শ্রীকৃষ্ণের কামলীলা – পর্ব (১)

“যাহা রটে তাহা কিছুটা হলেও ঘটে” যদিও উল্লেখ্য এই ঈশ্বর, অবতার ও দেব দেবী অপ্রমাণিত কিংবা এককথায় কাল্পনিক। কিন্তু যেহেতু এই কাল্পনিক চরিত্রগুলো উপাসিত হয়, অন্ধ বিশ্বাসের উপাত্ত ও সর্বপরি কুসংস্কারের উদ্দিপক হয়ে বিদ্যমান; সেহেতু আমাদের বলারও ক্ষেত্র থেকেই যায়। রাধা কৃষ্ণের প্রেম, অবৈধ সম্পর্ক ও কৃষ্ণের লীলা সম্পর্কে প্রায়শই গুঞ্জন শোনা যায়। তখন একপক্ষ দাবি করেন কৃষ্ণ কামুক ও এই দুইজনের মধ্যে এক্সট্রা ম্যারিটাল এফেয়ার বা বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিলো – আরেকপক্ষের দাবি কৃষ্ণ ও রাধার মাঝে কোনোরূপ সম্পর্কই ছিলোনা কিংবা রাধা নামের কোনো চরিত্রেরই অস্তিত্ব নেই। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই বিতর্কসমূহের পক্ষে ও বিপক্ষে জোড়ালো কোনো প্রমাণাদি থাকেনা, ফলশ্রুতিতে আলোচনা সমালোচনা বা তর্ক বিতর্কেরও অবসান হয়না। এই আলোচনা, সকল তর্ক বিতর্ককে একটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে কিছুটা হলেও নিতে সহায়ক হিসেবে, হিন্দু ধর্মে রাধার অস্তিত্ব ও কৃষ্ণের লীলা সেইসাথে রাধা এবং বাকি গোপীদের প্রতি শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান বা তাঁদের দুজনের মধ্যে এক্সট্রা ম্যারিটাল এ্যাফেয়ার ছিলো কিনা এই সম্বন্ধে একটি প্রমাণসাপেক্ষ প্রেক্ষাপট তৈরিতে অবদান রাখবে।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ :

হিন্দুধর্ম তথা হিন্দুদের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের একটি অন্যতম সংস্কৃত ধর্মগ্রন্থ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ। যেখানে শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার জীবনকেন্দ্রীক পৌরাণিক উপাখ্যান এবং নাটকীয় ঘটনার বর্ণনাসমূহ সাবলীল উঠে এসেছে । এই পুরাণে শ্রীকৃষ্ণকে সর্বোচ্চ ঈশ্বর এবং গণেশ, শিব প্রমুখদের কৃষ্ণের অবতার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সেইসাথে শ্রীরাধার উপস্থিতি প্রকৃতির অবতার হিসেবে। এই গ্রন্থ মোট ৪ টি খণ্ডে লিপিবদ্ধ। খণ্ডসমূহ যথাক্রমে ;

ক. ব্রহ্মখণ্ড
খ. প্রকৃতিখণ্ড
গ. গণেশখণ্ড
ঘ. এবং শ্রীকৃষ্ণ জন্মখণ্ড।

ব্রহ্মখণ্ডে ; পরমব্রহ্ম হতে কিরূপে অপরামেয় বিশ্বখণ্ডের উৎপত্তি হল তা বর্ণিত হয়েছে। প্রকৃতিখণ্ডে বর্ণিত হয়েছে ; পরমা প্রকৃতির অনন্য শক্তিরূপে আবির্ভাব, পাতিব্রতা মাহাত্ম্য ও পাপাচারীর শাস্তি প্রসঙ্গ। গণেশখণ্ডে বর্ণিত হয়েছে ; বিঘ্ননাশক গণপতির জন্ম, তাঁর কাজ এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়বস্তুসমূহ। চতুর্থ ও সর্বশেষ শ্রীকৃষ্ণ জন্মখণ্ডে শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে। যেহেতু এই আলোচনার বিষয়বস্তু রাধা এবং গোপী কেন্দ্রীক শ্রীকৃষ্ণের অবস্থান সম্পর্কে, সেহেতু ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ থেকেই শুরু কর যাক।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে রাধা – কৃষ্ণ উপাখ্যান :

(১) বহু বর্ষ আগে এই রাধা উপাখ্যান।
শ্রীদুর্গারে কহিলেন শিব ভগবান।।

(২) যেভাবে পঞ্চানন কহেন দেবীরে।
সেইভাবে এই কাহিনী কহি তোমারে।।

(৩) শিব কহেন, প্রাণেশ্বরী শুন দিয়া মন।
শ্রীরাধার কথা আমি করিব বর্ণন।।

ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বৃন্দাবনের বর্ণনা ;

( ৪) গো- লোক মাঝারে আছে বৃন্দাবন।
অতি রমনীয় স্থান অতি সুশোভন।।

( ৫) শতশৃঙ্গ পর্ববততে ফোটে নানা ফুল
মালতি মল্লিকা বাসে পরাণ আকুল।।

শ্রীকৃষ্ণের উপস্থিতি ও কাম আশা ;

( ৬) ইচ্ছাময় জগন্নাথ কৃষ্ণ সনাতন।
রত্নময় সিংহাসনে বসিয়া তখন।।

( ৭) সহসা কামের ইচ্ছা জাগে মনে তাঁর।
রমণ করিতে মন চাহি আনিবার।।

( ৮) শ্রী কৃষ্ণের ইচ্ছামত সব কার্য্য হয়।
আপনারে দুই ভাগ করে ইচ্ছাময়।।

( ৯) দক্ষিণাঙ্গে কৃষ্ণ মূর্তি মদন মোহন।
বামেতে রাধিকা জন্মে অতি সুদর্শন।।

শ্রীরাধার রূপ বর্ণনা ;

(১০) কোটি চন্দ্র সম মুখ অতি মনোহর।
তপ্ত কাঞ্চনের সম দীপ্ত কলেবর।।

( ১১) নানা রত্নে বিভূষিতা কি’বা শোভা পায়।
সুন্দর মালতী মালা শোভিছে মাথায়।।

( ১২) উন্নত বর্ত্তুল স্তন, নবীনা যুবতী।
হেরিয়া শ্রীকৃষ্ণ হন কামাতুর অতি।।

স্বামীকে ভুলে যা করেছিলেন কামাতুর রাধা ;

( ১৩) পতিরে হেরিয়া দেবী কামাতুর অতি।
ধাবমান হইলেন শ্রী কৃষ্ণের প্রতি।।

তারপরো ভগবানের সাথে লীলায় রাধার সম্মান ;

(১৪) এ কারণ রাধা নাম হইল তাঁহার।
রাধা নামে খ্যাতা দেবী জগত – মাঝার।।

(১৫) শ্রীরাধা কৃষ্ণেরে সদা করে আরাধন।
রাধা আরাধনা করে কৃষ্ণ সনাতন।।

( ১৬) উভয়ে সমান তারা সাধুগণ কয়।
যেই কৃষ্ণ সেই রাধা সকল সময়।।

(১৭) ” রা” শব্দেতে মুক্তি পায় সকল ভক্তগণ।
” ধা ” শব্দেতে হরিপদে ছুটি যায় মন।।

(১৮) শ্রীরাধার লোমকূপে জন্মে গোপীগণ।
মহালক্ষী শ্রীরাধার বামভাগে হন।।

( ১৯) নারায়ণ প্রিয়তমা – মহালক্ষী সতী।
বৈকুন্ঠে তাঁহার বাস অতি পূণ্যবতী।।

( ২০) শ্রীকৃষ্ণের বক্ষে রাধা করে অবস্থান।
সকলের অধিষ্ঠাত্রী শ্রীহরির প্রাণ।।
[ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ষড়ত্রিংশ অধ্যায়, রাধা
উপাখ্যান, রাধা শব্দের বুৎপত্তি ]

যে কৃষ্ণ, অর্জুনকে বলেছিলেন কাম বর্জন করো ;

” ত্রিবিধম্ নরকস্য ইদম্ দ্বারম্ নাশনম্ আত্ননঃ।। কামক্রোধঃ ততঅ লোভঃ তস্মাৎ এতত্ ত্রয়ম্ ত্যাজেত ২১।। ”

অনুবাদ : অর্থ – কাম, ক্রোধ ও লোভ এই তিনটি নরকের দ্বারস্বরূপ। অতএব উত্তম ব্যক্তিরা এই তিনটি পরিত্যাগ করেন। কারণ এগুলি আত্মাকে অধঃগামী করে।
[ শ্রীমদ্ভাগবত গীতা, অধ্যায় ১৬, দৈবাসুরসম্পদ বিভাগ যোগ, শ্লোক ২১।] আবার পরের শ্লোকেও এই সম্পর্কে কৃষ্ণ বলেছেন,

” এতৈঃ বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমদ্বারৈঃ ত্রিভিঃ নরঃ।। আচরিত আত্ননঃ শ্রেয় ততঃ জাতি পরাম্ গতিম্।।”

অনুবাদ : হে কৌন্তেয়, এই তিন প্রকার তমদ্বার থেকে মুক্ত হইয়া মানুষ আত্নার শ্রেয় আচরণ করিবে, তাহলেই পরাগতি লাভ করিতে পারিবে।
[শ্রীমদ্ভাগবত গীতা, অধ্যায় ১৬, দৈবাসুরসম্পদ বিভাগ যোগ, শ্লোক ২২।]

” যঃ শাস্ত্রবিধিম্ উৎসৃজ্য বর্ততে কামকারত।।
ন সঃ সিদ্ধিম্ অবাপেনাতি ন সুখেন ন পরাম গতিম্।। ২৩।। ”

অনুবাদ : শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করে যে কামাচারে বর্তমান থাকে, সে সিদ্ধি বা সুখ বা পরা গতি লাভ করিতে পারেনা।
[শ্রীমদ্ভাগবত গীতা, অধ্যায় ১৬, দৈবাসুরসম্পদ বিভাগ যোগ, শ্লোক – ২৩।]

সেই কৃষ্ণেরই ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে অন্যের স্ত্রী
রাধাতে তৃপ্তি মেটেনি, প্রয়োজন হয়েছে আরো নারীর :

১। একদিন শৃতশৃঙ্গ পর্বত – মাঝার।
বিরজা সহিত কৃষ্ণ করেন বিহার।।

পর্বত শৃঙ্গে যে গোপীর সাথে কৃষ্ণ কামে মত্ত
হলেন সেই গোপীর রূপ, দুজনকার অফুরন্ত কামকার্য প্রভৃতি :

২। রাধিকা সমান গোপি ছিলো রূপবতী।
তাই কৃষ্ণ কামাতুর হন তার প্রতি।।

৩। রতন নির্মিত সেই রাসের মণ্ডল।
চতুর্দিকে রত্ন দ্বীপ জ্বলিছে উজ্জল।।

৪। চন্দন চর্চিত ছিলো শরীর দোঁহার।
মহাসুখে নানাভাবে করেন বিহার।।

৫। অবিশ্রাম দুইজনে করেন রমণ।
বহুকাল গেলো তবে তৃপ্ত নহে মন।।

কৃষ্ণ কর্তৃক আরো নারীর সাথে এই কামকার্য সম্বন্ধে অবগত হয়ে সেই পর্বত শৃঙ্গে থাকা বাকি গোপীরা শ্রীরাধাকে বিষয়টি জানালেন ;

৬। বিদিত হইয়া তাহা গোপি চারিজন।
রাধিকারে গিয়া সব করে নিবেদন।।

ফলে পূর্বে কৃষ্ণের সাথে কামকার্যে
লিপ্ত হওয়া ( সেই অন্যের স্ত্রী) রাধার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ;

৭। শুনিয়া দূতীর মুখে সমস্ত বিষয়।
শ্রীরাধিকা হইলেন ক্রুব্ধ অতিশয়।।

৮। মহাক্রোধে শ্রীরাধার কাঁপে কলেবর।
ভূষণ ছাড়িয়া দূরে ফেলিল সত্ত্বর।।

৯। বস্ত্রের অঞ্চল দিয়া মুছিলা সিন্দুর।
গাত্রের বসন সব করিলেন দূর।।

১০৷ জল দিয়া অলক্রাদি করে প্রক্ষালন।
ক্রোধেতে কবরি খুলি ফেলিলে তখন।।

১১। মহাক্ষোধে কাঁদে তাঁর অষ্ঠ ও অধর।
সমস্ত সখিরে কাছে ডাকিলে সত্ত্বর।।

১২। এককোটি তিনলক্ষ লইয়া গোপিকা।
দ্রুতগামী রথে চড়ি চলিলেন রাধিকা।।

শ্রীরাধার এই ক্ষোভ ও মানসিকভাবে
ভেঙে পরার সংবাদ শ্রীকৃষ্ণ পান, অতঃপর ;

১৩। জানিতে পারিয়া তাহা সুদাম সত্ত্বর।
করিলেন সে সংবাদ শ্রীকৃষ্ণগোচর।

১৪। রাধাভয়ে শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্হিত হয়।
বিরজা ( রাধা ব্যতিরেকে যে গোপীর সাথে শ্রীকৃষ্ণ এতদিন কামে মত্ত ছিলেন) পরানত্যাগ করে সে সময়।।
[ ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, সপ্তত্রিংশ অধ্যায়, শ্রীকৃষ্ণের সহিত বিরজার বিহার, রাধার ক্রোধ, বিরজা নদীর প্রাপ্তি]

এর মাধ্যমে এই অনুমেয় যে অন্যের স্ত্রী রাধার সাথেই শুধু নয়, গোপীদের সাথেও শ্রীকৃষ্ণ কামে লিপ্ত হয়েছিলেন। যার প্রমাণ শ্রীরাধার সখী বিরজার মাধ্যমে আমরা পাই। এই আলোচনায় এও প্রতীয়মান হয়, শুধুমাত্র কৃষ্ণও অন্যের স্ত্রীর প্রতি কামকাতর ছিলেন না। অন্যের স্ত্রীগণও শ্রীকৃষ্ণের প্রতি কামকাতর ছিলেন।

( চলবে)

সহায়ক গ্রন্থ :

১৷ শ্রীমদ্ভাগবত গীতা,
অধ্যায় ১৬, দৈবাসুরসম্পদ বিভাগ যোগ।
২। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ।
৩। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে ; প্রকৃতিখণ্ড।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

84 − = 75