মুসলমানদের উচ্চ জন্মহারের কারণ সন্ধানে

একটা স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাকে যদি প্রশ্ন করা হয়, “জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ কি?” সে হয়তো গড়গড় করে মুখস্ত বলতে থাকবে, “দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, নারী শিক্ষার অভাব, বহুবিবাহ, বাল্যবিবাহ, ছেলে সন্তান প্রত্যাশা, ধর্মীয় কুসংস্কার প্রভৃতি।” এগুলো অবশ্যই জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ। বাংলাদেশের স্কুলের পাঠ্যপুস্তকে এসব কারণের বিশদ ব্যাখ্যা ও বর্ণনা আছে। এই কারণগুলো আমিও অস্বীকার করি না। কিন্তু আমি একটা জিনিস খেয়াল করলাম ইউরোপের লিবারাল সেক্যুলার দেশগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুবই কম। নরওয়েতে ০.৯৪%, সুইডেনে ০.৮০%, স্পেনে ০.৭৩%, সুইজারল্যান্ডে ০.৬৮%, বেলজিয়ামে ০.৬৭%। ইউরোপের কোনও কোনও দেশে আবার জনসংখ্যা পড়তির দিকে অর্থাৎ জনসংখ্যা বৃদ্ধি তো পাচ্ছেই না বরং হ্রাস পাচ্ছে। যেমন, স্লোভেকিয়া -০.০২%, গ্রিস -০.০৭%, জার্মানি -০.১৭% [১]। কিন্তু আফ্রিকা ও এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোর দিকে যদি তাকাই তাহলে দেখা যাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুব বেশি। যেমন, নাইজেরিয়া ২.৪৩%, মালি ৩.০২%, মিশর ২.৪৫% [২] ইরাক ২.৮৭%, আফগানস্তান ২.৩৪%, ইয়েমেন ২.৩৭% [৩]। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এত বেশি কেন আর ইউরোপের সেক্যুলার দেশগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এত কম কেন? মুসলিমদের এই উচ্চ জন্মহারের পিছনে ইসলাম কি কোনোভাবে দায়ী? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। কেন এবং কিভাবে সেটা নিয়েই এখানে আমি আলোচনা করবো।

সভ্যতার শুরু থেকেই জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষকে পরিশ্রম করতে হয়েছে। আধুনিক যুগে অর্থ উপার্জনের জন্য মানুষ চাকরি, ব্যবসা বা অন্য কোনও পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে মানুষ অবসর পায়। তখন একঘেয়েমি কাটানোর জন্য এবং মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য মানুষের চিত্তবিনোদনের প্রয়োজন হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মানুষ চিত্তবিনোদনের জন্য কি করতে পারে? মানুষ গান শুনতে পারে বা গান গাইতে পারে, কবিতা পড়তে পারে বা কবিতা লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে বা কোনও আর্ট এক্সিবিশনে গিয়ে বড় বড় শিল্পীদের আঁকা ছবি দেখতে পারে, টেলিভিশনে নাচ-গান দেখতে পারে, কোনও ঘরোয়া খেলা যেমন দাবা খেলতে পারে। মানুষ তার অবসর সময় এসব সৃষ্টিশীল কাজের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করতে পারে। এতে যেমন মানুষের একঘেয়েমি কাটবে তেমনি সে নিজেকে সমৃদ্ধও করতে পারবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে মানুষের চিত্তবিনোদনের জন্য আধুনিক বিশ্বে যত সৃষ্টিশীল কাজ আছে তার প্রায় সবই ইসলামে নিষিদ্ধ।

সঙ্গীত এবং গান-বাজনা ইসলামে হারাম। হাদিসে আছে- [৪]

আবু মালিক আশআ’রী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পরিবর্তন করে তা পান করবে। আর তাদের মাথার উপর বাদ্যযন্ত্র ও গায়িকা রমনীদের গান বাজতে থাকবে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে যমীনে ধ্বসিয়ে দিবেন। আর তাদের কিছুকে বানর ও শূকর বানিয়ে দিবেন। (ইবন মাজাহ  ৪০২০)

অন্য একটি হাদিসে আছে- [৫]

ইমরান ইবন হুসাইন রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন, এই উম্মতের জন্য ভূমিধ্বস, চেহারা বিকৃতি এবং পাথর বর্ষণের আযাব রয়েছে। জনৈক মুসলিম ব্যক্তি তখন বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, কখন হবে তা? তিনি বললেন, যখন গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের বিস্তার ঘটবে এবং মদ্যপান দেখা দিবে। (তিরমিযী ২২১৫)

চিত্রাঙ্কনও ইসলামে হারাম। মূর্তি তৈরিও ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদিসে আছে- [৬]

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি যে, ‘‘প্রত্যেক ছবি [বা মূর্তি] নির্মাতা জাহান্নামে যাবে, তার নির্মিত প্রতিটি ছবি বা মূর্তির পরিবর্তে একটি করে প্রাণ সৃষ্টি করা হবে, যা তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে থাকবে।’’ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘যদি তুমি করতেই চাও, তাহলে গাছপালা ও নিষ্প্রাণ বস্তুর ছবি বা মূর্তি তৈরি করতে পার।’ (বুখারী ও মুসলিম)

হাদিসে আরও আছে- [৭]

ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যারা এ জাতীয় [প্রাণীর] মূর্তি বা ছবি তৈরি করে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে। তাদেরকে বলা হবে, তোমার যা বানিয়েছিলে তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা কর।’’ (বুখারী)

হযরত মুহম্মদ কবিতা ও কবিদের ঘৃণা করতেন। তাই কবিতাও ইসলামে নিষিদ্ধ। হাদিসে আছে- [৮]

মুহাম্মদ ইবনু মুসান্না ও মুহাম্মাদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … সা’দ (রাঃ) সুত্রে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, কোন ব্যক্তির পেট পুঁজে ভর্তি হয়ে যাওয়া যা তার পেটকে পটিয়ে নষ্ট করে দেয়, তা কবিতায় ভর্তি হওয়ার চাইতে উত্তম। (সহীহ মুসলিম, ৫৬৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

হাদিসে আরও আছে- [৯]

কুতায়বা ইবনু সাঈদ সাকাফী (রহঃ) … আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে ‘আরজ’ এলাকায় সফর করছিলাম। তখন এক কবি কবিতা আবৃতি করতে করতে আসতে লাগল। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ শয়তানটাকে ধরে ফেল কিংবা (বর্ণনা সন্দেহ, তিনি বললেন) শয়তানটাকে রুখে দাও। কোন লোকের পেট পুঁজে ভর্তি হয়ে যাওয়া কবিতায় ভর্তি হওয়া থেকে উত্তম। (সহীহ মুসলিম, ৫৬৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

বিভিন্ন ঘরোয়া খেলা যেমন দাবা খেলাও ইসলামে হারাম। হাদিসে আছে- [১০]

যে ব্যক্তি দাবা খেললো সে যেন নিজ হাতকে শুকরের গোস্ত ও রক্ত দিয়ে রঞ্জিত করলো। (মুসলিম ২২৬০)

সুতরাং দেখা যাচ্ছে আধুনিক বিশ্বে যত সৃষ্টিশীল কাজ আছে তার সবকিছুই ইসলামে হারাম। তাহলে একজন মুসলিম অবসর সময়ে কিভাবে চিত্তবিনোদন করবে? কিভাবে কাজের একঘেয়েমি কাটাবে? একটাই রাস্তা আছে, সেটা হচ্ছে স্ত্রীর সাথে যৌনসংগম করা। আর এ কারণেই মুসলিমদের জন্মহার এত বেশি।

তাছাড়া অশিক্ষিত মুসলিমদের মাঝে একটা মনস্তাত্ত্বিক ধারণা কাজ করে যে তারা অধিক সন্তান জন্ম দিয়ে বিশ্বে মুসলিম জনসংখ্যা বাড়াবে। আর এই বিশাল জনসংখ্যা দিয়ে তারা ইউরোপ-আমেরিকা দখল করে নেবে। অর্থাৎ তারা মনে করে, তারা সংখ্যা দিয়ে তাদের শত্রুকে পরাজিত করবে। অনেক ওয়াজ মাহফিলে ইসলামিক বক্তারা মুসলিমদের অধিক সন্তান জন্মদানে উৎসাহিত করে। [১১]

সুতরাং মুসলিমদের উচ্চ জন্মহারের পিছনে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি ইসলাম ধর্মটাও একটা বড় কারণ। এটা অস্বীকার করার কোনও উপায় নেই।

রেফারেন্সঃ

[১] https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_European_countries_by_population_growth_rate

[২] https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_African_countries_by_population_growth_rate

[৩] https://en.wikipedia.org/wiki/List_of_Asian_countries_by_population_growth_rate

[৪] ইবন মাজাহ  ৪০২০

[৫] তিরমিযী ২২১৫

[৬] সহীহুল বুখারী ২২২৫, ৫৯৬৩, ৭০৪২, মুসলিম ২১১০, তিরমিযী ১৭৫১, ২২৮৩, নাসায়ী ৫৩৫৮, ৫৩৫৯, আবূ দাউদ ৫০২৪, ইবনু মাজাহ ৩৯১৬, আহমাদ ১৮৬৯, ২১৬৩, ২২১৪, ২৮০৬, ৩২৬২, ৩৩৭৩, ৩৩৮৪

[৭] সহীহুল বুখারী ৫৯৫১, ৭৫৫৮, মুসলিম ২১০৮, নাসায়ী ৫৩৬১, আহমাদ ৪৪৬১, ৪৬৯৩, ৪৭৭৭, ৫১৪৬, ৫৭৩৩, ৬০৪৮, ৬২০৫, ৬২২৬, ৬২৯০

[৮] সহীহ মুসলিম, ৫৬৯৭, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

[৯] সহীহ মুসলিম, ৫৬৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

[১০] মুসলিম ২২৬০

[১১] https://www.youtube.com/watch?v=25uKyYlMeyU&feature=youtu.be

পার্থ দাশ

২৬/০৫/২০

ঢাকা, বাংলাদেশ

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4