একটি শান্তির আয়াত ও ইসলামে মানবতা

নাস্তিকদের সাথে বিতর্ক করার সময় মডারেট মুসলিমরা ইসলামকে শান্তির ধর্ম প্রমাণ করার জন্য প্রায়ই বলে থাকেন, ” কোরানের সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতে আছে, যে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল সে পুরো মানব জাতিকে হত্যা করল আর যে একজন মানুষকে রক্ষা করল সে পুরো মানব জাতিকে রক্ষা করল।“ এই আয়াতটি বলে তারা ইসলামকে মানবিক প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে তারা কখনও পুরো আয়াতটা বলেন না, আয়াতটার প্রথম অংশ বাদ দিয়ে শুধু সেই অংশটুকুই বলেন যেটুকু বললে তাদের কার্যসিদ্ধি হয় অর্থাৎ ইসলাম শান্তির ধর্ম প্রমাণিত হয়। এবার আমি এই আয়াতটার একটু ব্যবচ্ছেদ করবো।

সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর যে আয়াতটা আছে সেটা হচ্ছে, “এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলে র প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।“

লক্ষ্য করুন, এই আয়াতটির প্রথম অংশে আছে, “এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলে র প্রতি লিখে দিয়েছি যে”। অর্থাৎ আব্রাহামিক ঈশ্বরের এই আদেশটি শুধুমাত্র বনী ইসরায়েল অর্থাৎ ইহুদিদের জন্য প্রযোজ্য, মুসলিমদের জন্য নয়।

এখন দেখা যাক আব্রাহামিক ঈশ্বর ইহুদিদেরকে সত্যিই এধরনের কোনও আদেশ দিয়েছিলেন কিনা। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাত বা ওল্ড টেস্টামেন্টে এরকম কোনও আয়াত বা ভার্স নেই। তাওরাত হচ্ছে আব্রাহামিক ঈশ্বরের বাণী। কিন্তু এধরনের একটি কথা খুজে পাওয়া যায় “তালমুদ” নামক একটা গ্রন্থে। কিন্তু তালমুদ আব্রাহামিক ঈশ্বরের বাণী নয়। আমাদের দেশের হুজুররা যেমন ইসলামের ওপর বিভিন্ন চটি বই লিখে থাকেন, যেগুলো নীলক্ষেতে পাওয়া যায়, তালমুদও ঠিক সেরকমই একটা বই। এটা ইহুদি হুজুরদের লেখা একটা বই।

তালমুদে আছে, “Whoever destroys a single life is considered by Scripture to have destroyed the whole world, and whoever saves a single life is considered by Scripture to have saved the whole world.” (Mishnah Sanhedrin 4:5; Yerushalmi Talmud 4:9, Babylonian Talmud Sanhedrin 37a.) হযরত মুহম্মদ তালমুদের এই কথাটাই আব্রাহামিক ঈশ্বরের বাণী মনে করে কোরানে কপিপেস্ট করেছেন।

এখন ধরে নিই, সত্যিই আব্রাহামিক ঈশ্বর এরকম কোনও আদেশ দিয়েছেন এবং সেটা ইহুদিদের পাশাপাশি মুসলিমদের জন্যও প্রযোজ্য। অর্থাৎ আয়াতটির মূলভাব এরকমই – “যে একজন নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করল সে পুরো মানব জাতিকে হত্যা করল আর যে একজন মানুষকে রক্ষা করল সে পুরো মানব জাতিকে রক্ষা করল।“ তাহলেও কিন্তু ইসলাম শান্তির ধর্ম প্রমাণিত হয় না। কেন হয় না সেটা বলছি। এখানে “নিরপরাধ” শব্দটি লক্ষ্য করুন। কে “নিরপরাধ” আর কে “নিরপরাধ না” সে বিষয়ে ইসলামের নিজস্ব সংজ্ঞা আছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সমকামি নিরপরাধ নন। হাদিসে সমকামিদের হত্যা করতে বলা হয়েছে।

ইসহাক ইবন ইবরাহীম (রহঃ) ………. ইবন আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ যদি অবিবাহিত ব্যক্তি সমকামিতার সময় ধরা পড়ে, তবে তাকে পাথর মেরে হত্যা করতে হবে। (সূনান আবু দাউদ, ৪৪০৪., ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

ইসলামের দৃষ্টিতে একজন ধর্মত্যাগী (মুরতাদ) নিরপরাধ নন। হাদিসে মুরতাদদের হত্যা করতে বলা হয়েছে।

আহমদ ইব্‌ন মুহাম্মদ (রহঃ) — ইকরাম (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, আলী (রাঃ) ঐ সব লোকদের আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেন, যারা মুরতাদ হয়েছিল। এ সংবাদ ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌছলে, তিনি বলেনঃ যদি আমি তখন সেখানে উপস্থিত থাকতাম, তবে আমি তাদের আগুনে জ্বালাতে দিতাম না। কেননা, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোময়া আল্লাহ্‌ প্রদত্ত শাস্তির (বস্তু) দ্বারা কাউকে শাস্তি দেবে না। অবশ্য আমি তাদেরকে আল্লাহ্‌র রাসূলের নির্দেশ মত হত্যা করতাম। কেননা, তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যদি কেউ দীন পরিত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে যায়, তবে তোমরা তাকে হত্যা করবে। আলী (রাঃ) ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ)-এর এ নির্দেশ শুনে বলেনঃ ওয়াহ্‌! ওয়াহ্‌! ইব্‌ন আব্বাস (রাঃ) সত্য বলেহছেন। আর ইহাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ। (সূনান আবু দাউদ, ৪৩০০., ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

ইসলামের দৃষ্টিতে যে সকল নারী পুরুষ বিবাহ ছাড়াই পরস্পর পরস্পরের সম্মতির ভিত্তিতে যৌনসঙ্গম করে (ব্যাভিচারি) তারা নিরপরাধ নন। হাদিসে ব্যাভিচারিদের হত্যা করতে বলা হয়েছে।

আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ্ (রহঃ) ….. ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ এমন মুসলিমকে হত্যা করা বৈধ নয়, যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ছাড়া কোন মা’বুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রসূল। কিন্তু তিনটি কাজের যে কোন একটি করলে (তা বৈধ)।
১. বিবাহিত ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হলে; ২. জীবনের বিনিময়ে জীবন, অর্থাৎ কাউকে হত্যা করলে; ৩. এবং স্বীয় ধর্ম পরিত্যাগকারী, যে (মুসলিমদের) দল থেকে বিচ্ছিন্ন (মুরতাদ) হয়ে যায়। (সহীহ মুসলিম, ৪২৬৭-(২৫/১৬৭৬), ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৪২২৮, ইসলামিক সেন্টার ৪২২৮)

যারা ইসলামের সমালচনা করেন তারা ইসলামের দৃষ্টিতে নিরপরাধ নন। অভিজিৎ রায়, রিচার্ড ডকিন্স, স্যাম হ্যারিস এরা কেও ইসলামের দৃষ্টিতে নিরপরাধ নন। ইসলামের দৃষ্টিতে এরা সবাই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন এবং মৃত্যুদণ্ডই এদের শাস্তি। হযরত মুহম্মদ তার সমালোচনাকারিদের হত্যা করতে বলেছেন।

ইয়াযিদ ইবনে যায়েদ ইবনে হিসান আল-খাতমির স্ত্রী আসমা বিনতে মারওয়ান ছিলেন সেকালের একজন প্রসিদ্ধ মহিলা কবি। তিনি মুহাম্মদের নীতির ঘোর বিরোধী ছিলেন। সেকথা কবিতায় তিনি অকপটে লিখে ফেলতেন। এই কবিতা শুনে মুহাম্মদ বাক্রুদ্ধ হয়ে উঠে উপস্থিতি সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বলে উঠেন, ‘তোমাদের মধ্যে কে আছে যে এই মহিলাকে খুন করবে?’ উমায়ের বিন আল-খাতমি নামের এক সাহাবী একথা শোনার সাথে সাথে সে রাতেই সেই মহিলার বাড়িতে গিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। এই মহিলা কবি তখন তাঁর শিশুসন্তান পরিবেষ্টিত হয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। একটি শিশু তখন তার মায়ের স্তন্যপান করছিলো, উমায়ের সেই দুগ্ধপানরত শিশুটিকে সরিয়ে মহিলার বুকে তার তলোয়ার আমূলবিদ্ধ করে হত্যা করেন। পরদিন সকালে উমায়েরের সাথে দেখা হলে মুহাম্মদ তাঁকে বলেন, ‘তুমি আল্লাহ আর তার নবীকে সাহায্য করেছ।‘ উমায়ের বলেন, ‘তার পাঁচটি ছেলে ছিল; আমার কি অনুশোচনা করা উচিৎ?’ মোহাম্মদ উত্তর দেন, ‘না, কারণ তার মৃত্যু আর দুটো ছাগলের ঢুঁশোঢুঁশি করা সমান (ইবনে সা’দ কিতাব আল-তাবাকাত আল-কবির অনুবাদ এস. মইনুল হক, ভল্যুম ২, পৃ. ৩১)।

ইসলাম সমকামিদের, মুরতাদদের, ব্যাভিচারিদের, সমালোচনাকারিদের হত্যা করতে বলে যেহেতু তারা ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধী।

একারণে সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াতটিকে কোনোভাবেই মানবিক বলার সুযোগ নেই। সুতরাং এই আয়াতটি ব্যবহার করে আর যাই হোক ইসলামকে শান্তির ধর্ম প্রমাণ করা যাবে না।

পার্থ দাশ

২৪/০৫/২০

ঢাকা, বাংলাদেশ

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

1 + 2 =