প্যাসিফিকে ৩-দিন সমুদ্র-সহবাস ও ডলফিন বন্ধুত্বে স্বাপ্নিক দেশে গমন

বেশ কদিন সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে একটা বালুতট পেলাম আমি। কিন্তু রাতের ঘনান্ধকারে কিছুই দেখতে পেলাম না বিপন্ন বোধের ব্যাকরণিক জটিলতায়। অন্ধকার প্রকৃতির মৌন কাফেলায় চিকচিকে বালিতে ঘুমিয়ে পড়লাম প্রায় ৭০/৮০ ঘন্টার সমুদ্র সাঁতার শেষে। কতক্ষণ ঘুমালাম জানিনা আমি। জ্বলজ্বলে সূর্যতাপে চোখ মেলে দেখি, সকালের শিশু-রোদ উবে গিয়ে মাথার উপরে সূর্য নাচছে তার যৌবনময়তায়। বিগত ৩-দিনে কিছুই খাইনি আমি সমুদ্রের নোনা জল আর বৃষ্টির সামান্য কফোটা পানি ছাড়া। মনে পড়লো ‘ফিজি’ থেকে ‘টোঙ্গা’ গিয়েছিলাম আমি দিন দশেক আগে বেড়াতে। টোঙ্গার Kukualfa থেকে দেশি নৌকায় ‘সামোয়া’ যাওয়ার পথে ঝড়ে পড়েছিল নৌকো। ১২-জন যাত্রী ছিলাম নারী-পুরুষ মিলে আমরা ঐ বোটে। ৩-জন সামোয়ান মাল্লা ছাড়া সবাই ছিল ইউরোপিয়ান শেতাঙ্গ আর আমি। শান্ত সমুদ্রে সামোয়ার কাছাকাছি প্রায় পৌঁছে গিয়েছিলাম আমরা। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরিয় ঘুর্ণিঝড় হঠাৎ উল্টে দিলো আমাদের নৌকাটিকে। একটা ছোট লাইফ জ্যাকেটে ভাসলাম কাকচোখা দিগন্তের নীলাদ্রির নীল জলে একাকি আমি। অনেক জলজ হিংস্র প্রাণি আর হাঙরেরা ঘুরে গিয়েছিল আমার শরীরের আদিম ঘ্রাণে কিন্তু বিপন্ন মানুষদের পাশে সম্ভবত ‘সমুদ্র নাস্তিক’ ডলফিনরা এগিয়ে আসে। আতঙ্ক আর ভয় মিশ্রিত দু:খের যাপিতকালে যখন শিকারি স্পিনার, কিয়াম আর ব্লাকটিপ হাঙরেরা নুনজলে অবসপ্রায় সাদা পা কেটে নিতে চায় আমার, তখন অলৌকিক ভালবাসার পতাকা হাতে হাজারো অতলান্তিক মহাসাগরীয় বটলনোজ ডলফিন, হাম্পব্যাক ডলফিন, ইউরিহ্যালাইন ডলফিন, স্নাবফিন ডলফিন আর রাঙা ঠোঁটের মেকং ডলফিনগুলো তীব্র জলতাড়না তুলে তাড়িয়ে দেয় মাংসভুক হিংস্র হাঙরদের। রঙিন আর ধুসরমুখো ডলফিনের ঝাঁক এসে সমুদ্রে আলো সৃষ্টি করে আমায় আগলে রাখে ধর্মান্ধ হাঙর সন্ত্রাসি থেকে।
:
নানা রং আর চেহারার হাজারো ডলফিনের ঝাঁক বেরিং স্রোত হয়ে আমায় নিয়ে যায় উষ্ণ কুরোশিয়ো স্রোতের দিকে। এ স্রোতাঞ্চলে ঘন কুয়াশা ও ঝড়বৃষ্টির মাঝে আমি কেবল চারদিকে চলমান ডলফিন ছাড়া আর কিছু্ই দেখিনা তখন। দুদিন পর এক ঘূর্ণস্রোতের অভ্যন্তর ভাগের জলাবর্তে ভেসে স্রোতবিহীন সমুদ্রতটে রেখে যায় আমায় ডলফিন সৈনিক বন্ধুরা। এক অদ্ভুৎ আনন্দধ্বনি করতে করতে তারা হারিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। স্রোতহীন সমুদ্রের স্থির জলে নানারূপ শৈবাল, আগাছা, তৃণ, উদ্ভিদ আর সপ্তরঙা জলজ বৃক্ষবাগানের দিকে চেয়ে থাকি আমি প্রকৃতির অমোঘ নৈকট্যে। সূর্য কখন হেঁটে যায় দুপুরের দিকে, তাই রোদ-তাপের সাথে আদিম ক্ষুধারা হানা দেয় পুরো শরীরে আমার। উঠে দাঁড়াই আমি ঘন বনের দিকে খাবারের খোঁজে। মানুষহীন এ দ্বীপজঙ্গলে কিভাবে খাবার পাবো, ঘন জঙ্গলের মাঝে খাবার আছে কিনা এ চিন্তনে এগুতে থাকি সৈকত ছেড়ে উঁচু বাগানের দিকে।
:
প্রত্নতাত্ত্বিক অজানা এ দ্বীপের ইতিহাস উল্টে রেখে সামনে এগুতেই স্বাপ্নিক দৃষ্টিভ্রমে উড়ে যাই আমি এক মোহময়তায়। গুমোট অন্ধকারে অজস্র আলোর ঝলকানির মতো অদূরেই বেশ কজন মানুষ দেখতে পাই আমি। নারী-পুরুষ-শিশু সবাই সমবেত হয়েছে একটা অনুষ্ঠানে মনে হলো। প্রত্যেকেই খাবার নিতে একটা লাইনে দাঁড়িয়ে। হয়তো খাবার রেস্টুরেন্ট হবে এটি। ক্ষুধাতুর আমি দ্রুত হাঁটি খাবার সংগ্রহে। কাছে গিয়ে বিস্মিত চোখে তাকাই্ চারদিক। সব মানুষ এখানে নিরাভরণ। হয়তো পোশাক নেই এ দ্বীপের মানুষের। কেউ কোন কথা বলছে না মনে হলো মৃতদের ঘর। কাছে গিয়ে জানতে চাই, খাবার কার কাছে পাবো আমি? শব্দ শুনে সবাই তাকায় চোখ বড় করে আমার দিকে। ভাষা বুঝতে পারেনি মনে করে ইংরেজি, বাঙলা, হিন্দি আর আরবিতে বলি একই কথা। মনে হলো এক অদ্ভুৎ কথা শুনছে তারা। আবার পুনরাবৃত্তি করি আমার জানা ৪-ভাষাতেই। একজন ইশারায় ডাক দেয় আমায়। খাবারের কাছে থাকা মানুষটিকে মনে হলো নারী। কাছে গেলেই বড় পাতায় নানাবিধ ফল আর সব্জি মিশ্রিত কাঁচা খাবার তুলে দেয় আমার হাতে পর্দা আর হিজাবহীন এ দ্বীপ নারী। মিনিটের মধ্যে তা শেষ করে আবার হাত পাতি আমি। ক্ষুধা তখনো শেষ হয়নি আমার, ৩ দিনের অভুক্ত আমি। এবার সবাই একযোগে হাততালির মত অদ্ভুৎ ইশারা করে। দুজন লোক এসে একটা বড় খাবারের স্তুপের কাছে নিয়ে যায় আমায়। আমি পেট ভরে খেয়ে ক্লান্তিতে মাটিতেই্ শুয়ে পরি ওখানেই। অচিন দেশের ভয়ানক নৈ:সঙ্গের ভেতরও আমি এক আঁশটে তান্ডবের নির্ঝর নৈ:শব্দ্য শুনতে পাই।
:

দু:স্বপ্নের ভয়ে নির্ঘুম সময় কেটে ঘন্টাখানেক পর চোখ খুললে দেখি, ঐ দুজন মানুষ আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ইশারায় তারা তাদের অনুসরণ করতে বলে আমায়। কতক্ষণ চললে চোখে পরে সুন্দর অনুপম সারিতে লাগানো গাছ থেকে কেউ ফল পারছে ,কেউ কুড়োচ্ছে, কেউ জড়ো করছে। সবাইকে ব্যস্ত দেখতে পাই আমি। সব ফল আর সবজি স্তুপিকৃত করে রাখছে তারা। আমার সাথের দুজনও ফল স্তুপ করার কাজে লেগে যায় তখন। ঔৎসুক্য নিয়ে সামনে হেঁটে যাই আমি, দেখি নানান ফসলের ক্ষেত। তাতে যন্ত্রের মত কাজ করছে হরেক বয়সি মানুষ। কেউ চারা লাগাচ্ছে, কেউ জল দিচ্ছে, কেউ ফসল কাটছে, কেউ আগাচ্ছা পরিস্কার করছে এসব। শব্দহীনভাবে কাজ করছে সব নারী-পুরুষ, কেউ তাকাচ্ছে না কারো নিরাভরণ পর্দাহীন শরীরের দিকে, যেন মৃতদের ফসলের বিল পার হচ্ছি আমি ধর্ষণ আর ইভটিজিংমুক্ত শান্ত জনপদ।
:
মেঠো চলার পথের পাশেই দেখি কলা নিয়ে বসে আজে একজন। দুতিন জনে অনেক পাকা কলা নিয়ে আসলো সেখানে। দুজন দুটো কলা নিয়ে খেতে খেতে চলে গেল আমার পাশ দিয়ে কোন শব্দ না করে।কেউবা হেঁটো গেলো তরমুজ নিয়ে আরো সামনে। এগুতেই দেখি অনেক তরমুজ জড়ো করা হয়েছে অদুরেই। একটা বড় কিছু দিয়ে তা স্লাইজ করে কেটে রাখছে এক নারী। কাছে যেতেই ইশারায় বললো, খাবে? আমি মাথা নেড়ে জানতে চাইলাম, বিক্রি করো? দাম কতো? ডলার চলে এদেশে? আমার পকেটে ইউএস ডলার আছে। হা করে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে তারপর হেসে এক টুকরো দিলো আমার হাতে। ইশারায় বললো আমায় খেতে। জীবনে এতো সুস্বাদু তরমুজ আর খাইনি আমি। ছোলা ফেললে চেহারায় রাগ ভাব আনলো মেয়েছি। উঠে ছোলাটা এনে নিজেই খেলো। আরেক টুকরো চাইলাম তার কাছে। চেহারায় দু:খভাব নিয়ে অনেকগুলো টুকরো দিলো আমার হাতে। ৩-দিন সাগরে ভাসলেও কোমরে ছোট ট্রাভেল ব্যাগ বাঁধা ছিল আমার, যাতে পাসপোর্ট ডলার সবই ছিল যেন দেশে ফিরতে পারি আমি। কোমর থেকে দলাপাকানো ডলার বের করে জানতে চাই, দাম কতো? চোখ বড় করে তরমুজ রক্ষক নারী ইশারায় বলে, এটা কি? বুঝতে পারি তরমুজ বিক্রেতা বোবা, আর ডলার চেনেনা সে। আমার জিন্সপ্যান্ট আর ব্যাগ দেখে ইশারায় বলতে চায়, এটা কেন পরেছি আমি? মানে পোশাক চেনেনা তারা। মনে মনে বলি, ঢাকার রাস্তায় গেলে তুমি বুঝতে নারী পোশাক কাকে বলে? পোশাকের সাথে হিজাবও পরতে হতো তোমায়। তারপরো ধর্ষণের শিকার হতে তুমি, আমার মত কেবল তরমুজ খেয়ে চলে যেত না তোমায় একাকি এভাবে নির্পোশাকে দেখে।
:
হাঁটতে হাঁটতে কখন সৈকতে চলে এসেছি জানিনা আমি। দেখি সূর্য ডুবছে অনন্ত সমুদ্রে। সমুদ্রতীরে বসে ভাবতে থাকি, কি করবো কোথায় যাবো এখন? আপাতত ভয় নেই এ বসতিপূর্ণ দ্বীপে। কিন্তু কেমন মরা মরা লাগে দ্বীপটি, কোন শব্দ নেই, এমনকি পাখির শব্দও নেই। শব্দহীন এমন দ্বীপও আছে পৃথিবীতে? চারদিকে অন্ধকার হলে উঠে দাঁড়াই লোকালয়ে যেতে। দ্বীপের আলো আঁধারির মাঝে একটা মানুষকেও্ আর খুঁজে পাইনা আমি। কারো কোন ঘরবাড়ি, আলো, হাসি-কান্নাহীন অন্ধকারে কিছুক্ষণ ঘুরে আবার সৈকতে ফিরে এতিম মানুষের মত বালুতটে ঘুমোতে।
:
সকালে জেগেই পুরো দ্বীপময় কর্মমুখর মানুষদের দেখতে পাই আমি। দেখি যন্ত্রের মত প্রত্যেকেটি মানুষ কেউ কৃষি, কেউ কুমোর, কেউ মুটে, কেউবা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে বিবিধ জিনিসপত্র এখান থেকে সেখানে। কিন্তু শব্দহীন এ দ্বীপের মানুষ। প্রত্যেকেই কি এক নিজস্ব প্রণোদনায় কাজ করে যাচ্ছে বাঁধাহীন, বাক্যহীন, শব্দহীনভাবে। দেখলাম গাছের ছায়ায় ছোট শিশুদের গাছে চরা, ফল সংগ্রহ, কৃষি কাজ শেখাচ্ছেন অভিজ্ঞ শিক্ষক নানাবিধ প্রায়োগিক উপায়ে। কিন্তু শব্দহীন সবাই। সম্ভবত এ দ্বীপের মানুষের কোন শাব্দিক ভাষা নেই, সব কাজই ইশারায় করে তারা। বড় মোহনীয় আর অর্থবহ সে ইশারা। বেশি স্থুল বা কৃশ, খাটো বা লম্বা মানুষ দেখলাম না। সবাই প্রায় একই রকম উচ্চতা আর স্থাস্থ্যধারী। কোন বিদ্যুৎ, টিভি, সেলফোন কোন কিছুই নেই মানুষের কাছে। নারী পুরুষ সবাই্ অলঙ্কারহীন নিরাভরণ কারো দিকে কেউ তাকাচ্ছেই না, রোবটরা যেমন তাকায়না কেউ কারো দিকে নিজের সমর্পিত কাজ ছাড়া্।
:
আমি সারাদ্বীপে ঘুরে বেড়ালাম দুপুর পর্যন্ত। কেউ তেমন একটা তাকালো না আমার দিকেও। তবে ২/১ জন নারী আমাকে প্যান্ট পরা দেখে মুখ টিকে হেসে চলে গেল পাশ দিয়ে। বুঝলাম দ্বীপে কোন টাকা, মাদ্রাসা, দোকান, ধর্ম, রাজনীতি, উপাসনালয়, কোরান, গীতা, ত্রিপিটক, বাইবেল, নেতা, গণভোট, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, অপহরণ, ঘুষ, হারাম-হালাল কিছুই নেই তাদের। নিজস্ব চেতনা আর দায়িত্ববোধ থেকে তারা তাদের উপর অর্পিত কাজ করে যাচ্ছে বিরামহীনভাবে। পথ চলা কাঁচা সড়কের পাশে সজ্জিত নানাবিধ প্রাকৃতিক খাবার, তা চাহিদামত খেয়ে নিচ্ছে দ্বীপের মানুষ যখন যার ইচ্ছেমত। হঠাৎ একজন পরে গেল গাছ থেকে। শব্দহীনভাবে পরেও কোন চিৎকার করলো না সে। কেবল আকাশে তীরের মত একটা কিছু নিক্ষেপ করলো পাশের লোকটি। মুহূর্তে দৌঁড়ে এলো ৪-ব্যক্তি। যাদের দুজন নারী, দুজন পুরুষ। চারজনে বিশেষ কায়দায় কাঁধে করে দ্রুত চললো অন্য পথে। আমিও দ্রুত চললাম তাদের পিছুপিছু। বুঝলাম এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নয়, নারী পুরুষ ভেদাভেদ নেই এখানে। আহারে! তসলিমা নাসরিন এদেশটা যদি দেখতো! সম্ভবত এখানেই থেকে যেতে চাইতো তবে !
:
একটু হেঁটে মাটির গর্তের মতো ঘরে ঢুকলো তারা। নিচে নেমে অভিভূত হলাম আমি। মাটির নিচে মাটি দিয়েই বানানো সুন্দর হাসপাতাল ঘর। সেখানেও ডাক্তার নার্স জাতীয় মানুষ, আর রোগি অনেক দেখলাম। সবাই পোশাকের বদলে কেবল বিশেষ রঙে চেহারাকে রঞ্জিত করেছে। ভেষজ চিকিৎসা সব ওখানে। সদ্য আগত রোগিকেও কি খাওয়ালেন যেন হাসপাতালের লোকজন, হাত পা টানলেন একটু। ৩/৪ মিনিটর মাঝে রোগি উঠে বসলো। দেয়ালে হেলান দিয়ে বসানো হলো তাকে, কিছু একটা খাওয়ানোর পর আমায় চমকিত করে হেঁটে বাইরে চলে গেলো গাছ থেকে পরা রোগি।
:
মাটির নিচে বিশাল জগত এ দ্বীপের মানুষদের। হাসপাতালের পাশেই দেখলাম বুড়ো মানুষদের আবাসস্থল। তারা কেউ বসে নেই, ছোট ছোট নানাবিধ কাজ করছে তারা। একদম অকর্মন্য কাউকেই্ পেলাম না ওখানে। বুড়োদের ঘরের পাশে হাজারো শিশু সাজানো বয়সভেদে, এক রুমে দেখলাম কেবল ঘুমন্ত শিশুদের, যাদের নার্সিং করছে সমসংখ্যক নারী-পুরুষরা। পাশের রুমে হাঁটতে শিখছে এমন শিশুর বাস। এভাবে মাটির নিচে পুরো দ্বীপটাতেই তাদের মাটির ঘরবাড়ি বানানো, ওপরে ক্ষেত খামার বাগান পথ। সম্ভবত সন্ধ্যার পর সবাই এ মাটির ঘরে চলে আসে, তাই গতরাতে কাউকে আর খুঁজে পাইনি আমি। দু:খ জলের ন্যুব্জতা ভেঙে অপেক্ষা করতে থাকি আমি পরবর্তী নাট্যকল্পের চিত্ররূপের !
:
সারাদিন ঘুরলাম স্বাধিনমনে সর্বত্র কেউ আমায় বাঁধা দিলোনা বা কিছু জানতে চাইলো না আমার কাছে। ওদের সব কিছুই দেখলাম একদম ছিমছাম গোছানো কোন ঝামেলাহীন। কেউ কারো সাতে-পাঁচে নেই, সবাই নিজ নিজ কাজ কর‌্ছে, সবাই নিয়মমত খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা আর কাজ পাচ্ছে। যেন মৌমাছির জীবনের মত লোভহীন সাজানো ঐ নিবাবরণ মানুষের দেশ।
:
সন্ধ্যার আগেই প্লান করলাম রাতে কোথায় যায় কি করে এরা দেখবো আমি। হঠাৎ সূর্য ডোবার প্রাক মুহূর্তে বেশ কটি গর্তগেট দিয়ে লাইন ধরে ঢুকলো সব নারী পুরুষরা। বয়স হিসেবে তারা ব্যবহার করলো ভিন্নভিন্ন গর্ত-গেট। কমবয়েশি শিশুরা বিশাল হলঘরের মতো বেডরুমে গেল একসাথে। সেক্স হিসেবে মেয়ে শিশু, আর ছেলে শিশুদের আলাদা আলাদা শয়নঘর। বয়সভেদে যেমন কুড়ি বছরের পুরুষ-নারীরা জোড়ায় জোড়ায় একেকটা মাটির কুঠরিতে ঢুকলো, আবার ৩০, ৪০, ৫০ এভাবে সমবয়সি নারীপুরুষেরা জোড়ায় জোড়ায় পরস্পর হাত ধরে চলে গেল আরো নিচের শয়নঘরে। ঘন্টাখানেকের মধ্যে দেখলাম কেউই নেই কোন গর্তদরজায়। আলোহীন অন্ধকার শব্দহীন ঘরগুলোতে নিশব্দে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম আমি। কিন্তু কোন শব্দ পেলাম না। এ দ্বীপে কি কোন শিয়াল, কুকুর বা পাখিও নেই?
:
পরদিন দুজন মানুষ মারা গেলো মাটির ঘরের হাসপাতাল সংলগ্ন বুড়োদের ঘরে। যার একজন পুরুষ অন্যজন বয়স্ক মহিলা। কেবল ঐ নারী পুরুষের সন্তানেরা আর তাদের পৌত্ররা বহন করলো তাদের লাশ। অন্যেরা যার যার কাজ করতে থাকলো নিত্যদিনের মত, যেন কিছুই হয়নি এখানে। পরম যত্নে সন্তান আর তার বংশধরেরা দুজনের মৃতদেহকে সমুদ্রে সমাহিত করলো। যেহেতু তারা কথা বলেনা, তাই কোন নাম নেই সম্ভবত ঐ স্থানটিরও। নীল জলের গভীর সমুদ্রে ভাসিয়ে ঐ জলে সবাই স্নান করে লোকালয়ে ফিরলো স্বজনরা ভগ্ন হৃদয়ে চোখ মুছতে মুছতে তামাটে শরীরে।
:
ধর্মমুক্ত, ভাষামুক্ত, রাষ্ট্রমুক্ত, শাসকমুক্ত, বিয়েমুক্ত, শোষণমুক্ত এমন সুশৃঙ্খল দেশটি দেখে অভিভুত হলাম আমি। যেখানে ধর্মীয় বিভাজন, ঝগড়া বিবাদ, শোষণ, প্রতারণা, ফতোয়া, রাজনীতি, নারীবাদ, পুরুষতন্ত্র, মিথ্যাচার, ভ্যাজাল, ঠকানো সব কিছুই অনুপস্থিত। বাংলাদেশ নামক আধুনিক বিশ্বের একটা জটিল প্রপঞ্চের দেশের বাসিন্দা আমি। তাই এমন দেশকে কল্পনা করি নিজের দেশের সাথে। আহ্‌! এমন দেশ যদি হতো বাঙলাদেশ নামক আমার দেশটিতে। যেখানে ধর্মের নামে, জাতি-উপজাতির নামে, বর্ণের নামে, ধনী-দরিদ্রের নামে, অভিজাত-অনভিজাতের নামে, পেশা-অপেশার নামে, নাস্তিক-আস্তিকতার নামে কত অত্যাচার জুলুম আর নির্যাতন হয় প্রতিনিয়ত। শোষণহীন, ক্ষুধাহীন, পুঁজিবাদহীন এমন সাম্যের শব্দহীন রাষ্ট্রটিকে নিয়ে যেতে মন চাইছে আমার প্রবলভাবে নিজ দেশে। কিন্তু আমি জানিনা এটা কোন দেশ আর কিভাবে যাবো আমি আমার দেশে এ দেশের এ সভ্যতাকে বহন করে? আমি কি কখনো যেতে পারবো এ শিষ্ঠাচারকে নিয়ে যেতে আমার দেশে?
:
নামহীন ঐ নিবাবরণ মানুষের দেশে বাংলাদেশের বাঁশবাগানে চাঁদ ওঠা গ্রামীণতার চিরচেনা সন্ধ্যা নামে। স্বপ্নময় ভোর বাতাসেরা মেঘ ঘুড়ি হয়ে প্রশান্ত মহাসাগরের আকাশে ওড়ে। নিবাবরণ দ্বীপের স্বর্ণোজ্জ্বল জন্ম-মৃত্যুর আল্পনা আঁকা মানুষেরা ভালবাসার প্রেমজ মধুরতার মাঝে তাদের রাতদিন কাটায়। বাকহীন মানুষের মাঝে আলো আর আকাশ দেখি আমি মেঘের মানচিত্রে সমুদ্র তটে বসে থেকে। মেঘমুক্ত আকাশে উজ্জ্বল আতশবাজির মতো সন্ধ্যার নক্ষত্রমালারা খসে পরে দুরের সমুদ্রজলে। কালের পাতায় বিবর্তিত হতে থাকে পৃথিবীর ভূ-গোলক আর অথৈ জলমালারা। বাংলাদেশ নামক দেশটির মানুষের প্রাগৈতিহাসিক রূঢ়তার গল্পগুলো মনে করে চোখ থেকে ঝরে পরে আমার হৃদয়ের রক্ত! আমার দেশের বন্ধ শৈশবের শক্ত কাঠ দুয়ার খুলে আমি ঢুকতে পারিনা নিজ ঘরে। দক্ষিণ প্যাসিফিকের নিরাভরণ দ্বীপের নীল জলে ধর্মহীন ডলফিনের ঝাঁক দেখি আমি আনন্দ কেলিরত। ঝরাপাতা কুয়াশায় হিম বিষণ্ণতা নিয়ে আমি প্রহর গুণতে থাকি কবে ফিরবো বাংলাদেশে? অপলক দূর-দিগন্তে চেয়ে-চেয়ে শব্দহীন মৃত ঐ দ্বীপে আমি শুনতে পাই বাংলাদেশের করুণ এস্রাজের দু:খাতুর আওয়াজের সুর। সুতো ছেড়া নাটাই ঘুড়িতে প্যাসিফিক আকাশে বাউল আ. করিমের গানের সুর বেজে চলে বেদনার সবুজঘ্রাণে-
:
“আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম,
গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান,
মিলিয়া বাউলা গান আর মুর্শিদি গাইতাম,
হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইত,
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম।।
জারি গান, বাউল গান আনন্দের তুফান,
গাইয়া সারি গান নৌকা দৌঁড়াইতাম,
বর্ষা যখন হইত, গাজির গান আইত,
রঙে ঢঙে গাইত, আনন্দ পাইতাম ।।
কে হবে মেম্বার, কে বা গ্রাম সরকার,
আমরা কি তার খবরও লইতাম?
হায়রে আমরা কি তার খবরও লইতাম!
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম ।।
বিবাদ ঘটিলে পঞ্চায়েতের বলে,
গরীব কাংগালে বিচার পাইতাম ।।
মানুষ ছিল সরল, ছিল ধর্ম বল ।।
এখন সবাই পাগল বড়লোক হইতাম ।।
করি ভাবনা, সেই দিন কি আর পাব নাহ,
ছিল বাসনা সুখি হইতাম ।।
দিন হতে দিন আসে যে কঠিন,
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম,
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম…………………………………………”!

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

39 − = 33