আমার জীবন পথের গল্পমালা : বাহরাইনের প্রিন্সেস নায়লা ও হাওয়ার দ্বীপ

পারস্য উপসাগরে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ হঠাৎ ডুবে যায়। যোজনব্যাপী নীল জলরাশির মাঝে এক ঘোর অন্ধকারের মধ্যে ফেনিল জল কেটে-কেটে ঘন্টায় ২০০- নটিক্যাল মাই্ল গতিতে, অত্যাধুনিক এ “জলকপোত”টি এগুতে থাকে স্বয়ংক্রিয় রাডার স্ক্রিন দেখে। বাইরাইনের নিরাপদ দুরত্বের “হাওয়ার” দ্বীপে সেট করা হয়েছে এর প্রোগাম। তাই প্রচন্ড গতিতে ফ্রান্স নির্মিত এ জলযানটি ঘুটঘুটে অন্ধকারের মাঝে ছুটে চলে “হাওয়ার” দ্বীপের দিকেই। এর চালক একুশ বছরের এক আরব নারী নাম ‘নায়লা ফাওয়াদ’। তার পাশেই জীবন অস্তিত্বের সুরভিভরা ম্লানতা ছড়িয়ে বাংলাদেশের কুড়ি বছরের এ জীবন গল্পের লেখক।
:
ভোর ৩-টার দিকে জনমানবহীন ‘হাওয়ার’ দ্বীপে থামে বোট। একটুও সময় নষ্ট না করে আমাকে নামতে বলে দ্বীপে নায়লা। বিষাক্ত মৃত্যুসিক্ত এ জলপথে কিভাবে নামবো আমি? রক্তাভ অশ্রু নামে আমার দুচোখে। দুখের বিষাক্ত বাতাসে ‘নায়লা’কে বলি – “কিভাবে ফিরে যাবে তুমি একাকি ঐ আবাসে”? অচল আর নিশ্চল নীলিমা-খচিত জলধিমাঝে নায়লা হাত ধরে আমার। মায়ালোকের মৃত মানুষের মত নিরেট অন্ধকার হাতড়িয়ে বলে – “যেতেই হবে আমার মৃত্যু হলেও”! আর মুখ ঘুরিয়ে স্বয়ংচালিত রাডারে হাত রেখে সেট করে ‘আল-সাফরিয়াহ প্রাসাদ’। অন্ধকার এ দ্বীপের অদেখা আলোয় শেষ চুম্বন করে সে আমার ঠোঁটে। তারপর চিৎকার করে বলে, ‘হাররাক’। আমি বুঝি এখনই নামতে হবে আমায়। মরু রাত্রির করুণ স্তব্ধতায় ইস্পাতের মত ঘনান্ধকার মাটিতে পা রাখি আমি। রিমোটে হাত রেখে নায়লা বোট ঘুরিয়ে দেয় দক্ষ ক্যাপ্টেনের মত, আর শেষ বাক্য বলে আমায়
– ‘আ্লবিদা ইয়া হাবিবি’।
বুকের অনন্ত সমুদ্রে হাতুড়ি পেটাতে থাকে নায়লার ‘আ্লবিদা ইয়া হাবিবি’ ধ্বনি। নায়লার বোট অন্ধকারে হারিয়ে যায় প্রচন্ড গতিময়তা নিয়ে বাইরাইনের ‘আল-সাফরিয়াহ’ প্রাসাদের দিকে ।
:
এবার অন্ধকারের মাঝেও অনুভব করি আমি পারস্য উপসাগর মাঝে এটা একটা বালির চর। কোন মানুষ কিংবা গাছপালার কোন ছায়াও দেখা যাচ্ছেনা এ দ্বীপে। সাথে জিনিসপত্র কিছুই নেই আমার কেবল পরণের জামা-কাপড় ছাড়া। আর বোটে একফাঁকে নায়লা প্যান্টের পকেটে ভরে দিয়েছিল কিছু দিনার। কত দিনার তাও জানিনা আমি। জীবন বাঁচাতে সব এমন ‘কুইক’ করতে হয়েছে যে, কোন জিনিসপত্র, কাপড়চোপড়, এমনকি নিজের পাসপোর্টটা পর্যন্ত নিয়ে আসতে পারিনি আমি। ঘনান্ধকার এ রাতে নায়লা যদি এ বোটে ৬০০-কিমি দুরের হাওয়ার দ্বীপে এভাবে না রেখে যেতো আমায়, সম্ভবত সকালে আমার লাশ পরে থাকতো আল-সাফরিয়াহ সৈকতে। তাই নিজে কিভাবে ফিরে যাবো বাংলাদেশে? প্রাসাদে ফিরে যাওয়ার পর রাজকুমারি নায়লার কি হবে এখন? কিভাবে এলাম এখানে আমি? এসব চিন্তনে ডুবে যাই আমার জীবন পথের হিমশীতল বারান্দায়।
:
এক বছর আগের ঢাকার তরুণ আমি যখন!
*****************************************
ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তির আগে জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির ভূগোল বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম আমি। হলে সিট না পাওয়াতে কাকরাইলে এক আত্মীয়ের বাসায় থাকতাম। ভার্সিটি বাসের জন্যে অপেক্ষা করছিলাম কাকরাইল জনশক্তি অফিস সংলগ্ন মোড়ে একদিন। হঠাৎ অনেক মানুষের জটলা আর পুলিশ দেখে এগুলাম ভীড়ের মাঝে। ধাক্কাধাক্কিতে পুলিশ সবাইকে জোর করে বসিয়ে দিলো নিচে। আমিও বাধ্য হলাম বসতে পাকা ফ্লোরে। কিছুক্ষণের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশ আর বিদেশি ৪-উর্ধতন পুলিশ অফিসার এলেন আ্মাদের মাঝে। বসা যুবকদের ভেতর থেকে ২০-জনকে দাঁড়াতে বললো বিদেশিরা। আমাকেও দাঁড় করানো হলো ঐ ২০-জনের মধ্যে। ভেতরে নেয়া হলো ২০-জনকে। আমি ঔৎসুক্যে উপভোগ করছিলাম বিষয়টা। তাই নির্দেশমত কাজ করছিলাম দেখি শেষ পর্যন্ত কি হয়! অবশেষে নানাবিধ পরীক্ষার পর আমাকেসহ ১০-জনকে চূড়ান্ত বাছাই করলো “সোরতাত আল খাস আল বাহরাইনি” (স্পেশাল পুলিশ অব বাহরাইন) হিসেবে। দুপুর পর্যন্ত ঐ অফিসেই আমাদের ছবিসহ নানাবিধ কাজ করালো। পাসপোর্ট ফরম পুরণ করালো। গোনা ৭-দিনের মধ্যে আমার যেতে হবে “সোরতাত আল খাস আল বাহরাইন” এর সদস্য হিসেবে।
কাউকে জানালাম না বিষয়টা এমনকি মাকেও না। জানতাম মা কখনো যেতে দেবেনা আমায়। মিথ্যে বললাম মাকে – “একটা স্টাডি সফরে” ১-মাসের জন্যে বিদেশ যেতে হবে। টাকা পয়সা সব ভার্সিটি দেবে। সরল বিশ্বাসে মা যেতে দিলেন আমায় মহাখুশিতে।
:
বৃটিশ এয়ারে দোহা হয়ে কনকর্ডে নামলাম ‘মুহাররাক এয়ারপোর্টে’। শেখশাসিত দ্বীপদেশটিতে এসে জানলাম, বাইরাইনের জনসংখ্যার ৭০% শিয়া কিন্তু শাসক হচ্ছে সৌদিপন্থী সুন্নি। তাই পুলিশে কর্মরত বাইরাইনিদের বিশ্বাস করেনা রাজপরিবার। এ কারণে ২০-টি দেশের ২০০-নাগরিক নিয়ে “সোরতাত আল খাস আল বাহরাইনি” নামে রাজপরিবারকে রক্ষার একটা আলাদা বাহিনি গঠন করবে বাইরাইন সরকার। আমি তার একজন সদস্য হয়ে এসেছি এদেশে বাংলাদেশ থেকে। “বুসাইথিনে” ৬-মাসের প্যারেড, আর নানাবিধ অস্ত্র প্রশিক্ষণ হলো আমাদের, সাথে আরবি ভাষা শিক্ষা। ফ্রান্সে তৈরি “স্টারলিং” নামের এক স্বয়ংচালিত অস্ত্র প্রশি্ক্ষণ দেয়া হয় বিশেষভাবে। যাতে ১-সাথে ৪৮-টা গুলি বের হয় কিন্তু ওজন খুবই হালকা। “বুসাইথিন” প্রশিক্ষণ ব্যারাকে পরিচয় হয় পাকিস্তান আর্মির এক্স মেজর সামাদের সাথে। যিনি ৭১-এ ঢাকায় বাংলাদেশের বিরু্দ্ধে যুদ্ধ করেছিল এখন এখানের ট্রেনার। আমাকে ট্রেনিংকালে সে সবসময় ‘গাদ্দার বাঙালি’ বলতো হেসে-হেসে। আরবি আর উর্দু ভাল না বোঝার কারণে তার জবাব দিতে পারতাম না আমি তখন!
:
প্রশি্ক্ষণশেষে আমাকে ‘রফা’য় দেওয়ান আমিরিতে শাসক ‘শেখ ইসা বিন সালমান আল খলিফার’ বাড়িতে তার ‘গার্ড’ হিসেবে পাঠানো হয়। ছোটসাইজের এ ‘রাজা’ যখন তার রাজমুকট পরতেন ও তলোয়ার কোমরে ঝোলাতেন, তা হাস্যকরভাবে লেগে থাকতো মাটিতে। তবে খুবই অমায়িক ভদ্র ছিলেন এ শেখ। প্রায়ই ১ট বড় রাজকীয় প্লেটে আমাদের ৭-জন দেহরক্ষির সাথে খাবার খেতেন তিনি। বড় একটা থালায় ‘রুজ বুখারির’ (বুখারির রাইস) ওপরে একটা ‘দুম্বাভুনা’ রেখে তার চারদিকে রাজাসহ আমরা বসতাম সবাই। রাজা শুরু করার পর আমরাও এক থালা থেকেই খাবার খাই। খাবার শেষে তিনি আমাদের উপহার ও ধন্যবাদ দেন। কদিন পর আমাকে স্থায়ীভাবে পাঠানো হলো দক্ষিণ পশ্চিম বাহরাইনের সমুদ্র সৈকতে নির্মিত ‘আল-সাফরিয়াহ প্রাসাদে’। সমুদ্রতীরে খেজুরবাগান ঘেরা এ প্রাসাদে বসবাস করতো রাজা শেখ ইসার ছেলে শেখ খালিদ বিন ইসার অনেক স্ত্রীর একজন ‘নায়লা ফাওয়াদ’। দেশে ও বিদেশে পড়ালেখা করা এ নারী ছিলেন কুয়েতের রাজপরিবারের রাজকন্যা। তাকে তার মতের বিরু্দ্ধে অনেকটা জোর করে বিয়ে করে রাজপুত্র শেখ খালিদ। যে কিনা দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় নেশাসক্ত থাকতেন। রাজকাজে তার কোন অংশগ্রহণ ছিলনা কখনো। বিয়ের ২-বছরের মাথায় এ স্ত্রীর প্রতি নেশা কেটে যায় তার, যতটা না নেশা বাড়ে ফরাসি ওয়াইনের প্রতি।
:
খেজুর গাছঘেরা নির্জন সমুদ্র সৈকতে একাকি প্রাসাদে বাস করতো ‘নায়লা ফাওয়াদ’। ঘরে ছিল কেবল ফিলিপিনি ৪-নারী গৃহপরিচারিকা। গেটসংলগ্ন ছোট ২-রুমের কক্ষটিতে থাকতাম আমরা ৩-জন স্পেশাল ফোর্স সদস্য। আমি ছাড়াও অপর দুজন ছিল শ্রীলংকান ও পাকিস্তানি। আর গেটের বাইরে বড় ৫/৬ রুমের দোতলা বাড়িটিতে প্রায় ২০-জনের মতো মানুষ বসবাস করতো। যারা মূলত এ রাজবাড়ির মালি, কুক, ড্রাইভারসহ নানাবিধ পেশার বিদেশি মানুষ। এরা কখনো প্রাসাদে ঢুকতে পারতো না। রান্না হলে খাবার নিয়ে গেট পর্যন্ত এলে ফিলিপিনো মেয়েরা এসে ভেতরে নিয়ে যেতো খাবার। আমাদের সবার জন্য সাধারণ খাবার তৈরি হলেও ‘নায়লা ফাওয়াদ’ আর ভেতরের ৪-নারীর জন্যে তৈরি হতো নানাবিধ সব দামি ফুড, যার সুঘ্রাণ কদাচিৎ পেতাম আমরা। ইন্টারকম বা কাগজে লিখে অর্ডার পাঠালেই, দেওয়ান আমিরি থেকে টাকা নিয়ে সব বাজার করে খাবার তৈরি করে দিতো ভারতীয় খৃস্টান কুক। বাজারের জন্যেও দুটো গাড়ি ছিল ও বাড়িতে।
:
মাকে সত্যি না বলে গিয়েছি তাছাড়া কম বয়স ছিল, তাই মন ভাল লাগতো না আমার এ জনমানবহীন প্রাসাদ এলাকায়। শহর মানামা ছিল অনেক দুরে। প্রায় ৭/৮ কিমি হেঁটে ‘কারজাখান’ গেলে, বাস বা ট্যাক্সি পাওয়া যেত রাজধানী মানামার। ব্যারাকে থাকার কারণে কারো সাথে পরিচয়ও ছিলনা আমার, তাই কেবল বেতন পেলেই মানামা আসতাম। এ ছাড়া বিকেলে প্রাসাদ সংলগ্ন সিঁড়িতে বসে নানাবিধ বই আর কবিতা পড়তাম আমি। পারস্য উপসাগরের স্বচ্ছ নীল জলে তাকিয়ে মাছেদের জীবন দেখতাম। বাড়িটি এমনভাবে নির্মিত হয়েছিল যে, তার একটা কক্ষ ছিল সমুদ্র জলের মধ্যে। যেখান থেকে সহজ ওঠা যেতো প্রাসাদের সাথে বাঁধা আধুনিক বোটে। দুয়েকবার বোটেও উঠেছি আমি। একবার বোট ড্রাইভার বললো, আর কখনো যেন না উঠি এগুলোতে। কেবল রাজপরিবারের কেউ কখনো কোথাও গেলে, বা পালিয়ে গেলে এ বোটে যেসব স্থানের কথা বলা আছে, কেউ না চালালেও সেখানেই চলে যাবে বোট অটো প্রোগ্রামিংয়ে।
:
রাজকুমারি ‘নায়লা ফাওয়াদ’ খুব বের হতেন না ঘর থেকে। কখনো ২/১ জন নারী সাথে করে সমুদ্রে ঘুরতে যেতেন বিকেলে নিজস্ব বোটে। প্রায়ই রাজপ্রাসাদের গাড়ি এলে চলে যেতো বাইরে। কখনো মুখ দেখতাম না আমরা তার, কেবল স্যালুট দিতে হতো আমাদের। একদিন বিকেলে ডিউটি না থাকাতে প্রাসাদ সংলগ্ন সমুদ্র সিঁড়িতে বসে তাকিয়ে ছিলাম জলের দিকে। ‘নায়লা ফাওয়াদ’ বের হলো তার পরিচারিকা নিয়ে। ডাকলেন আমায় বোটের কাছে। নাম ভাষা জানতে চাইলেন। এক সময় বোটে উঠতেও বললেন ইশারায়। ইতস্তত করে এক সময় উঠলাম আমি বোটে। নানাবিধ প্রশ্ন করে আমার প্রায় সব পরিচয় নিলেন সে। এতো অল্প বয়সে কেন বিদেশে এলাম মা বাবা ছেড়ে তাও জানতে চাইলো আকুতি নিয়ে। খুব দু:খি আর মানবিক নারী মনে হলো তাকে। রাত না হওয়া পর্যন্ত সমুদ্র্রে ঘুরলো আমাকে নিয়ে তার পাশে বসিয়ে। ফিলিপিনো মেয়েটা ঘুরাতো থাকলো চক্রাকারে বোটটা সমুদ্রে তার নির্দেশে।
:
ক্রমান্বয়ে ঘনিষ্ঠতা হলো শেখ নায়লার সাথে আমার। আমার প্রতি একটা টান হয়েছিল তার। ভেতরে খাবার খেতে ডাকতো আমায় প্রায়ই। নানাবিধ জিনিস পাঠাতো ফিলিপিনো মেয়েদের দিয়ে আমার জন্যে। অনেকেরই নজরে পড়লো বিষয়টা। একদিন পাকিস্তানি পুলিশ সদস্য সাবধান করে বললো, আমাদের প্রাসাদে ঢোকা নিষেধ তা জানি কিনা আমি? বোটে ওঠাও চোখে পড়লো অনেকের। কিন্তু কেউ মুখ খুললো না। কেবল একজন বললো, ঐ নারীর স্বামী শেখ খালিদ মদ্যপ ও বদমেজাজি খুব। কর্মচারীদের কেউ কেউ ধরলো আমাকে, যেন তাদের বেতন বাড়ানোর কথা বলি শেখ নায়লাকে।
:
মাত্র ৩-৪ মাসের ব্যবধানে আরব এ শৃঙ্খলিত নারীর জন্মান্ধ ভালবাসা অনুভব করি আমি। দ্রাক্ষাবনে অনন্ত জোয়ারের মত এক ধরণের টান জাগলো এ নারীর জন্যে আমারো। কিন্তু তা কেমন প্রেমজ নাকি ভাললাগার ঝুমঝুমি তা বুঝতাম না আমি। মনোলোক অবুঝ নাবালক হয়ে কেবল তাকিয়ে থাকতাম আমি তার দিকে। মায়কোভস্কির কবিতার সেই রূপক নারীর মত, এ দু:খবতি নারীর মাঝে ভাললাগার অপরিমেয় বোধ দেখে ভাল লাগতে থাকে আমার। পারস্য উপসাগরের নীল জোয়ারে ভরা চাঁদ ওঠে একদিন আকাশে। আমরা সাগরঘাটে পাশাপাশি বসি। কথা বলত বলতে অনেক সময় হেলে পরে। রাত গভীর হতে থাকে ক্রমশ। চাঁদ মাঝ আকাশে চলে যায় কখন আমাদের খেয়াল থাকেনা ।
:
হঠাৎ চিৎকার আর গুলির শব্দ শুনি গেটে। হ্যা, নায়লার মদ্যপ স্বামী শেখ খালিদ কারো কাছ থেকে খবর পেয়ে, এ গভীর রাতে একাকি এসেছে গাড়ি চালিয়ে। প্রথমে রুমে ঢুকেই ঘুমন্ত পাকিস্তানি পুলিশকে গুলি করেছে সে আমাকে ভেবে। তারপর গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ঢুকেছে নায়লার প্রাাসাদে। দরজার কাঁচ ভেঙে ঘরে ঢুকে নায়লাকে না পেয়ে কয়েকটা গুলি ছুড়ে আরবিতে নানাবিধ গালি দিয়ে, আবার চলে গেলো ঝড়ের বেগে যেমন এসেছিল সে।
:
অন্ধকারে দেয়ালের আড়ালে থাকতেই আঁতকে ওঠা ঘুঘুর মত নায়লা বলে
– “বোটে ওঠো তাড়াতাড়ি, ও আবার আসবে। তোমাকে বা আমাকে পেলে খুন করবে সে এখনই”। ঘটনার ক্লেদ কয়লার বিষময় মিথেনে কি করবো বুঝতে পারিনা আমি তাৎক্ষণিকভাবে। নায়লা দৌঁড়ে কেবল একবার ঘরে যায়, তারপর আবার দৌঁড়ে এসে টেনে তোলে আমায় অন্ধকার বোটে। মনুষ্যপশুর হিংস্রতা আর রক্তস্নাত কসাইখানা থেকে পালাতে আ্মরা অন্ধকারে সাঁতরাতে থাকি নিরাপদ আশ্রয়। বোট চলতে থাকে অন্ধকার সমুদ্রে। এক নিরাপদ দ্বীপ খুঁজি আমি আর নায়লা নীল জলরাশি, অগণিত নক্ষত্র আর পারস্য উপসাগরীয় নোনা বাতাসে!
:
মৃত ভূমি-জীবন থেকে লখিন্দরের বাড়ি ফেরার মত, নিজ দেশে নিজ বাড়িতে নিজ মায়ের কাছে ফিরতে “হাওয়ার” দ্বীপে প্রহর গুণতে থাকি আমি। বিদায়ের প্রাক্কালে ‘নায়লা’র শেষধ্বনি ‘হাররাক’ (কুইক) এবং ‘আ্লবিদা ইয়া হাবিবি’ ধ্বনি পুরো দ্বীপময় ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হয়ে কানে বাজতে থাকে আমার। কষ্টের রাত অবশেষে ভোর হয়। রাত্রিশেষে সূর্যের অলস উত্তাপ কলের বাঁশির তীব্র হাহাকারের মত পিঠ পুড়িয়ে দেয় আমার। বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্খার দহনে বুকের ভেতর নীল বহ্নিশিখার আগুন জ্বলতে থাকে ক্রমাগত। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়, দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কোন মানুষ বা নৌকো কাছাকাছি চোখে পরেনা আমার। বসতিহীন দ্বীপের চারদিকে কেবল অথৈ নীলজল। ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় বুক ফেটে যা্চ্ছিল আমার। বৃক্ষহীন বালুময় দ্বীপের প্রচন্ড গরম আর তাপে কিছুক্ষণ সমুদ্রজলে ডুবে রইলাম আমি। মানব আর শব্দহীন এ দ্বীপে দূরের কোন কুটীরে কান্নার শব্দও ভেসে আসেনা কানে আমার কেন? পৃথিবী এমন শব্দহীন হয়, এই প্রথম বুঝলাম আমি! মা-হীন এ অন্ধকারের নিঃশব্দ মৃত্যু সাগরে নিমজ্জিত হওয়ার প্রাক-মূহূর্তে একটা মাঝারি দেশি সাম্পানোর মত ট্রলার চোখে পড়লো দুরে। গায়ের গোলাপি সার্টটি খুলে জলের খুব কাছে গিয়ে নাড়াতে থাকলাম জোরে জোরে। আর চিৎকার করলাম শরীরের সব শক্তি একাকার করে। কিন্তু কেউ দেখলোনা আমায়। শতাব্দীর ব্যর্থ চেষ্টার পরও, মৃত এ বালির দ্বীপে রেখে ট্রলারটি এগিয়ে গেলো ফেলে আমায়। কষ্টকর মনোজগতের অতৃপ্ত গ্রহে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইলাম আমি ধাবমান ট্রলারটির দিকে। হঠাৎ কারো কাপড়জাতীয় কিছু একটা উড়ে পড়লো ট্রলার থেকে সমুদ্রে। উড়ন্ত কাপড় ধরতে একজন তাকালো পেছন দিকে। সম্ভবত ঐ কাপড়টির বদলে আমার গোলাপি সার্টটি নজরে পড়লো তার। আর আমাকে পোড়ো বালির এ আনত আভূমিজ সংসার থেকে উদ্ধারে, বোটটি ঘুরলো। হ্যাঁ ঘুরে গেল আমার দিকে সূর্য ডোবার ঠিক প্রাক-মূহূর্তে। আমার কুঁকড়ে থাকা ন্যুজ প্রেমজ শরীরকে টেনে তুললো বোটের ৩-জন মানুষ এক নতুন জীবনের গন্ধে।
:
জল দিলো, খাবার দিলো, সাহস আর প্রাণতা দিলো সবাই মিলে আমায়। তারপর কথা কইলাম ৭-ট্রলারম্যানের সাথে। তারা ওমানের ‘মিনা আল সুর’ থেকে এসেছে তরমুজ নিয়ে। কাতারের ‘রুবব আল সুরকিয়া’তে তরমুজ নামিয়ে ফিরে যাচ্ছে তাদের ‘সুর’ এলাকায়। ৭-মা্ল্লার ৪-জন মাসকাটের মাঝি টাইপের, আর ৩-জন ভারতীয় কেরালার শ্রমিক। অল্প আরবি শিখেছিলাম আমি, তাই ভাঙা আরবিতে মিথ্যে কাহিনি বললাম নতুন ঝামেলা এড়াতে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অবৈধ পথে একটা বড় জাহাজে উঠে গ্রীসে যাচ্ছিলাম এ মিথ্যে গল্প। টের পেয়ে জাহাজ থেকে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে আমায় আজ ভোরে এ দ্বীপের কাছে। সাঁতরে উঠলাম দ্বীপে সকালে একাকি। নিজ দেশে ফিরে যেতে চাইছি এখন। বিধ্বস্ত যুদ্ধাহত সৈনিকের মত কাকভেজা অবস্থা দেখে, সরল মাঝিরা বিশ্বাস করলো আমার মিথ্যে কাহিনি। জাহাজ আর তার ক্রদের ধ্বংস কামনা করলো সবাই সম্মিলিতভাবে আল্লাহর কাছে। যুদ্ধের ক্ষত বুকেও দু:খাতুর হাসি হাসলাম আমি তাদের প্রার্থনার ভাষা আর ভঙ্গীতে।
:
জীবন চিন্তনের তীব্র হেডলাইটের ঝলসানো দলিত আলোয় এতোক্ষণ ‘নায়লা’র কথা ভুলে গিয়েছিলাম আমি। এবার নাক্ষত্রিক আকাশে গভীর শূন্যতায় অস্পষ্ট তারার আলোয় নায়লাকে দেখি আমি। মেঘ, চাঁদ আর ক্ষীয়মান জলাকাশে নায়লা ভাসতে থাকে দীর্ঘ নখের ত্রিকোণ আঘাতে, যেখানে চিরে ফেলা হয়েছে তার ভালবাসার হৃৎপিণ্ড। পারস্য উপসাগরের ফেনিল জলরাশি মাঝে আকাশের অলৌকিক চাঁদ ভেসে থাকে জলের আকাশে। গভীর ক্লান্তিতে ভয়, অনিশ্চিত ভবিতব্য, দাহ আর ক্লেদময়তা নিয়ে ঘুমিয়ে পরি আমি এক অন্ধকার স্বপ্নকে সাথী করে।
:
খুব ভোরে কাতারের ‘দালমা’ জেলেদ্বীপে থামে বোট। খাবার পানীয় নিয়ে ঘন্টা খানেক পর আবার অনন্ত জলকাটে ‘সুর’গামী ছোট দেশি জাহাজ। ক্রমান্বয়ে আমিরাতের ‘মারওয়াহ’ দ্বীপ হয়ে, ‘জানানাহ’ মিনা থেকে তেল নিয়ে ‘আবু আবায়েদে’ যাত্রা বিরতি করে বোট। সেখান থেকে নানাবিধ জিনিসপত্র ভরে আমিরাতের ‘আল রফিক দ্বীপ’ থেকে সরাসরি বোট চলতে থাকে ‘খোর ফাক্কান’ বরাবর। ওমানের ‘আল হাযার’ হয়ে ‘সুরে পৌঁছুতে পাক্কা ৫-দিন, ৫-রাত কেটে যায় আমাদের। জাহাজ থেকে ফেলে দেয়া কুড়ি বছরের কমনীয় চেহারার ‘নিষ্পাপ’ এ তরুণের প্রতি সব মাঝিদের কৃপা অব্যাহত থাকে। তারা সব ভাল খাবার, সেবা ছাড়াও নানাবিধ প্রবোধ দেয় আমায়। দেশে ফিরতে সাহায্য করবে এমন কথাও বলে তারা। আমি চাইলে ‘সুর’এ বা তাদের জাহাজে চাকুরি করতে পারি নির্বিঘ্নে এ প্রস্তাবও দেয় তারা। আমি তাদের আকুতি জানাই দেশে ফেরার ‘হেলপ’ করতে।
:
“সুর”এ ৩-দিন জাহাজেই্ কাটাই আমি। কেবল ২/৩ বার নেমে মাঝিদের বাড়ি গিয়েছিলাম আমি তাদের অনুরোধে। আমার জাহাজ থেকে ফেলে দেয়ার ঘটনায় সবাই করুণা করতে চায় আমায়। চাঁদাতুলে ৪০০ ডলার আমার পকেটে দেয় তারা। যদিও আমার পকেটে তখন ১০,০০০ বাহরাইনি দিনার, তারপরো অনেক দুরে বাংলাদেশ, তাই দিনারের কথা গোপন রাখি আমি ভবিষ্যত চিন্তায়।
:
৩-দিনের মাথায় তরমুজ ট্রলারের মাঝিরা ইরানের ‘পেসাবন্দর’গামী ঐ শ্রেণিরই আরেকটা ট্রলারে তুলে দেয় আমায়। জাহাজ থেকে ফেলে দেয়ার মিথ্যে করুণ কিসসায় ওমানি “দুম্বা” বহনকারী ‘পেসাবন্দর’গামী জাহাজের ইরানি মাল্লারাও সাদরে গ্রহণ করে আমায়। মাঝিদের অনুরোধে কোন ভাড়া বা খাবার টাকাও নিতে অস্বীকার করে ফার্সি ভাষিক ইরানিরা। কেবল উত্তাল “জাজিরাত আল ওমান” যেন নির্বিঘ্নে পাড়ি দিতে পারে, এমন দোয়া করতে বলে জাহাজ আর তাদের জন্যে। আমি ‘নায়লা’র কথা ভুলে অদেখা ঈশ্বরকে ডাকতে থাকি, যেন ঠিকমত ওপারে পৌঁছে এ দেশী নৌকার মত জাহাজ, আর যেন আমি পৌঁছতে পারি আমার মায়ের কোলে। ধারাবাহিক ২-দিন ২-রাত চলে হিমালয়ের মত বড় বড় ঢেউ ভেেঙে, মোচার খোলের মত ছোট এ দেশি জাহাজটি অবশেষে ‘গালফ অব ওমান’ পাড়ি দিয়ে বেলুচিন্তানের কাছাকাছি পৌঁছোয় তারা। সরাসরি ইরানে না ঢুকে আমাকে বেলুচিন্তানের ‘জিওয়ানি’ এলাকায় নামিয়ে দেয় খুব ভোরে। সাথে দেয়ে ৫০০-পাকিস্তানি রুপি। জিওয়ানি পাকিস্তানের “ব্রাহুই বালুচ”দের এলাকা। এদের ভাষা ফার্সি, কালচারও অনেকটা ইরানের মত। পাঞ্জাবিদের তুলনায় ভাল মানুষ এরা। জিওয়ানি থেকে ২০-রুপিতে খচ্চরের পিঠে চড়ে কাছের শহর ‘গাওয়াদারে’ পৌঁছি সকাল ১০-টার মধ্যে। ‘গাওয়াদার’ থেকে মুরির টিন মার্কা বাসে বেলুচিস্তানের ‘রুমরা’ তারপর ‘মাকরান’ এবং শেষে ‘গুরমারা’ পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায় আমার। খবর নিয়ে জানতে পারি, রাত ১০-টায় ‘গুরমারা-করাচি’ মেল ট্রেন আছে। ৪০-রুপিতে ৩য় শ্রেণির টিকেট কেটে করাচির মেলট্রেনে ৮-টায় উঠেই বসে থাকি আমি। ছাড়ার আগে ট্রেন প্যাসেঞ্জারে গিজগিজ করতে থাকে। আমি সারাদিনের ক্লান্তিতে ৩য় শ্রেণির লাগেজ রাখার বাথে ঘুমিয়ে পরি অল্পতেই অবোধ শিশুর মত।
:
বছর খানেক বাহরাইন থাকাতে কিছু আরবি আর উর্দু শিখেছিলাম আমি। খুব ভোরে করাচি প্লাটফর্মে নেমে কাছের একটা ছোট হোটেলে উঠলাম ৩০০ রুপি ভাড়ায়। ১০,০০০ বাইরাইনি দিনার ভাঙাতে গেলাম করাচির সিটি সেন্টারে। মানি এক্সচেঞ্জে বাহরাইন দিনার বের করলে শেখ ইসার ছবির পরিবর্তে প্রতিটি নোটে ‘নায়লা’র ছবি দেখতে পাই আমি। আকাশের পিছনে দাঁড়ানো কম্পমান নায়লাকে এক সাদাকালো ঘনান্ধকার মেঘদিগন্তে ভাসতে দেখি ষ্পষ্টত আমি। মনে হলো শত শত কোটি বছর কেটে গেল আমার, নায়লাকে ফেলে এসেছি ঐ নক্ষত্রমন্ডলীর মাঝে। দিনার ভাঙিয়ে অনেক টাকা পেলাম আমি। একটা ব্যাগ, কটা জামা-কাপড় কিনলাম নায়লার টাকায়। যাতে গন্ধ লেগেছিল কুয়েতি রাজকুমারী ‘নায়লা ফাওয়াদ’ -এর। হোটেলে ফিরলাম একরাশ বেদনা আর দেশে ফেরার আশাবাদ নিয়ে। খবর নিয়ে জানলাম, করাচি থেকে ৫/৬-ঘন্টার বাস পথে ‘কেটি’ জেলেপল্লীতে গেলে জেলে নৌকোতে ভারত যাওয়া যায় সহজে, নিরাপদে আর অল্প টাকায়।
:
করাচির সস্তা হোটেলে নির্ঘুম রাত কাটালাম নানা উদ্বিঘ্নতায়। সকালে উঠেই এবার ‘কেটি’ বাজারের বাসে উঠলাম ভারতে যেতে। দুপুরেই পৌঁছলাম এ গ্রাম্য সস্তা বাজারে। নানা মানুষে গিজগিজ করছে পথ সড়কে। ভারত যওয়ার কথা শুনতেই কজন দালাল ঘিরে ধরলো আমায়। রুপেয়া নেই সাথে বলাতে কেটে পড়লো সব দালাল মুহূর্তে। এক মুদি দোকানিকে একাকি পেয়ে হেলপ চাইলাম তার। সে দোকানে বসিয়ে ‘গফফার’ নামে ডাকলো এক “ভদ্র দালাল”কে। গফফার বললো, ২০০০-রুপেয়া দিলে আজ রাতেই্ যেতে পারবো আমি। আর ১০০০ রুপেয়া দিলে কাল। রাত ১০-টায় ছাড়বে ফিশিং বোট। দোকানে বসে ২০০০-টাকা দিলাম দোকানির হাতে নগদ। দোকানি দিলো গফফারকে। বললো, গোপন রেখো কথা। আর ৮-টার দিকে চলে এসো এই দোকানে।
:
সারাদিন ‘কিটি’ জেলে বন্দরের অলিতে গলিতে ঘুরলাম আমি। সময় কাটাতে ‘কিদিয়ারি’ নদীর তীরে বসে কাটালাম অনেকক্ষণ। জেলেদের মাছধরা আর বিপণনের নানাবিধ কাজ দেখলাম বন্দরের পাইকারি মাছের বাজারে। তারপরো প্রহর গুণতে থাকলাম কখন বাজবে রাত ৮-টা। সময় না বাজতেই হাজির হলাম ‘গফফার’র সন্ধানে মুদি দোকানে। চা খেতেই গফফার এলো আরো দুজনকে নিয়ে। মোট ৩-জনকে নিয়ে অ্ন্ধকারে অনেকদুর হেঁটে চললো গাফফার। ‘হাজামরো’ ঘাট থেকে প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে ইঞ্জিনচালিত জেলে বোটে উঠলাম আমরা। পুলিশ মাথাপিছি ৫০০ রুপেয়া নিলো আমাদের সামনেই। রাত ১১-টা পর্যন্ত পথে পথে আরো ১৮/২০ জন নারী পুরুষ শিশু তুললো গাফফারের জেলেবোট। ঘোর অন্ধকার রাতে ‘খারোচান’ এলাকা দিয়ে সিন্ধু নদী আরব সাগরে মিশেছে, এমন মোহনা দিয়ে জেলে ট্রলার এগিয়ে যায় ভারতীয় জলসীমায়। গুজরাটের নারায়ন সরোবরের দক্ষিণে ‘আখারি’ এলাকার কাছাকাছি একটা জঙ্গলে ভোর ৪-টার দিকে ভারতীয় দালাল “পল্টুর” হাতে তুলে দিয়ে বোট ফিরে যায় পাকিস্তান জলসীমায়। কথামত প্রত্যেকেই ভারতীয় পল্টুকে ১০০০-রুপি দেই ঐ জঙ্গলেই আমরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই পল্টু আমাদের নিয়ে যায় বিশেষ গাড়িতে গুজরাটের “ভুজে”।
:
দুপুরের ট্রেনে তৎকালের টিকেট পেলাম আহমেদাবাদের। সেখান থেকে ইন্দোর, নাগপুর, বিলাসপুর, রৌরকেলা, জামসেদপুর, খড়গপুর হয়ে প্রায় ৩-দিনের জার্নিতে একদম কোলকাতা। হ্যা, আমার মায়ের পাশের দেশ কোলকাতা। এই প্রথম মনে হলো জীবন ফিরে পেলাম আমি সত্যিই বুঝিবা। তাই্ কোলকাতা থেকে প্রথমেই বাড়িতে ফোন করলাম মাকে। অনেকদিন মার সাথে যোগাযোগ নেই আমার। সে জানেনা এসব ঘটনার কিছুই। আমি কোলকাতা শুনে বিস্মিত হলেন মা। তার পরিচিত অনেক হিন্দু পরিবার আছে কোলকাতাতে। তাদের কাছে যেতে বললেন তিনি। আমি কেবল একজনের সাথে যোগাযোগ করলাম কলকাতাতে। পরদিন হাজির হলাম বাংলাদেশ কনসুলেট কোলকাতাতে। আবার মিথ্যে গল্প ফাঁদলাম একটু। বললাম, “জাহাঙ্গীরনগর ভার্সিটির ভুগোলের ছাত্র আমি। ঘুরতে এসেছি ১৫-দিন আগে বন্ধুদের সাথে। গুজরাট ঘুরতে গিয়ে পাসপোর্ট হারিয়ে এসেছি ব্যাগসহ। তাই্ দেশে ফেরার জরুরি পাসপোর্ট দরকার”। দুতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি বিভাগীয় চেয়ারম্যান-শিক্ষকদের নাম জানতে চাইলেন জাবির। হলের নাম, লোকেশন, কোন বাসে যাই নানাবিধ প্রশ্নে পাস করলাম আমি। একটা খয়েরি রঙয়ের বাংলাদেশ-ভারত যাতায়াতের সাময়িক পাসপোর্ট পেলাম আমি দুদিনেই্।
:
পাসপোর্ট হাতে পেয়ে খুলে যায় আমার অন্তুহীন উদ্যানের সূর্যালোকিত পথেরা। দেশে ফিরবো এ চিন্তনে আমার অস্তিত্বের ভূভাগের আদিতম মানবশিশুরা গেয়ে ওঠে অবগাহনের ঘাসফুলের গান। বিগত কদিনের বুনো ঘোড়ার খুরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত আমি এই প্রথম পৃথিবীর আহ্নিক বার্ষিক গতি বুঝতে পারি। রক্তচক্ষু ট্রাইবাল টোটেমসমূহ, আর মর্ত্যের সব বাঁধা ডিঙিয়ে গ্রামীণ কৃষাণপুত্র আমি মৃত্যুকে জয় করে এগুতে থাকি বাংলাদেশের দিকে। বনগাঁ ট্রেন থেকে নেমে পেট্রাপোলে পৌঁছেই দেখতে পাই বেনাপোল তথা বাঙলাদেশকে। মৃত্যু থেকে ফিরে আসা আমি আমার মা, আর জন্মভূমির আলোকণা খুঁজেফিরি বেনাপোল নামক চাঁদমাটিতে। ঢাকা ফিরে যাচ্ছি এ ভাবনায় অগণিত প্রেমময় হৃদয়শস্য, ভালবাসার রূপকথা ফুল, আর নদীস্বপ্নে বিভোর হই আমি। পাসপোর্টে ভারতীয় সিল লাগিয়ে নো-ম্যান্স ল্যান্ডে এসে মাতৃভূমিতে পা রাখার প্রাকক্ষণে চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে থাকতে দেখি ‘নায়লা’কে। আমার ঘুর্ণীত জীবন টারবাইনের ক্লেদময় রূপোলি শহরে কুয়েতি রাজকন্যা ‘নায়লা’ দাঁড়িয়ে থাকে প্রাক-পৌরাণিক বিরহী নারী হয়ে। অশ্রুভরা নিষাদের মায়ামৃগে, বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখতেই নায়লা’র শেষধ্বনি ‘হাররাক’ (কুইক) হৃদয়ে দহন তোলে আমার এবং নোম্যান্স ল্যান্ডের আকাশ-বৃক্ষে নায়লার কণ্ঠ ভাসতে থাকে – ‘আ্লবিদা ইয়া হাবিবি’! ‘আ্লবিদা ইয়া হাবিবি’ !!

 

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

51 + = 54