বৌদ্ধ শাস্ত্রে নারী অশুচি – পর্ব (২)

বৌদ্ধ শাস্ত্রে নারী ও নারী গর্ভকে যেভাবে অশুচি রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে, সহজভাবে বললে এককথায় নরকের সমতুল্য। একারণেই নরক সমতুল্য, বৌদ্ধ শাস্ত্রে গৌতম বুদ্ধকে আমরা যেভাবে জেনেছি ; যুক্তিবাদী ধারণার সকল সীমা ছেড়ে, সম্পূর্ণ অলৌকিক আমেজে তিনি তাঁর অতীতে ( বোধিসত্ত্ব প্রক্রিয়ায় ) পাঁচতাধিকেরও অধিকবার মানুষ ও বিভিন্ন প্রাণী রূপেও জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি সাড়ে পাঁশতাধিকেরও অধিকবার মাতৃগর্ভের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। শাস্ত্রে বর্ণিত গৌতমের পূর্ব জন্ম প্রক্রিয়ার এই বর্ণনাসমূহ স্বয়ং বুদ্ধ কর্তৃকই মুখনিঃসৃত। বৌদ্ধমতে বোধিসত্ত্ব ; সেই পরমব্রত মুক্তিকামী স্বত্বা, যিনি জন্ম জন্মান্তর পরিভ্রমণ করে বুদ্ধ হওয়ার লক্ষ্যে পারমী বা পূণ্য সঞ্চয় করে লক্ষ্যে এগিয়ে চলেন। থেরবাদ মতে ; যার জীবনের একমাত্র ব্রত বোধিলাভ করা, ফলশ্রুতিতে বোধিসত্ত্ব বলতে বুদ্ধের পূর্ববর্তী বিভিন্ন জন্ম থেকে বোধিলাভ করা পর্যন্ত সময়কে বোধিসত্ত্বের জীবন হিসেবে বোঝানো হয়েছে। মহাযান মতে ; যিনি বুদ্ধত্ব লাভের সমস্ত ধাপ অতিক্রম করেন তিনিই বুদ্ধ। বুদ্ধ হওয়ার জন্য বোধিসত্ত্ব রূপে বিভিন্ন জন্ম প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেয়েও, মাতৃগর্ভের চাইতে বুদ্ধ তথা বৌদ্ধ শাস্ত্রে স্বর্গই উন্নত এবং উন্নতদের চিরন্তন আবাস্থল হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। এমনকি বৌদ্ধমতের অন্যতম লক্ষ্য নির্বাণকেও রাখা হয়েছে সেই মাতৃগর্ভেরই ওপরে!

সূত্র পিটকে নারী মোহ এবং মাতৃগর্ভ অযোগ্যদের :

( ক) “গদ্ভমেকে উপ্পজ্জন্তি, নিরযং পাপকম্মিনো।
সগ্গং সুগতিনো যন্তি, পরিনিব্বন্তি অনাসবা।। ”

অনুবাদ : ( মৃত্যুর পর) কেহ কেহ মাতৃগর্ভে ও পাপীরা নরকে উৎপন্ন হয় ; ধার্মিক ব্যক্তিরা স্বর্গ লাভ করেন এবং ক্ষীণাসবগণ ( বৌদ্ধমতের মূল লক্ষ্য নির্বাণ যোগ্যরা) পরিনির্বাপিত হন।
– খুদ্দক নিকায়ে ধম্মপদ, পাপ বর্গ, গাথা ; ১২৬।

আবার লালসা ছেদন করতে বুদ্ধ – ভিক্ষুদের প্রতি যেভাবে আহ্বান জানিয়েছেন ; সেদিকটায় গেলে দেখা যাবে, মাতৃদুগ্ধও যেনো লালসা ও বাসনারই নামান্তর! তাই যদি হয়, মাতৃদুগ্ধ পানে আমরাও কি ছলনার স্বীকার হয়েছিলাম? কিংবা মাতৃদুগ্ধ দ্বারা মাতৃকুল আমাদের সাথে প্রতারণা করে বা করেছে? এই গাথায় বুদ্ধ লালসা ও বাসনাযুক্ত চিত্তের কারণ ব্যাখ্যায়, নারীকে যেরূপে দায়ি করেছেন অবস্থাদৃষ্টে মনে হবে, এর সমস্ত দ্বায় কেবল নারীরই একার। আরো পরিস্কারভাবে বললে পুরুষের লালসা ও বাসনাযুক্ত দায়, পুরুষের নয় বরং নারীর৷

( খ) “যাব হি বনথো ন ছিজ্জতি, অনুমত্তোপি নরস্স নারিসু। পটিবদ্ধমনোব তাব সো, বচ্ছোখীরমকোভ মাতরী।। ”

অনুবাদ : ভিক্ষুগণ ( লালসার) বন ছেদন করো, বৃক্ষ ( দুঃখবিশেষ) কাটিও, বন হইতে ভয় উৎপন্ন হয় ; বন ও বনথ ( ঝোপ) ছেদন করিয়া তোমরা নির্বন ( বাসনামুক্ত) হও৷ যতদিন নারীদের প্রতি নরের অণুমাত্র বাসনাও অচ্ছিন্ন থাকে, ততদিন মাতার প্রতি আসক্ত স্তন্যপায়ী বৎসের ন্যায় তাহার চিত্তও নারীতে আবদ্ধ থাকবে।
– খুদ্দক নিকায়ে ধম্মপদ, মহাবর্গ, গাথা ; ২৮৪।

বুদ্ধ কর্তৃক বর্ণিত আরেক শ্লোকমতে ; মাতৃগর্ভ সেই অপরাধীদেরই জায়গা যারা অলস, অতিভোজী, স্থুল, নিদ্রার ক্ষেত্রে শুকরের ন্যায় এবং মনন জুড়েই নেতিবাচক! যে মাতৃগর্ভে বোধিসত্ত্ব রূপে না জন্মালে, বুদ্ধ হওয়ার লক্ষ্যে পৌঁছানো যায় না, সেই মাতৃগর্ভই অপরাধী বা অযোগ্যদের হিসেবে বিবেচিত হয়েছে!

( গ) ” মিদ্ধী যদা হোতি মহগ্ঘোসো চ, নিদ্দাযিতা সম্পরিবত্তসাযি। মহাবরাহোব নিবাপপুট্ঠো, পুনপ্পুনং গদ্ভমুপেতি মন্দো।।”

অনুবাদ ; যে অলস ব্যক্তি অধিকভোজি, খাদ্যপুষ্ট স্থুল, বরাহের ন্যায় নিদ্রালু এবং পার্শ্বপরিবর্তন পূর্বক শয়নশীল সে মন্দবুদ্ধি বারবার মাতৃ জঠরে জন্মগ্রহণ করে।
– খুদ্দক নিকায়ে ধম্মপদ, নাগ বর্গ, গাথা ; ৩২৫।

একইভাবে বুদ্ধ, পুণর্জন্ম তথা মাতৃগর্ভ সম্পর্কে বলেছেন ইহা তাদেরই স্থান যারা মিথ্যায় নিমজ্জিত, প্রসারিত এবং সম্প্রসারিত হয়ে বিদ্যামান ও চলমান থাকেন ।

( ঘ) হে ভিক্ষুগণ, পূণর্জন্মের হেতু কিরূপে সঞ্চয় হয়? ভিক্ষুগণ ; মিথ্যাদৃষ্টি, মিথ্যা সংকল্প, মিথ্যা বাক্য, মিথ্যা কর্ম, মিথ্যা জীবিকা, মিথ্যা প্রচেষ্টা, মিথ্যা স্মৃতি, মিথ্যা সমাধি, মিথ্যাজ্ঞাণ ও মিথ্যা বিমুক্তিতে হয়।
– অঙ্গুত্তর নিকায়ে দশক নিপাত, পূণর্জন্মের হেতু সঞ্চয়কারী সূত্র।

অঙ্গুত্তর নিকায়, রূপাদি বর্গে নারী :

বুদ্ধ তখন শ্রাবস্তীর জেতবনে অনাথপিণ্ডিকের আরামে বাস করছিলেন। অতঃপর সেখানে অবস্থানকালীন একদিন ভিক্ষুদের উদ্দেশ্য করে বলেন ;

১. হে ভিক্ষুগণ ; আমি একরূপও দেখিতেছিনা যাহা পুরুষের চিত্ত অধিকার ( এমন রূপ খুঁজে পাইনা যে রূপ পুরুষের মন ভোলাতে সক্ষম) করিয়া থাকে। কিন্তু স্ত্রীরূপ, স্ত্রীরূপই হে ভিক্ষুগণ পুরুষের চিত্ত অধিকার ( কিন্তু নারীরূপই খুঁজে পাই, যে রূপ পুরুষের মন ভোলাতে সক্ষম) করিয়া থাকে।

২. হে ভীক্ষুগণ, আমি অন্য এক শব্দও দেখিতেছিনা যাহা পুরুষের চিত্ত অধিকার ( এমন শব্দ খুঁজে পাইনা যাতে পুরুষ মত্ত হয়) করিয়া থাকে। কিন্তু স্ত্রী শব্দ, স্ত্রী শব্দই হে ভিক্ষুগণ পুরুষের চিত ( কিন্তু নারী শব্দই খুঁজে পাই, যে শব্দ পুরুষ মত্ত থাকে ) অধিকার করিয়া থাকে।

৩. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক গন্ধও দেখিতেছিনা যাহা পুরুষের চিত্ত অধিকার ( এমন গন্ধ খুঁজে পাইনা যাতে পুরুষ মগ্ন থাকে) করিয়া থাকে। কিন্তু স্ত্রী গন্ধ, স্ত্রী গন্ধই হে ভিক্ষুগণ পুরুষের চিত্ত অধিকার ( কিন্তু নারী গন্ধই খুঁজে পাই, যে গন্ধে পুরুষ মগ্ন থাকে ) করিয়া থাকে।

৪. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক রসও দেখিতেছিনা যাহা পুরুষের চিত্ত অধিকার ( এমন রস খুঁজে পাইনা যে রসে পুরুষ ব্যকুল হতে পারে ) করিয়া থাকে। কিন্তু স্ত্রী রস, স্ত্রী রসই হে ভিক্ষুগণ পুরুষের চিত্ত অধিকার ( কিন্তু নারী রসই খুঁজে পাই, যে রসে পুরুষ ব্যকুল হতে পারে ) করিয়া থাকে।

৫. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক স্পর্শও দেখিতেছিনা, যাহা এইরূপ পুরুষের চিত্ত অধিকার ( এমন কোনো স্পর্শ খুঁজে পাইনা যে স্পর্শে পুরুষ উন্মাদ হতে পারে) করিয়া থাকে। কিন্তু স্ত্রী স্পর্শ, স্ত্রী স্পর্শই হে ভিক্ষুগণ পুরুষের চিত্ত অধিকার ( কিন্তু নারী স্পর্শেই খুঁজে পাই, যে স্পর্শে পুরুষ উন্মাদ হতে পারে) করিয়া থাকে।

৬. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক রূপও দেখিতেছিনা যাহা স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( এমন কোনো রূপ খুঁজে পাইনা, যে রূপ স্ত্রীকে ভোলাতে সক্ষম) করিয়া থাকে। কিন্তু পুরুষরূপ, পুরুষরূপই হে ভিক্ষুগণ স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( কিন্তু পুরুষ রূপেই খুঁজে পাই, যে রূপে নারীর মন ভুলে যায়) করিয়া থাকে।

৭. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক শব্দও দেখিতেছিনা যাহা স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( এমন কোনো শব্দ খুঁজে পাইনা যে শব্দে নারীর মত্ত হতে পারে) অধিকার করিয়া থাকে। কিন্তু পুরুষশব্দ, পুরুষ শব্দই হে ভিক্ষুগণ নারী চিত্ত অধিকার ( কিন্তু পুরুষ শব্দেই খুঁজে পাই, যে শব্দে নারী মত্ত হতে পারে ) অধিকার করিয়া থাকে।

৮. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক গন্ধও দেখিতেছিনা, যাহা স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( এমন কোনো গন্ধ খুঁজে না পাওয়া যাতে নারী মগ্ন হতে পারে ) করিয়া থাকে। কিন্তু পুরুষগন্ধ, পুরুষগন্ধই হে ভিক্ষুগণ স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( কিন্তু পুরুষ গন্ধেই খুঁজে পাওয়া, যে গন্ধে নারী মগ্ন হতে পারে ) করিয়া থাকে।

৯. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক রসও দেখিতেছিনা যাহা নারী চিত্ত অধিকার ( এমন গন্ধ খুঁজে না পাওয়া যাতে নারী ব্যকুল হতে পারে ) করিয়া থাকে। কিন্তু পুরুষ রস, পুরুষ রসই হে ভিক্ষু স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( কিন্তু পুরুষ রসেই খুঁজে পাই, যে রসে নারী ব্যকুল হতে পারে ) করিয়া থাকে।

১০. হে ভিক্ষুগণ, আমি অন্য এক স্পর্শও দেখিতেছিনা, যাহা স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( এমন স্পর্শ খুঁজে পাইনা, যে স্পর্শে নারী উন্মাদ হয়) করিয়া থাকে। কিন্তু পুরুষ স্পর্শ, পুরুষ স্পর্শই হে ভিক্ষুগণ স্ত্রী চিত্ত অধিকার ( পুরুষ স্পর্শই খুঁজে পাই, যে স্পর্শে নারী উন্মাদ হয়) করিয়া থাকে।
– অঙ্গুত্তর নিকায়, রূপাদি বর্গ।

অঙ্গুত্তর নিকায়ে নারীর, যা হওয়া সম্ভব নয় :

যে তথ্যটি পুনরায় অবগত করে শুরু করছি, বৌদ্ধ শাস্ত্রে সমস্ত উপদেশ, পরামর্শ, গাথা বা শ্লোক মাত্রই গৌতম বুদ্ধ কর্তৃক মুখনিঃসৃত। আমরা এই অব্দি যা পড়েছি বা জেনেছি ; তা বৌদ্ধ শাস্ত্রে বুদ্ধের কাছ থেকে পাওয়া উপদেশ, পরামর্শ বা শ্লোক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে৷ অঙ্গুত্তর নিকায়ের এই বর্গেও বুদ্ধ বলেছেন ; নারী শত্রুতা করতে পারবেনা, কুবুদ্ধির পরিকল্পনা করতে পারবেনা, ঈশ্বর স্বত্বা ধারণ, লালন ও প্রয়োগ করতে পারবেনা এবং সর্বপরি বুদ্ধ হতে পারবেনা। কিন্তু একজন পুরুষ এর সবই করতে পারবে।

১২। হে ভিক্ষুগণ, ইহা সম্পূর্ণ অসম্ভব, একজন স্ত্রীলোক অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধ ( বুদ্ধ) হইবে ইহা কিছুতেই হইতে পারেনা। কিন্তু একজন পুরুষের পক্ষে, অর্হৎ সম্যক সম্বুদ্ধ ( বুদ্ধ) হওয়া সম্পূর্ণ সম্ভব।

১৩। হে ভিক্ষুগণ, ইহা অসম্ভব, একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে রাজ চক্রবর্তী ( রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বা শ্রেষ্ঠ শাসক) হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়। কিন্তু একজন পুরুষের পক্ষে তা হওয়া সম্ভব।

১৪। হে ভিক্ষুগণ, ইহা অসম্ভব, একজন স্ত্রীলোকের পক্ষে শত্রুত্ব ( শত্রুতা করতে পারবেনা ) , মারত্ব ( কুবুদ্ধির পরিকল্পনা করতে পারবেনা ) এবং ব্রহ্মত্ব ( ঈশ্বর স্বত্বা ধারণ ও প্রয়োগ করতে পারবেনা ) লাভ করা সম্ভব নয়৷ কিন্তু একজন পুরুষের পক্ষে তার সবই সম্ভব।

 

( পরবর্তী ১৫, ১৬ এবং ১৭ নং শ্লোকেও ১৪ নং শ্লোকের অনুরূপ শ্লোক বর্ণিত হয়েছে)
– সূত্র পিটকের অন্তর্গত, অঙ্গুত্তর নিকায়, অট্ঠান ( অসম্ভব) বর্গ।

( চলবে…)

সহায়ক গ্রন্থ :

১। খুদ্দক নিকায়ে ধম্মপদ, শ্রীমৎ ধর্মাধার মহাস্থবির অনুদিত।
২। অঙ্গুত্তর নিকায়, দশক নিপাত, অনুবাদক ; ভদন্ত প্রজ্ঞাদর্শী ভিক্ষু।
৩। সূত্র পিটক, অঙ্গুত্তর নিকায়, একক নিপাত, রূপাদি বর্গ, অনুবাদক ; অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া।
৪। অঙ্গুত্তর নিকায় ( প্রথম খণ্ড) অনুবাদক ; অধ্যাপক সুমঙ্গল বড়ুয়া।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 2 =