ভাষার গুরুত্ব

আমার সিরিয়ান ও আফগান সহপাঠী বন্ধুরা প্রায়ই বাঙলাদেশ নিয়ে হাসিতামাশা করে। তারা প্রায়ই বলে- বাঙলা হচ্ছে সেই ভাষা, যেই ভাষার জন্য এতোসব আন্দোলন নির্যাতন বিসর্জন দেওয়ার পরেও মানুষের মধ্যে ভাষার প্রতি কোন মায়া মমতা নেই। আমি তাদের এই বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিরোধিতা করি।
কিন্তু যখনই তারা বলে, বাঙলাদেশের মানুষ একটি বাক্যে পাঁচটি শব্দ থাকলে তিনটি শব্দই ইংরেজি বলবে। এটাই কি ভাষার প্রতি মানুষের প্রেম? তারা এটাও স্বীকার করে যে, প্রতিটি ভাষার মধ্যে ইংরেজি বা বিদেশী শব্দ ঢুকে গেছে। কিন্তু, বাঙলাদেশের মানুষ কথা বলার সময় ইংরেজিতে শুরু করে বাঙলায় বাক্য শেষ করে। আবার, বাঙলায় বাক্য শুরু করে ইংরেজিতে শেষ করে। কেউ কেউ বাঙলা, ইংরেজি ও হিন্দি মিশিয়ে ব্যাকালাপ চালায়। এইসব কথা যখন বলতো- আমি অবাক হয়ে শুনতাম। আমার মনে প্রথমেই প্রশ্ন আসতো এইসব কাহিনী তারা জানলো কীভাবে?
আমি যখন দেশে থাকতাম তখন ‘প্রথম আলো’ পত্রিকার একটা পৃষ্ঠার খানিকটা অংশ ছিল পৃথিবীর অদ্ভুত সকল নিয়ম আইন ইত্যাদি নিয়ে। সেখানে নানা দেশের নানা ধরণের আইন, নিয়ম, প্রথা, সংস্কৃতি ছোট্ট করে লেখা হতো। ঠিক একইভাবে, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের পত্রিকার একটি অংশ থাকে- যেখানে বাইরের দেশে অদ্ভুত, হাস্যকর, ভিত্তিহীন কাহিনী/ঘটনা তুলে ধরে। যাতে মানুষজন অন্য দেশের বৈশিষ্ট্য, আচরণ ও পরিবেশ জানতে পারে। যে দিন আমি প্রথম জেনেছি বাঙলা ভাষা নিয়ে গবেষণা করার মুখ্য ভূমি বাঙলাদেশ নয়, বরং ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশ, সে দিন আমি বড়সড় ধাক্কা খেয়েছি।
আমাদের দেশেই মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি, আর বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাঙলায় কথা বলে। প্রচলিত ভাষার মধ্যে বাঙলার অবস্থান পঞ্চম। অথচ আমাদের দেশে গবেষণা হচ্ছে না কেনো? আর গবেষকেরাই বা কারা? বাঙলা একাডেমি শেষ কবে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেছে? তা কি কারো জানা আছে? তাদের কাজ কি শুধু সম্পাদনা করা?
আমাদের দেশে গবেষণা করার জন্য অর্থ বরাদ্দ পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার। গবেষণার জন্য অর্থ চাইলে সংকীর্ণমনা ব্যক্তিবর্গ বলে ওঠে টাকার প্রয়োজন কী? মানসম্পন্ন ও সময়োপযোগী উচ্চশিক্ষা ও স্বাধীনভাবে কর্মসম্পাদনের অভাবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে সৃষ্টিশীল শিক্ষার্থী থেকে গবেষক বের হচ্ছে না। গবেষণা করার জন্য দুটি ভাষার দক্ষতা থাকা সবচে’ জরুরী। এবং আমাদের দেশে এই শূন্যতা পূরণ হচ্ছেই না। যার ফলে আমাদের সব কিছুতেই উন্নতবিশ্বের আবিষ্কার, সুযোগ-সুবিধে ও সিদ্ধান্তের উপর অপেক্ষা করে থাকতে হয়।
আমাদের দেশের মানুষেরা শুদ্ধ ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার মধ্যে পার্থক্যটুকু বোঝে না। যার ফলে অশুদ্ধ বাঙলা উচ্চারণের সাথে সাথে নিজের দুর্বলতা ও ব্যর্থতাকে লুকোনোর জন্যে উদাহরণস্বরূপ আঞ্চলিক ভাষাকে টেনে নিয়ে আসে। অর্থাৎ শুদ্ধ হওয়ার প্রয়াস দেশের মানুষের মধ্যে খুব একটা নেই। বাঙলা ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য নিয়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও জার্মানির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চর্চা ও গবেষণা করা হচ্ছে।
এছাড়া পোল্যান্ড, রাশিয়া, সুইডেন, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, চেক রিপাবলিক, কানাডা, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের ৩০টির অধিক দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাঙলা ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণা হয়ে থাকে। এই সকল দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পশ্চিমবঙ্গের অনেক বাঙালি গবেষককে খুঁজে পাওয়া গেলেও বাঙলাদেশের গবেষকের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েজন।
শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.