করোনা জিহাদ বনাম মুসলিম বিদ্বেষ

ভারতের রাজধানী দিল্লিতে তাবলীগ জামাতের সদর দফতরে হাজার হাজার লোকের সমাবেশ থেকে অসংখ্য মানুষের ভেতর করোনাভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কা দেখা দেওয়ার পর গোটা বিষয়টি নিয়ে তীব্র সাম্প্রদায়িক বিতর্ক শুরু হয়েছে [১]। বিবিসি নিউজের এই খবরটা একটু আলোচনার দাবি রাখে। মরকজ নিজামুদ্দিন’ নামে পরিচিত একটি মসজিদে একটি ধর্মীয় সমাবেশ উপলক্ষে মার্চ মাসের মাঝামাঝি অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার তাবলীগ সদস্য সমবেত হয়েছিলেন। শহরের একটি অত্যন্ত ঘিঞ্জি এলাকায় একটি ছ’তলা ভবনের ডর্মিটরিতে তারা সবাই গাদাগাদি করে ছিলেন। এদিকে তাবলীগ জামাত কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে আত্মপক্ষ সমর্থন করে দাবি করেছে, প্রথমে দিল্লি সরকার এবং পরে প্রধানমন্ত্রী মোদী লকডাউন ঘোষণা করার পরই সারা দেশে ট্রেন ও বাস চলাচল আচমকা বন্ধ হয়ে যায় – এবং সে কারণেই তাদের সদস্যরা আটকা পড়েন এবং এক জায়গায় ঠাসাঠাসি করে থাকতে বাধ্য হন! দিল্লি সরকার অবশ্য বলছে, লকডাউন ঘোষণার অনেক আগেই তারা সব ধরনের ধর্মীয় বা সামাজিক সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তার পরও তাবলীগ জামাত এই সমাবেশ আয়োজন করে ‘গর্হিত অপরাধ’ করেছে [২]। আমি ব্যাক্তিগত ভাবে যে কোনও ধরণের সাম্প্রদায়িকতা ও জাতিবিদ্বেষের বিরোধী। কিন্ত একটা সম্প্রদায় যখন ক্রমাগত অপরাধ করে, অন্য সম্প্রদায়কে ঘৃণা করে তখন সেই সম্প্রদায়ের প্রতি অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষের বিদ্বেষ সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। আমি ভারতের এই দুর্দশার জন্য শুধু তাবলীগ জামাতকে নয় বরং ইসলামকেও দায়ী করবো। এখন আপনি বলতে পারেন, গুটিকয়েক মুসলিমের জন্য ইসলামকে দায়ী করছেন কেন? এর উত্তরে আমি বলবো, কোনও মুসলিম যদি চুরি করে তাহলে আমি কখনোই ইসলামকে দায়ী করবো না। কারণ ইসলামে চুরি করা নিষেধ। কোরানে আছে [৩]-“যে পুরুষ চুরি করে এবং যে নারী চুরি করে তাদের হাত কেটে দাও তাদের কৃতকর্মের সাজা হিসেবে। আল্লাহর পক্ষ থেকে হুশিয়ারী। আল্লাহ পরাক্রান্ত, জ্ঞানময়।”(৫:৩৮) কিন্তু কোনও মুসলিম যদি চাপাতি দিয়ে কোনও ব্লগারকে কোপায় তাহলে তার জন্য অবশ্যই ইসলাম দায়ী। কারণ হযরত মুহম্মদ তার সমালোচনাকারিদের হত্যা করতে বলেছেন [৪]। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভারতে এই করোনার সময় সরকারি নিষেধ উপেক্ষা করে তাবলীগ জামাতের সমাবেশের পিছনে কি ইসলাম দায়ী? উত্তর হচ্ছে হ্যাঁ। কেন ও কিভাবে সেটা নিয়েই এখানে আমি আলোচনা করবো।

ইসলাম অনুসারে রোগ-শোক ও অসুখ-বিসুখ আল্লাহর হচ্ছে আল্লাহর নেয়ামত। হাদিসে আছে [৫]-

উবায়দুল্লাহ ইবনু উমর আল কাওয়ারীরী (রহঃ) … জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন উম্মু সায়িব কিংবা উম্মূল মূসায়্যিব (রাঃ) এর কাছে গিয়ে বললেন, তোমার কি হয়েছে হে উম্মু সায়িব অথবা উযুল মুসায়্যিব! কাঁপছ কেন? তিনি বললেন, ভীষণ জ্বর, একে আল্লাহ বরকত না দিন। তখন তিনি বললেনঃ তুমি জ্বরকে গালি দিয়ো না। জ্বর আদম সন্তানের গোনাহসমূহ মোচন করে দেয়, যেভাবে হাঁপর লোহার মরিচা দূর করে দেয়। (সহীহ মুসলিম, ৬৩৩৬।, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

হযরত মুহম্মদ বলেছেন, রোগ-শোক এর মাধ্যমে আল্লাহ মুসলমানদের গোনাহ ক্ষমা করেন। হাদিসে আছে [৬]-

আবূ সাঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘মুসলিমকে যে কোনো ক্লান্তি, অসুখ, চিন্তা, শোক এমন কি (তার পায়ে) কাঁটাও লাগে, আল্লাহ তা‘আলা এর মাধ্যমে তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন।’’ (সহীহুল বুখারী ৫৬৪২, মুসলিম ২৫৭৩, তিরমিযী ৯৬৬, আহমাদ ৭৯৬৯, ৮২১৯, ৮৯৬৬, ১০৬২৪)

ইসলাম সংক্রামক রোগের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। ইসলাম মতে, সংক্রামক রোগ বলতে কিছু নেই। হাদিসে আছে [৭]-

মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (রোগের মধ্যে) কোন সংক্রমণ নেই এবং শুভ-অশুভ নেই আর আমার নিকট ‘ফাল’ পছন্দনীয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেনঃ ‘ফাল’ কী? তিনি বললেনঃ উত্তম কথা। (সহীহ বুখারী, ৫৩৬১, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

হাদিসে আরও আছে [৮]-

আবূল ইয়ামান (রহঃ) … আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ (রোগে) কোন সংক্রমণ নেই। আবূ সালামা ইবনু আবদুর রহমান বলেন আমি আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে শুনেছি, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ রোগাক্রান্ত উট সুস্থ উটের মধ্যে মিশাবে না। যুহরী সুত্রে আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ (রোগে) সংক্রমণ নেই। তখন এক বেদুঈন দাঁড়িয়ে বলল এ ব্যাপারে অপনার কি মত যে, হরিণের ন্যায় সুস্থ উট প্রান্তরে থাকে। পরে কোন চর্মরোগগ্রস্ত উট এদের সাথে মিশে সবগুলোকে চর্মরোগে আক্রান্ত করে। তখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তা যদি হয় তবে প্রথমটিকে কে রোগাক্রান্ত করেছিল? (সহীহ বুখারী, ৫৩৬০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন)

হাদিসে আরও আছে [৯]-

আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সংক্রামক রোগ বলতে কিছু নেই। কুলক্ষণ বলতে কিছু নেই সফর মাসকেও অশুভ মনে করা যাবে না এবং পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত রয়েছে তাও অবান্তর। তখন এক বেদুঈন বললো, হে আল্লাহর রাসূল! আমার উটের পাল অনেক সময় মরুভূমির চারণ ভূমিতে থাকে, মনে হয় যেন নাদুস-নুদুস জংলী হরিণ। অতঃপর সেখানে কোনো একটি চর্মরোগে আক্রান্ত উট এসে আমার সুস্থ উটগুলোর সাথে থেকে এদেরকেও চর্মরোগী বানিয়ে দেয়। তিনি বললেনঃ প্রথম উটটির রোগ সৃষ্টি করলো কে?
মা‘মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) বলেছেন, অতঃপর এক ব্যক্তি আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেনঃ রোগাক্রান্ত উটকে যেন সুস্থ উটের সাথে একত্রে পানি পানের জায়গায় না আনা হয়।’’ আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)-এর এ হাদীস শুনে এক ব্যক্তি বললো, আপনি কি এ হাদীস বর্ণনা করেননি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ সংক্রামক ব্যাধি বলতে কিছু নেই, সফর মাসকে অশুভ মনে করবে না এবং পেঁচা সম্পর্কে যেসব কথা প্রচলিত আছে তা অবান্তর?’’
তখন আবূ হুরাইরাহ বলেন, না, আমি তোমাদের নিকট এরূপ হাদীস বলিনি। যুহরী বলেন, আবূ সালামাহ (রাঃ) বলেছেন, তিনি অবশ্যই এ হাদীস বর্ণনা করেছেন, তবে আমি আবূ হুরাইরাহকে এ হাদীস ছাড়া কখনো কোনো হাদীস ভুলে যেতে শুনিনি। (সুনান আবূ দাউদ, ৩৯১১, আল্লামা আলবানী একাডেমী)

ইসলামে যেহেতু সংক্রামক রোগের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাই তাবলীগ জামাতের সদস্যরা ভেবেছিলো তাদের একজন থেকে আরেকজনে করোনা ছড়াবে না। যেহেতু তারা ধর্মান্ধ তাই তারা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতো হায়াত মউত আল্লাহর হাতে, আল্লাহই তাদের রক্ষা করবেন। একারণেই তারা সরকারি নিষেধ উপেক্ষা করে বিশাল জনসমাবেশ ঘটিয়েছিল।

বাংলাদেশে অনেক ইসলামী বক্তা ওয়াজ মাহফিলে দাবি করেন, মুসলিমদের করোনা হবে না, করোনা নাকি অমুসলিমদের ওপর আল্লাহর গজব। [১০]

তাবলীগ জামাতের সদস্যরা করোনা ছড়িয়েছে মূলত তাদের অজ্ঞতা ও ধর্মান্ধতার কারণে। কিন্তু ভারতের কিছু হিন্দুত্ববাদী দাবি করছে, মুসলিমরা নাকি করোনা জিহাদ করছে, তারা নাকি খাবার-দাবারে থুতু ছিটাচ্ছে যাতে অমুসলিমরা করোনায় আক্রান্ত হয়। কিন্ত তাদের এই দাবিগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিদ্বেষ প্রসূত [১১]। এধরনের জাতিবিদ্বেষমূলক প্রোপাগান্ডার বিরুদ্ধে আমাদের অবশ্যই রুখে দাঁড়াতে হবে।

আমাদেরকে অবশ্যই ইসলামের যৌক্তিক সমালোচনা করতে হবে। কিন্তু ভারতের সাধারণ মুসলিমরা যেন মুসলিম বিদ্বেষের শিকার না হয় সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।

রেফারেন্সঃ

[১] https://www.bbc.com/bengali/news-52120852

[২] https://www.bbc.com/bengali/news-52105607

[৩] https://quran.com/5/38?translations=20,24

[৪] https://wikiislam.net/wiki/List_of_Killings_Ordered_or_Supported_by_Muhammad#List_of_Killings

[৫] https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=18659

[৬] https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=22341

[৭] https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=6005

[৮] https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=6004

[৯] https://www.hadithbd.com/hadith/link/?id=61279

[১০] https://www.youtube.com/watch?v=6At2sLrkafM

[১১] https://www.theguardian.com/world/2020/apr/13/coronavirus-conspiracy-theories-targeting-muslims-spread-in-india

পার্থ দাশ

০২/০৬/২০

ঢাকা, বাংলাদেশ

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

6 + 3 =