যৌনবাদী ও সাম্প্রদায়িক

বাঙলাদেশের মানুষজনেরা আমেরিকা ও ইউরোপের বর্ণবাদ নিয়ে যতটা সচেতন, ততোটা নিজ ভূখণ্ডের বর্ণবাদ নিয়ে সোচ্চার হলে আমেরিকা ও ইউরোপের গালে শুধু চপেটাঘাত দেওয়াই যেতো না বরং একটি ক্ষেত্রে তারা ইউরোপ ও আমেরিকার থেকেই উৎকৃষ্ট- তা স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখতো।
কিন্তু নিজেদের সাদা চামড়ার প্রতি দুর্বলতা ও মোহ, অন্ধের মত সাদাদের শ্রেষ্ঠ মনে করা, আবার; সংকীর্ণমনাদের কাছে সাদা মানেই ষড়যন্ত্রকারী বোধ করা, ওজন, উচ্চতা, শারীরিক গঠন নিয়ে কুৎসিত মনোভাবের পরিচয় দেওয়া, ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষদের চাইনিজ, জাপানিজ, নাক বোঁচা, দুধ নাই, বাইট্টা, কালা, মোটকা, চালের বস্তা, বিশ্রী ইত্যাদি নিকৃষ্ট ও জঘন্য সকল বর্ণবাদমূলক ধারণা পোষণ, আদিবাসীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, ধর্মের মাধ্যমে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষদের তিরস্কার এবং ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে হত্যা এবং নিজেদের অসঙ্গতি ও সংকীর্ণতাকেই শ্রেষ্ঠ মতবাদ দাবী করে বাদবাকি সব কিছুকে খারিজ করে দেওয়াও যে ভয়ংকর রকমের বর্ণবাদ – সে বিষয়ে কথা বলতে অপারগ। নিজেদের অসঙ্গতি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা না করে যারা অন্যের অসঙ্গতি নিয়ে সোচ্চার তারা কখনোই বিচারের পক্ষে নয় বরং সুবিধাবাদের সঙ্গী।
বাঙলাদেশের পুরুষেরাই যে শুধু বর্ণবাদী আচরণ করে তা নয়, নারীদের মধ্যেও বর্ণবাদ তীব্র। যে দেশের পুরুষেরা নারীদের মূল্যায়ন করে শরীর দিয়ে, চামড়া দিয়ে, উচ্চতা দিয়ে, মাংস দিয়ে, ওজন দিয়ে, চুল দিয়ে- সে দেশের নারীদের চিন্তাচেতনাও প্রায় পুরুষদের দ্বারা ঘেরা।
আমাদের দেশের পুরুষদের স্বপ্নের নায়িকা কিংবা কল্পনার সঙ্গী কিংবা বীর্যপাতের কামরক্ষীতা যেমন ফর্সা বা সাদা চামড়ার সুন্দরী রূপবতী হয়ে থাকে, তেমনই আমাদের দেশের নারীদের স্বপ্নের পুরুষ, প্রিয় নায়ক, প্রিয় রাজনীতিক– সবই সাদা চামড়ার হয়। কালো চামড়ার মানুষেরা খুব একটা কারো স্বপ্নের পুরুষ হতে দেখা যায় না। যদি কারো পছন্দ হয়েও থাকে- নিশ্চয়ই স্বপ্নের পুরুষটি দৈহিক ও আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ।
আমাদের দেশের বর্ণবাদ মূলত যৌনতা দ্বারা পরিবেষ্ঠিত এবং ভয়ংকর রকমের যৌনবাদী। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক, জাতি, অঞ্চল, রাজনীতিকেন্দ্রিক। আর আমেরিকা ও ইউরোপের বর্ণবাদ সরাসরি সাম্প্রদায়িক, জাতি-দল রাজনীতিকেন্দ্রিক।
যে দেশের মানুষ নিজ জাতিগোষ্ঠীর কালো চামড়ার মানুষদেরকেই নিগ্রো বলে পরিহাস ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে -তাদের কাছে আফ্রিকান বা ব্ল্যাক আমেরিকানদের জীবনের মূল্য কতটা হতে পারে তা বোঝা কঠিন নয়। যে দেশের মানুষেরা নারীর অগ্রগতি থামানোর জন্য প্রায় সময়ই বলে থাকে ‘নিগ্রো দিয়ে চোদানো উচিত’ সে দেশের মানুষেরা মানুষ হিশেবে কতটা অমানুষ তা বোঝার বাকি থাকে না।
যে ভূখণ্ডের বীর মানুষেরা ক্রসফায়ার ও লেখকের স্বাধীনতার হত্যার বৈধতা দিতে পারে তারা কতটা যে অমানবিক ও হিংসাত্মক এবং সাম্প্রদায়িক ধ্যানধারণা লালন করে অশুদ্ধকে শুদ্ধ প্রমাণে মরিয়া তা কারো অজানা নয়।
যে দেশে বৌদ্ধ ও হিন্দুদের মূর্তি ও মন্দির ভাঙার পরেও উচ্চস্বরে বলে অসাম্প্রদায়িক দেশ- সে দেশের মানুষ হিপোক্রেট না হয়ে কি পারে? যে দেশের পুরুষেরা কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ভ্রমণ করতে গেলেই একটা আদিবাসী নারীকে বিছানায় পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকে এবং নিকৃষ্ট সকল কৌতুক ও রূপকথা শুনিয়ে থাকে- সে দেশের পুরুষেরা রেসিস্ট না হয়ে কি পারে?
ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

4 + 3 =