নক্ষত্রচ্যুতি: শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

কিছুক্ষণ আগে খবর পেলাম আমাদের সকলের গুরুজন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকারী শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী আর নেই। এত ভালো একজন মানুষ এভাবে হঠাৎ করে চলে যাবেন, মেনে নিতে কষ্ট হয়।

ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম বিপ্লবী শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং বাঙালির চেতনার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। সারাজীবন অন্যায়, অত্যাচার, জুলুমের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

উকিল কামিনি কুমার চৌধুরী ও রমা রানী চৌধুরীর পঞ্চম সন্তান বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী ১৯১১ সালের ১০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী থানার উত্তর ভূর্ষি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।

১৯২৭ সালে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী দল যুগান্তরে যোগ দান করেন।

১৯২৯ সালে সারোয়াতলী উচ্চ বিদ্যালয় হতে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন।

১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাষ্টার’দা সূর্য সেনের নেতৃত্বে বিপ্লবীরা চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনের অস্ত্রাগার লুট করে ব্রিটিশদের টনক নড়িয়ে দিয়েছিল। শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী ছিলেন সেই বিপ্লবী দলেরই একজন।

১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে মাষ্টার’দা সূর্যসেনের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী বাহিনী সাথে ব্রিটিশ সৈন্যদের সাথে যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে শহীদ হন অনেক বিপ্লবী। বিনোদ বিহারী চৌধুরীর কণ্ঠনালীতে গুলি লাগে। আহত অবস্থায় তিনি আত্মগোপন করেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মৃত বা, জীবিত ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০০ টাকা পুরস্কার দেবার কথা ঘোষণা করে।

১৯৩৩ সালে ব্রিটিশ সৈন্যদের হাতে ধরা পড়েন এই মহান বিপ্লবী।

১৯৩৪ সালে ভারতের রাজপুতনা দেউলি ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দী অবস্থাই ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে পাশ করেন।

১৯৩৬ সালে বন্দী থাকাকালে ডিস্টিংশনসহ বিএ পাশ করেন।

১৯৩৯ সালে গৃহবন্দী অবস্থায় তিনি ইংরেজিতে এমএ ও বিএল (আইনে স্নাতক) পাশ করেন। একই বছর ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন এবং চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সহ-সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪০ সালে শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী আইনজীবী কিরন দাশের মেয়ে বিভা দাশকে (বেলা চৌধুরী) বিয়ে করেন। একই বছর বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের নির্বাহী কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯৪৬ সালে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

৪৭’এ দেশভাগের পর ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তিনি পূর্ব-পাকিস্তান প্রাদেশিক-পরিষদের নির্বাচিত সদস্য ছিলেন।

২০০০ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদক ‘স্বাধীনতা পদকে’ ভূষিত করে।

২০০৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর দীর্ঘদিনের সাথী বিভা দাশকে (বেলা চৌধুরী) হারিয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন।

শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী সারাজীবন অন্যায়-অবিচার, অপশাসন, সাম্প্রদায়িকতা ও মানবতার অধিকারের সংগ্রামে লড়াকু ভূমিকা পালন করেছেন। আমৃত্যু তিনি মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম চালিয়ে গিয়েছেন। আত্মত্যাগী, বিনয়ী, উদার এই মহান বিপ্লবী সারাজীবন অতি-সাধারণ জীবন-যাপন করেছেন। মোমিন রোডের নিজবাড়িতে ছাত্র পড়াতেন বড়মনের এই মানুষটি।

শেষের দিকে বার্ধক্যজনিত নানান সমস্যায় ভুগছিলেন শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে চিরসংগ্রামী এই মানুষটি আজ (১০ এপ্রিল, ২০১৩, বুধবার) সাড়ে দশটায় কলকাতার ফোর্টি হাসপাতালে ১০৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন।

বড়মনের ভালমানুষগুলো দিনকে দিন আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। আমাদের দেশের বর্তমান বাস্তবতায় এটা কি ভাবা যায় যে, একজন সাবেক-সংসদ-সদস্য নিজবাড়িতে ছেলে-মেয়েদের পড়াতেন? আজীবন দেশ ও দেশের মানুষের জন্য আন্দোলন করে যাওয়া শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরী বাঙালীর মনে চিরভাস্মর হয়ে থাকবেন।

শ্রদ্ধেয় বিনোদ বিহারী চৌধুরীর প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
.
.
.
[পোস্টটি শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর শেষ-নিশ্বাস ত্যাগের খবর শুনে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় গতকাল রাতে লেখা]
.
.
.
© সাব্বির হোসাইন
.
.
.

ফেসবুক মন্তব্য
শেয়ার করুনঃ

১ thought on “নক্ষত্রচ্যুতি: শ্রদ্ধেয় বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

37 + = 38