বিদেশের মাটিতে বিপ্লবের স্বপ্ন বুনা যায় ,কিন্তু বিপ্লব করা যায়না।

পাহাড়ের কিছু শিশুসুলভ রাজনীতি মানসিকতা সম্পন্ন জুম্ম তরুণদের লুফে নিয়ে এতদিন শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভেদের দেয়াল তৈরি করে আসছিল। ৯০ দশকেও জাতির সাথে বিভেদের হোলিউৎসবে মেঠে উঠেছিল এক ঝাঁক বিপদগামী জুম্ম তরুণদের সাথে নিয়ে। সেই তরুণদের শিশুসুলভ রাজনীতির সুযোগ নিয়ে শাসকগোষ্ঠী এতদিন চুক্তি বাস্তবায়নে অন্তরায় হয়ে থেকেছিল। শাসকগোষ্ঠী ফাঁদে পড়ে জুম্ম জাতিকে বিভক্তি, অনৈক্য, সংঘাত উপহার দিয়েছিল এই প্যারিস চাকমার মতন তরুণরাই। তাদের সেই শিশুসুলভ রাজনীতির কারণে জুম্ম জাতিকে আজও কঠিন পরিস্থিতি মুখোমুখি হয়ে চলতে হচ্ছে। বিভেদ কারা সৃষ্টি করেছিল? এই প্যারিস চাকমার মতন কাণ্ডজ্ঞানহীন, রাজনৈতিকগতভাবে অপরিপক্ক তরুণরাই সেদিন বিভেদের দেয়াল তৈরি করে শাসকগোষ্ঠী ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের দ্বার উন্মোচিত করে দিয়েছিলেন। সবাই যখন চুক্তি স্বাক্ষরের পক্ষে আনন্দে নেচেছিলেন, খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন তখন একদল প্যারিস চাকমার মতন তরুণ জুম্ম জাতির বুকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন। আজও সেই অনৈক্যের বোঝা জুম্ম জাতিকে বহন করতে হচ্ছে। শাসকগোষ্ঠী যে ব্যুহচক্র চরনা করেছিল সেই ব্যূহচক্রে ঢুকেছে অনেক বিপদগামী জুম্ম তরুণ। তারমধ্যে প্যারিস চাকমাও একজন অন্যতম অনুচর। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম প্রতিক্রিয়াশীল, বিভেদপন্থী ও সুবিধাবাদী দলের সদস্য হয়েও তিনি দাবী করেন নিজেই একজন সাধারণ বুদ্ধিজীবী লেখক। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের প্রাণপ্রিয় নেতা শ্রী জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমাকে একদিকে আজু বলে পায়ে ধরে সমীহ করেন, অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর ন্যায় কখনো সন্তু লারমা কারোর দ্বারা প্ররোচিত হন এবং সন্তু লারমা কারোর পরামর্শ কর্ণপাত করেন না, নানাভাবে তকমা লাগিয়ে সমীহ করার বিপরীতে মাথায় লাঠি ঘুরানোর চেষ্টা করবেন-এধরণের অসৌজন্যমূলক ও শিষ্টাচার বহির্ভূত আচরণ জুম্ম জনগণের কাছে কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না। এমন একটি সময়ে তার এই লেখাটি ছুঁড়ে দিলেন যখন জুম্ম জনগণের মধ্যেকার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দুটি দলের মধ্যেকার ঐক্যের বাতাবরণ বয়তে শুরু করেছে। এই প্যারিস চাকমার বিরুদ্ধে অভিযোগের কোন শেষ নেই যা জুম্মস্বার্থ পরিপন্থী ও চুক্তি বিরোধী এবং জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতির সুদৃঢ় ভিত্তিকে ভাঙ্গণ ধরাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়েছে বলে জানা যায়। একদিকে জুম্ম জাতির মধ্যে(চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা ও তঞ্চঙ্গ্যা) ভাগ করে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করার সুগভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে জুম্ম জাতীয় নেতাদের কাছে অবাস্তব প্রস্তাবনা দিয়ে রাজনীতি অ-আ শেখানোর চেষ্টা। আপনার এধরণের ভূঁয়া চিঠি, প্রবন্ধ লিখে শাসকগোষ্ঠীর মন গলানো যাবে ঠিক কিন্তু জুম্ম জনগণের অধিকার অর্জন কখনো সম্ভব নয়।

এখানে শেষ নয় বন্ধুরা, Amit Hill নামে এক ফেইক আইডি পোস্টে লিখেছেন বিদেশের মাটিও বিপ্লবের স্বপ্নভূমি হতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে উল্লেখ করেছেন, হো চি মিন আর চে গুয়েভারা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকেও উদ্ধৃত করেছিলেন। কিন্তু একথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন যে, তিনি প্যারিস চাকমাকে বাঁচাতে মরীচিকার পেছনে লাফ দিয়ে চলেছেন। বিদেশের মাটিতে বসে বিপ্লবের স্বপ্ন বুনা যায়, বিপ্লব করা যায় না। একথা স্মরণ করার জন্য Amit Hill নামক ফেইক আইডিকে আবারও ইতিহাসের ঘটনাবলীর পূনরাবৃত্তি করে দেখাতে হবে। যদি তাই করতে হয়, তবে সে সামর্থ্য পৃথিবীর কারোর নেই। কেননা সময়কে পেছনে নিয়ে যাওয়ার মতন শক্তি আর সামর্থ্য দুটোই কারোর নেই, আছে কেবল অতীত সময়ের পূঙ্খানুপূঙ্খ বিশ্লেষণ করার, তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার সামর্থ্য।

যাইহোক, হো চি মিন বিদেশের মাটিতে থেকে বিপ্লবের স্বপ্ন বুনেছিলেন, কিন্তু তার সে স্বপ্ন ভিয়েতনামের বাস্তব অবস্থা থেকে কোন কালেই বিচ্ছিন্ন ছিল না এবং তিনি সেকারণেই বিদেশের মাটিতে বিপ্লবী বাহিনী গঠন করা শুরু করেছিলেন। আর সেই বিপ্লবী বাহিনী কাজ করেছিল ভিয়েতনামের বিপ্লবের জন্যেই এবং অবশ্যই ভিয়েতনামের জনগণকে সাথে নিয়ে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আর সেটা ভিয়েতনামের অভ্যন্তরেই এটায় বাস্তব সত্য। তারা কেবলমাত্র বিদেশ থেকে আপনাদের মতন করে চিল্লাইয়া, দাঁত বের করে কলমের কালি খরচ না করে ফেইসবুকের বুলি দিয়ে সেটা করেননি। ভিয়েতনামের জনগণের অগ্রগামী বাহিনীকে সাথে নিয়ে সবচেয়ে শ্রেণীসচেতন, প্রগতিশীল মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে ধারণ করেই মৃতঃপ্রায় পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায় সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। আর বিদেশের মাটিকে কেবল পশ্চাদভূমি হিসেবেই ব্যবহার করেছিলেন, বিপ্লবের ভূমি হিসেবে নয়-বুঝেছেন?

তিনি Amit Hill ফেইক আইডি থেকে এমএন লারমার উদাহরণ টেনেছেন, একইভাবে। কিন্তু তিনি বরাবরই একজন ভুল পথের পথিকের দ্বারা পরিচালিত হলেন। এম এন লারমা ভারতে বসে বিপ্লব করেননি, তিনি কেবল পশ্চাদভূমি হিসেবে সেটা ব্যবহার করেছেন। বিপ্লবের ভূমি হিসেবে নয়। তাই আমার অনুরোধ হলো এই রঙবস্ত্র পরিধান করে ধর্মীয় লেকচার করুন, তাতে আমার আপত্তি নেই। তবে রাজনীতি বিষয়ে বলবার আগে তার অবস্থা, প্রকৃতি সবকিছুকে মূল্যায়ন করার সামর্থ্য অর্জন করে তা করবেন। আর প্যারিস চাকমা যদি আমেরিকাকে (সাম্রাজ্যবাদের মূলভূমি) পশ্চাদভূমি হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তাহলে কেবল আমার নয়, সমগ্র অধিকারকামী মানুষদের মুচকি হাসির খোরাক যোগাবেন। মাও সেতুং এর সেই অমোঘবানী আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই,”বিপ্লব কোন ভোজসভা নয়, প্রবন্ধ রচনা কিংবা সূচিকর্মও নয়, বিপ্লব হচ্ছে অভ্যূত্থান, উগ্র বলপ্রয়োগের কাজ। যার দ্বারা এক শ্রেণী কর্তৃক আরেক শ্রেণীকে উৎখাত করে। শোষিতশ্রেণি ও শোষকশ্রেণিকে উৎখাত করে থাকে।

বিশেষ করে প্যারিস চাকমার লেখনী দেখলে না বোঝার কোন উপায় নেই, তিনি কারোর দ্বারা প্ররোচিত এবং সেটা অবশ্যই এমন কারোর দ্বারা, যারা জুম্ম জনগণের আন্দোলনের বিরুদ্ধ শক্তি। তা না হলে নিজের এমন মনগড়া বক্তব্যের দ্বারা জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং আন্দোলনের প্রক্রিয়াকে ভিন্ন পথে প্রবাহিত করার কেন প্রয়াস করেন। যদি সৎ সাহস আর সৎ পরামর্শের দ্বারা তার বোধ পরিচালিত হতো, তাহলে স্বয়ং এসে জনকল্যাণের জন্য নিজেকে সোপে দিতেন, এরকম বাইরে বসে উস্কানীমূলক আর বিভেদমূলক লেখনী প্রচার করতেন না অথবা এমন কিছু লিখতেন, যার দ্বারা জুম্ম সমাজের ভাঙন নয়, ঐক্যতা অর্জিত হয় । প্যারিস চাকমার লেখা দেখলে এমননি বুঝা যায় তার জ্ঞানের সীমা কতটুকুই হবে। তিনি অন্যের দ্বারা চালিত ও দাবা গতির ভূমিকায় অবতীর্ণ।

আমি আরও উল্লেখ করতে চাই, প্যারিস চাকমা লেখাতে নামে-বেনামে সেনা ডিজিএফআই, শাসকগোষ্ঠীর লেজুর-দালাল, আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফ কর্মীদের মধ্যে থেকে ব্যক্তিগতভাবে তাকে সমর্থন দিয়ে কমেন্ট করতে দেখেছি। এহেন পরিস্থিতি ও বাস্তবতার মধ্যে আঞ্চলিক দল থেকে যদি এধরণের উগ্রবাদী, সাম্প্রদায়িক উস্কানীদাতা ও কাণ্ডজ্ঞানহীন প্যারিস চাকমাদের লুফে নিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের প্রয়াস চালায় তাহলে জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করার চলমান প্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে, তার কোন সন্দেহ নেই। আবার দেখেছি প্যারিস চাকমা, Amit Hill তাদের বিতর্কিত লেখাগুলো তাদের নিজস্ব ওয়াল থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে দিয়ে নিজেরাই ভাল মানুষ সাজবার জন্য লেখাগুলো মুছে ফেলেছেন। কি চমৎকার সস্তায় জনপ্রিয়তা অর্জনের থিওরি! Mukti Chakma আইডি থেকে বলা হল অসহিষ্ণু মানসিকতা জুম্মদের লড়াইয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা-তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিভক্তির রাজনীতি ধারা থেকে বেড়িয়ে এসে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের জন্য সন্তু লারমাকে প্রধান কান্ডারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার নাকি আহ্বান করেছিলেন। তাই আবারও বলছি, প্যারিস চাকমা তার চিঠি লিখাতে বলেছিলেন, সন্তু লারমা কারোর দ্বারা প্ররোচিত এবং কারোর পরামর্শ কর্ণপাত করেন না, গোষ্ঠীবাদের মধ্যেও ফেলানোর অপচেষ্টা করেছিলেন-এগুলো লেখার উদ্দেশ্য কি সন্তু লারমাকে কান্ডারী মনে করা বুঝায়? আবার আপনারা এই উগ্রবাদী, কাণ্ডজ্ঞানহীন প্যারিস চাকমাকে রক্ষার্থে তার চাপাই গাইছেন, গেয়ে চলেছেন। এভাবে অনেকেই প্যারিস চাকমার উগ্রতা ও সাম্প্রদায়িকতা ও কাণ্ডজ্ঞানহীন শিশুসুলভ রাজনীতিকে ব্যবহার করে ফায়দা লুটে নেওয়ার জন্য এবং সস্তায় জনপ্রিয়তা লাভের উদ্দেশ্যে পক্ষাবলম্বন করে চলেছেন। তাই সেখান থেকে সবাই বেড়িয়ে আসুন, জুম্ম জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ়করণে ঐক্যবদ্ধ হউন।

তাই এই মুহুর্তে সকলকে সতর্কতার সাথে কদম ফেলতে হবে, শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা না দিয়ে তাদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কলমের শক্তিকে জাগ্রত করুন। প্যারিস চাকমাদের ফাঁদে পা দেবেন না, রাষ্ট্রীয় বাহিনী এবং তাদের মদদপুষ্ট লেজুর বাহিনীর সমস্ত রকমের অপকর্মগুলোকে জনসমক্ষে প্রচার করে দিয়ে, তাদের ভন্ডামীর মুখোশ উন্মোচন করে দিন। সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হোক।

লেখকঃদর্পন তঞ্চঙ্গ্যা(আদিবাসী অধিকার আন্দোলনের কর্মী)

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

+ 45 = 47