ধর্মের শেষ হয় ইশ্বরের পায়ে আর বিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত!

আপনারা এই যে বিজ্ঞান বনাম ধর্ম নিয়ে এত কথা বলছেন এসব অভ্যাস কিন্তু অামাদের একদিনে হয়নি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা এই মন্দির আর মসজিদের ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। আর স্বাধীন দুই দেশের নাম হয়েছিল ভারত, পাকিস্তান। তারপর পাল্লা দিয়ে দুই প্রন্তে গড়ে উঠতে থাকে মন্দির, মসজিদ। তখন এই মন্দির মসজিদ গড়ার মূল মদদ জুগিয়েছিলো রাষ্ট্রগুলো। শুধুমাত্র এই ধর্মকে পূজি করেই রাজনীতিতে সফল হয়েছিল তৎকালীন রাষ্টনায়কেরা। শান্তিপ্রিয় ধর্মভীরু মানুষকে হিংস্র করেছে দুইশো বছরের ইংরেজি শাসন। আর সেই আগুনে ঘি ঢেলে স্বাধীন হয়েছে দুই রাষ্ট্র।

ইতিহাসের মধ্যে অনেক ইতিহাস থাকে। সেইসব ইতিহাস গুলো মানুষের অজানা থাকে। সেই অজানা ইতিহাসের উপর গড়ে উঠেছে অাজকের এই বাংলাদেশ। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আর ধর্মীয় বিভেদের ফলে গড়ে উঠা রাষ্ট্র থেকে আমরা কি বা আশা করতে পারি? যখন বিভেদ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তখনো বিজ্ঞান ছিল নিষ্ক্রিয় দর্শক। শুধুমাত্র নিভৃতে কাজ করে চলেছেন কিছু মানুষ। একদিকে ধর্ম নিয়ে মাতামাতি চলছে অন্যদিকে বিজ্ঞানে আগ্রহ নেই জনতার।

ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের মধ্য অাদৌতে কোন যুদ্ধ ছিল না। মূলত এই দুয়ের যোগসূত্র যে ইতিহাস তা মানুষের অজানা ছিল। মূলত বিভেদ সেই অজানা ইতিহাসের কারণে। এখানে উনিশ শতকের একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে।

ধর্ম এবং বিজ্ঞানে বিশ্ব বিজয় করে ফিরেছেন দুই বাঙালী। একজনকে সংবর্ধনা জানাতে লক্ষ জনতার ঢল। লঞ্চঘাট থেকে ট্রেন স্টেশন কোথায় তিল পরিমাণ মানুষ ধারণের যায়গা নেই। অন্যজন অত্যন্ত সাদামাটা একা-একা ফিরলেন দেশে। শুধুমাত্র স্ত্রী আর কাকামশাই এগিয়ে নিতে এসেছেন রেল স্টেশনে। আমি বলছিলাম বাঙালির ধর্ম এবং বিজ্ঞান বিজয়ীদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কাহিনী। একজন হলেন স্বামী বিবেকানন্দ এবং অন্যজন জগদীশ চন্দ্র বসু।

কলম্বাসের অামেরিকা অাবিষ্কারের একশ বছর পূর্তি উপলক্ষে শিকাগো শহরে বিশ্ব ধর্ম সম্মেলন বসেছিল। দিক দিগন্ত থেকে হাজির হয়েছিল ধর্ম প্রচারকেরা। বিশাল সেই মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন সব ধর্মের মহান ব্যক্তিবর্গ। এক বাঙালী যুবক সেখানে ধর্মের কথা বললেন। সারা ইউরোপ জুড়ে সারা পড়ে গেল। সেই যুবকের নাম স্বামী বিবেকানন্দ। সেই বাঙালী যুবক যখন ভারতে পদার্পণ করলেন তখন লাখো মানুষের ঢল নামলো, মানুষ জয়োধ্বনি করতে লাগল। মুম্বাই থেকে কলকাতা ফেরার পথে জনতা ট্রেন আটকিয়ে সেই মহান মানুষটিকে এক নজর দেখল। মিডিয়া সংবাদপত্র সব যেন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। সারা ভারত জুড়ে হুল্লোড় পড়ে গেল ভারতের ধর্ম বিজয় উপলক্ষে।

অন্যদিকে, প্যারিসের শতাব্দী পূর্তি উপলক্ষে অন্তর্জাতিক পদার্থ বিজ্ঞান মেলার অায়োজন করা হয়েছিল। সেখানে দিক-বি-দিক থেকে মহা বিজ্ঞানীরা কেরামতি দেখাতে উপস্থিত হয়েছিলেন। এক ভারতীয় বাঙালী সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাঙালিবাবু তার গবেষণা লব্ধ জ্ঞান সকলের সামনে উপস্থাপন করলেন। চোখ ছানাবড়া করে সব বিজ্ঞানীরা যেন তা মেনে নিতেই চাইলেন না। তখন তিনি উপস্থাপন করলেন তার যুক্তি এবং প্রমাণ। অবশেষে তাঁর আবিষ্কার মেনে নিতে হল সমস্ত বিজ্ঞান মহলে। সেই বাঙালী বাবু যখন দেশে ফিরলেন তখন ভারতবাসী নিশ্চুপ। যেখানে অন্তর্জাতিক জার্নাল গুলো হুমড়ি খেয়ে পড়ল সেখানে ভারতীয় কোন মিডিয়ায় কোথাও কোন খবর নেই। যেন কেও কিছু জানেই না।

সাধারণ ভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে মনে হতে পারে বিজ্ঞানে মানুষের অাগ্রহ নেই। কিন্তু আদৌতে তা নয়। অামার একান্তই ব্যক্তিগত মতামত এই যে বিজ্ঞান সম্পর্কে মানুষের অজ্ঞতাই এর প্রধান কারণ। উল্লেখ্য দুই ঘটনায় দেখা যায় যে বিবেকানন্দের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের খবর গোটা ভারত জানে। জানে কারণ ঢালাই ভাবে প্রচার করা হয়েছিল সেই খবর। অন্যদিকে জগদীশ চন্দ্র যে দেশে ফিরলের, বিজ্ঞানের এমন জিনিস অাবিষ্কার করলেন, ইউরোপ কাপিয়ে এমন বিজয় নিয়ে অাসলেন তা সকলের অজানা।

এবার এই বিজ্ঞান অার ধর্মের প্রচার এবং প্রসার নিয়ে দুটি কথা বলে বাঙালীবাবু দ্বয়ের প্রসঙ্গ ইতি টানছি। জগদীশ চন্দ্র বিজ্ঞান সভা কিংবা বিজ্ঞান গবেষণা করার জন্য অর্থ সাহায্য পাচ্ছিলেন না অন্যদিকে বিবেকানন্দ ভারতবর্ষের চর্তুদিকে মঠ প্রতিষ্ঠা করতে লাগলেন। ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্র সহ সকলে সেই অর্থের জোগান মিটিয়েছেন।

ধর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে একটু ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে দেখা যাবে আমার পূর্বপুরুষের পূর্বপুরুষেরা কিন্তু একসাথে গলা মিলিয়ে চলেছেন। বাংলায় গোলা ভরা ধান, মুকুর ভরা মাছের যে সমস্ত ইতিহাস পাওয়া যায় তা সম্ভবত সেই সময়ের। কিন্তু এই বাংলায় এত প্রাচুর্য থাক সত্ত্বেও চতুর্দশ শতকে ইবনে বতুতা বাংলাকে প্রাচুর্যের নরক বলে গেছেন। সেই সময়ে ইসলাম মূলত বাংলায় দলা পাকাতে শুরু করেছে। সুফিসাধক হজরত শাহাজালাল তখন সিলেটে গোড়াপত্তন করেন ৩৬০ অাওলিয়া নিয়ে এক যুদ্ধ বিজয়ের মধ্য দিয়ে। হিন্দু মৌলবাদ চারিদিকে ছেয়ে পড়েছে। তখনি মূলত সত্য ইতিহাসকে ধর্ম এবং রাষ্ট্র কোন পক্ষই প্রকাশিত হতে দিচ্ছে না। মূল সমস্যার গোড়া পত্তন তখন থেকে শুরু হতে থাকে।

এইযে ধামাচাপা ইতিহাসের কারণে গোটা বঙ্গালা অাজ রণক্ষেত্র। এর মোদ্দা করাণ হল সুশিক্ষার অভাব। সর্বস্তরে শিক্ষা প্রবেশ না করায় অামরা গুটি কতক মানুষের কথাকে বেদ বাক্য মেনে নিয়েছি। অামরা জানতে পারেনি সৃষ্টি কর্তার অাসল রহস্য। ধর্ম প্রচারকেরা অাড়ালে ঢেকে রেখেছেন অামাদের মহান সৃষ্টিকর্তাকে। মানুষের হৃদয়ে যে সৃষ্টিকর্তার বাস তা স্থাপিত করেছে মসজিদ, মন্দির, মাজার, দরগা, মঠ গুলোতে। সৃষ্টির রহস্য লুকায়িত অাছে যে কুরান, পুরান, বাইবেল, ত্রিপিটকে তার পাঠদান কেন্দ্র কোথাও ছিল না এবং এখনো নেই। এর ফলে মানুষের থেকে ক্রমস দূরত্ব তৈরি হয় সৃষ্টিকর্তার। মধ্যপন্থি হিসাবে হাজির হয় ধর্ম প্রচারকের দল। যারা পরবর্তী সময়ে নিজেদের প্রয়োজন মত পরিবর্তন করে নিয়েছে মূল গ্রন্থ এবং তার অর্থ গুলো। এখন সেই পরিবর্তিত গ্রন্থ গুলো পাঠদান করে ভূল ইতিহাস মানুষকে জানানো হচ্ছে। অার সৃষ্টিকর্তা রহস্য ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।

আমাদের গ্রামে মসজিদের সংখ্যা ৫ টি, মন্দির আছে ২ টো আর লাইব্রেরী সংখ্যা ০। যদি একটু পাশ্ববর্তী গ্রাম থেকে ঘুরে অাসি সেখানে মসজিদ ১১ টি অার মন্দির ৩ টি। লাইব্রেরি সংখ্যা ০। এখন যদি সমগ্র বাংলাদেশের দিকে একটু নজর দেওয়া যায় তবে দেশে মসজিদের সংখ্যা অাড়াই লাখের বেশি, মন্দিরের সংখ্যা চল্লিশ হাজার অার লাইব্রেরী সংখ্যা সর্বসাকুল্যে কত হবে? বাংলাদেশ গ্রন্থাগার পরিচালিত ৭০ টি লাইব্রেরী। উপজেলা শহরে একটা করে বন্ধ পাবলিক লাইব্রেরী এই তো।

শুধু ধর্ম কিংবা শুধু বিজ্ঞান দিয়ে কখনো জগতের কল্যান সম্ভব নয়। অাস্তিক নাস্তিক তর্কে গেলে সেখানে রক্তের এক ভয়াবহ ইতিহাস চোখের সামনে ভেসে উঠবে। জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারের সাথে বিজ্ঞান চর্চা মানব জাতির কল্যান বয়ে অানতে পারে। অজ্ঞনতা যখন জাতিকে ঘিরে ধরে তখন কুসংস্কার ভরে যায় মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে। ইতিহাস থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে ধ্বংস অনিবার্য।

তাহলে কি শিক্ষার হার ১০০% হলে আমরা সমস্যা থেকে মুক্তি পাবো? অামি বলবো কখনোই না। কারণ পাঠ্যবই কখনো ইতিহাস ধারণ করে না। অন্যদিকে অন্ধ শিক্ষা মানুষকে হিংস্র করে। ইতিহাস ব্যতিরকে শুধুমাত্র ধর্ম মানুষের বোধকে নষ্ট করে। জিহাদের নামে মানুষ হত্যা করে। ধর্মের নামে রক্ত গঙ্গা বয়ে চলে। কিন্তু ধর্ম কখনোই তা বলে না। শিক্ষা বিস্তারের মান উন্নয়ন ব্যতিরকে আমরা কখনোই মুক্তি পাবো না। গোড়ায় গলদ করে যতই যা করি কোন সমাধান মিলবে না।

ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের এই যুদ্ধে রাষ্ট্র সবসময় দুমুখো সাপ। যখন যে পাল্লা ভারী হয়েছে সেদিকে অবস্থান করেছে রাষ্ট্রগুলো। ইউরোপ থেকে বঙ্গলা সবখানে একই চিন্ত্র! তন্মধ্যে বাঙ্গলা দেশের অবস্থা বড়ই ভয়ানক। ইহা অাজিকার চিত্র নয়। শত বছর ধরে চলে অাসছে ধর্ম বনাম বিজ্ঞানের এই যুদ্ধ। যেখানে ধর্মের সমাপ্তি ঘটে ইশ্বরের পায়ে সমর্পিত হয়ে মনের অাত্মতৃপ্তিতে অার বিজ্ঞানের নতুন দিগন্তে। জগতের কল্যানে বিজ্ঞান এবং ধর্ম একে অপরের পরিপূরক। উভয়ের প্রয়োজন অনস্বীকার্য।

ফেসবুক মন্তব্য

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

55 − = 54