একটা কিডনি ও এক ফাদারের গল্প

দক্ষিণ ভারতের কেরালার পাল্লুর গাঁয়ের দরিদ্র মুসলিম পরিবারের তরুণ মোরশেদ দুবাই গিয়েছিল নিজ পরিবারের দারিদ্র্যতা ঘোচাতে। ঋণ শোধ করতে-করতে প্রায় দুবছর চলে গেল মোরশেদের দুবাই মরু শহরে। এর মধ্যেই আকস্মিক শরীর খুব দুর্বল হলো মোরশেদের। দুবাইর ভারতীয় ডাক্তার পরীক্ষা করে বললো – “দুটো কিডনিতেই মারাত্মক সমস্যা হয়েছে মোরশেদের। মাত্র ১০% কাজ করছে কিডনি দুটো তার, তাই ডায়ালাইসিস দরকার এখনই। এখানে চিকিৎসা বিদেশিদের জন্যে অত্যন্ত ব্যয়বহুল বলে, দেশে গিয়ে এর চিকিৎসার পরামর্শ দেন স্বদেশী ডাক্তার”।
:
ফিরে এলো মোরশেদ পাল্লুর গাঁয়ে তার মা, বাবা, ভাই আর বোনের কাছে। সবাই শুনলো মোরশেদের অসুখের কথা। স্বজনদের সবার সহযোগিতায় সপ্তাহে ২-দিন ডায়ালাইসিস শুরু করলো সে কোচি হাসপাতালে। এটা খুবই ব্যয়বহুল। প্রতি সপ্তাহে পাঁচ হাজার গুণতে হয় এ কাজের জন্যে। তারপরো ডাক্তাররা বললো, ক্রমে খারাপ হচ্ছে কিডনির অবস্থা, তাই ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া উপায় নেই তার। সর্বোচ্চ ৬-মাস ডায়ালাইসিস করতে পারবে সে। ভাইবোনের রক্ত, টিস্যু ম্যাচ করেনি মোরশেদের সাথে, তাই তারাও কেউ দিতে পারবে না কিডনি মোরশেদকে। ভারতীয় আইনে রক্ত সম্পর্কের আত্মীয় ছাড়া অন্য ডোনার থেকে কিডনি নেয়ার বিধানও নেই।
:
কোচি হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় রবিন একদিন পরিচয় করালো ‘প্রিতমে’র সাথে। প্রিতম টাকার বিনিময়ে জোগার করি দিতে পারে কিডনি ডোনার। এ ক্ষেত্রে ৪-লাখ লাগবে টোটাল। তবে আড়াই লাখ দিতে হবে অগ্রিম। কই পাবে এতো টাকা নি:স্ব মোরশেদ! মা-বাবাকে হতাশার সুরে বলে, “থাক আর চিকিৎসা করতে হবেনা। যে কদিন বেঁচে থাকি এমনই থাকি বিনে চিকিৎসায়”। সব শুনে একমাত্র খালা স্কুল টিচার নাজমা নিজের সঞ্চিত ৫০,০০০ এর সাথে ব্যাংক থেকে লোনের ব্যবস্থা করেন আরো দুলাখ। আড়াই লাখ তুলে দেয় মোরশেদ প্রিতমের হাতে নগদ। কথা হয় দুচার দিনেই ডোনার হাজির করবে প্রিতম। ফোনে প্রিতম জানায় খুশীর খবর এই যে, “ডোনারের ব্লাডগ্রুপ ও টিস্যু ৮০% ম্যাচ করেছে মোরশেদের সাথে, যা বিস্ময়কর। ৩-দিন পরই সে ডোনারকে ভর্তি করাবে কোচি হাসপাতালে।
:
দিন গুণতে গুণতে ১২-দিন চলে যায় কিন্তু প্রিতমের ফোন বা ডোনার কেউই ভর্তি হয়না কোচিতে। বার-বার ফোন করে বন্ধ পাওয়া যায় প্রিতমের নম্বর। এবার মারাত্মক ভেঙে পড়ে মোরশেদ। কিডনিও পেলোনা, মাঝে আড়াই লাখ টাকার প্রতারণা। ডায়ালাইসিস বন্ধ করতে চায় মোরশেদ। শুনে খালা নাজমা পাশে এসে পিঠে হাত রাখে মোরশেদের। বলে – “দুলাখ ধার করেছি আমি ব্যাংক থেকে, তা আস্তে আস্তে বেতন থেকে শোধ দেবো আমি, তুমি চিন্তা করোনা একটুও। ডায়ালাইসিসটা চালিয়ে যাও বাবা! তুমি সুস্থ্য হলে আবার পরিবারের খুশী ফিরে আসবে”।
:
পরদিন আবার লোকাল বাসে ওঠে মুরশেদ কোচি হাসপাতাল যেতে। এবার ওয়ার্ডবয় রবিন জানায় – “খবর পাওয়া গেছে প্রিতমের। সে আছে থুপপি জেল হাজতে”। রবিনসহ মোরশেদ দেখা করে জেলহাজতে প্রিতমের সাথে। জানতে পারে “অর্গান ডোনেশনের অবৈধ কাজে জড়িত থাকার কারণে মামলা হয়েছে প্রিতমের নামে। সব টাকাও জব্দ করেছে পুলিশ। সব শুনে থানায় গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে মোরশেদ। বলে – “দারোগা বাবু, আমি খুবই দরিদ্র। এ আড়াই লাখ টাকা অনেক কষ্টে লোন করেছি আমি। টাকাটা দিয়ে দিন আমায়”। পুলিশ অফিসার জানায় – “কোর্টে টাকা পয়সা সব জমা দেয়া হয়েছে, তাই আর কোনভাবেই এ টাকা ফেরত দেয়া সম্ভব নয়। পুরো লেনদেনটাই ছিল অবৈধ। তাই কোনভাবেই টাকা ফেরত পাবেনা সে। বরং ঝামেলা করলে সেও এ মামলায় জড়িয়ে যাবে”। ঝামেলা এড়াতে আড়াই লাখের শোক ভুলে বাড়ি ফেরার লোকাল বাসে ওঠে মোরশেদ।
:
পুরো বাসে বিমর্ষ মোরশেদের দিকে বার-বার তাকায় পাশের সিটে বসা ফাদার নিকোলাস, জানতে চায় তার বিমর্ষতার কারণ। এক পর্যায়ে ব্যথাতুর ক্ষয়িষ্ণু জীবনের মুমূর্ষু কষ্টের কর্কশ বাতাসের মত হুঁ-হুঁ করে কেঁদে ওঠে মোরশেদ। এক নিশ্বাসে দুবাই থেকে পাল্লুর গাঁয়ের তার দুখ-জীবনের স্মৃতিদীর্ণ পোড়ো বাড়ির কষ্টের মত পুরো কাহিনি শোনায় সে ফাদারকে। পাল্লুর নিজ গাঁয়ে নামার আগে ফাদার রেখে দেয় মোরশেদের মোবাইল নম্বর। পরদিন মোরশেদ ফোন পায় ফাদার নিকোলাস থেকে। মোরশেদকে একটা কিডনি দিতে চায় সে তার নিজের। ভিন জাতি-ধর্মের অপরিচিত এক ফাদার কেন তার নিজ কিডনি দেবে মোরশেদকে বুঝতে পারেনা মোরশেদ বা তার পরিবারের কেউই। তাই ঔৎসৌক্যে জানতে চায় মোরশেদ
– “ফাদার কেন কিডনি দেবেন আমাকে”?
বিনীত স্বরে ফাদার বলে – “ঈশ্বর আমাকে দুটো দিয়েছে, তোমার একটাও নেই। ঈশ্বরের এ দান তোমাকে একটা দেব আমি ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ”।
ফাদারের এ কথা শুনে মূঢ় মানবিক বোধ আর মৃত প্রেমিকার শবদাহের যন্ত্রণার বন্যায় ভেসে যায় মোরশেদ আর তার মুসলিম পরিবার।
:
বিস্ময়করভাবে ফাদারের টিস্যু ৯৩% ম্যাচ করে মোরশেদের সাথে। কিন্তু অনাত্মীয় বিধায় এর অনুমোদন দরকার। প্রথমে বিশপের কাছে উপস্থিত হয় ফাদার নিকোলাস। সব শুনে বিশপ জানায় – “খুবই পুণ্যময় কাজ করছো তুমি একজন মানুষ বাঁচাতে। ঈশ্বরের সন্তানের মতই কাজ করেছো তুমি”! অনাত্মীয় হলেও এ বিশেষ কেসটিতে কোন অর্থ লেনদেন হয়নি বরং মানবিকতাকে সমুজ্জ্বল করতে চাইছে এক মানবিক ফাদার এ বিবেচনায় “ভারতীয় স্বাস্থ মন্ত্রক” অনুমোদন দেয় কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের।
:
আবার আনন্দের বন্যা বয় মোরশেদের পরিবারে। সবার চোখে ভাসতে থাকে একটা কিডনি নেয়ার পর সুস্থ্য হয়েছে মোরশেদ। আবার কাজ করছে সে সুস্থ্য স্বাভাবিক মানুষের মত। সুখ আর আনন্দ ফিরে এসেছে এ পরিবারে। কিন্তু এমনটা ঘটেনা বাস্তবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের অনুমোদন আসতে প্রায় ১০/১২ দিন চলে যায়। এই ফাঁকে ফাদার নিকোলাস কিছুটা অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। শহরে ডাক্তারের চেম্বারে যেতে ব্যস্ত সড়ক পার হতে দ্রুতগামি বাস চাপা দেয়ে ফাদার নিকোলাসকে। জ্যোৎস্না জলের ভালবাসায় স্নাত হয়ে নুয়ে পড়া বৃক্ষের মত কোচির ব্যস্ত সড়কে পড়ে থাকে এক মানবিক ফাদারের রক্তাক্ত মরদেহ।
:
এসব কিছুই জানেনা মোরশেদ। দুখভরা আর্দ্র চৈতন্যের কালো মেঘের ভেলায় উড়তে থাকে মোরশেদ নামের এক তরুণ! শোকভরা কষ্টবাতাসে। মেঘের হৃৎপিণ্ড ফুঁড়ে কতনা রঙমাখা মেঘ উড়ে যায় দুর আকাশে! কত সপ্তরঙা মেঘ হেসে ওঠে মায়াবী আলোর ভেলায়! কিন্তু মোরশেদ ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনা, পথকাটার নির্বাসনের সুখ আকাশে ভেসে-ভেসে এক মানুষরূপী দেবমানব শুয়ে রয়েছে দুপুরের তপ্ত রোদে কোচির রক্তভেজা পিচঢালা সড়কে ! যেখানে প্রাণের গভীরের মগ্নতায় যাপিত জীবনের অন্যসব প্রাপ্তি তুচ্ছতর মনে হয় এ জীবনের কাছে!
[একটি সত্যি ঘটনার ছায়া অবলম্বনের রূপকে রচিত]

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

17 − = 15