সংগ্রামে-শপথে বলীয়ান গৌরবময় সংগ্রামের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী।

পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ,একটি নাম, যে নামের সাথে রয়েছে লক্ষ তরুণের ভালোবাসা,অধিকারকামী প্রতিটা মানুষের প্রেম আর মহান জুম্ম জনগণের অকৃত্রিম মমতার সম্পর্ক।

জন্মলংগ্ন থেকেই পিসিপি তার আপন আলোয় উজ্জীবিত হয়ে আলোর দিশারী হয়ে জুম্ম জনগণের লড়াই-সংগ্রামে নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে এসেছে,এখনো যাচ্ছে।

আমার রাজনীতির হাতেখড়ি,প্রিয় পাঠশালা,প্রিয় পিসিপি। প্রথম যখন রাঙামাটির বাইরে পা রেখে চট্টগ্রামে যাই,সেখন হতেই পিসিপির সাথে পথচলা। খুব বেশি সময় ধরে সেটা না হলেও বর্তমান অবধি সংগঠনটির প্রতি ভালোবাসা আর হৃদয়ের টান কোনটাই কমে নি,বরং আরো বেড়েছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো আরো বৃদ্ধি পাবে।

অনেকে বলতে পারেন,রাঙামাটি থাকতে পিসিপির সাথে যুক্ত ছিলেন না,তাহলে চট্টগ্রামে গিয়ে কি আপনার চৈতন্য ঠিক হয়েছিল? বিষয়টা ঠিক সেরকম না!
মহান কার্ল মার্কস একটা কথা বলেছিলেন,”মানুষের চিন্তাধারা তার চারপাশের সামাজিক অস্তিত্বের দ্বারা নির্ধারিত হয়” অর্থাৎ মানুষ যে পরিবেশে বাস করে বা বেড়ে ওঠে, তার চিন্তাধারাও ঠিক সেই প্রকারে গড়ে ওঠে।

.jpeg” alt=”” width=”854″ height=”480″ />

মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হওয়ায় চিন্তাধারাটও ঠিক ততদূর পর্যন্তই বিকশিত হয়ে উঠেছিল,যতটুকুতে আমার পরিবারের শ্রেণীর অবস্থান। চারপাশের মানুষগুলোর চিন্তাধারা,তাদের অর্থনৈতিক জীবনধারা সবকিছু মিলিয়ে আমি এমন এক পরিবেশে বেড়ে উঠেছি,যেখানে কেবল সুবিধাবাদিতা ছাড়া অন্য কোন কিছুরই অস্তিত্ব ছিল না। চট্টগ্রাম যাওয়া অবধি আমি বড় হয়েছি,”লেখাপড়া ভালো করে করো,যাতে একটা ভালো চাকরী পাও” এই চিন্তাটা মাথায় নিয়ে। জীবনকে জেনে জীবনকে পরিবর্তন করার মূলমন্ত্রটা তখনো আমার নাগালের বাইরে ছিল বলা যায়। এখানে কোথাও জীবনের মানে নেই,আছে কেবল পরের দুঃখে হাসা,অপরকে ঠকিয়ে নিজে বেঁচে থাকা,হিংস্রতায় আর নগ্নতায় ভরা সে জীবন। জীবনকে জীবনের মূল্য দেওয়ার কোন অর্থই সে জীবনে ছিল না।

তারপরে চট্টগ্রামে গিয়েছিলাম,সেখানে গিয়েই সরাসরি পিসিপির সাথে যুক্ত হই। প্রিয় সংগঠনের হাত ধরে খুব অল্প সময় পথচলা হলেও শিক্ষাটা নেহাতই অল্প ছিল না।
নিজেকে জানতে পারার রহস্য যেন আমি উন্মুক্ত করে ফেলেছিলাম,পৃথিবীটাকে যেন এক নতুম আঙ্গিকে দেখতে শুরু করলাম,রঙিন দুনিয়ার ভিড়েও আরো এক সুন্দর আর সুশৃঙ্খল জীবন যে আছে,সেটা পিসিপির সংস্পর্শে না আসলে কল্পনা করতে পারতাম না। ভালোবাসা আর ত্যাগের মহিমায় অভিভূত হয়ে নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগটুকু পেয়েছিলাম পিসিপির হাত ধরেই।
মানুষের প্রতি প্রেম,ভালোবাসা,বিপদে দৃঢ় হওয়া,স্থিরচিত্তে সমস্যার সমাধান করা,ছোট-বড় সবাইকে নিয়ে একসাথে কাজ করা সমস্ত কিছুই আমি পেয়েছি পিসিপির কাছ থেকেই। আমার আমি থেকে আমাদের বলতে পারার সাহসটুকু সঞ্চিত করতে পেরেছি,কেবল এর আদর্শের দ্বারাই।

মনে পড়ে সেই,ভাড়া বাঁচাতে বাসে দুলোদুলি করে যাতায়ত করা,জরুরী প্রয়োজনে ক্লাস ছেড়ে উঠে যাওয়া,দুপুরের খাবার রাত্রিরে খাওয়া,রাত্রিরে কখনও বা উপোস,শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত হতো সেই চট্টগ্রামের রাজপথগুলি “মহান নেতা এম.এন.লারমা,লও লও লাল সালাম,এসে ভাই,এসো বোন,গড়ে তুলি আন্দোলন,দিয়েছি তো রক্ত,আরো দেবো রক্ত,রক্তের বন্যায়,ভেসে যাবে অন্যায় ইত্যাদি”,প্রেসক্লাব চত্ত্বর মুখরিত হতো জনসমাগমে,শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্যগুলি,চেরাগী পাহাড় আর আন্দরকিল্লার মিছিলগুলো,প্রখর রৌদ্রতাপের মাঝেও রাস্তায় হেঁটে অনুষ্ঠানের কার্ড বিলি করা,মেডিকেলের সেই নিদ্রাহীন রাত্রিগুলো। সমস্ত কিছুই ছিল আগাগোড়াই ভালোবাসায় মোড়ানো।

এবার পিসিপি ৩১ বছর অতিক্রান্ত করে ৩২ বছে পদার্পণ করবে। পথচলার এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় পিসিপি অনেক সংকটময় মুহুর্ত অত্যান্ত সাহসিকতার সাথে মোকাবেলা করে এসেছে,দুর্দিনেও ভেঙে না পড়ে দূর্বার গতিতে সাহসের সঞ্চার করে এগিয়ে চলেছে আজ অবধি। “শিক্ষা,সংহতি,সাম্য,প্রগতি” এই চার মূলমন্ত্রে দীক্ষত হয়ে ছাত্রসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী এই সুশৃঙ্খল সংগঠনটির শুরুটা হয়েছিল ইতিহাসের এক রক্তমাখা ঘটনা থেকে। ১৯৮৯ সালের ৪ঠা মে লংগদু গণহত্যার কথা আমরা সকলেই জানি। সেই সময়ে আমাদের অনেক বন্ধু,ছাত্র(স্বয়ং আমিও) জন্মগ্রহণ না করলেও,আমরা সেই সময়কার সেই ঘটনার ভয়াবহতা আর নৃশংতার কথা জানি। কেমন করে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে সেদিন শাসকেরা উল্লাসে মেঠে ওঠেছিল,হিংস্র হায়েনাদের মতন কিরুপে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল অসহায় জুম্মদের উপর,ভাইয়ের সামনে বোনকে ধর্ষণ,স্ত্রীর সামনে স্বামীকে হত্যা,বোনের সামনে কিরুপে এক মাতাকে বিবস্ত্র করা হয়েছিল আমরা সেই দূধর্ষ সময়টির কথা জানি।

বাঁচার আকুতি নিয়ে হাত জোড় করে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী হয়েও আল্লাহর নাম নিয়েছিল জুম্মরা সেদিন,তারপরেও তাদের বাঁচার আকুতি পৌঁছায়নি সেই নরপশুদের কানে। উন্মত্ত হাসি হেসে উপহাস করেছিল তারা। লংগদুর সমস্ত আকাশ-বাতাসকে প্রকম্পিত করে,গিরিরাজি থেকে বয়ে চলা ঝর্ণাধারাও বোধহয় সেদিন কিছুক্ষণের জন্যে হলেও থেমে গিয়েছিল,সেই নৃশংসতা দেখে। কিন্তু দানবের হৃদয় কাঁপে নি সেদিন,মানবতা ক্রন্দন করেছিল কেবল আর দানবতা তার কুঠারসম দাঁত বের করে উল্লাসে ফেটে পড়েছিল।

লংগদুর আকাশের কালো মেঘের ছাঁয়া এখনোও সরে নি,সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের কোথাও আজ নিরাপত্তার লেশমাত্র চিহ্ন নেই। চারিদিকে আজ কেবল হাহাকার আর অরাজকতা বিরাজমান। এই মুহুর্তে পিসিপি হয়ে উঠুক আরো উজ্জ্বল আরও দেদীপ্যমান। সমস্ত পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে অন্যায় আর অত্যাচারের ঘোলা জলে আজ বড়গাঙ ও কলুষিত,সময় এসেছে সেটাকে পবিত্র করার।

পৃথিবীর বড় বড় লড়াইগুলোতে আর জাতীয় সংকটময় মুহুর্তে আমরা ছাত্র সমাজের ভূমিকাটা দেখেছি,১৯৪৮ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লবের মূলশক্তি ছিল ছাত্র সমাজ। ‘জার’ আমলে রাশিয়ায় ছাত্ররাই বিভিন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা ঘটায়। এমনকি ১৯৫৫ সালে আর্জেন্টিনায়, ১৯৫৮ সালে ভেনিজুয়েলায়, ১৯৬০ সালে কোরিয়ায় ছাত্র সমাজ পালন করে ঐতিহাসিক ভূমিকা। ১৯৬৪ সালে দ. ভিয়েতনাম ও বলিভিয়ার ক্ষেত্রেও জাতীয় সংকটে ছাত্র সমাজের অবদান ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবেই বিবেচিত হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্র রাজনীতি ত্রিয়মান কোনো ঘটনা নয়। এদেশও ভূখণ্ডের জন্মের সঙ্গে মিশে আছে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। বিশেষ করে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ’৬২-র কুখ্যাত হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন, ’৬৬-র ঐতিহাসিক ৬ দফা ও ১১ দফা, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-র নির্বাচন, ’৭১-এ মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি ও আন্দোলন সফল করার ভ্যানগার্ড হিসেবে তৎকালীন ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা অপরিসীম। পরবর্তীতে ’৯১-র স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও এদেশের ছাত্র রাজনীতির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকা।

জন্মলগ্ন থেকে পাহাড়ী ছাত্র পরিষদও তার ঐতিহাসিক দায়িত্বকে পালন করে আসছে। সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ছাত্রসমাজকে একত্রিত করে,তাদের শিক্ষা,সাংস্কৃতিক ও নৈতিক মানোন্নয়ন,ভিন্ন  ভাষাভাষী ১৪টি জাতিগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার প্রসার ঘটানো,ছত্র সমাজের মধ্যে প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিকাশ সাধন করে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটময় মুহুর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার-প্রসারে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে এসেছে এবং এখনো চালিয়ে যাচ্ছে।

১৯৯৭ সালে সম্পাদিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে পিসিপির ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সভা,সেমিনার,মিছিল-সমাবেশের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বরাবরই পিসিপি জুম্ম জনগণের আমনিয়ন্ত্রণাধিকারের কথা বলে আসছে এবং সেই উদ্দেশ্য কার্য পরিচালনা করে চলেছে।

ছাত্রসমাজের প্রতি,

আমরা সকলেই জানি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা একটি রাজনৈতিক সমস্যা। এটি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়,নয় কেবলমাত্র এক সাংস্কৃতিক সমস্যাও। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের অধিকারের প্রশ্ন এতে জড়িত,মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার প্রশ্ন এটি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে বিচার করলে দেখা যায়,পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ভাবে শাসন-শোষণ শিকার হয়ে আসছে। আমরা দেখি যে,স্বাধীন রাজার আমলে সামন্ততান্ত্রিক শোষণের শিকার হয়েছে জুম্ম জনগণ,মুঘল আমল,ব্রিটিশ আমল,পাকিস্তান আমলে এমনিক অধূনা বাংলাদেশ আমলে এসেও এই শোষণের মাত্রা বিন্দুমাত্র কমে নি। বরং বাংলাদেশ আমলে এসে সেটা আরো বেশি প্রকটাকার ধারণ করেছে। পাকিস্তান আমল থেকে অমুসলিম অধ্যূষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যূষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পরিণত করার যে ষড়যন্ত্র,স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সেটি অত্যান্ত সুকৌশলে,স্থিরচিত্তে বাস্তবায়ন করে চলেছে। বহুজাতির, বহু সংস্কৃতির বৈচিত্র্যটাপূর্ণ বাংলাদেশকে এক জাতি একরাষ্ট্র হিসেবে উওস্থাপনের হীন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল রাষ্ট্র। জিয়া সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে একটি অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে উপদ্রুত এলাকা হিসবে চিহ্নিত করে সেনাশাসনের কবলে জর্জরিত করেছিল।

দীর্ঘ দুই যুগের অধিক স্বশস্ত্র সংগ্রামের পরে ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও পাহাড়ে শান্তি ফিরে আসে নি,শান্তির পায়রা আকাশে ওড়ার আগেই মাটিতে লুঠোপুটি খেয়ে পড়ে গেছে। নয়া ঔপনিবেশিক কায়দায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে শাসন করা হচ্ছে,অপারেশন দাবানল(Operation wildfire) এর পরিবর্তে অপারেশন উত্তরণ জারি রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতিকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে দেয়া হয়েছে। চুক্তি বিরোধী অপশক্তিকে উস্কে দিয়ে পাহাড়কে অশান্ত করার হীন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে চলেছে রাষ্ট্র।

পাহাড়ের এই চলমান সংকটে প্রতিটি জুম্ম ছাত্রের নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত,আমি কে?

এর উত্তর বিশেষ বাস্তবতার আলোকে বিশেষ হতে পারে। তবে সেই বিশেষ থেকে সাধরণীকরণের মাধ্যমে আমরা যেটা পায়,সেটা হচ্ছে আমি একজন ছাত্র এবং কেবল ছাত্র নয়,একজন জুম্ম ছাত্র। যার উপর দুটি প্রধান ঐতিহাসিক গুরুদায়িত্ব বর্তমান।

প্রথমত ছাত্র হিসেবে আপনাদের নিজেদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা আবশ্যক,সেটা হোক রাষ্ট্রের প্রতি বা সমাজের প্রতি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি,তা হচ্ছে আপনি একজন জুম্ম ছাত্র। জুম্ম হিসেবে আপনার পরিচয়ের সাথে ছাত্র শব্দটি যুক্ত হওয়ার এর কর্মের পরিধি,দায়িত্ব ও কর্তব্য উভয়ই বেশি হয়ে যায়।

আপনি যখন নিজের গ্রাম ছেড়ে শহরে বা অন্য কোথাও পড়াশোনা করতে যান,সেখানে কেবল আপনি স্বয়ং নন। আপনি আপনার এলাকা বা গ্রামের প্রতিনিধি হিসেবেই সেখানে যান(বিবেচনা করুন)।

এরপরে আপনি যখন আরো উচ্চশিক্ষার জন্য পার্বত্য চটগ্রামের বাইরে যান,তখন আপনি কেবল আপনার গ্রামের প্রতিনিধি নয়,তখন আপনি পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবেই পরিচিত হন। যদি দেশের বাইরে যান,তখন আপনি নিজের দেশের প্রতিনিধি।

স্বভাবতই,আপনি যখন নিজের গ্রাম বা পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধিরুপে বর্তমান,তখন আপনার দায়িত্ব ও কর্তব্য বর্তায় সেই সমস্ত মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো,তাদের কথাগুলো প্রচার-প্রসার করে দেওয়া,সমস্যা-সম্ভাবনাগুলোকে বহির্বিশ্বের সাথে পরিচিতি করিয়ে দেওয়া। গ্রামের প্রতিটি মানুস যেমন আপনার কাছে ভালো কিছুর প্রত্যাশা করে,ঠিক তেমনিরুপে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি জুম্ম আপনার কাছ থেকে একটি সুন্দর,নিরাপদ ভূমির প্রত্যাশা করে। একটি সুন্দর ভোর আর নিরাপদ একটি রাত্রি,দু-বেলা দু মুঠো আহার,সাধরণ জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে। কারণ আপনি শিক্ষিত(অবশ্যই সুশিক্ষিত)।

মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা যে আদর্শের পথ দেখিয়ে গেছেন,সেই আদর্শকে আঁকড়ে ধরে সামনের দিকে এগোতে হবে,আঁধারের রাত্রি পেরিয়ে আলোকিত ভোরের সন্ধানে। এম.এন. লারমা ছাত্রাবস্থাতেই কাপ্তাই বাঁধর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে লিফলেট বিলি করেছিলেন। তরুণ বয়সেই তাকে কারাবরণ করতে হয়। তারই প্রদর্শিত পথ ধরে জনসংহতি সমিতি এখনো তার লড়াই-সংগ্রামকে অব্যাহত রেখেছে। যুগে যুগে প্রতিক্রিয়াশীলরা এই আন্দোলনকে স্থিমিত করার প্রচেষ্টা করেছে,কিন্তু তারা বারেবারেই ব্যার্থ হয়েছে। আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে শাসকগোষ্ঠীর লেজুর সংস্কারপন্থীরা এবং ৯৭সালে পিসিপিকে বিভক্তকারী সেই প্রসিত-সঞ্চয়রা এখনও বর্তমান। ইউপিডিএফ এর অবস্থান কিছুটা নমনীয় হলেও সংস্কারপন্থীরা তাদের হীন কার্যকলাসমুহ প্রশাসনের ছত্রছায়ায় অনায়াসেই চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতিহত করতে ছাত্রসমাজকেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে হবে,সঠিক ইতিহাসকে জেনে সঠিক কর্মপদ্ধতি নির্ধারণ করে জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্টার লড়াই সংগ্রামে সামিল হতে হবে।

ডারউইন একটা কথা বলেছেন,”বাঁচতে গেলে প্রতি পদে পদে সংগ্রাম করতে হয়”।

এম.এন. লারমা বলে গেছেন,”যে জাতি বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে পারে না,তাদের পৃথিবীতে বেঁচে থাকার কোন অধিকার নেই”।

দূর্যোধন আর দুঃশাসনরা আবারো মেতে উঠেছে রক্তের হোলি খেলায়,রাবণ তার অহংকারের লালসায় মেঠেছে,তাই আসুন একটি সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে ব্রতী হয়ে হাতে হত ধরে এগিয়ে চলি একসাথে।

কবি সুকান্তের ভাষায়,

“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে

চলে যেতে হবে আমাদের।

চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি

নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।

অবশেষে সব কাজ সেরে

আমার দেহের রক্তে নতুন শিশুকে

করে যাব আশীর্বাদ,

তারপর হব ইতিহাস।”

উপসংহারঃ পিসপির গৌরবজ্জ্বল দিনগুলো আবারো ফিরে আসুক,দীর্ঘ এই পথচলায় পিসিপি যেমনি বলিষ্ঠ নেতৃত্ব অর্জন করেছে,ঠিক তার বিপরীতে হারিয়েছে অনেক ত্যাগী নেতৃত্বকেও,যারা অকুতোভয় যোদ্ধা হয়ে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে পিসিপিকে করে গেছেন আরে মহান,আরো উদ্দীপ্ত। তাদের রক্তে স্নাত পিসিপি আজও স্বপ্ন দেখে এক নতুন সমাজের,এক নতুন পৃথিবীর।

মিতুল চাকমা বিশাল,সাবেক তথ্য ও প্রচার সম্পাদক,পিসিপি চট্টগ্রাম মহানগর

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

5 + 3 =