পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিলো ?

সৌর জগতের সকল গ্রহের মধ্যে শুধু মাত্র আমাদের এই নীলাভ গ্রহটিতেই প্রাণ আছে, এমনকি বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেও এখন পর্যন্ত সমস্ত মহাবিশ্বের কোথাও প্রাণ খুঁজে পায়নি। তো, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছিলো ?

প্রথম প্রাণের উৎপত্তি কিভাবে হয়েছে তা জানার আগে ১৯৫২ সালে মিলার এবং উরির ল্যাব থেকে একটু ঘুরে আসি, সেখানে কি এক্সপেরিমেন্ট হচ্ছিলো তা একটু চুপিচুপি দেখে আসি, তারা ল্যাবেরটরিতে খুব সহজ একটি পৃথিবী তৈরি করলেন, কাচের আবদ্দ্ব একটি গোলকে পানি, মিথেন, এমোনিয়া এবং হাইড্রোজেনে আবদ্দ্ব করে সেখানে তাপ দিয়ে পানিকে বাষ্পীভূত করে আবার সেটাকে শীতল করে তরল করতে থাকলেন, পৃথিবীতে যেরকম সমুদ্র থেকে পানি বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে বজ্রপাত হয়, সেটি সৃষ্টি করলেন বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ দিয়ে। কিছুদিনের ভিতর তারা দেখলেন এই প্লাক্সের ভিতর জীবন সৃষ্টির জন্য প্রয়োজনীয় এমিনো এসিডগুলোর বড় একটি অংশ তৈরি হয়ে গেছে। অর্থাৎ পৃথিবীতে যে প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল এবং যে অজৈব গ্যাস ছিল সেগুলো দিয়েই পৃথিবীতে জৈব মৌল তৈরি হতে পারে এবং দীর্ঘ সময়ে সেগুলো ক্রিয়া বিক্রিয়া করে এই পৃথিবীতেই প্রানের সৃষ্টি সম্ভব।

প্রাণ সৃষ্টির উৎস অনুসন্ধানের পূর্বে পদার্থ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারণার প্রয়োজন আছে। আমরা জানি পদার্থ দুই প্রকার। মৌলিক ও যৌগিক। যে সব পদার্থের সমন্বয়ে উদ্ভিদ ও জীবদেহ গঠিত হয় তাকে বলে জৈব পদার্থ এবং বাদবাকিগুলো অজৈব পদার্থ। জৈব ও অজৈব পদার্থের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হল, জৈব পদার্থের প্রত্যেকটি অণুর কেন্দ্রে একটি মৌলিক পদার্থের পরমাণু থাকে, যাকে কার্বন বলা হয়। কার্বনের বাংলা অঙ্গার বা ছাই, জৈব পদার্থ পুড়ালে সবসময় এই অঙ্গার পাওয়া যাবে। তাহলে বুঝা গেল কার্বনই জৈব পদার্থের মূল উপাদান কিন্তু এটিই শেষকথা নয়। পদার্থবিশেষে এর সাথে মিশে থাকে অক্সিজেন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, গন্ধক এবং আরও অনেক পদার্থ। জৈব পদার্থের অণুর গর্ভস্থ কার্বনের সাথে এইসব পদার্থের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় মিলনের ফলে জন্ম হয় ভিন্ন ভিন্ন জৈব পদার্থের। যেমন-কার্বন ও হাইড্রোজেন মিশালে পাওয়া যায় হাইড্রোকার্বন।

origin of life

জীবদেহ যেহেতু জৈব পদার্থ, এর ক্ষয়পূরণ ও পুষ্টির জন্য প্রয়োজন হয় খাদ্যের। খাদ্য গ্রহণের প্রধান উদ্দেশ্য হল কার্বন সংগ্রহ করা। জীব-জন্তু কার্বন সংগ্রহ করে লতা-পাতা, তরি-তরকারি, কীট-পতঙ্গ, মাছ-মাংস ইত্যাদি থেকে। সংগৃহীত কার্বন বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে রূপান্তরিত হয় জৈব পদার্থে। উদ্ভিদ কার্বন সংগ্রহ করে বাতাস থেকে। এখন প্রশ্ন জাগতে পারে এই জৈব পদার্থ সৃষ্টি হল কিভাবে- আকাশে আমরা যেসব নক্ষত্র দেখে থাকি তাদের মধ্যে আয়তন ও উত্তাপের পার্থক্য আছে। সর্বনিম্ন ৪০০০˚ সে. থেকে সর্বোচ্চ ২৮০০০˚ সে. উত্তাপের নক্ষত্র আছে। স্পেক্ট্রোস্কোপ যন্ত্রের সাহায্যে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, খুব বেশি উত্তপ্ত নক্ষত্রদের কার্বন পরমাণুরা একা একা ভেসে বেড়ায়। এরা অন্যকোন প্রমাণুর সাথে জোড় বাঁধে না। কিন্তু যে সব নক্ষত্রের উত্তাপ ১২০০০˚ সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি, সেখানে কার্বন পরমাণু হাইড্রোজেন পরমাণুর সাথে মিলে সৃষ্টি করেছে হাইড্রোকার্বন। এই হাইড্রোকার্বন একটি জৈবিক পদার্থ। বিজ্ঞান বলে এখান থেকেই জৈবিক পদার্থ সৃষ্টির সূত্রপাত। এ তো গেল নক্ষত্রের কথা, পৃথিবীতে কার্বন সৃষ্টি হল কিভাবে ?

আমরা জানি সূর্যের বাইরের উত্তাপ প্রায় ৬০০০˚ সে. । সূর্যের মধ্যে দেখা গেছে একাধিক মৌলিক পদার্থের মিলন ঘটতে। সেখানে কার্বনের সঙ্গে হাইড্রোজেন, কার্বনের সঙ্গে নাইট্রোজেন, কার্বনের সঙ্গে কার্বনের মিলন ঘটছে। ফলে সেখানে একাধিক জৈব পদার্থের জন্ম হয়েছে । উল্কাপিন্ডের দেহ পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ পেয়েছেন, উল্কার দেহে কার্বন ও ধাতুর মিলনে জন্ম হয়েছে কার্বাইড। ইটিও একটি জৈব পদার্থ।

সূর্য, নক্ষত্র ও উল্কার দেহে যে প্রক্রিয়ায় জৈব পদার্থ জন্মেছে, পৃথিবীতেও অনুরূপ প্রক্রিয়ায় জৈব পদার্থ সৃষ্টি হয়েছে। পৃথিবীতে বর্তমানে যে পরিবেশ বিরাজমান আদিতে তেমনটি ছিল না। পৃথিবী ও সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলো সূর্যের খন্ডিত টুকরো। জন্মলগ্নে এই গ্রহগুলো ছিল জলন্ত এবং তাপমাত্রা প্রায় সূর্যের সমান। তখন এগুলো গ্রহ ছিল না, নক্ষত্রই ছিল। কোটি কোটি বছর জ্বলার পর এগুলোর জ্বালানি নিঃশেষ হয়ে গেলে এগুলো গ্রহে পরিণত হয়। সূর্য থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে সৌরজগতের গ্রহগুলো সূর্যকে আকর্ষণ করে প্রদক্ষিণ করছে। উপগ্রহগুলো গ্রহ থেকে সৃষ্টি হয়েছে, তাই এগুলো গ্রহকেই আকর্ষণ করে প্রদক্ষিণ করছে । যেমন-চাঁদ পৃথিবীর উপগ্রহ। এটি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া একটি অংশ, তাই চাঁদ পৃথিবীকে আকর্ষণ করে ঘুরছে। আদি পৃথিবীর জলন্ত সময়কালেই পৃথিবীতে জৈব পদার্থের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রোটিন তৈরি হয় হাজার হাজার কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন পরমাণুর সুবিন্যস্ত সংযোগে । বিজ্ঞানীরা বলেন, পৃথিবীর আদিম সমুদ্রে প্রোটিন তৈরি হওয়ার মত অনুকূল পরিবেশ বজায় ছিল। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর আদিম সমুদ্রে হাইড্রোকার্বনের নানা রূপান্তরে তৈরি হয়েছিল প্রোটিন। এই প্রোটিন হতে জন্ম নিয়েছিল জীবদেহের মূল উপাদান প্রোটোপ্লাজম।

 

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে প্রকৃতির কাজ কি ? প্রকৃতির একমাত্র কাজ পরিবর্তন করা। এই পরিবর্তনকেই বিবর্তন বলা হয়। যা আমাদের চোখের গোচরে ঘটছে কিন্তু আমরা সেভাবে চিন্তা করছি না । তবে পৃথিবীতে বিভিন্ন বস্তুর বিবর্তনের সময়-কাল এক নয়। এদের মধ্যে ব্যবধান অনেক দীর্ঘ। বিবর্তনের জন্য যেটা জরুরী তা হচ্ছে উপযুক্ত পরিবেশ । আমরা জানি পৃথিবীর মেরু অঞ্চলে পানি জমে বরফে পরিণত হয় । বরফ পানির বিবর্তিত রূপ। কিন্তু বাংলাদেশের পানিকে প্রকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বরফে রূপান্তরিত করতে পারে না । এটার কারণ হচ্ছে পরিবেশের তারতম্য । প্রকৃতি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দুধকে দধিতে ও তালের রসকে তাড়িতে পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু রেডিয়ামকে শীশায় পরিণত করতে সময় লাগে লক্ষ লক্ষ বছর । ঠিক অনুরূপ কার্বন (জৈব পদার্থ) হতে একটি প্রোটোপ্লাজম সৃষ্টি করতে প্রকৃতির সময় লেগেছে প্রায় একশত কোটি বছর। পদার্থ জৈব হলেই তা জীব একথা বলা যায় না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে জীবনের লক্ষণ প্রকাশ না পায়। কোন পদার্থে দেহপুষ্টি ও বংশবৃদ্ধি এই লক্ষণ দুটি যদি প্রকাশ পায় তাহলে নিশ্চিতভাবে বলা যায় ঐ পদার্থটি সজীব । প্রোটোপ্লাজমের মুখ্য উপাদান প্রোটিন এবং এটি ছাড়াও আরও বিভিন্ন জৈব-অজৈব পদার্থ। এটি আদিম সমুদ্রের জলে গোলা দ্রব অবস্থায় ছিল। এটি সম্পূর্ণ জলে মিশে না, জলের উপর ভাসমান অবস্থায় থাকে। যার ইংরেজি নাম কলয়ডাল সলিউশন। এই সলিউশন জৈব বা অজৈব উভয় পদার্থের হতে পারে। অজৈব পদার্থের সলিউশন দ্রবীভূত হয়ে জলের নিচে পড়ে থাকে। এখানে জৈব ও অজৈব পদার্থের মধ্যে একটি চরিত্রগত পার্থক্য প্রকট হয়ে উঠেছে । জৈব পদার্থের সলিউশন জলে ভেসে থাকার সক্ষমতা অর্জন করেছে, পক্ষান্তরে অজৈব পদার্থের সলিউশন জলে আত্মসমর্পণ করেছে। জৈব কলয়ডাল সলিউশনের মধ্যে এই স্বকীয়তা দেখা গেছে যে, সে জলের শক্তির কাছে নিজেকে সমর্পণ করতে রাজী নয়।

কলয়ডাল সলিউশনের মধ্যে একটি বিশেষ গুণ দেখা যায়। এটি জলে ভাসমান অন্য জৈব-অজৈব পদার্থকে আত্মসাৎ করে নিজ দেহ পুষ্ট করতে থাকে। এই প্রক্রিয়া লক্ষ লক্ষ বছর চলতে থাকলে কলয়ডাল জৈব পদার্থটি আয়তন ও ওজনে বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং একটা পর্যায়ে এসে ফেটে দুই টুকরা হয়ে যায়। এই টুকরাদ্বয় পূর্বের মত আলাদা আলাদাভাবে পুষ্ট হতে থাকে এবং আরও একটা পর্যায়ে এসে ফেটে চার টুকরা হয়। কালের পরিক্রমায় চার টুকরা ফেটে হয় আট টুকরা। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল কলয়ডাল পদার্থটির পুষ্টি ও বংশবৃদ্ধির ধারাটি। আমরা জানি জীবনের প্রধান বৈশিষ্টের মধ্যে অন্যতম হল পুষ্টি ও বংশবিস্তার করা। এই বিশেষ ধরনের কলয়ডাল পদার্থটির নাম প্রোটোপ্লাজম বা সেল । বাংলায় জীবকোষ বলা হয়। আদিম সমুদ্রের জলে অতি সামান্য প্রোটোপ্লাজম বিন্দুকে আশ্রয় করেই প্রথম প্রাণের অভ্যুদয় এবং পৃথিবীতে শুরু হয়েছিল জীবনের অভিযান । এ বিষয়ে বিজ্ঞানীদের কোন দ্বিমত নেই । সেই প্রাণ ছিল খুবই সহজ সরল, এক কোষী একটি প্রাণী, যার ভেতরে কোন নিউক্লিয়াস পর্যন্ত নেই। এই অত্যন্ত আদিম সহজ সরল এক কোষী প্রাণী পৃথিবীতে একদিন দুইদিন নয়, কয়েক বিলিওন বছর টিকে ছিল। অনুমান করা হয় এই সময় পৃথিবীতে ভাইরাসেরও জন্ম হয়ে গেছে। সকল প্রাণীর নিঃশ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকার জন্যে প্রয়োজনীয় যে অক্সিজেন, পৃথিবীতে সেই অক্সিজেন আসার পর নানা ধরনের বিক্রিয়া হয়ে পৃথিবীর পরিবেশের পরিবর্তন হতে শুরু করলো।

প্রায় আরো এক বিলিওন বছর কেটে গেল। আজ থেকে নয়শত মিলিওন বছর আগে প্রথম বহুকোষী প্রাণের জন্ম হলো। এই বহুকোষী প্রানী সৃষ্টি হওয়ার একটা প্রক্রিয়া শুরু হলো। বহুকোষী প্রাণিগুলো পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়ার জন্যে নানা ধরনের বিবর্তনের মাঝ দিয়ে যেতে লাগলো। এভাবে প্রায় চারশত মিলিওন বছর কেটে গেলো। আজ থেকে প্রায় সাড়ে পাঁচশত মিলিওন বছর আগে প্রথম এক ধরনের প্রাণের জন্ম হলো যার শরীরে মেরুদন্ডের আভাস রয়েছিলো।

বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করলেন ‘প্রাণ’ শক্তিটি কোন কোন পদার্থের সম্মিলিত রাসায়নিক ক্রিয়ায় উদ্ভূত একটি অভিনব শক্তি। পৃথিবীর আদি অবস্থায় তাপ, আলো, বায়ুচাপ, জলবায়ুর উপাদান ইত্যাদির পরিমাণ প্রাণ সৃষ্টির অনুকূল ছিল বলে তখন প্রাণের উদ্ভব সম্ভব হয়েছিল। প্রকৃতির সেই আদিম অবস্থা আর নেই, তাই এখন চলছে বীজোৎপন্ন প্রাণ প্রবাহ বা প্রাণ থেকে প্রাণ উদ্ভবের ধারা। কিন্তু বিজ্ঞানীরা গবেষণা করছিলেন কৃত্রিম উপায়ে প্রাণ সৃষ্টি করা যায় কি না ? ১৮২৮ খৃষ্টাব্দে জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রেড্রিক ওহলার টেস্টটিউবে ইউরিয়া (জৈব পদার্থ) তৈরি করে প্রমাণ করেন, প্রকৃতির ন্যায় মানুষ জৈব পদার্থ তৈরি করতে পারে।

এই ছিল আমাদের পৃথিবীতে প্রথম প্রাণের উৎপত্তির ইতিহাস, ২য় পর্বে আলোচনা করা হবে কিভাবে বহুকোষী প্রাণী থেকে সমস্ত পৃথিবীতে প্রাণিজগতের “বৈচিত্রের” বিষ্পোরন ঘটলো। এতক্ষন ধৈর্য্য ধরে পোস্ট টি পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।

তথ্যসূত্র –

https://en.m.wikipedia.org/wiki/Earliest_known_life_forms

https://en.wikipedia.org/wiki/Miller%E2%80%93Urey_experiment

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

− 2 = 4