সবুজ বরফ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

সাদা মহাদেশ এন্টার্কটিকা। সাদা বরফের চাদরে ঢাকা। কিন্তু গত কয়েক বছর যাবত সাদার মাঝে সবুজ রঙের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ক্যাম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটি একদল গবেষক এই বিষয়ে একটি রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ সব তথ্য উঠে এসেছে সেই গবেষণায়। যা মানবজাতির জন্য তো বটেই বিশেষ করে বাংলাদেশের জন্য মোটেও সুখকর না।

চিত্র ১

সাম্প্রতিক কেম্ব্রিজ ইউনিভার্সিটির কিছু গবেষক যে রিসার্চ পেপার প্রকাশ করেছেন তাতে বিস্তারিত অবজারভেশন উল্লেখ করেছেন কিভাবে এন্টার্কটিকার বরফের চাদর সবুজ রঙের হয়ে যাচ্ছে (চিত্র ১)। তাদের মতে সবুজ রঙের আচ্ছাদনের কারণ হল মাইক্রোস্কোপিক অ্যালগি (Microscopic Algae)। অ্যালগি অর্থ শৈবাল। শৈবাল কিছু স্থানে এত প্রবলভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে যে সেটা স্পেস থেকে স্যাটেলাইটের মাধ্যমেও দেখা যাচ্ছে। মূলত এই রিসার্চে তারা সেন্টিনেল স্যাটেলাইটের ইমেজেনারি ব্যাবহার করেছেন। তারা এন্টার্কটিকের আস্ত একটা ম্যাপ বানিয়েছেন যেখানে অনেক সুক্ষ্ম জিনিসও ফুটে উঠেছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক বার্তা। কেননা অ্যালগির কারণে অন্য প্রজাতি বৃদ্ধি পেতে পারে। অ্যালগির উপরে অনেক প্রজাতি নির্ভরশীল। বহু প্রজাতির জন্য এটা প্রধান খাদ্য। সেই প্রজাতিগুলো যখন পর্যাপ্ত খাদ্য পেতে থাকবে তখন খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করবে।

চিত্র ২: এন্টার্কটিকার পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র

এন্টার্কটিকার পূর্বে রয়েছে ইস্ট এন্টার্কটিক আইস শিট, ও পশ্চিমে রয়েছে ওয়েস্ট এন্টার্কটিক আইস শিট। পশ্চিমে লেজের মতো যে অংশটি বেরিয়ে আছে সেটিকে বলা হয় পেনিনসুলা। পেনিনসুলার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এটি পুরো মহাদেশ থেকে বাহিরে বিস্তৃত হচ্ছে। বেশিরভাগ শৈবাল এই অঞ্চলেই দেখা গেছে। এখানে আমেরিকা, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, চীন, সাউথ আফ্রিকা, ইন্ডিয়া সহ ৩০ টি দেশের একাধিক রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। ভারতের দুটো স্টেশন রয়েছে। এই দুটির নাম মৈত্রী ও দক্ষিণ গাঙ্গোত্রি।

চিত্র ৩: বরফে শৈবাল

গবেষকরা যে ছবিগুলো প্রকাশ করেছেন তা কিছুটা এরকম (চিত্র ৩)। যেখানে এমন বিচ্ছিন্ন ভাবে বরফ কয়েকটি স্থানে এমন সবুজ রঙ ধারণ করেছে। দূর থেকে দেখলে এগুলোকে সবুজ রঙের বরফ মনে হয় কিন্তু আসলে সেটা নয়।

এন্টার্কটিকার পুরো সারফেস এরিয়া বরফে ঢাকা থাকে। পুরো মহাদেশের মাত্র ০.৮% ভূপৃষ্ঠে বরফের কোনো আচ্ছাদন নেই। পেনিনসুলা এরিয়ার ১.৩৪% ভূমিতে বরফ নেই। ঐ অংশগুলোতে হয় পাথর নয়তো কোন প্রকার মস রয়েছে। ব্রিটিশ গবেষক দলের দাবী বরফহীন সারফেস ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বৃদ্ধির কারণে বরফ গলছে ফলে অ্যালগির বিস্তারের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। যেকোনো অঞ্চলে শৈবাল জন্মানোর জন্য স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ দরকার। আর এন্টার্কটিকায় সেটাই তৈরি হয়েছে। এখানে বরফ আছে, পানি আছে, কিছুটা কাঁদা আছে। উল্লেখযোগ্য একটি বিষয় হল এন্টার্কটিকার পেনিনসুলা এরিয়ায় অ্যালগি দেখা যাওয়া একটা স্বাভাবিক ঘটনা। কারণ এন্টার্কটিকার অন্য অঞ্চলের তুলনায় এখানে তাপমাত্রা কিছুটা বেশি থাকে। ধরা যাক মূল ভূভাগে যদি তাপমাত্রা -৩০° হয় তাহলে পেনিনসুলায় তাপমাত্রা হবে -১০°। এটা বৃদ্ধি পায় নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত। সাউদার্ন হ্যামিস্ফিয়ারে তখন গ্রীষ্মকাল চলে। পানিতে নির্ভরশীল হওয়ার কারণে পেঙ্গুইনও মূলত উপকূলবর্তী অঞ্চলেই থাকে। পেনিনসুলা এলাকায় রয়েছে বেশিরভাগ পেঙ্গুইনদের কলোনি। তাদের বর্জ্যের কারণেও অ্যালগি এই অঞ্চলে বৃদ্ধি পায়। ইদানীং পেনিনসুলা অঞ্চলে কিছু ছোট ছোট দ্বীপ দেখা গেছে। যা এন্টার্কটিকার আগের ম্যাপে সংযুক্ত ছিলো না। দ্বীপগুলোতেই বেশিরভাগ অ্যালগি খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রিসার্চে জানা গেছে, ঐ অঞ্চলে ১৬৭৯ টি অ্যালগি ব্লুম রয়েছে। এগুলো খুব ছোট ছোট ব্লুম। কিন্তু সবগুলোকে একত্রিত করলে মোট অ্যালগাল ব্লুমের আয়তন হয় ১.৯ স্কয়ার কিলোমিটার। এন্টার্কটিকার বিশাল আয়তনের অনুপাতে ১.৯ স্কয়ার কিলোমিটার কিছুই না। কিন্তু মনে রাখতে হবে শৈবাল খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে হয়ত ২ স্কয়ার কিলোমিটার হয়ে গেছে, আগামী দুই বছর পর এটা ৭/৮ স্কয়ার কিলোমিটারে বৃদ্ধি পাবে। এক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক বিষয় হলো দুই তৃতীয়াংশ অ্যালগাল ব্লুম অর্থাৎ ৬৬% অ্যালগাল ব্লুম দেখা গেছে শুধু মাত্র পেনিনসুলার আশেপাশের ছোট ছোট দ্বীপগুলোতে। ঐ দ্বীপগুলোর তাপমাত্রা গত কয়েক বছর ধরে নজরদারি করা হচ্ছে, জানা গেছে পুরো এন্টার্কটিকার সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা ঐ দ্বীপগুলোতেই খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্য এলাকার তুলনায়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং এর সরাসরি প্রভাব এই দ্বীপগুলোতে দেখা যায়।

এন্টার্কটিকার সবুজ হয়ে ওঠার পেছনে অ্যালগি ছাড়া আরেকটি বড় কারণ হল মস (Moss Growth)। মস ওখানে আগেও পাওয়া যেত, সব সময়ই পাওয়া যেত। মসেরও এলাকা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মস একধরণের ব্রায়োফাইট (Bryophyte)। যখন প্ল্যান্ট কিংডম বৃদ্ধিপায় তখন যেকোনো অঞ্চলে ব্রায়োফাইট দেখা যায়। যেকোনো জঙ্গলে, ঠাণ্ডা এলাকায় গেলে পাথর, গাছের বের হওয়া শিকড় অথবা মাটিতেও এর দেখা মেলে। এটা শৈবালের থেকে আলাদা। শৈবাল একধরণের এক কোষী অর্গানিজম কিন্তু মস একধরণের প্লান্ট। এটাই দুই শ্রেণীর মধ্যে প্রধান পার্থক্য। শৈবাল খুব দ্রুত বৃদ্ধি পায় কিন্তু মস ধীরে বৃদ্ধি পায়। এন্টার্কটিকার মস নিয়েও তিন বছর আগে একটা গবেষণা হয়েছিলো, সেটা কারেন্ট বায়োলজি নামের একটি জার্নালে ছাপানো হয়।

চিত্র ৪: আইস শিট বা গ্লেসিয়ারে পানির স্রোত

গবেষকরা মসের বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করে জানতে পারে ধীরে বৃদ্ধি সত্ত্বেও মরু এলাকায় এর আয়তন বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত পঞ্চাশ বছরে এর গ্রোথ রেট আরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মস প্রতি বছর ১ মিলিমিটার করে বৃদ্ধি পেত কিন্তু গত পঞ্চাশ বছরে বৃদ্ধি পেয়েছে ৩ মিলিমিটারেরও বেশি। অর্থাৎ ৩ গুণ বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মসের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল এটি পরীক্ষা করে পুরাতন ডেটা বের করা সম্ভব। বিজ্ঞানীরা মাটির নিচে ড্রিল করলে তারা প্রায়শই বহু পুরাতন মস আবিষ্কার করেন। সেটার কার্বন টেস্ট ও এনালাইজ করে জানা যায় কতটা ফটোসিন্থেটিক একটিভিটি ঐ এলাকায় রয়েছে। কার্বন আইসোটোপ একুমুলেশনের মাধ্যমেও অনেক তথ্য বিজ্ঞানীরা উদ্ধার করতে পারেন। বিজ্ঞানীদের মতে মসের বৃদ্ধির মূল কারণ গ্লোবাল ওয়ার্মিং। যখন তাপমাত্রা বাড়ে তখন এন্টার্কটিকার আইস শিট বেশ পুরু হওয়া সত্ত্বেও এর স্তর গলা শুরু হয় ফলে অনেক বড় বড় হৃদ এমনকি বরফের উপর দিয়ে নদীও প্রবাহিত হয়। তখন মস বৃদ্ধি পাওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হয়। এটা নিয়ে এন্টার্কটিকায় বহু বার রিসার্চ হয়েছে। অনেকেই জানেন কিভাবে আইস শিট নিয়মিত ভাঙে। বড় ধরণের আইস শিট ভাঙলে সেটা কয়েকদিন সংবাদ শিরোনামেও থাকে। ৪ নং চিত্রে বরফের মাঝে যে পানি চোখে পড়ছে তা আসলে গ্লেসিয়ার। এগুলো সব কিছু দিনের মধ্যেই ভেঙে যাবে।

চিত্র ৫: আলবিডো ইফেক্ট

বরফ কম থাকার আরেকটি বড় ক্ষতিকর দিক হল আলবিডো ইফেক্ট (Albedo Effect)। সূর্য কিরণ যখন বরফের উপরে পড়ে তখন সাধারণত আলোর ৯০ শতাংশই প্রতিফলিত হয়। এর ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা কম থাকে। কিন্তু বরফ গলে পানি হয়ে গেলে তখন রশ্মির ৯০% প্রতিফলন হয় না। বেশিরভাগ রশ্মী পানি, মাটি, পাথর, মস, শৈবাল শোষণ করে ফেলে। তখন ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। গ্লোবাল ওয়ার্মিং যদি এভাবেই চলতে থাকে তাহলে সেই দিন আর দূরে না যেদিন এন্টার্কটিকায় আমরা কোনো বরফ  দেখতে পাবো না, শুধু মসই পাবো। কয়েক হাজার বছরের মধ্যে যে সেখানে জঙ্গল হয়ে যাবে না এই নিশ্চয়তাও দেওয়া যাবে না।

চিত্র ৬: ভবিষ্যতের সম্ভব্য বাংলাদেশ

মরু এলাকায় যদি ভারসাম্য বজায় না থাকে, সমস্ত বরফ যদি গলে যায়, এন্টার্কটিকা ও আর্কটিকের সমস্ত বরফ না থাকে তবে সমুদ্রের স্তর বৃদ্ধি পাবে ৭০ মিটার বা ২৩০ ফিট। ২৬০ ফিট পানি বৃদ্ধি পেলে পৃথিবী দেখতে কেমন হবে তা মোটামুটি আতঙ্কজনক। এন্টার্কটিকার পশ্চিম ভাগ পুরোটাই পানির নিচে চলে যাবে। খুব কম ভূমি থাকবে যা পানির উপরে থাকবে। বাংলাদেশেরও মানচিত্র একবার দেখে নিন (চিত্র: ৬)। বাংলাদেশ, পশ্চিম বাংলা সহ যত লো লাইন এরিয়া আছে সব পানির নিচে চলে যাবে। বাংলাদেশের কোনো অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না। এন্টার্কটিকার ক্লাইমেট হল পৃথিবীর জন্য থার্মোমিটার। যে পরিবর্তন এন্টার্কটিকায় দেখা যাবে সেটা মাইক্রোস্কীপিক লেভেল হোক বা যেই স্কোপিক লেভেলই হোক না কেন সেটা আমাদের জন্য একটা সতর্ক বার্তা।

তথ্যসূত্র:
https://www.cam.ac.uk/stories/antarctica-turning-green

https://amp.theguardian.com/world/2020/may/20/climate-change-turning-parts-antarctica-green-say-scientists-algae

https://www.nationalgeographic.com/magazine/2013/09/rising-seas-ice-melt-new-shoreline-maps/

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 1 = 7