বৈষম্যে ভরা সমাজে সাম্য কোথায়? বাংলাদ‌েশের বাস্তবতা।

বৈষম্য হলো পার্থক্য, অর্থাৎ একই প্রকৃতি বা একই সংজ্ঞার পর্যায়ে পড়ে এমন সকল বৈশিষ্ঠ্য থাকা সত্বেও একটি সাথে অন্যটির যে পার্থক্য করা হয় বা পার্থক্যের ধারণা গুলি সৃষ্টি করা হয়- সেটিই হলো বৈষম্য। যেমন ধরা যাক একটি শব্দ “মানুষ”। এ শব্দটির মধ্যে কোন শ্রেণী বিন্যাস নেই। যা আছে তা হলো পৃথিবীর সর্বত্র বিচরন করা এমন একটি গোষ্ঠি বা মানুষ নামে বুদ্ধিমান একটি প্রাণী। এ ধারণা থেকে আফ্রিকার কালো যেমন বলবে “আমরা মানুষ” ঠিক তেমনি এশিয়, কিংবা ককেশিয়া, কিংবা ইংল্যান্ডের সাদা চামড়া মানুষ গুলোও বলবে “আমরা মানুষ”। সুতরাং আমরা মানুষ এটি একটি স্থান কাল পাত্র ব্যতিরেকে এমন একটি কমন-ইজম যার মধ্যে কোন পার্থক্য বা বৈষম্য নাই। কিন্তু যদি আমরা পৃথিবীতে বসবাস করা সকল মানুষের আকার, গাত্রবর্ণ, ভাষা, বিশ্বাস বা ধর্মের বিষয় গুলি নিয়ে চিন্তা করি তাহলে একে অন্যের সাথে ভুরি ভুরি পার্থক্য পেতে পারি। আর এ পার্থক্য থেকে একে অন্যের চাইতে শ্রেষ্ঠত্ব খোঁজে, শ্রেষ্ঠত্ব দেখায় এবং এ ধারণা থেকেই বৈষম্যের সৃষ্টি কর‌ে।

আজকে বর্ণবাদ তথা ব‌ৈষম্য শুধু অাম‌েরিকার মধ্য না। বরং পৃথিবী জুড়ে আজ বৈষম্যের মহোৎসব। এ সবের তালিকায় আছে জাতিগত বৈষম্য (জাতিবিদ্বেষ হল একটি বিশ্বাস যাতে মনে করা হয় কিছু ‘জাত’ অন্যদের থেকে শ্রেষ্ঠতম – বিভিন্ন শারীরিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য (যেমন চামড়ার রঙ) অথবা জাতিগত পৃষ্ঠভূমি ইত্যাদির মত ভ্রান্ত ধারণার ওপর ভিত্তি কিছু লোককে অন্যের তুলনায় শ্রেষ্ঠ করে তোলে)।
আর্থিক বৈষম্য (ধনী দরিদ্যের পার্থক্য সৃষ্টি করে), কর্ম বৈষম্য (কায়িকশ্রম এবং অকায়িক শ্রম বৈষম্য), লিঙ্গ বৈষম্য (পূরুষ শাসিত নারী কিংরা পূরুষ কর্তৃক নির্যাতিত) এভাবে বহু বৈষম্যের নামোচ্চারণ করা যায়।অথচ, এ সব বৈষম্য দূরীকরনের জন্য জাতিসংঘ সহ হাজার হাজার মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন বিশ্বজুড়ে কাজ করছে। তবুও বৈষম্য কমছে না, বরং বাড়ছে তো বাড়ছে। পৃথিবীতে এধরনের যত রকম বৈষম্য আছে এর সব কটির কুফল প্রায় একই ধরনের হলেও সব ধরনের বৈষম্যের ধ্বংসাত্বক ক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছে জাতিগত বৈষম্য। অন্ততঃ মানবজাতির ইতিহাস তাই স্বাক্ষ্য দেয়।

আজক‌ের বাংলাদ‌েশের পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ের চ‌িত্র দ‌েখল‌ে বুঝা যায় কঠিনতম এক বাস্তবতার মধ্য প্রবাহিত হয়ে চলছে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়িদের জীবনযাত্রা ।সামগ্রিক বিবেচনায় দারুন অশান্ত এবং রানৈতিকভাবে চরম অস্তিতিশীল । বাঙালী শাসকগ‌োষ্টী তথা স‌েনাবাহ‌িনীর পায়‌ের তলায় প‌িষ্ট হয়‌ে গ‌েছে পাহাড়ীদ‌ের অধ‌িকার।

ক্রমাগত এই শোষণ ,বঞ্চনা ,নিপীড়ন, নির্যাতন ,ধর্ষন ও মানবাধিকার লঙ্গন সর্বোপরি জুম্মদের অধিকারহীনতার ফলে পাহাড়ী আদিবাসীরা আজ নিজভূমি পরবাসী হয়ে জীবন যাপন করছে ।
অথচ, ১৯৭১ সালে এদেশের মানুষ ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যুদ্ধ করে‌ছিল। সে সময়ে স্বাধীন বাংলাদ‌েশ গড়া‌র মুল উদ্দ‌েশ্য ছ‌িল একট‌ি বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করা। য‌েখানে বৃহত্তর বাঙালী মুসল‌িমদ‌ের পাশাপাশ‌ি দেশের সংখ্যালঘুরাও সমান অধ‌িকার ভ‌োগ করব‌েন
অথচ, বাংলাদেশের ৪৮ বছর পর আজও জাত‌িগত বৈষম্যের পাশাপাশি অর্থন‌ৈতিক, সামাজ‌িত সেই বৈষম্য গুলিই রয়ে গেছে, যেগুলির কারণে ১৯৭১ সালে যুদ্ধ করতে হয়েছিল। জাতিগত বৈষম্য বর্ণ, জাতি, ধর্ম এর ভিত্তিতে পক্ষপাত মূলক আচরণ করা হচ্ছ‌ে সংখ্যালঘু দ‌ের স‌াথ‌ে।

এদেশের বর্তমানে সংখ্যালঘুদ‌ের সাথ‌ে শাসকগোষ্টীর দৃশ্যমান বৈষম্য গুলি নিয়ে অন‌েকে আলোচনা করেন, অন‌েক রাজনীত‌িবিদও কথা বল‌েন, সমাধানের উপায় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন।ক‌িন্তু, মুখে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, বক্তৃতায় অসংখ্য আশার ফুলজুরি, কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান ক‌োনো বাস্তবতা ন‌েই। শাসকগ‌োষ্টী এদেশের সংখ্যালঘু আদিবাসী মানুষদ‌ের সাথ‌ে যেভাবে মনস্তাত্বিক বৈষম্যে ও ব্যবদান সৃষ্ট‌ি কর‌েছেন তা কয়েকশত বছরেরও সারাবার নয়।
এজন্য আমরা দেখি প্রত‌িটি জায়গায় পার্বত্য চট্টগ্রাম‌ের বাইর‌ে যখন একজন পাহাড়ী আদিবাসী তার চাকরী, পড়াশুনার জন্য অন্যান্য জায়গায় যায় তখনই তাক‌ে বাঙালী কর্তৃক ব‌িভিন্ন হ‌েনস্তার শ‌িকার হত‌ে হয়।নাক বুচা, জঙ্গলী নান‌া নাম‌ে অাখ্যায়‌িত করা হয়।
অাজ এভাবে প্রতিদিনই য‌ে পার্থক্য বেড়ে চলছে যেন এ পার্থক্য কমাবার কেহ নেই।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

73 − 65 =