এই সময়ে এসে এটাকে অত্যন্ত খেলো বলে মনে হয়। ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ শিরোনামে এটা লেখা ও পাঠ করেছিলাম। যাইহোক অনুষ্ঠানের দিন সাতেক আগ থেকেই সিলেটে মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। সেকি যেইসেই বৃষ্টি নাকি। দিনরাত্রি অবিরাম বৃষ্টি আর বৃষ্টি। যেদিকেই যাই বৃষ্টি মাথায় করেই যাই। কাপড়চোপড় সব ভেজা। কাপড় ধুয়ে দিলেও সহজে আর শুকায় না। এদিকে আমরা লিফলেট-পোস্টার যা লাগাই তা বৃষ্টি নিমিষেই ধুইয়ে মুছে সাফ করে দেয়! লিটন, সৈকত, আমি ও অসীম আমরা এই বৃষ্টির ফাঁকে ফাঁকে বৃষ্টি মাথায় করেই সিলেটের প্রায় সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হাতে লেখা পোস্টার, লিফলেট, চিঠি এসব প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন অসীম দাস আর তার নাটকের দল ‘নগরনাট’ও আমাদেরকে বেশ সহযোগিতা করেছে। ২৭ জুন, ২০০৭। সেদিনও বৃষ্টি। প্রচণ্ড বৃষ্টি। স্থান সিলেট শারদা হল। আমরা ভেবেই নিয়েছি আমরা নিজেরা নিজেরাই খালি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবো। দর্শক বলতে কেউ হয়তো উপস্থিত হবে না। এদিকে বিজ্ঞানবক্তা আসিফ ও তাঁর টিমও ঢাকা থেকে যথাসময়ে হাজির। অনুষ্ঠানের কিছু ভুলত্রুটি থাকা সত্ত্বেও আমরা মোটামুটি বেশ গুছিয়ে নিয়েছি। এবার যথাসময়ে দর্শক উপস্থিত হবে কি না কে জানে! টিমের অন্যরা এই নিয়ে বেশি চিন্তিত হলেও আমার চিন্তা ভিন্ন। পারবো তো শেষমেশ নিজের কাজটা ঠিকঠাক মতো করতে? অনুষ্ঠানের আগে আগে আবহাওয়া একটু ভালো হয়। বৃষ্টি খানিকটা কমে আসে। দেখি ধীরে ধীরে একজন দু’জন করে তখন আসতে দু’জন শুরু করেছে। দর্শকদের আসা দেখে সবাই মোটামুটি উৎফুল্ল। একেবারে দর্শক না হলে কীভাবে কি! যাইহোক অনুষ্ঠান যথাসময়ে শুরু হয়। আমিও ততক্ষণে ঘেমে-নেয়ে দুরুদুরু বুকে প্রবন্ধ পাঠ শেষ করি। ততক্ষণে বেশ সাহস হয়ে গিয়েছে। এরপর সভাপতি, প্রধান অতিথি থেকে সবাই সেই প্রবন্ধের আলোকে সমালোচনা-ভুলত্রুটি ধরে ধরে বেশ চমৎকার এক মনোজ্ঞ আলোচনা করেন। বিশেষ করে অধ্যাপক আবুল ফতেহ ফাত্তাহ ও কবি মোস্তাক আহমাদ দ্বীন অত্যন্ত চমৎকার করে পুরো আলোচনা অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে রাখেন। আমাদের অনুষ্ঠানে ‘ডিসকাশন প্রজেক্ট’ ও বিজ্ঞানবক্তা আসিফের প্রদর্শনীই ছিলো মূলত মুখ্য। তাঁর মহাজাগতিক এই ব্রহ্মাণ্ড নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি তখন বেশ ভালো সাড়া জাগিয়েছিলো। তো আলোচনা অনুষ্ঠান একটু দীর্ঘায়িত হওয়ায় এটা শুরু করতে না করতেই দর্শক কিছুটা বিরক্ত হয়ে উঠে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু নতুন হিসেবে আমরা তখন সময়ের ব্যাপারটা এতোটা খেয়াল করে উঠতে পারিনি। তদুপরি বিরূপ আবহাওয়া। তো পরের পর্ব শুরু হতেই এর মাঝে হঠাৎ সিডি চ্যাঞ্জ করতে না করতে বা প্রজেক্টরে কিছু একটা গণ্ডগোল হতেই উপস্থিত দর্শকেরা মনে করে যে অনুষ্ঠান এখানেই শেষ! তাই অনেকেই তখন বের হয়ে যেতে থাকে। শেষমেশ আর ঠিক পুরো ডকুমেন্টারিটি দেখানো যায় নি। শেষে বিজ্ঞান, বিবর্তন নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বও ছিলো। সেটা মোটামুটি আমরা চালিয়ে নিতে পেরেছিলাম। তখনও বিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী বেশ কিছু দর্শক হলে উপস্থিত ছিলেন। তো ঘটনাবহুল পুরো দিনশেষে আমরা জিন্দবাজারের তখনকার ‘মহানগর’ রেস্টুরেন্টে দলবল নিয়ে খেতে যাই। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নিজেদের ভুলত্রুটিগুলো নিয়ে আলোচনা করি। খেয়াল করি আমরা আসলে কেউই খুব ভালো সন্তুষ্ট না হলেও প্রথম অনুষ্ঠান হিসেবে আমরা যে খুব খারাপ পারফর্ম করেছি এমনও নয়। বরং বেশ ভালোভাবেই প্রথমবারের মতো উৎরে গিয়েছি। সবাই টিমওয়ার্ক করাতেই তা সম্ভব হয়েছে। দেখলাম অনন্ত বিজয় দাশও বেশ সন্তুষ্ট। এই অনুষ্ঠানেই আমাদের আনুষ্ঠানিক নাম ঘোষণা ঘোষণা দিয়ে নয়া কমিটি গঠন করা হয়।

আজ এই অবেলায় অবিশ্বাসীর সহচর-সহযাত্রী হিসেবে এসব আমার আমাদের বন্ধুদের বারবার মনে পড়ে। বারবার স্মৃতির অতলে ডুব দেই। স্মৃতি হাতড়াই। অনন্তকে খুঁজি। আমাকে আমি খুঁজি। আমাদের সবাইকে খুঁজি। হারানো সেই সোনালি সময়কে খুঁজি ফিরি। এখন কেমন যেনোবা ভ্রম বা মরীচিকা বিলে মনে হয়! কারণ এই বয়সে এসব স্মৃতিচারণা করার তো আমাদের কারোরই কথা ছিলো না। কথা ছিলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার। আর আজ কী না ফেলে আসা সোনালি স্মৃতিময় দিনগুলোতে অনন্ত বিজয় দাশকে নানা রকম ঘটনায় আমরা বারবার খুঁজে ফিরি। এখন এই পাঁচ বছরে মে’র ১২ তারিখ আসতে না আসতেই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে সবাই কেমন যেন আপ্রাণ চেষ্টা করি ১২ মে, ২০১৫ দিনটা যেনো কেউই ভুলেও উচ্চারণ না করি! কিন্তু প্রাগৈতিহাসিক কালের নিয়ম মেনেই সেই কালো দিনটি আমাদের সামনে আসে। আমরা ভুলে-বেভুলে, শোক চেপে কুখ্যাত এই দিনটিকে অসহনীয় এক যন্ত্রণা বুকে নিয়ে পার করি। আর আজ সেই কুখ্যাত কালো দিন। সেই বিভীষিকাময়, ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুরতম ঠাণ্ডা মাথার পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের দিন। আজ বিজ্ঞান লেখক-ব্লগার অনন্ত বিজয় দাশের পঞ্চম হত্যা বার্ষিকী। শোক-কান্না ও বিচারহীনতার পাঁচ পাঁচটি বছর গতো হলো আজ ১২ মে, ২০২০ ইসায়ি সালে। অনন্তহীন পাঁচ পাঁচটি বছর!

“আমরা হেঁটেছি যারা নির্জন খড়ের মাঠে পউষ সন্ধ্যায়
দেখেছি মাঠের পারে নরম নদীর নারী ছড়াতেছে ফুল
কুয়াশায় …
… জানি না কি আহা
সব রাঙা কামনার শিয়রে যে দোয়েলের মতো এসে জাগে
ধূসর মৃত্যুর মুখ…”

প্রিয় অনন্ত বিজয়, আমরাও আস্তে ধীরে সেই ধূসর অন্ধকার পরিণতির দিকে হয়তোবা স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকেই সবাই ক্রমশ ধাবিত হচ্ছি। কিন্তু আফসোস যে আপনি সেই টগবগে তারুণ্যের ফ্রেমে থেকেই আমাদের দিকে তাকিয়ে, সেই চিরচেনা মুচকি হাসি হেসেই সারা জীবন ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেই যাবেন। ব্যক্তি অনন্ত বিজয় দাশ যে ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে, ন্যায় বিচার চেয়ে বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হলো তার দায় তো আমরা কেউই কোনোভাবেই এড়াতে পারি না। তাই এ লজ্জা আমাদের। এ অক্ষমতা-ব্যর্থতা একান্তই আমাদের। এ দায় আমাদের। এ লজ্জা গোটা দেশের। আমাদের ক্ষমার কোনো সুযোগ নেই!

মনির হোসাইন
১২ মে, ২০২০
জার্মানি ।

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 4 = 4