বলতে না পারার বেদনা; জুম পাহাড়‌ের বাস্তবতা ।

লিখতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে কলম। মুখ খুলল‌ে মুখ বন্ধ কর‌ে দিচ্ছ‌ে। সারাটাদ‌িন জট পাকিয়ে যাচ্ছে ভাবনা-চিন্তায়। স‌েই শিশুকাল থ‌েকে ভয় এবং অাতঙ্ক‌ের মাঝে বেড়‌ে ওঠা। যারফল‌ে প্রত‌িবাদ শব্দটা অামাদ‌ের ন‌িত্য দ‌িনের সঙ্গী।তাই আমার উপর ক‌োনো অন্যায়, অব‌িচার হল‌ে ন‌ি:সন্দ‌েহে, ভয়হীন হয়‌ে প্রত‌িবাদ কর‌ি ।

প্রত‌িবাদই যখন আমাদ‌ের জীবন‌ের সঙ্গী তখন না লিখতে, ন‌া বলত‌ে পারার বেদনা মনকে পীড়িত করে বহু বহু। এই পীড়ন মস্তিষ্কেও ঘর বাঁধে। ঝাপসা হয়ে আসে সবক‌িছু। ভাবত‌ে হয় ক‌োন দ‌েশে আছ‌ি। ক‌েন আমার অধ‌িকারক‌ে অধ‌িকার বলত‌ে পার‌িনা?ক‌েন বারবার আমার আত্মপর‌িচয়‌ের উপর আঘাত দ‌েয়? সবম‌িলিয়‌ে বলত‌ে না পারার ব‌েদনা , ল‌িখত‌ে না পারার ব‌েদনা ন‌িপীড়‌িত পাহ‌াড়ীরা সহ্য কর‌ে নিচ্ছ‌ে।

চারপাশে যে ধরনের আলামত প্রত্যক্ষ করছি তাতে করে সঞ্চারিত হয় ভয় ও ভীতি। সত্য বলতে গেলেও ভয়, লিখতে গেলেও ভয়, বলত‌ে গেল‌েও ভয়।এ যেন একটা অস্বাভাব‌িক পর‌িবেশ ।দ‌েশের একটা অস্বস্তি আর ভীতিকর অবস্থা চলছ‌ে ।শাসকগ‌োষ্টীর ক্ষমতার অপব্যাবহার‌ে দ‌েশের বাকস্বাধীনতা ন‌েই বল‌ে চল‌ে । সময় নাকি চলে যায়, সময় কিন্তু আবার ফিরেও আসে। পারিপার্শ্বিক অবস্থা দেখে তেমনটাই প্রতীয়মান হচ্ছে। স্বস্তিহীনতার সাথে সাথে সম্ভ্রমহীন সময়ের ভিতর যেন একটু একটু করে ঢুকে যাচ্ছি। কিছু অবশিষ্ট থাকছে না আর। ক‌েননা আম‌ি একজন নিপীড়‌িত জাত‌ির সন্তান, ন‌ির্যাত‌িত জাত‌ির সন্তান। আমার পাহাড়ে শাসকগ‌োষ্টীরা আদ‌িবাসীদ‌ের উপর অন্যায় ,অব‌িচার চালায়।দাঙ্গা, হাঙ্গামা ,ভিটা বাড়‌ি ভশ্ম কর‌ে দিয়ে দেশান্তর‌িত কর‌ে। ন‌িরীহ মানুষদ‌ের হত্যা কর‌া হচ্ছ‌ে এবং পাহাড়ী নারী ধর্ষ‌িত হচ্ছ‌ে । অথচ, পাহ‌াড় য‌েই পর‌িবেশে রয়‌েছে তা বুঝা যায় না। বাইর‌ে থেক‌ে রং ব‌েরং, পর্যটন‌ে ভরা স‌েই পাহাড় ক‌িন্তু ভ‌িতর‌ে আসল‌ে পাহাড়ীদ‌ের রক্ত‌ে রঞ্জ‌িত । ঔই য‌ে বললাম ল‌িখত‌ে না পারার ব‌েদনা, বলত‌ে না পারার ব‌েদনা। ক‌েননা প্রত‌িবাদ তথা বলত‌ে বা ল‌িখত‌ে গ‌েলে স‌েনা শাসকগ‌োষ্টীর কর্তৃক গুম, হত্যা শ‌িকার হওয়ার পাশাপাশ‌ি পুর‌ো পর‌িবার‌ের উপর কাল‌োছায়া ন‌েমে আছ‌ে।জুম পাহাড়‌ের জুম্মদের জন্য এটা বড় দুঃসময় । ড‌িজিটাল ম‌িডিয়াত‌ে কি লিখবো আর কি লিখবো না, দ্বনদ্বটা সেখানে নয়। মোটকথা লিখতেই মন চাইছে না। চারপাশে লেখার অন্তহীন বিষয়।। এই তো আমার পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ে পাহাড়ীদ‌ের উপর স‌েনা,স‌েটেলার বাঙালী কর্তৃক কতগুল‌ো গণহত্যা সংগঠ‌িত হয়‌েছে। ব‌িচার প‌েয়েছ‌ি কি? পাহাড়‌ে আজও আগ্রাসন চলছ‌ে । উন্নয়ন‌ের নাম‌ে পাহাড়ীদ‌ের উচ্ছ‌েদ কর‌ে দেশহীন কর‌ে দেয়া হচ্ছ‌ে । লংগদু, তাইনদং, বাঘাইহাট পুড়ে ছাই হলো। মরণযন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কত পাহাড়ী।কার উপর কখন ক‌ি হয় বল‌া যায় না।স‌েনা শ‌াসকগ‌ো‌েষ্টীর রাইফ‌েলের ব্যারল‌ের মাথ‌ায় প্রত‌িটি পাহাড়ীর প্রাণ।ইচ্ছ‌ে হল‌ে যেক‌োনো সময় ক‌েড়ে ন‌িতে পার‌ে। দ‌েশের তাদ‌ের থামান‌োর ক‌েউ নেই। অসাম্প্রদায়‌িকের বুল‌ি আউর‌িয়ে দ‌েশের সংখ্যালঘুদের ন‌ি:চিন্হ করার ষড়যন্ত্র চলছ‌ে মাত্র ।

এখন আমাদের বোধ জাগ্রত হচ্ছ‌ে। এই রাষ্ট্র আমাদ‌ের সাথ‌ে প্রতারনা কর‌ে‌ছে।জুম পাহাড়‌ের সাথ‌ে প্রতারনা কর‌েছে।পার্বত্য চুক্ত‌ি অবাস্তবায়‌িত র‌েখে প্রতারণা করছ‌ে।

আমার স্বজাত‌ির মা ব‌োনদের ধর্ষণ করছ‌ে ,আমাক‌ে আমার বাপ দাদার চ‌ৌদ্দ পুরুষ‌ের ভুমি থ‌েকে উচ্ছ‌েদ করছ‌ে । কিন্তু তা প্রত‌িকার‌ের জন্য ব‌িচার চাইব‌ো কার কাছ‌ে ? রাষ্ট্রের কাছ‌ে? পাব‌ো না। কারন এই
রাষ্ট্রের ব‌িচার ব‌িভাগ অস‌াম্প্রদায়‌িক নয়। এই রাষ্ট্রের ব‌িচার ব‌িভাগ ন‌িরপ‌েক্ষ নয়। ন‌িরপ‌েক্ষ ক‌েউ বিচার ব‌িভাগ চালায় না। বাংলাদ‌েশের ত‌িন হাজার‌ের অধ‌িক আইন রয়‌েছে । ক‌িন্তু এই আইন আমার মত সংখ্যালঘুদ‌ের জন্য ন‌া ।এই আইন আমার পক্ষ হয়‌ে দাড়ায় ন‌া। আম‌ি আইন ন‌িয়ে পড়াশুনা কর‌েছি । ভাবত‌েই লজ্জা লাগ‌ে এই দ‌েশে আইন‌ের ক‌োন‌ো ভ্যালু ন‌েই। এমন‌ি আমাদ‌ের জন্য ন্যায় বিচার হয়না। য‌েটা হয় স‌েটা হচ্ছ‌ে টাকা, ক‌িংবা ক্ষমতার ব‌িনিময়‌ে।

বলত‌ে পার‌েন এই অন্যায় এবং অশোভন খবরটি দেশের যেকোনো বিবেকসম্পন্ন নাগরিককে বিচলিত করা স্বাভাবিক। সরকার , সেনা‌ ,আমলা য‌ে হিংসাত্মক আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছ‌ে পাহাড়ীদ‌ের উপর সেটা কজন বা জান‌ে সমতল‌ের বৃহৎ জনগ‌োষ্টীরা। আম‌ি আমার আত্মপর‌িচয়‌ের অধ‌িকার পাবার জন্য যখন রাজপথ‌ে নাম‌ি তখন বন্দুক‌ের নল তাক কর‌ে বলা হয় খামোশ! তুই দ‌েশব‌িরোধী।

ভিন্নমতে এতটা অসহিষ্ণু হলেতো মুশকিল।দ‌েশটা আর অসাম্প্রদায়িক থাক‌ে না। একদিকে বলা হচ্ছে অবাধ অসাম্প্রদায়‌িকের পক্ষে, অন্যদিকে সংখ্যালঘু আদ‌িবাসীদ‌ের গল‌া চ‌েপে রাখ‌া হচ্ছ‌ে।জুম পাহাড়‌ের সাথ‌ে এই যে রাষ্ট্রের আচরণের বৈশ‌িষ্ট্য তা দ‌েশের জন্য য‌েমন সুখবরও নয়,সমগ্র দেশ ও জনগণের জন্যও স্বস্তিপ্রদও নয়। আজক‌ে আমার পার্বত্য চট্টগ্রাম ন‌ি‌য়ে প্রধ‌ানমন্ত্রী থ‌েকে শুরু কর‌ে আমলা, স‌েনা বাহ‌িনী শান্ত‌ির কথা বল‌েন ,উন্নয়ন‌ের কথা বল‌েন । মুখে গণতন্ত্র আর আচরণে স্বৈরতন্ত্র কেবল পাহাড়‌ে কেন, দেশের জন্যও বয়ে আনে অমঙ্গল। চারপাশে যখন এমন দৃশ্য অবলোকন করি তখন বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। থেমে থাকে কলম।বন্ধ থাক‌ে মুখ। এই যে‌ থ‌েমে যাওয়া, বন্ধ হয়‌ে যাওয়া আমার ন‌িজের ইচ্ছায় নয় আমাক‌ে শাসকগ‌োষ্টী, স‌েনা আমলাড়া থাম‌িয়ে দেয় ,বন্ধ কর‌ে দেয়।

লেখার ইচ্ছাহল‌ে হল‌ে কিসের যেন বেদনা অনুভব করি।ড‌িজিটাল আইন‌ের ভয় অনুভুত হয়। ক‌েননা অধ‌িকারহীন মানুষদ‌ের মুখ বন্ধ করার জন্য সরকার ড‌িজিটাল আইন চালু কর‌েছে। অর্থাৎ, ধরা যাব‌েনা,ছোঁয়া যাব‌েনা এমন‌কি বলাও যাব‌েনা এই বাস্তবতা ক‌রে র‌েখেছে।

তাই লেখার বিষয় বিবেচনায় বিভ্রাটে পড়তে হয়। লিখতে গেলে তো বিষয় হিসেবে এসবই চলে আসে। তাই লেখালেখিতে মন সায় দেয় না মাঝ‌ে মাঝে।আমার অধ‌িকার ন‌িয়ে ল‌িখল‌ে,বলল‌েও দুশমন বাড়ে। রাষ্ট্রীয় বাহ‌িনী কর্তৃক গ‌ুমের শ‌িকার হত‌ে হয়। প্রতিবাদ করলেও কণ্ঠ ক্ষীণ হয়‌ে যায়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ে পাহাড়ীদ‌ের এমন অবস্থায় এসে ঠেকেছে ‘ভাসুরের নাম মুখে আনতেই যেন বারণ’। আম‌ার অধ‌িকার ন‌িয়ে আম‌ি প্রত‌িবাদ করত‌ে পার‌িনা। করল‌ে আম‌ি দেশব‌িরোধী, সন্ত্রাসী উপাধ‌ি পায়।

তাই মনঃপীড়ায় আর অপমানে লেখালেখির পাঠ চুকিয়ে ফেলত‌ে হচ্ছ‌ে অন‌েকেই। বলতে গেলে আমার অধ‌িকার ন‌িয়ে যখন সরকার‌ের সমাল‌োচনা করি তখন‌ি অসত্য মামলায় জড়িয়ে রিমান্ডের নামে শারীরিক নির্যাতন করা হয়। এমন অন্যায়ের বিপক্ষে শক্ত কোনো প্রতিবাদ-প্রতিরোধ গড়‌ে ওঠে না, তাই ভয়ে আতঙ্কে তখন লেখার ইচ্ছাটাই উড়ে যায়।অথচ পাহাড়‌ে আগুন লাগে, লংগদু,তাইনদং পুড়‌ে যায় এসব ক‌ি তা দেশবাসী উপলব্ধি করতে পারে ?

এই উপলব্দ‌ি না পারার কারণেই সমতল‌ের বন্ধুদ‌ের এমন ধারণা য‌ে আমাদ‌ের নাক‌ি সুখ‌ে থাকত‌েই ভুত‌ে কিলাচ্ছ‌ে।
অন্যায়-অবিচারেয় যখন দেয়াল‌ের প‌িঠ ঠ‌েকে গ‌ে‌ছে।তাই লিখতে গেলে তো কর্কশ বাক্য দ‌িয়ে শুরু করত‌ে হয়।
তারপরও হয়ত‌ো বলা যায় লিখলে কি অন্যায়ের আগুন থামবে? না,পাহাড়ীদ‌ের উপর অন্যায়, অবিচার র‌োধ করা যাব‌ে । যদি তা দ‌িয়ে করা সম্ভব না হয় তবে লেখে কী লাভ!
বন্ধ কর‌ে দিন কলম‌ের যুদ্ধ। তব‌ে শাসকগ‌ো‌ষ্টীর মন‌ে রাখ‌া উচিত কলম‌ের ব‌িকল্প য‌ে অস্ত্রটা আছ‌ে সেটা ক‌োনো বাধা মান‌ে না।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 3 = 4